মাদুরো অপহরণ: ট্রাম্প কি পারবেন ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ নিতে?
নিকোলাস মাদুরো অপহৃত হওয়ার পর ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষ দেখিয়ে দিচ্ছে, একজন রাষ্ট্রপতিকে বন্দি করলেই জনগণকে বন্দি করা যায় না। নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে আনার পর ডনাল্ড ট্রাম্প দম্ভভরে ঘোষণা করেছিলেন, নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারাই ভেনেজুয়েলার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
৩ জানুয়ারি মাদুরোকে অপহরণ করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে আসার পর সাংবাদিকরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ভেনেজুয়েলার শাসনভার এখন কার হাতে, কে বা কারা দেশটি শাসন করবেন? ট্রাম্প তখন নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারাই ভেনেজুয়েলার দায়িত্ব গ্রহণ করছেন ঘোষণা দিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ প্রশাসনের লোকদের দেখিয়ে বলেছিলেন, এরাই ভেনেজুয়েলা চালাবে এবং তার নির্দেশেই সবকিছু হবে। পরের দিন অবশ্য ট্রাম্প বললেন, তিনি আশা করেন অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ তাদের নীতি অনুসরণ করে দেশ চালাবেন। না হলে দেলসিদের ওপর মাদুরোর চেয়েও ভয়াবহ আঘাত করা হবে।
এরপর সাংবাদিকরা ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন, ভেনেজুয়েলার পরবর্তী নেতা হিসেবে তিনি কি নোবেল বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর কথা ভাবছেন? উত্তরে ট্রাম্প বলেন, মাচাদো একজন চমৎকার মহিলা, কিন্তু নেতা হিসেবে তিনি তেমন গ্রহণযোগ্য নন।
নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অনেক আগে থেকেই ভেনেজুয়েলার বিতর্কিত নেত্রী, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মারিয়া মাচাদো যুক্তরাষ্ট্রকে তার দেশে হামলা ও হস্তক্ষেপের জন্য বিভিন্ন বক্তৃতায়, এমনকি লিখিতভাবে বারবার অনুরোধ করেছেন। মাদুরো অপহৃত হওয়ার পর মাচাদো প্রকাশ্যে মার্কিন নেতৃত্বকে ভেনেজুয়েলায় গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে দিয়ে যাওয়ার আহ্বানও জানান। কিন্তু তার অনুরোধ সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলার বাস্তবতায় তা সম্ভব হয়নি। যদি তা করার বাস্তবতা থাকত, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসন নিশ্চয়ই আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ম লঙ্ঘন করে রাতের অন্ধকারে কমপক্ষে ৪০ জনকে হত্যা করে মাদুরোকে অপহরণ করত না।
প্রকৃতপক্ষে ভেনেজুয়েলার ক্ষমতায় এখন কে? দেশটির নিয়ন্ত্রণ ও শাসনভার এখন কার হাতে? মাদুরোর অনুপস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ২৩৩ ধারা অনুসারে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে ৯০ দিনের জন্য ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ করেছে। একই সঙ্গে নিকোলাস মাদুরোকেই দেশটির একমাত্র বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবেও উল্লেখ করেছে।
সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় দেলসি রদ্রিগেজ দেশটির দায়িত্ব পালন করলেও অনেকের কৌতূহল, ভেনেজুয়েলা আসলে এখন কে চালাচ্ছে?
ট্রাম্প প্রশাসন নিঃসন্দেহে মাদুরোকে অপহরণ করেছে ভেনেজুয়েলায় রেজিম চেঞ্জের উদ্দেশ্যে। কিন্তু অপহরণের পর ভেনেজুয়েলায় কি সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে? সরকারবিরোধীরা, দেশীয় অলিগার্ক, করপোরেট, মার্কিন এজেন্সি ও ধনী শ্রেণি তাদের অর্থে ব্যাপক জনসমাগম ও গণঅভ্যুত্থান তৈরি করতে পারেনি। বিপরীতে মাদুরো সমর্থকদের বিশাল মিছিল, জনসমাবেশ, সঙ্গীতানুষ্ঠান ও যুদ্ধের প্রস্তুতি শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকলকে মাতৃভূমি রক্ষায় উদ্দীপ্ত করছে এবং রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে তারা।
মারিয়া মাচাদোকে দায়িত্ব না দেওয়ার বিষয়ে অনীহার কারণ হিসেবে ট্রাম্প বলেন, তার গ্রহণযোগ্যতা নেই। মজার ব্যাপার হলো, মার্কিনিরাই দীর্ঘদিন ধরে এই মাচাদোকে অতিরঞ্জিত করে বিশ্বের কাছে উপস্থাপন করেছে। যোগ্যতা না থাকলেও এই বিতর্কিত, ধূর্ত ব্যক্তিকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পর্যন্ত দিয়েছে—যে পুরস্কার নিয়ে নোবেল কমিটিও দ্বিধাবিভক্ত ছিল। তাহলে যাকে সামনে রেখে তারা ভেনেজুয়েলার শাসনকাঠামো সাজাতে চেয়েছিল, ওই ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তারা নিজেরাই প্রশ্ন তুলছেন। নিশ্চয়ই তাদের কাছে তথ্য আছে যে, তাকে দিয়ে মাদুরোকে ঠেকানো যাবে না।