কৃষিবান্ধব ইশতেহার : উন্নয়নের রাজনৈতিক অঙ্গীকার
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র আজও কৃষি। স্বাধীনতার পর থেকে উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের ভাগ্য যথাযথভাবে উন্নয়ন লাভ করতে পারেনি। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমশক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত এবং জাতীয় জিডিপির প্রায় ১২–১৪ শতাংশ কৃষিখাত থেকে আসে। অথচ কৃষি খাত আজ নানা সংকটে জর্জরিত। আবাদযোগ্য জমি দ্রুত হ্রাস, সার, বীজ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং বাজার ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীর আধিপত্য এসব চ্যালেঞ্জ কৃষিকে টেকসই রাখতে বাধা সৃষ্টি করছে। জাতীয় রাজনীতিতে কৃষকের কণ্ঠ দুর্বল। সংসদে পেশাদার কৃষকের প্রতিনিধিত্ব খুবই কম। ফলে নীতি-নির্ধারণে মাঠের বাস্তব সমস্যা প্রতিফলিত হয় না। কৃষক ন্যায্য মূল্য, ভালো বীজ, সহজ ঋণ, সংরক্ষণ সুবিধা এবং বাজার সুরক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনও বঞ্চিত। সাম্প্রতিক সময়ে ফসলের মূল্য না পাওয়ায় কৃষকের ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য সতর্কবার্তা।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এটি আরও গুরুতর। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি মাত্র ১.৭৯ শতাংশ, যা ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ৪ শতাংশের চেয়ে অনেক কম। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, কেবল প্রযুক্তি বা উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সুশাসন, নীতি, বাজেট বরাদ্দ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার মাধ্যমে কৃষি খাতকে টেকসই ও লাভজনক করা সম্ভব।
কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাও সমস্যার সম্মুখীন। উৎপাদন খরচ বাড়লেও কৃষক ন্যায্য মূল্য পান না; মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ীরা মোটা মুনাফা অর্জন করে। কৃষক সংগঠন দুর্বল হওয়ায় কৃষকের দাবি-দাওয়া নীতি ও বাজারে প্রতিফলিত হয় না। এ অবস্থায় কৃষকবান্ধব রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা অপরিহার্য। বিশ্বে অনেক দেশ কৃষিবান্ধব নীতি গ্রহণ করে গ্রামীণ উন্নয়নে সফল হয়েছে। ভিয়েতনামে সরকার ও কৃষক সংগঠন মিলিতভাবে উৎপাদন দ্বিগুণ করেছে, জাপানে খাদ্য নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে, ভারতে কৃষক আন্দোলনের ফলে বিতর্কিত আইন বাতিল হয়েছে।
কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদন নয়, এটি কর্মসংস্থান, জীবিকা, গ্রামীণ সমাজের স্থিতিশীলতা এবং দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। কৃষিকাজে নারীর অংশ প্রায় ৪৫ শতাংশ, কিন্তু তাদের অধিকাংশই জমির মালিকানা, ঋণ সুবিধা ও ন্যায্য স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। একই সঙ্গে দেশের প্রায় ৩৪ শতাংশ তরুণ জনগোষ্ঠী কৃষিকে কম আয়ের ও কঠিন শ্রমসাধ্য পেশা মনে করে। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যদি কৃষিকে মর্যাদাপূর্ণ, লাভজনক ও আধুনিক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে তরুণদের আকৃষ্ট করে কৃষিকাজকে আরও টেকসই করা সম্ভব।
বাংলাদেশ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনি প্রেক্ষাপটে, রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার কৃষিখাতকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেওয়া আবশ্যক। ক্ষমতায় এলে তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নীতিনির্ধারণে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছাড়া কৃষি খাতকে টেকসই করা সম্ভব নয়। তাই একটি সুষ্ঠু, সুসংগঠিত ও টেকসই কৃষিবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা হবে প্রযুক্তিনির্ভর, লাভজনক, সম্মানজনক এবং কৃষকের জন্য নিরপেক্ষ। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনি ইশতেহারে কৃষিবান্ধব প্রস্তাবনা অন্তর্ভুক্ত করা এবং তা ম্যানিফেস্টোতে রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমত, কৃষি বাজেট বৃদ্ধি: বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমশক্তি কৃষিখাতে কাজ করে, কিন্তু কৃষি খাতের বাজেট বরাদ্দ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। ২০০৮–০৯ সালে কৃষিখাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৭ শতাংশ, যা ২০২৪–২৫ অর্থবছরে নামিয়ে আনা হয়েছে মাত্র ৫.৯৪ শতাংশে। কৃষিখাতের অগ্রগতির জন্য এটি যথেষ্ট নয়। তাই নির্বাচনি ইশতেহারে জাতীয় বাজেটের অন্তত ৮–১০ শতাংশ কৃষিখাতে বরাদ্দ এবং এর কমপক্ষে ২০ শতাংশ গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও শিক্ষায় বিনিয়োগ করার অঙ্গীকার থাকা উচিত। এর ফলে আধুনিক সেচ, উন্নত বীজ, কৃষি যন্ত্রপাতি, ড্রোন ও ডেটা অ্যানালিটিক্সের মতো প্রযুক্তি মাঠে সহজলভ্য হবে, যা কৃষকের উৎপাদনশীলতা ২০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে সাহায্য করবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- নির্বাচনী ইশতেহার
- কৃষিখাত