আমাদের অজানা জিয়া
সারা দেশ গভীর ঘুমে নিমজ্জিত। শেষ রাতে চট্টগ্রামে সেদিন মুষল বৃষ্টি। ঘাতকরা তাদের দুষ্কর্ম সেরে তাড়াতাড়ি পালিয়েছে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ থেকে। প্রধান গেট আর বারান্দায় ছড়িয়ে আছে নিরাপত্তা প্রহরীদের অবিন্যস্ত লাশ। দোতলার সিঁড়ির কাছে অত্যন্ত অনাদরে পড়ে আছে দেশের সর্বস্তরের মানুষের একান্ত প্রিয়জন, মনের গহিনে জায়গা নেওয়া রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
সদ্য তাহাজ্জুতের নামাজ শেষ করে ফজরের আজানের প্রতীক্ষায় থাকা মানুষটি বাইরে গোলাগুলির শব্দ শুনে সবে কক্ষ থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়েছেন ঘটনা জানার জন্য। দেশের মানুষের একান্ত আপনজন শহীদ জিয়া কখনোই নিরাপত্তার কঠিন বাঁধনে না বেঁধে বলিষ্ঠ আত্মপ্রত্যয়ে সাধারণ মানুষের মতো গ্রামের আইল আর গেরস্তের উঠোন পেরিয়েছেন পরম আত্মবিশ্বাসে। মাটির বারান্দায় বসে কুয়োর পানিতে তৃষ্ণা মিটিয়েছেন নির্দ্বিধায় আর গ্রামের সাধারণ মানুষ আপনজনের আস্থায় টিনের থালায় এগিয়ে দিয়েছেন আপ্যায়নের গুড়-মুড়ি আর বাড়ির তৈরি মোয়া। এত গভীর ভালোবাসায় নিরাপত্তার চাদর জড়িয়ে নিজেকে জনবিচ্ছিন্ন করার কথা ভাবতেই পারেননি এই ক্ষণজন্মা মানুষটি।
মানুষের মনের রাজা চলে গেছেন অকস্মাৎ শত মাইল দূরে, ঢাকায় কিশোর দুই পুত্র বা স্ত্রী তখনও জানেন না কত বড় সর্বনাশ ঘটে গেছে কিছুক্ষণ আগে। দেশের মানুষের কথা ভাবতে গিয়ে পরিবার-পরিজন আর নিকটাত্মীয়দের কথা ভাবার সময়ই হয়নি শহীদ জিয়ার। অন্য আর দশজনের পিতৃ বা স্বামীবিয়োগের বেদনার সঙ্গে এই ঘটনার অমিল যে ভীষণরকম। সাধারণ চাকুরের জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই পরিবারের ব্যাংকের হিসাবের খাতায় জমা আর খরচের অঙ্ক সমান সমান। সঞ্চয়ের ঘর শূন্য। সরকারি আবাসন মাথায় উপর থেকে সরে গেলে মাথা গোঁজার কোনো জায়গা নেই। মরণোত্তর পেনশনের টাকায় ছেলেদের লেখাপড়ার খরচ জোগানো অসম্ভব। সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে জিয়াউর রহমান আত্মীয়স্বজনের কাছে থেকে একটা প্রচ্ছন্ন দূরত্ব বজায় রাখতেন। তাই এই পরিবারের পক্ষে তাদের সান্নিধ্যে যাওয়ার সহজাত অস্বস্তি থাকা অস্বাভাবিক নয়। যে মানুষ দেশের কোটি কোটি মানুষের আত্মার আত্মীয়, তার তো আলাদা করে আত্মীয় খোঁজার দরকার কী। সেজন্যই সম্ভবত দেশের মানুষ কেন, তার দলের ঘনিষ্ঠজনের কাছে অজানা তার ভাই-চাচা আর নিকটাত্মীয়ের নাম-পরিচয়। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের লাখ লাখ মানুষের জমায়েত, তখন একদিকে ধানমন্ডি আর অন্যদিকে ফার্মগেটের রাজপথ ছুঁয়েছে, তবুও মানুষের আসার বিরতি নেই। পৃথিবীর কোথাও কারও জানাজায় এত মানুষের সমাগমের উদাহরণ সম্ভবত আর একটাও নেই।
