
কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে বৃত্তি পরীক্ষা বৈষম্যকে আইনি রূপ দেবে
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বৃত্তি পরীক্ষায় কিন্ডারগার্টেন বা কেজি স্কুলের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাতিল করে সরকার যেটি করেছে, সেটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—এটা এক ধরনের শিক্ষানীতিগত বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সামিল।
১৭ জুলাই ২০২৫, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে একটি পরিপত্র জারি করে জানানো হয়, চলতি বছরের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় কেবলমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পিটিআই সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই অংশ নিতে পারবে। কিন্ডারগার্টেন বা এনজিও পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নয়। অর্থাৎ দেশের শহরাঞ্চলের লাখো শিক্ষার্থী এই পরীক্ষার বাইরে থাকছে শুধুমাত্র তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধরন ভিন্ন বলে।
১৫ জুলাই অনুষ্ঠিত নির্বাহী কমিটির এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই পরিপত্র জারি করা হয়েছে। এই পরিপত্র জারির পর থেকেই দেশের লাখ লাখ কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষক-উদ্যোক্তাদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় বইছে এবং সংগঠিতভাবে আন্দোলনের প্রস্তুতির কথাও শোনা যাচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে—শিক্ষার মেধা যাচাইয়ের এমন একটি জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় কেন কিছু শিশুকে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে? কেন একটি শিশুর ভবিষ্যৎ প্রাথমিক পর্যায়েই নীতিনির্ধারকদের এই শ্রেণিবিভাজনের বলি হবে?
বাংলাদেশে কিন্ডারগার্টেন নামক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মূলত অভিভাবকদের চাহিদা, সরকারি ব্যবস্থার ঘাটতি এবং কিছুটা মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষার অভাবের কারণে বিকশিত হয়েছে। শহরাঞ্চলে অনেক পরিবারই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সন্তান পাঠাতে চান না নানা কারণে—শিক্ষকের স্বল্পতা, অবকাঠামোর দুরবস্থা তো আছেই, পাঠদানের মান নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। সেই জায়গা থেকে নানা রকম কেজি স্কুল গড়ে উঠেছে। অনেকেই নির্দিষ্ট কোনো সরকারি স্বীকৃতির আওতায় না থাকলেও, বাস্তবে তারা প্রাথমিক শিক্ষার অনেক বড় একটি অংশ জোগান দিচ্ছে।
২০২২ সালের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক তথ্যে দেখা যায়, দেশে আনুমানিক ৬০ হাজার কিন্ডারগার্টেন রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। এটি বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপখাত। বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি ইকবাল বাহার চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় এক কোটির বেশি শিক্ষার্থী এবং দশ লক্ষাধিক শিক্ষক সরাসরি কিন্ডারগার্টেন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।
কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা করে ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেছেন, কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে কোনো ধরনের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া হলে তা বৈষম্য ছাড়া কিছু নয়। একে তিনি দেশের শিক্ষা কাঠামোর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবেও অভিহিত করেন। তার ভাষায় এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করে নীতিনির্ধারকরা যদি এমন সিদ্ধান্তে অটল থাকেন, তাহলে তা শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে নয়, বরং রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে বাধ্য। একইসঙ্গে বাংলাদেশ বেসরকারি স্কুল বোর্ড ও বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দও যৌথভাবে এই সিদ্ধান্ত বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন এবং প্রয়োজনে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছেন।
মূলত, ২০০৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষা চালুর মাধ্যমে বৃত্তি পদ্ধতি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২২ সালে আবারও বৃত্তি পরীক্ষা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। তবে মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মেধা বৃত্তি’ এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য ‘উপবৃত্তি’ চালু থাকে। চলতি বছর নতুন করে বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ২১-২৪ ডিসেম্বর তারিখে। চারটি বিষয়ে—বাংলা, ইংরেজি, প্রাথমিক গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় ও প্রাথমিক বিজ্ঞান (যেখানে শেষ দুটি বিষয় একত্রে ৫০ শতাংশ করে এক পত্রে)—এই পরীক্ষা হবে বলে জানা গেছে।