‘স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে’ করা যাবে নাকি যাবে না?
সা
ম্প্রতিক সময়ে ‘দ্বিতীয় বিয়ে করতে আর স্ত্রীর অনুমতি লাগবে না’—এমন একটি সিদ্ধান্ত সমাজে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি নিছক আইনি সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দাম্পত্য সম্পর্কের ভারসাম্য, নারীর মর্যাদা, পারিবারিক কাঠামো এবং রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান। ফলে প্রশ্ন উঠছে—আইন কী শুধু অনুমতির শর্ত শিথিল করলো, নাকি একটি গভীর সামাজিক বাস্তবতাকেই অস্বীকার করলো?
আইন সাধারণত সমাজের চাহিদা ও বাস্তবতার প্রতিফলন। কিন্তু পরিবার একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান, যেখানে কেবল আইন দিয়ে সম্পর্কের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায় না। দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়ার বিধানটি ছিল মূলত একটি নৈতিক ও সুরক্ষামূলক দেয়াল—যা একদিকে স্বামীর স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ন্ত্রণ করত, অন্যদিকে স্ত্রীর মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করত। সেই দেয়াল সরিয়ে দিলে আইনের সুবিধা বাড়লেও, সম্পর্কের ঝুঁকি কি বেড়ে যাবে না?
সমর্থকেরা বলছেন, অনুমতির বিধান অনেক সময় জটিলতা তৈরি করতো, প্রশাসনিক দুর্নীতিও হয় এমন নজিরও আছে। বাংলাদেশে দ্বিতীয় বিয়েতে (অর্থাৎ polygamous marriage বা দ্বিতীয় স্ত্রী নেওয়ার ক্ষেত্রে) আপনাকে প্রধানত "Arbitration Council"-এর অনুমতি নিতে হবে, এবং তা আগে থেকেই লিখিতভাবে নেওয়া বাধ্যতামূলক— কোনো বিয়ে ও রেজিস্ট্রেশন তা কেবল সেই অনুমতির ভিত্তিতে করা যাবে। বর্তমানে “Muslim Family Laws Ordinance, 1961” অনুযায়ী, আপনার বিদ্যমান বিবাহ চলাকালীন অন্যত্র আবার বিয়ে করার জন্য Arbitration Council-এর পূর্ব লিখিত অনুমতি নিতে হবে। কারণ আইন এমনভাবে সাজানো থাকে না যে আপনার প্রথম স্ত্রীর সম্মতি নিতে হবে। কাউন্সিলে আবেদন করার সময় আবেদনপত্রে বর্তমান স্ত্রীর সম্মতি উল্লেখ করা যেতে পারে, কিন্তু তা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়— সিদ্ধান্ত নেবে কাউন্সিল নিজেই।
আবেদন পাওয়ার পর স্থানীয় চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি Arbitration Council গঠন হয়, যেখানে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা শুনানি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে তা ইনভ্যালিড বিবাহ (বিবাহ নিবন্ধনযোগ্য হবে না) এবং সেই ব্যক্তিকে জরিমানা, কারাদণ্ড বা উভয়ই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।
বাংলাদেশে আইনে সরাসরি এমন কোনো শর্ত নেই যে একটি পরকীয়া বা দ্বিতীয় বিয়ে করতে হলে প্রথম স্ত্রীকে সম্মতি দিতে হবে। আদালত স্পষ্ট বলেছেন যে অনুমতির কর্তৃত্ব স্ত্রীর কাছে নয়, বরং আরবিট্রেশন কাউন্সিল-এর কাছে।
আবাসিক নির্বাহী-চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গঠিত Arbitration Council-এর অনুমতি প্রয়োজন। হাইকোর্ট এই বিধানকে বৈধ ও সংবিধানসম্মত বলে রায় দিয়েছে। একটি রিট petition-এ আইনটি চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে দ্বিতীয় বিয়েতে স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক করা উচিত। কিন্তু হাইকোর্ট সেই রুলটিকে খারিজ করে দিয়েছে এবং আইন পূর্বের মতোই বহাল রেখেছে। আদালত বলেছে, আইন নারীদের মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে নয়। দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে কী হতে হবে, তা সংসদ-গৃহীত আইনের ব্যাপার; হাইকোর্ট আইনটি বৈধ ও নীতিগতভাবে ঠিক বলেছে। প্রথম স্ত্রীর সরাসরি সম্মতি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক না হলেও Arbitration Council-এর hearing-এ স্ত্রীর মতামত বিবেচনা করা হতে পারে। প্রথম স্ত্রীর সম্মতি নেওয়া নিয়মে নেই। Arbitration Council-এর অনুমতি নিতে হবে। আইনের এই হাইকোর্টে বৈধ ও কার্যকর রাখার রায় এসেছে।
সম্প্রতি দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে একধরনের বিভ্রান্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো হচ্ছে—যেন আদালত বা আইন প্রথম স্ত্রীর অনুমতিকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করে নারীর অধিকার খর্ব করেছে। বাস্তবতা হলো, আইন নতুন কিছু বলেনি; বরং পুরোনো আইনের ভুল ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। সমস্যা আইনে নয়, সমস্যা আমাদের বোঝার সদিচ্ছায়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- অনুমতি
- দ্বিতীয় বিয়ে