বেগম জিয়ার মৃত্যু : স্বাভাবিক, নাকি স্লো পয়জনিং করে
এ লেখাটি লিখতে বসলাম বুধবার বিকাল পৌনে ৫টায়। তার পৌনে ২ ঘণ্টা আগে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা এবং মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তার জানাজা সমাপ্ত হলো। এ জানাজা নিয়ে আর কী লিখব? লেখার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। অতীতে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় জানাজা দেখেছি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার। তখনকার মতো সেটিই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃহত্তম জানাজা। এরপর দেখলাম শহীদ ওসমান হাদির জানাজা। এ জানাজা শহীদ জিয়ার জানাজার চেয়েও বড় ছিল। সম্ভবত কারণ হতে পারে, শহীদ জিয়ার শাহাদতের ৪৪ বছর পর শহীদ ওসমান হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ ৪৪ বছরে ঢাকা মহানগরীর জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়।
কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম। এ যেন এক মহাসমুদ্র। কোনো কূল নেই, কোনো কিনার নেই। নেই কোনো পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ। এতে যে কত মানুষ অংশ নিয়েছিলেন, সেটি হিসাব করে বা গণনা করে বের করা কঠিন। কারণ দক্ষিণে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রোড পর্যন্ত, উত্তরে শ্যামলী পর্যন্ত, পূবদিকে কাওরান বাজার পর্যন্ত মানুষ আর মানুষ। যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই মানুষ। এক সহযোগী দৈনিক শিরোনাম দিয়েছেন, ‘এক কোটি মানুষ’। আমি লক্ষ-কোটি কিছুই বলব না। কারণ, এক কথায় বলা যায়, মানুষের সংখ্যা বেশুমার। যিনি যত লক্ষ বা কোটি ধারণা করেছেন, তার সেই ধারণা করা অযৌক্তিক হবে না। কারণ একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলের ভাষ্যকাররাই তো বললেন, সমুদ্র উত্তাল জনতা। এ গোনার নেই কোনো শেষ। তারা এ-ও বললেন, এ শৈত্যপ্রবাহে, প্রচণ্ড কনকনে ঠান্ডার মধ্যেও তাদের মতে উত্তরে তেঁতুলিয়া আর দক্ষিণে সাজেক পর্যন্ত সব জায়গা থেকেই মানুষ এসেছিলেন। তেঁতুলিয়া আর সাজেক তার কল্পনা। কারণ তিনিও ভাবতে পারেননি, এত মানুষ কোত্থেকে এলো?
আমরা আর নতুন করে কিছু বলব না। যুগান্তরের প্রিয় পাঠক ভাইয়েরা, আপনারাই এখন বুঝে নিন, একজন মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা কত গভীর এবং সব শ্রেণির মধ্যে সেটি প্রোথিত না থাকলে লক্ষ বা কোটি মানুষ মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জানাজায় শামিল হতে পারে না। আর কী কী এবং কত ধরনের গুণ থাকলে একজন মানুষ হাজার নয়, লক্ষ নয়, কোটি মানুষের অন্তরে স্থান করে নিতে পারেন। অথচ সেই মানুষটি, অর্থাৎ বেগম খালেদা জিয়া গত ৬ বছর হলো, ক্ষমতা তো দূরের কথা, রাজনীতির দৃশ্যপটেই নেই।
শেখ মুজিব মানুষ খেপিয়ে রাজনীতি করতেন। তিনি অনলবর্ষী বাগ্মী ছিলেন। কিন্তু তার সেই আগুনঝরা বক্তৃতাই ছিল তীব্র বিদ্বেষ, ঘৃণা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আগুনের হলকায় ভরা। কিন্তু বেগম জিয়া তার ৪৪ বছরের রাজনৈতিক জীবনে শত্রু-মিত্র কারও বিরুদ্ধে কোনো রকম উসকানিমূলক অথবা ঘৃণাসূচক বক্তব্য দেননি। যে শেখ হাসিনা দেশনেত্রীর মতো একজন সফিস্টিকেটেড মহিলা ও নেত্রীকে সম্পূর্ণ মিথ্যা একটি মামলায় প্রথমে ৫ বছর এবং পরে ১০ বছর কারাদণ্ড বাড়িয়ে দেন, তার বিরুদ্ধেও বেগম জিয়া কোনো প্রতিশোধমূলক বক্তব্য দেননি। এমনকি ৫ আগস্ট জুলাই বিপ্লবের অবসানের পর ৬ আগস্ট যখন বেগম জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়, তখন মুক্তির পর ৭ আগস্ট নয়াপল্টনে বিএনপির জনসভায় অনলাইনে বক্তৃতা দিতে গিয়েও তার চরম শত্রু শেখ হাসিনার নাম ধরে তিনি কোনো কথা বলেননি। নাম না ধরেও তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক কোনো বক্তব্যও দেননি। বরং উলটো তিনি বলেছেন, এখন আর কোনো প্রতিশোধ নয়, এখন আসুন আমরা শান্তি কায়েম করি এবং শান্তিপূর্ণ একটি দেশ গড়ে তুলি।
যাকে কারাগারে স্লো পয়জনিং করা হয়েছে বলে বিএনপির নেতারা অভিযোগ করেছেন, সেই নেত্রী যদি সেদিন কারও দিকে অঙ্গুলি তুলতেন, তাহলে তার জনতার পদতলে পিষ্ট হওয়ার কথা; কিন্তু তার পরিবর্তে তিনি শান্তির ললিত বাণী শুনিয়েছেন চরম উত্তেজিত লক্ষ লক্ষ জনতাকে। অথচ তার হৃদয়ের শোক এবং কান্না যে কত গভীর, সেটি বোঝা যায় তার একটি উক্তিতে। উদ্গত কান্নায় তিনি বিলাপ করেছেন, ‘আমি কম বয়সে স্বামী (জিয়াউর রহমান) হারিয়েছি। কারাগারে থাকতে আমি আমার মাকে (তৈয়বা মজুমদার বেগম) হারিয়েছি। অফিসে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় আমি একটি সন্তান (আরাফাত রহমান) হারিয়েছি। আরেকটি সন্তান (তারেক রহমান) নির্যাতনে পঙ্গু হয়ে দূরদেশে এখনো চিকিৎসাধীন। আমার এ স্বজনহীন জীবনে দেশবাসীই আমার স্বজন।’
২.
৩০ ডিসেম্বর এক শীতার্ত সকালে ৬টার সময় আল্লাহ তাকে এ পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে এ কলাম লেখার সময় পর্যন্ত ৩০ ঘণ্টায় বাংলাদেশের সব দৈনিক পত্রিকা, টেলিভিশন, রেডিও ইত্যাদি গণমাধ্যমে মরহুমা দেশনেত্রী সম্পর্কে অসংখ্য খবর, ভাষ্য, কলাম এবং বিদগ্ধজনদের মন্তব্য প্রকাশিত ও সম্প্রচারিত হয়েছে। তার চরিত্রের এমন কোনো গুণবাচক দিক নেই, যা কেউ না কেউ বলেননি। তিনি আপসহীন, তিনি সদাচারী, তিনি মৃদুভাষিণী, তিনি শালীন, তিনি মার্জিত ইত্যাদি বহুমুখী গুণবাচক বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে এবং লেখা হয়েছে। আমি তার চরিত্রের গুণবাচক যে বিষয়টিই এখন বলব, সেটিই হয়ে যাবে রিপিটেশন।
তবে লক্ষ করেছি, একটি বিষয় অন্তত তার মৃত্যুর পর কেউ বলেননি। মৃত্যুর আগে যখন তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন, যখন তিনি ছিলেন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, তখন খোদ বিএনপিরই একাধিক নেতা গুরুতর অভিযোগ করেছেন, তাকে স্লো পয়জনিং করে হত্যা করা হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়েই আজ আমার লেখায় ফোকাস পাবে।
অন্য সব পয়েন্ট বাদ দিয়েও একটি বিষয় সবার মনেই আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেটি হলো, ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তাকে যখন কারাগারে নেওয়া হয়, তখন তিনি শারীরিকভাবে ছিলেন সম্পূর্ণ সক্ষম এবং সুস্থ। তার কারাদণ্ডের রায় শোনার পর থেকেই বিএনপির সর্ব শ্রেণির নেতাকর্মী এবং জনগণের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল। এ পুঞ্জীভূত আগুনের যেন প্রচণ্ড বিস্ফোরণ না হয়, তার জন্য বেগম জিয়া কারাগারে প্রবেশের আগেই নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দেন। তিনি বলেন, আমার কারারুদ্ধ হওয়াকে কেন্দ্র করে কেউ যেন কোনো অশান্তি বা হানাহানি সৃষ্টি না করে। তাই দেখা যায়, বেগম জিয়াকে কারাগারে নেওয়ার জন্য যখন প্রিজন ভ্যান আসে, তখন তাকে এসকর্ট করার জন্য অন্তত ৬ হাজার ব্যক্তি ৬ হাজার মোটরসাইকেলে স্টার্ট দেওয়া অবস্থায় উপবিষ্ট ছিলেন।