আবার ফিরছে দ্বিদলীয় রাজনীতি
গণতন্ত্র মানে ভিন্নমতের সহাবস্থান ও প্রতিযোগিতা। গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থার কেন্দ্রে আছে নানা মতামতের স্কুল। আমরা এগুলোকে বলি রাজনৈতিক দল। একাধিক রাজনৈতিক দল নিজ নিজ বিশ্বাস, আদর্শ ও কর্মসূচি নিয়ে একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামে। তারা জনগণের কাছে যায়। জনগণ বেছে নেয় তারা কোনটা গ্রহণ করবে আর কোনটা বর্জন করবে। এখানে নির্ণায়ক হলো জনগণ।
একাধিক দল থাকলে জনগণের সামনে বেছে নেওয়ার একটা সুযোগ থাকে। যেসব দেশ একদলীয় সরকারব্যবস্থায় আছে, সেসব দেশের মানুষ এ সুযোগটি পান না। যারা সেসব দেশ চালান, তারা তাদের এ ব্যবস্থার পক্ষে নানা যুক্তি দেন, ওই ব্যবস্থাকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
শুরু থেকেই বাংলাদেশ বহুদলীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। মাঝেমধ্যে এটি সংকটে পড়েছে, হোঁচট খেয়েছে, আবার ওঠে দাঁড়িয়েছে। আমরা একদলীয় সরকারব্যাবস্থা চাই-এ কথাটি প্রকাশ্যে বলার মতো মুখ এখন আর কারও নেই। তবে তলে তলে কিংবা মনে মনে কে কী ভাবছেন, জানি না। রাজনীতির মাঠে বকধার্মিকরা সদা বিরাজমান।
শুরুর দিকে দেশে ছিল আওয়ামী লীগের একচেটিয়া উপস্থিতি। প্রকৃতপক্ষে, বহুদলীয় ব্যবস্থার আবরণে চলছিল একদলীয় অলিগার্ক। তারপর আন্দোলন, অভ্যুত্থান, সেনা হস্তক্ষেপ ইত্যাদি অনেক খানাখন্দ পেরিয়ে আমরা নব্বইয়ের দশকে এসে দেখা পাই দ্বিদলীয় রাজনীতির। মাঠে থাকে দুটো বড় দল-আওয়ামী লীগ আর বিএনপি। জনসমর্থনের পাল্লা কখনো এদিকে হেলে, তো কখনো ওদিকে। এভাবেই চলছিল।
দ্বিদলীয় রাজনীতির ক্লাসিক উদাহরণ দেখি যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাজ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থা প্রধানত আবর্তিত হয় প্রেসিডেন্টকে কেন্দ্র করে। সেখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয় দুটো বড় দলের মধ্যে-ডেমোক্রেটিক পার্টি আর রিপাবলিকান পার্টি। যুক্তরাজ্যে দেখি সংসদীয় সরকারব্যবস্থা, যার কেন্দ্রে আছে আইনসভা। সেখানেও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে দ্বিদলীয় রাজনীতি। সেখানে লেবার পার্টি আর কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। তারা পালা করে দেশ পরিচালনা করে।
দুটি দেশেই দ্বিদলীয় ব্যবস্থা টেকসই গণতন্ত্রের ভিত তৈরি করে দিয়েছে। সেসব দেশে ছোটখাটো আরও দল থাকলেও তারা খুব একটা সুবিধা করতে পারে না। কখনো-সখনো তাদের সমর্থকরা বড় দুটো দলের কোনো একটির পক্ষে চলে যায়। সংসদীয় ব্যবস্থায় অবশ্য ছোট দলগুলো কারও পক্ষে বা বিপক্ষে গিয়ে মাঝেমধ্যে সমীকরণ পালটে দিতে পারে।
আমাদের মতো উপনিবেশ-উত্তর সমাজে নানা ঝামেলা লেগেই আছে। কেউ একবার ক্ষমতা হাতে পেলে সেটি আর ছাড়তে চান না। তারপরও আমরা ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে তিনটি সাধারণ নির্বাচনে দ্বিদলীয় রাজনীতির প্রবল প্রকাশ দেখেছি। এরপরই শুরু হয় সংকট। আমরা আবার বহুদলীয় ব্যবস্থার চাদরে ঢাকা একদলীয় শাসনের খপ্পরে পড়ি। জনগণের সামনে পছন্দের দল বেছে নেওয়ার যে অস্ত্রটি ছিল, সেটি কৌশলে কেড়ে নেওয়া হয়। তারপর আবার আন্দোলন, আবার অভ্যুত্থান। এখন আমরা নতুন করে বহুদলীয় ব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকার দেখছি।
একদা প্রবল প্রতাপে বিরাজমান আওয়ামী লীগ দৃশ্যপটে নেই। দল হিসাবে তারা আর নির্বাচন করতে পারবে না। ফলে দ্বিদলীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। একটি বড় দল এত বছর ধরে চোখের সামনে নড়াচড়া করেছে, সেটি হঠাৎ উধাও হয়ে গেলে জনগণ বিকল্প খুঁজে পাবে কীভাবে? সেটির আপাত সমাধান হয়ে গেছে বলেই মনে হয়।
বিএনপি আছে আগের মতোই। দলটি রাজনীতির মাঠ দাবড়ে বেড়াচ্ছে। তবে মাঠ আওয়ামীবিহীন হলেও বিএনপি ওয়াকওভার পেয়ে যাবে বলে মনে হয় না। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা নানা সংবাদে দেখছি জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান ও জাগরণ। ফলে দ্বিদলীয় রাজনীতির দিকেই যাচ্ছি আমরা।
দেশে আরও অনেক দল আছে। তাদের মোটামুটি তিনটি বর্গে ফেলা যায়। কয়েকটি দল বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধেছে। কয়েকটি গেছে জামায়াতে ইসলামীর বলয়ে। কয়েকটি দল কোনো বড় দলের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেনি বা তাদের কেউ নেয়নি। তারা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে। তবে তারা রাজনীতিতে বড়সড় ঢেউ তুলতে পারবে বলে মনে হয় না।
ফলে দুটি জোট পরস্পরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছে। তবে এগুলো কোনো আদর্শিক জোট নয়। জোটসঙ্গীদের মধ্যে আছে বেশকিছু বিপরীত মেরুর দল। দুদিকেই হয়েছে আসন সমঝোতা। বুঝতে অসুবিধা হয় না, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী-এ দুটো দল নিজেদের প্রভাববলয় বিস্তৃত করতে গিয়ে ছোটখাটো কিছু দলের সঙ্গে সমঝোতায় গেছে।