আমাদের অজানা জিয়া অনেকের কাছেই এই অসাধারণ দেশপ্রেমিক মানুষের ভেতরের কথা জানার সুযোগ খুব কমই হয়েছে। নিজ আর পরিবারের চেয়ে দেশ যে অনেক বড়, তার হাজারো প্রমাণ এ মানুষটির জীবনের পরতে পরতে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানিদের আক্রমণের বিভীষিকার সামনে প্রথম বিদ্রোহ করা সেনাকর্মকর্তার নাম জিয়াউর রহমান। তার গায়ে রাজাকার আর আইএমআর-এর এজেন্টের তকমা পরাবার হাস্যকর চেষ্টার প্রত্যুত্তর দেওয়া সময়ের অপচয়।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পোশাক পরে তাদের চাইনিজ রাইফেল হাতে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে We Revolt বলার মতো সাহসী দেশপ্রেমিক হতে যে বুকের পাটা প্রয়োজন, সেটা রাস্তাঘাটে পাওয়া যায় না। সেদিন সৈন্যদল নিয়ে চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে রেললাইন ধরে কালুর ঘাটে যাওয়ার পথে সৈনিকরা জানতে চাইছিল, স্যার! বেগম সাহেবাকে বলে গেলেন না! জিয়ার পালটা জিজ্ঞাসা। তুমি বলে যাচ্ছ! না, স্যার! আমার পরিবার তো এখানে নেই। তুমি যখন বলে যাচ্ছ না, তখন আমার বলারই বা দরকার কী? চলো! পরিবারের কাছে মাস খরচের টাকাটাও দেওয়া হয়নি। তখন তো সবে ২৫ তারিখ বেতন হওয়ার সুযোগ কোথায়? স্ত্রী আর অসহায় দুটি শিশুকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে আবারও রেডিওর ঘোষণা : ‘আমি মেজর জিয়া, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।’ এই বেতার ঘোষণার অর্থ কতটা উপলব্ধি করি আমরা! এই ঘোষণার গভীরতায় নাই বা গেলাম, শুধু এই ঘোষণার পরিণতিতে অবধারিত কোর্ট মার্শাল মৃত্যুদণ্ড আর পরিবারের জন্য নিদারুণ অনিশ্চয়তা-তবুও সাহসের এতটুকু ঘাটতি তো ছিল না তার মাঝে। এই ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই পালটা বিমান আক্রমণে ধ্বংস হয়েছে বেতার কেন্দ্র। আবারও অনিশ্চিত যাত্রা সৈন্যদল নিয়ে। কোথায় যাবেন? কোন দেশে? আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি তাদের আকারে-ইঙ্গিতে কোনো আগাম নির্দেশনা দিয়েছিলেন? ইতিহাস তো সেটা বলে না। পরে ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হয়েছিলেন; কিন্তু জানতেন, এই সমতল বাংলাদেশ গেরিলাযুদ্ধে চূড়ান্ত সফলতা অসম্ভব। তাই হাজারো প্রতিকূলতা অতিক্রম করে গড়েছিলেন প্রথম ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’ তার নেতৃত্বে কামালপুরে যুদ্ধ, রৌমারীতে মুক্তাঞ্চল সৃষ্টি-এসব ইতিহাসকে যারা আবদ্ধ রাখতে চান, তারা বোকার স্বর্গের অধিবাসী।
জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা বা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বে দেওয়া কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। পাকিস্তানের সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষক থাকাকালে বাঙালি ক্যাডেটদের তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ আর অবশ্যম্ভাবী সংঘাতের পূর্বপ্রস্তুতি দিয়েছেন বরাবর-মেজর হাফিজ তার জবানীতে এই সত্যতার প্রতিধ্বনি যেমন করেছেন, তেমনই শহীদ জিয়া নিজের লেখনীতেও জানিয়েছেন, বাঙালির সাহস আর যুদ্ধসক্ষমতা নিয়ে কটাক্ষ করা পাকিস্তানি অফিসারকে মুষ্টিযুদ্ধে হারিয়ে বাঙালির সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছিলেন। পঁয়ষট্টির পাক-ভারত যুদ্ধে বেদিয়ান সেক্টরে জিয়ার কোম্পানির সম্মুখযুদ্ধের অসাধারণ কৃতিত্বের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।