রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র বনাম সংঘতন্ত্র
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র নিয়ে যত কথা হয়েছে, সংঘতন্ত্র নিয়ে তেমন হয়নি। ভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপির উত্থান ও বর্তমান অবস্থানের পেছনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ভূমিকা সামনে আসার পর রাজনীতিতে সংঘতন্ত্র নিয়ে নানা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।
ভারতীয় ওই সংঘ একটি ধর্মভিত্তিক সংগঠন, কিন্তু রাজনীতিতে সংঘতন্ত্র অন্য কোনো মতাদর্শ ঘিরেও হতে পারে। পাকিস্তানে রাজনীতিতে যেমন সেনা সংঘের প্রভাব সুপরিচিত। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একসময় ছিল ‘পার্টিতন্ত্রের’ প্রভাব। এগুলো সংঘতন্ত্রেরই রূপভেদ।
বাংলাদেশেরও একাধিক সংঘ দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করে, কিন্তু রাজনৈতিক শ্রেণিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মতো শক্তি অর্জন করতে পারেনি কোনো সংঘই।
তবে নতুন পরিস্থিতিতে ধর্মভিত্তিক সংঘের জন্য পরিবারতন্ত্রের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে পরিবারতন্ত্রের সঙ্গে সংঘতন্ত্রের একটি তুলনা করা প্রয়োজন পড়েছে।
চিকিৎসকের সন্তান চিকিৎসক হয়, সংগীতকারের সন্তান সংগীতকার হয় এবং সমাজ সেটিকে ইতিবাচক হিসেবে নেয়; কিন্তু রাজনীতিকের সন্তান রাজনীতিক হলে সমাজ তা নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। দেখার যথেষ্ট কারণও আছে। সে কথায় পরে আসছি, কিন্তু প্রথমে একটা কথা বলা যাক।
সেটি হলো রাজনীতিক যখন কোনো পাবলিক প্রতিষ্ঠান চালান, তখন সেটি একটি পেশা হয়ে ওঠে। এখন সন্তান যদি রাজনীতিক হতে চান, অর্থাৎ রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নিতে চান, তাহলে মা-বাবার পেশা যা-ই হোক না কেন, তাঁদের কি সন্তানকে বাধা দেওয়া উচিত? উচিত নয়। আবার মা-বাবা চাইবেন তাঁদের পেশায় সন্তান আসুক, সেই চাওয়ামতো সন্তানকে গড়ে তোলার মধ্যেও দোষের কিছু নেই।
বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে এমনও উদাহরণ আছে, রাজনৈতিক নেতা যে ক্ষমতার আসনে আসীন হয়েছেন, তাঁর পরিবারের সদস্য সেই আসনে আসীন হয়েছেন গণতান্ত্রিক উপায়েই। সেখানেও সমস্যা নেই।
সমস্যা হয় তখন, যখন গণতন্ত্রের পরিবেশ থাকে না, সবার জন্য সুযোগ প্রতিষ্ঠা করার উপায় থাকে না। এ সমস্যার গোড়ায় পানি আসে আরও অনেক পটভূমি থেকে। সেই পটভূমি ও পরিবেশগুলো ব্যাখ্যা করলে আমরা দেখতে পাব, রাজনীতিকের সন্তান রাজনীতিক হলে সমাজ কেন নেতিবাচক হিসেবে দেখে।
এখনো যেসব সমাজ সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব থেকে মুক্তি পায়নি, সেখানে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে পরিবারতন্ত্র একটা বড় ব্যাপার। রাজার সন্তান (কার্যত ছেলে) রাজা হবে, এটাই নিয়ম—এ মনোভাবের একটি ঐতিহাসিক দিক আছে।
গোষ্ঠীতন্ত্র থেকে রাজতন্ত্র পর্যন্ত, এই নিয়মে হাজার হাজার বছর চলার পর নতুন নিয়মে আসতে জড়তা কাজ করবে, এটিই স্বাভাবিক। রাজতন্ত্রের রেশ এখনো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে আছে। আধুনিক বিশ্বের সমাজগুলোর সাধারণ সদস্যরাও এ মনোভাব থেকে মুক্ত নন। কেননা আধুনিক মত ও পথগুলো বিশ্বের সর্বত্র সমানভাবে পৌঁছায়নি।
এখনো বহু সমাজ আছে, যারা ক্ষমতাশালী পরিবারকে ক্ষমতায় রাখতে চায়। কেননা এভাবে ক্ষমতায় রাখার জন্য কাজ করলে কিছু সুবিধা নেওয়া যায়। অথচ যেটিকে তারা সুবিধা মনে করে, সেটি যে আধুনিক মত-পথমতে তাদের অধিকার, এই বোধটা সেসব আধা সামন্ততান্ত্রিক সমাজে চাপা পড়ে থাকে। বোধের চাপা পড়ে থাকাটার অন্যতম কারণ, গণতন্ত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকা।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বাংলাদেশের রাজনীতি
- পরিবারতন্ত্র