অন্তিম যাত্রায় সঙ্গী পুরো দেশ
সূর্যের দেখা নেই; প্রকৃতিতে মধ্য পৌষের হানা। এরই মধ্যে তার শেষ বিদায়কে ঘিরে ঢাকায় ছুটে আসছে সারা দেশের মানুষ। বিদায়ি বছরের শেষ দিনটিতে জনতার এমন বাঁধভাঙা স্রোত আর কান্নার ঢেউ সামলাতে হঠাৎই যেন প্রকৃতি আড়মোড়া ভাঙে। যেন তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সূর্য তার কিরণ বিলিয়ে দেয়। থেমে যায় হিমেল হাওয়া! মানুষ ও প্রকৃতির এমন আদরমাখা বিদায় ক’জনের ভাগ্যেই বা জোটে! যা জুটেছে তার ভাগ্যে-কেননা তিনি তো বেগম খালেদা জিয়া। এ দেশের মাটি-পানি-তরুলতা যার স্নেহের পরশ মাখা। আর সেই ভালোবাসাই যেন ফিরিয়ে দিল এ দেশের ১৮ কোটি মানুষকে।
৩০ ডিসেম্বর ভোরে, কুয়াশা ঢাকা সকালে হাসপাতালের বিছানায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সাবেক তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন কণ্ঠস্বর বেগম খালেদা জিয়া। ভোরের আলো ফোটার আগেই তার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। শহর-নগর-গ্রাম থেকে ঢাকায় ছুটে আসতে থাকে মানুষ। তাদের কান্না আর দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল এলাকার পরিবেশ। একজন রাজনৈতিক নেতার জন্য সব শ্রেণি-পেশা ও ধর্ম-বর্ণের মানুষের এমন অভূতপূর্ব বিয়োগব্যথা পৃথিবী নিকট অতীতে আদৌ দেখেছে কিনা, তার কোনো দৃষ্টান্ত নেই।
বেগম খালেদা জিয়ার শেষ বিদায়কে ঘিরে বড় ধরনের জমায়েতের বিষয়টি বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শুরুতেই আলোচনা হয়। সে কারণে তার জানাজার স্থান নির্ধারণ করা হয় সংসদ ভবনের সামনের মাঠে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউকে লক্ষ্য রেখে এ স্থান নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীকালে লোকসমাগমের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মূল স্টেজ করা হয় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর পশ্চিম দিকে।
৩১ ডিসেম্বর দুপুর ২টায় জানাজার সময় নির্ধারিত থাকলেও সকাল থেকেই জানাজা স্থলকে কেন্দ্র করে জনতার ঢল নামে। দুপুরের আগেই পুরো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকা ছাড়িয়ে আশপাশের কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। রাজপথ থেকে অলিগলি-সবখানেই শোকার্ত মানুষের ঢল। এ এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। অবাক রাজধানী। কেবল পুরুষ নয়, রাজধানীতে শোকার্ত নারীদেরও ঢল নামে।
এক বিধবা নারী তার ছোট দুটি সন্তানকে নিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন। সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন আর দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যার কাছে ছিল পবিত্র আমানত, সেই মহীয়সীকে রাজপথ কখনোই নিরাশ করেনি। গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে তার অন্তিম যাত্রায় জনতার এ ঢল আবারও তার প্রমাণ দিল।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন-নির্যাতন, জেল-জুলুম আর হুলিয়া যাকে একটুও টলাতে পারেনি-সেই আপসহীন নেত্রীকে চোখের জলে মানুষ বিদায় জানাল। মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতিদান নিয়ে শেষ বিকালের দিকে তিনি স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সান্নিধ্যে চলে গেলেন। এখানেই চিরঘুমে কাটবে তার পরকালীন জীবনের অধ্যায়।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে বাংলাদেশবিরোধী চক্রান্তকারীদের হাতে নির্মমভাবে শাহাদতবরণ করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বীরউত্তম। সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া তখন পুরোদস্তুর গৃহিণী। এরপর নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসাবে যোগদান করেন। শুরু হয় তার রাজনৈতিক জীবন। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন এবং ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় প্রথম বক্তৃতা দেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বেই বিএনপির পূর্ণ বিকাশ ঘটে।
১৯৮৩ সালে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে সাত দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। এ সময় এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হলে বেগম জিয়া প্রথমে বিএনপিকে নিয়ে ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সাত দলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। একই সময়ে তার নেতৃত্বে সাত দল, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দলের সঙ্গে যৌথভাবে আন্দোলনের কর্মসূচি শুরু করে। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফা আন্দোলন চলে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বাধার সৃষ্টি হয়। ১৫ দল ভেঙে আট দল ও পাঁচ দল হয়। আট দল নির্বাচনে অংশ নেয়। এরপর বেগম জিয়ার নেতৃত্বে সাত দল ও পাঁচদলীয় ঐক্যজোট আন্দোলন চালিয়ে যায় এবং নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া ‘স্বৈরাচার এরশাদ হটাও’ এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। এর ফলে স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদ সংসদ ভেঙে দিতে বাধ্য হন। আবারও শুরু হয় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন।