গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইইউ উত্তেজনার বড় প্রভাব পড়তে পারে আমাদের ওপর
আমাদের মনোযোগ এখন আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের দিকে। অবশ্য তাই হওয়ার কথা। সবাই আশা করছে যে এর মাধ্যমে আমরা একটি নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক সরকার পাব এবং গণতন্ত্রের পথে নতুন করে যাত্রা শুরু হবে।
কিন্তু, বাকি বিশ্বের মনোযোগ অন্য দিকে। তারা বিদ্যমান বিশ্ব-ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা চায়; কিংবা অন্তত এমন একটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা চায়, যা বর্তমান বাস্তবতার চেয়ে গ্রহণযোগ্য।
পূর্ব দিকে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসন এবং পশ্চিম দিকে গ্রিনল্যান্ডের ওপর 'পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ' নেওয়ার মার্কিন হুমকি শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আমরা যে বিশ্বকে চিনতাম, সেটি বদলে দিয়েছে। সংকটে রয়েছে ইউরোপ।
রাশিয়ার এই আগ্রাসনের জন্য ইউরোপ হয়তো সামরিক, অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু, ইউরোপের কাছে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি। সেই যুক্তরাষ্ট্র যে কিনা তাদের বিশ্বস্ত মিত্র—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং মার্শাল পরিকল্পনার মাধ্যমে তাদের বিধ্বস্ত দেশগুলো পুনর্গঠনে সহায়তা করেছে।
বুধবার দাভোসে ভাষণ দেওয়ার সময় গ্রিনল্যান্ড নিয়েও কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সৌভাগ্যবশত, তিনি বলেছেন যে গ্রিনল্যান্ড দখলে বলপ্রয়োগ করবেন না। তার এই বক্তব্য ইউরোপের উদ্বেগ কিছুটা হলেও প্রশমিত করেছে। কিন্তু ধাক্কাটি এখনো কাটেনি। সেইসঙ্গে ট্রান্সআটলান্টিক জোটের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে।
ইউরোপের এই ধাক্কা খাওয়া শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের হঠাৎ ও অযৌক্তিক শুল্ক আরোপের মাধ্যমে। সেটাও হয়েছিল কোনো আলোচনা বা দরকষাকষি ছাড়াই। যদিও সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যাটো দেশগুলোকে এই শুল্ক থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
সেইসঙ্গে ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চিন্তাভাবনা তখনও তাদের উদ্বিগ্ন করেছিল এবং এখনো করছে। এর মানে কি? রাশিয়াকে এখন পর্যন্ত দখল করা ভূখণ্ড নিজেদের কাছে রাখার সুযোগ দেওয়া? শান্তির বিনিময়ে ইউক্রেনকে কী মূল্য দিতে হবে? রাশিয়া এখানে স্পষ্টতই আগ্রাসী। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি দেখে মনে হয় না যে তিনি বিষয়টিকে সেভাবে দেখছেন।
যখন ট্রাম্প কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হওয়ার 'আমন্ত্রণ' জানালেন, তখনই পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে আস্থায় বড় ধরনের ভাঙন দেখা দেয়। যেকোনো স্বাধীন দেশের নাগরিকই এটাকে অপমানজনক বলে মনে করবে এবং কানাডিয়রাও যথার্থভাবেই তাই করেছেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দাভোসে দেওয়া ভাষণে স্পষ্ট করেছেন, তাদের সম্পর্ক এখন কতটা ভেঙে পড়েছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতিগুলো কানাডার ওপর দীর্ঘমেয়াদে কী প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও বহু দশকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার কীভাবে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে শুরু করেছে, সেটার উদাহরণ দিতেই কানাডার প্রসঙ্গ আলাদাভাবে তুলে ধরা। কানাডার নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বাণিজ্যে বহুমুখীকরণের কৌশল নিয়ে কথা বলছেন।
গত আট দশক ধরে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোর সামরিক সুরক্ষায় থাকা সদস্যরা এখন এর প্রধান প্রতিষ্ঠাতার কাছেই হুমকির মুখে। এরই এক সদস্য দেশ ডেনমার্কের ভূখণ্ডের অংশ দখলের হুমকি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ন্যাটো সনদ অনুযায়ী, এর যেকোনো সদস্যের ওপর আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। তাই যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা দাবি করছে সেটা শেষ পর্যন্ত কীভাবে সমাধান হবে, এটাই ইউরোপীয় নেতাদের মনে ঘুরপাক খাওয়া সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যদিও দাভোসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন যে তিনি কোনো বলপ্রয়োগ করবেন না। কিন্তু এ কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে ডেনমার্কের ওই ভূখণ্ড তার লাগবেই।
ট্রাম্প যা করছেন সেটা আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ জাতীয় সার্বভৌমত্বের ধারণাকেই অর্থহীন করে তুলছে।
১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফেলিয়ার শান্তিচুক্তি আধুনিক আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের সূচনা করে। যদিও তখন ধারণাটি মূলত রাষ্ট্র ও শাসকের অধিকারকে কেন্দ্র করে ছিল। দার্শনিক জ্যাঁ-জ্যাক রুশো জনগণের ক্ষমতার ধারণা তুলে ধরে বলেন, 'সার্বভৌমত্ব জনগণের মধ্যেই নিহিত।' এর ফলে শাসকের কাছ থেকে জনগণের দিকে দৃষ্টি যায়। এর মাধ্যমে গণতন্ত্র অর্থবহ হয়ে ওঠে এবং বিশ্বে এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর হয়। উপনিবেশমুক্তির প্রক্রিয়া এবং জাতি ও জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের ধারণার মাধ্যমে জনগণকেন্দ্রিক সার্বভৌমত্বের নীতিটি আরও সুদৃঢ় হয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শান্তি প্রতিষ্ঠা
- ভূরাজনীতি