ক্রিকেট আয়োজনে ভারত আর নিরাপদ দেশ নয়

যুগান্তর এ কে এম শামসুদ্দিন প্রকাশিত: ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:১৩

আইপিএলে কলকাতার নাইটরাইডার্স (কেকেআর) থেকে বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়াকে কেন্দ্র এক জটিল পরীক্ষায় পড়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিবি) ভারতের উগ্রবাদী হিন্দুদের বাংলাদেশবিরোধী হুমকির মুখে নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতে টি ২০ বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। মোস্তাফিজকে অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়ার ঘটনা নিয়ে ভারতেও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। ভারতের অনেক ক্রিকেটবোদ্ধা ও রাজনৈতিক নেতা বিসিসিআই’র এ আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। উগ্রবাদী হিন্দুদের চাপে পড়ে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের গণমাধ্যমের বদৌলতেই জানা গেছে, মোস্তাফিজের ধর্মীয় ও বাংলাদেশি পরিচয়ই নাকি এ সিদ্ধান্তের মূল কারণ ছিল।


বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে ভারতে যে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উন্মাদনার পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাতে বিভিন্ন রাজ্যে বাঙালিবিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে সেদেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষই নিরাপত্তার হুমকির মধ্যে রয়েছেন। বাঙালি মুসলিম হলে তো কথাই নেই। ভারতে বাংলাদেশিবিদ্বেষ এমনভাবে ছড়িয়েছে যে, খোদ পশ্চিমবঙ্গেও বাঙালি মুসলমানরা বাংলাদেশি সন্দেহে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।


এছাড়া আরও একটি বিষয় বাংলাদেশিদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাদেশিদের হোটেল বুকিং পেতেও সমস্যা হচ্ছে। এক বাংলাদেশি নাগরিক গত সপ্তাহে ভারতের শিয়ালদাহ, জয়পুর ও আগ্রায় ভ্রমণ করতে গিয়ে হোটেল বুকিং নিয়ে হেনস্তার শিকার হয়েছেন। আমি যখন এ লেখা লিখছি, তখন ফেসবুকে পোস্ট করা এ ভদ্রমহিলার একটি ভিডিও চোখে পড়ে। ভিডিওতে তিনি বলেছেন, প্রতিটি শহরেই তিনি বিশ থেকে পঁচিশটি হোটেলে ঘুরে ঘুরে যদিও বুকিং পেয়েছেন, তবে এর জন্য তাকে দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হয়েছে। হোটেল স্টাফরা তাকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশিদের হোটেল রুম ভাড়া দিতে তাদের নিষেধ করা আছে। এ ছাড়া সেখানকার গাড়িচালকদের দুর্ব্যবহারও নাকি পীড়াদায়ক। এ ধরনের উটকো ঘটনা বাংলাদেশিদের জন্য মোটেও সুখকর নয়। ভারতে আসন্ন টি ২০ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের সময় বাংলাদেশের ক্রিকেট কর্মকর্তা, সংবাদকর্মী ও দর্শকদের এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের না খেলার সিদ্ধান্ত যথার্থ হয়েছে বলে মনে হয়।


বাংলাদেশের এ সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছে বিসিসিআই। মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ায় বাংলাদেশ ভারতে টি ২০ বিশ্বকাপ না খেলার মতো এত বড় যে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, এ কথা ভারত ভাবতেও পারেনি। ভারত মনে করছে, বাংলাদেশের ম্যাচ শেষ পর্যন্ত সরিয়ে নেওয়া হলে তাতে মুখ পুড়বে ভারতেরই। কারণ, এখন আইসিসির চেয়ারম্যান জয় শাহ, যিনি একাধারে বিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পুত্র। কাজেই জয় শাহ যদি ভারতভক্তি দূরে সরিয়ে রেখে বাংলাদেশের চাপে ভারত থেকে ম্যাচ সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের দাপট কমতে পারে। পাশাপাশি ভারতের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনে কিছু ঘটলেই অংশগ্রহণকারী দেশগুলো ভারতে যেতে দ্বিধা করবে।


সন্দেহ নেই, ভারতের ধর্মীয় আগ্রাসন ক্রিকেটীয় পরিবেশকে কলুষিত করছে। অর্থের জোরে ক্রিকেটবিশ্বে ভারত যে প্রভাব খাটাচ্ছে, তা ক্রিকেটের জন্য মোটেও ভালো নয়। নরেন্দ্র মোদি ভারতের ক্ষমতায় আসার পর, এর মাত্রা বেড়েছে বহুগুণে।


ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। অলিম্পিক, বিশ্বকাপ ফুটবল, সবকিছুর সঙ্গেই অতীতে একাধিকবার জড়িয়ে গিয়েছে রাজনীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন। তবে এ রাজনীতির দুটো রূপ। একটি উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সাম্প্রদায়িক, গত শতাব্দীর তিনের দশকে হিটলার বা মুসোলিনির আমলে যার ব্যাপকতা দেখা গিয়েছিল। এখন মোদির আমলে ভারত তার ধারক ও বাহক হয়েছে। ক্রীড়াঙ্গনের রাজনীতির অপর রূপটি হলো, ক্রীড়া বা সাংস্কৃতিক কূটনীতির মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে জোরদারের মাধ্যমে দুদেশের মানুষের মধ্যে মৈত্রী সুদৃঢ় করা। খেলা ও খেলোয়াড়ের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে অনেক জটিল কূটনৈতিক সমস্যা সমাধানের উদাহরণও আছে অতীতে। জয় শাহর পরিচালনায় আইসিসির বৈষম্যমূলক নীতিতে ক্রিকেট মানচিত্রের বহু দেশ পিছিয়ে পড়েছে। ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার বোর্ডকে সঙ্গী করে ক্রিকেটবিশ্বে ছড়ি ঘুরিয়ে যাচ্ছে বিসিসিআই। তাদের লক্ষ্য, ক্রিকেটীয় পরিবেশ বিষিয়ে দিয়ে প্রতিবেশী দেশ, বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘৃণার আবহ জিইয়ে রাখা, যাতে নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি ক্ষমতার রাজনীতিতে ফায়দা তুলতে পারে। অথচ অতীতে বিজেপি ক্ষমতায় থাকাকালীন পাকিস্তান ক্রিকেট দলের ভারত আগমন নিয়ে তাদের ঘনিষ্ঠতম শরিক শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বালঠাকরের হুমকিকেও আমল দেয়নি। ১৯৯৮-৯৯ সালে পাক-ভারত ক্রিকেট সিরিজ শুরুর আগে শিবসেনার উগ্রবাদীরা দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলায় স্টেডিয়ামের ক্রিকেট পিচ খুঁড়েও খেলা বন্ধ করতে পারেনি। বরং সেবার ওয়াসিম আকরামের দল উষ্ণ অভ্যর্থনাই পেয়েছিল। ২০১২ সালেও পাক-ভারত সিরিজ বন্ধের চেষ্টা করেছিলেন বালঠাকরে; ভারতের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার তার সেই দাবি অগ্রাহ্য করেছিল। বিজেপিও বালঠাকরেকে সমর্থন করেনি। অথচ বছর দুয়েক আগে ভারতের মাটিতে একদিনের বিশ্বকাপ খেলতে এসে বর্ণনাতীত ঘৃণা ও হেনস্তার শিকার হতে হয়েছিল বাবর আজমের ক্রিকেট দলকে; এবার এ তালিকায় সংযোজিত হলো বাংলাদেশ। এখন থেকে ভারতের মাটিতে খেলতে হলে লিটন দাসদেরও হয়তো বাবরদের পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।


আসন্ন টি ২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে ঘিরে যে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে, তা এখানেই শেষ নয়। পাকিস্তানে জন্মগ্রহণকারী বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য দেশের ক্রিকেটারদের ভিসা দেওয়া নিয়েও ভারত ঝামেলা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের চারজন এবং ইংল্যান্ডের দুজন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ক্রিকেটারকে ভিসা না দেওয়ার খবর প্রকাশের পর অন্য চারটি সহযোগী দেশের বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কারণ, তাদের মূল দলে একাধিক পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় রয়েছে। ভারত ক্রিকেটকে আজ এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে খেলাধুলার চেয়ে রাজনীতি ও পক্ষপাতই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। ক্রিকেটের ভেতর রাজনীতি ঢুকে পড়ার এ পুরো প্রক্রিয়ায় আইসিসির ভূমিকা চরমভাবে হতাশাজনক। বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি একটি দেশের ইচ্ছার কাছে নতজানু হয়ে পড়ে, তাহলে তাদের নিরপেক্ষতা ও অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। ক্রিকেটে রাজনীতি প্রসঙ্গে ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক নাসির হোসেইন একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের ভারতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত একেবারেই যৌক্তিক। এর আগে পাকিস্তানও ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। ভারত যেভাবে ক্রিকেটকে পুরোপুরি রাজনৈতিক খেলায় পরিণত করেছে, তা সত্যিই আশঙ্কাজনক। এমন চলতে থাকলে ক্রিকেট বিশ্বের দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে; এমনকি একটি নতুন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল গঠিত হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা দিতে পারে।’

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও