মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম পুলিশ বাহিনীর গৌরবময় ভূমিকা

দৈনিক আজাদী প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩:০৮

.tdi_2_bbb.td-a-rec-img{text-align:left}.tdi_2_bbb.td-a-rec-img img{margin:0 auto 0 0} (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে দৃশ্যত মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। এরপর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে দুই লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং ৩০ লক্ষাধিক মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাকিস্তানিদের পরাজিত করে বাঙালিরা বিজয় অর্জন করে। কার্যত এই স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য গোপন প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল তারও প্রায় এক দশক আগে। আর এ প্রস্তুতিতে নেপথ্য ভূমিকা ছিল বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। বাঙালি নৌ, সেনা ও বিমান বাহিনীর সদস্যরা ছাড়াও অনেক বেসামরিক কর্মকর্তার পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর অনেক ছোট-বড় কর্মকর্তারও গোপন সমর্থন ছিল সেই গোপন আন্দোলনে। তাঁদের অনেকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছিল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগাযোগ। তাঁরা বিশ্বাস করতেন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই দেশের স্বাধিকার বা স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব। তাই সত্তরের নির্বাচনের আগেই জেলা পর্যায়ের এসব পুলিশ ও বেসামরিক কর্মকর্তা স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থক হয়ে উঠেছিলেন। এ কথার প্রমাণ মেলে ঐতিহাসিক ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র আসামি, পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের নৌ কমান্ডার আবদুর রউফের বক্তব্যে। এ লেখককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশকে স্বাধীন করার একটা প্রক্রিয়া যে চলছে তা নিয়ে অনেকের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল। ১৯৬৭ সালে আমি শুনেছি, তৎকালীন ১৭ জেলার মধ্যে ১৬ জন বাঙালি পুলিশ সুপার ও ১৩ জন জেলা প্রশাসক গোপনে আন্দোলনকে সমর্থন দিচ্ছিলেন’। ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলন ও প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পূর্বাপর উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তার পাকিস্তান বিরোধী ভূমিকা, মুক্তিপাগল জনগণকে সহযোগিতা এবং স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয় তাঁরা কত বড় দেশপ্রেমিক বাঙালি ছিলেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন চট্টগ্রামের তৎকালীন পুলিশ সুপার শহীদ এম শামসুল হক, দুর্নীতি দমন বিভাগের উপপরিচালক নজমুল হক, দামপাড়া পুলিশ লাইন্সের রেঞ্জ ইন্সপেক্টর আকরাম হোসেন ও কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল খালেক। মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের সময় বাঙালিদের ওপর বিহারী ও বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যদের নির্যাতন-হত্যা থেকে রক্ষা, বিভিন্ন স্থান বন্দুকের দোকান ও চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাব থেকে অস্ত্র নিয়ে যেতে ছাত্র নেতাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা। দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সহযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এসব কর্মকর্তার বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে চি‎হ্িনত হয়ে আছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই চার দেশপ্রেমিককে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এসপি এম শামসুল হক শহীদ এম শামসুল হকের জন্ম পরিচয় ও স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর জড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বর্তমানে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা পিপিএম লিখেছেন, ‘দেশের গর্ব শহীদ এসপি এম. শামসুল হক ১৫ আগস্ট ১৯৩৩ খ্রীষ্টাব্দে রাজবাড়ি জেলার খানখানারপুর থানার ধোপাখালী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রখর মেধাসম্পন্ন শামসুল হক খানখানাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক এবং ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। সেখান থেকে এম এ পরীক্ষা শেষ করার পর পরই প্রথমে রাজবাড়ি কলেজে এবং পরবর্তী সময়ে রংপুর কারমাইকেল কলেজে শিক্ষকতা করেন। তিনি ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান পুলিশ বিভাগে (পিএসপি) সহকারী পুলিশ সুপার পদে যোগ দেন। মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৫৯-৬০ সাল পর্যন্ত গভর্নর আযম খানের এডিসি হিসেবে গভর্নর ভবনে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬১ সালে নেত্রকোণায় এসডিপিও (মহকুমা পুলিশ কর্মকর্তা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পুলিশ বিভাগে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন শেষে লন্ডন থেকে ফিরে ১৯৬৬ সালের অক্টোবরে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় এসপি হিসেবে প্রায় তিন বছর চাকরি করেন। ১৯৬৯ সালে উত্তাল গণ-আন্দোলনের মুহূর্তে তিনি সিলেটে এসপি হিসেবে বদলি হন। এ সময় তিনি নেপথ্যে সরকারের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কাজ করতে থাকেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে সিলেটে আওয়ামীলীগ নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজীর সাথে তাঁর সখ্য গড়ে উঠে এবং গাজীর মাধ্যমে একদিন সরাসরি সাক্ষাৎ ঘটে ইতিহাসের মহানায়ক, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে। সিলেটে এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ৭০ এর নির্বাচনপূর্ব সময়ে বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসার সুবাদে মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। ৭০ এর নির্বাচনের আগে চট্টগ্রামে মুসলিম লীগের ফজলুল কাদের চৌধুরীর সন্ত্রাসী বাহিনী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়িতে লুটপাট ও অত্যাচার শুরু করলে চট্টগ্রামের তৎকালীন পুলিশ সুপার এস এ মাহমুদ ফজলুল কাদের চৌধুরীর পক্ষ নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন। তখন বঙ্গবন্ধু এসপি এম. শামসুল হককে মাত্র ৪ ঘণ্টার মধ্যে সিলেট থেকে চট্টগ্রামে পদায়নের ব্যবস্থা করেন। ১৯৭০ সালের ৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের দায়িত্ব নেওয়ার দুই দিন পরেই অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে আওয়ামী লীগ অভূতপূর্ব বিজয় অর্জনের মাধ্যমে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৯৭১ সালের মার্চের শুরুতে সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে শামসুল হক লালদীঘিরপাড়স্থ নিজ দপ্তরের কন্ট্রোল রুম স্থাপন করে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। চট্টগ্রামে তখন অবাঙালি এবং বিহারীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়। এই ঘটনায় শতাধিক বাঙালি নিহত এবং দু’শতাধিক লোক আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়। বিহারীদের সাথে ছদ্মবেশধারী সশস্ত্র ২০ বেলুচ রেজিমেন্টের সদস্যরা সাধারণ নাগরিকের পোশাকে অংশ নেয় বলে শোনা যায়। সৈন্যরা প্রায় শতাধিক নিরপরাধ বাঙালিকে ধরে নিয়ে যায়। এসপি শামসুল হক ক্ষিপ্ত হয়ে সার্কিট হাউস গিয়ে বাঙালি সামরিক প্রশাসক এম আর মজুমদারের সাথে আলোচনা করে ঘটনার সাথে জড়িত ১৪৫ জন অবাঙালিকে গ্রেপ্তার করেন। বেলুচ রেজিমেন্ট তখন পুলিশ সুপারের সাথে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়। ৩ মার্চের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে মূলত মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ঘটে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ডাক দিলে এসপি শামসুল হকও মাতৃভূমি রক্ষার শপথ নিয়ে নেমে আসেন জনতার কাতারে। চট্টগ্রামে প্রায় সাড়ে চার হাজার পুলিশ সদস্য নিয়ে তিনি জনগণকে উৎসাহ যুগিয়ে মনোবল বৃদ্ধি করেন। ২১ মার্চ চট্টগ্রামের অস্ত্রের দোকানগুলো হতে অস্ত্র নিয়ে তা ছাত্রনেতাদের হাতে তুলে দেয়া হয় হানাদারদের কবল থেকে দেশকে রক্ষার জন্য। ২৫ মার্চ নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন বৃহত্তর চট্টগ্রামের পুলিশ সদস্যদের সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলে সেই ঘোষণা বার্তা দ্রুত চট্টগ্রামে পৌঁছে। এসপি শামসুল হক ওয়ারল্যাসযোগে আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরীকে এবং টেলিফোনে রায়নগর থানার ওসি আব্দুল মান্নানকে বার্তাটি পাঠান। এসপি’র নির্দেশে ওসি ম্যাসেজটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাবরুম থানার ওসি মি. মুখার্জীর হাতে বুঝিয়ে দেন এবং বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বার্তাটি ত্রিপুরা, কলকাতা হয়ে দিল্লীতে পৌঁছানোর অনুরোধ জানান। ২৭ মার্চ পুলিশ সুপার ও অন্য অফিসারদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে বাঙালি পুলিশ ফোর্সকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে ইপিআর বাহিনীর সাথে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ২৮ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দামপাড়া জেলা পুলিশ লাইন্স আক্রমণ করে। বীর পুলিশ সদস্যরা অস্ত্রে-শস্ত্রে সু-সজ্জিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে মরণপণ যুদ্ধ করে দেশের জন্য অকাতরে জীবন উৎসর্গ করেন। এতে ৫১ জন পুলিশ সদস্য শহীদ হন। এ সময় ১ জন মেজরসহ ৭ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। ৭ এপ্রিল শত্রু বাহিনী এসপি এম. শামসুল হকের সহযোদ্ধা দুর্নীতি দমন বিভাগের উপপরিচালক নাজমুল হক পিপিএমকে হত্যা করে। এতসব ঘটনার পরও এসপি শামসুল হক পালিয়ে না গিয়ে বরং পুলিশ সদস্যদের নিয়ে শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান গড়ে তোলেন। এরই মধ্যে অন্যান্য বাহিনীর লোকজন শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। শামসুল হক এনায়েত বাজার এলাকায় তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান নেন। ১৫ এপ্রিল সকাল বেলা বাঙালি অফিসার (ডিআইজি, চট্টগ্রাম রেঞ্জ) এস এ মাহমুদসহ কিছু অবাঙালি, শত্রু বাহিনীর গাড়ি বহর নিয়ে ওই বাড়িতে আসেন। ডিআইজি এস এ মাহমুদ শামসুল হককে চাকরিতে যোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন এবং মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে সার্কিট হাউজে নিয়ে যান। ১৭ এপ্রিল সার্কিট হাউজ থেকে ইন্টারোগেশন অফিসে যাওয়ার পথে তিনি তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে দেখা করেন। এরপর তাঁকে যে আবার গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, এরপর তাঁর স্ত্রী মিসেস মাহমুদা হক নানা জায়গায় খোঁজ করেও স্বামীর কোনো সন্ধান পাননি। আগস্ট মাসের মাঝামাঝির দিকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে মিসেস মাহমুদা হক একখানা চিঠি পান, যাতে লেখা-‘আপনার স্বামী এপ্রিল, ১৯৭১ এ মারা গেছেন।’ পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন সূত্রে খবর নিয়ে জানতে পারেন ১৭ এপ্রিলই শত্রু সেনারা ইন্টারোগেশন সেলে তাঁর স্বামীকে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।’ অন্য এক তথ্যে জানা গেছে, চট্টগ্রাম পুলিশ লাইন ছাড়াও টেলিফোন এঙচেঞ্জ, স্টেট ব্যাংক, বেতার ভবন, বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়িতে পাকিস্তান সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে যে অগণিত পুলিশ শহীদ হয়েছেন তার মধ্যে ৮১ জনের নাম পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনের প্রথম গেইটে ঢোকার সময় স্মৃতিস্তম্ভের দিকে তাকাতেই এই ৮১ জন শহীদ পুলিশ সদস্যের নাম চোখে পড়ে। এর শীর্ষ স্থানে রয়েছে শহীদ এম শামসুল হকের নাম। জানা যায়, চট্টগ্রামে নির্বাচনের আগে গোলোযোগ সৃষ্টির জন্য ফজলুল কাদের চৌধুরী চট্টগ্রামের উপকণ্ঠে একটি সংখ্যালঘু গ্রামে গণ্ডগোল সৃষ্টি করে। চট্টগ্রামের তদানীন্তন এসপি’র নিষ্ক্রিয়তার ফলে ব্যাপারটি সংঘটিত হতে পেরেছিল। ফলে তাঁকে বদলি করে শামসুল হককে নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে চট্টগ্রামের আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ঠিক ওই সময়ে বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামের উপকণ্ঠে উপদ্রুত অঞ্চল পরিদর্শনে যান, একই সময়ে তাঁকে হত্যার এক ষড়যন্ত্র করা হয়। কিন্তু এস পি শামসুল হকের বিচক্ষণতায় বঙ্গবন্ধু সে যাত্রায় বেঁচে যান। অন্যদিকে শামসুল হক পড়েন পাকিস্তানি সামরিক চক্রের শ্যেন দৃষ্টিতে। ২৬ মার্চ থেকে চট্টগ্রামে বাঙালি যোদ্ধাদের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম শুরু হলে তাতে বাঙালি সৈনিক ও ই পি আর এর পাশাপাশি পুলিশ বাহিনী দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই প্রতিরোধে শামসুল হকের ভূমিকা ছিল অভাবনীয়। ২৮ মার্চ পাকিস্তান বাহিনী তাঁর বাংলো আক্রমণ করলে তিনি বাড়ির পেছন দিয়ে বেরিয়ে যান এবং একটি গাড়ি এসে তাঁকে নিয়ে যায়। ২৯ মার্চ থেকে তিনি তাঁর এক আত্মীয়ের বাসায় আত্মগোপন করেছিলেন। পরে সামরিক কর্তৃপক্ষ স্থানীয় ডি আই জির সহায়তায় তাঁকে খুঁজে বের করে জিজ্ঞাসাবাদের নাম করে নিয়ে যায়। অসহযোগ আন্দোলনের সময় এম শামসুল হকের ভূমিকা কাছে থেকে দেখেছেন আন্দোলনের সক্রিয়কর্মী ও প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ও ইদরিস আলম। তিনি লিখেছেন, ‘৩ মার্চ পাহাড়তলী থেকে কাঁধে করে আমরা একজন নিহত বাঙালির লাশ এনে লালদীঘির ময়দানে জনসভা করি। পরদিন আমি, মওলানা নুরুল ইসলাম ও হারিসদা খালি পায়ে হেঁটে পুলিশের এসপি শামসুল হকের সঙ্গে দেখা করি। তিনি ছিলেন পাকিস্তানি পুলিশ সার্ভিসের একজন মেধাবী, দীর্ঘকায় সুদর্শন বাঙালি অফিসার। আমি তাঁকে রাগত কণ্ঠে বলি যে, “অবাঙালি পুলিশ-মিলিটারি যখন বিহারিদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে তখন আপনি একজন বাঙালি হয়ে কি করে বাঙালি পুলিশ নিয়ে চুপচাপ বসে আছেন?” আমি কথা বলছিলাম তারস্বরে উগ্রমেজাজে, কিন্তু তিনি হাসিমুখে শুনে যাচ্ছিলেন। এই আলাপের সময়ে দেখলাম তাঁর পাশে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর একজন পদস্থ অফিসার বসে আছেন। সেই অফিসার বাথরুমে গেলে তিনি আমাদের চাপাস্বরে বললেন, “ইনি ব্রিগেডিয়ার আনসারি, আমাকে পাহারা দিচ্ছে। তাই এতক্ষণ কিছু বলিনি। এখন বলছি শুনুন, “আপনারা যান, আমার পুলিশ আপনাদের পাশাপাশি থেকে অবাঙালি হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।” এই সময় পাথরঘাটার দুইজন আওয়ামী লীগ কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হলে তিনি তৎক্ষণাৎ তাদের ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। শামসুল হক সাহেব শুধু সকল থানাতেই কালো পতাকা তোলেননি, নিজের অফিসেও কালো পতাকা তোলেন। তখনো দু’জায়গায় কালো পতাকা উঠেনি, একটা কোতোয়ালী থানা ও অন্যটা লালদীঘির উত্তর পাড়ের এক “বিখ্যাত বাড়ি”। শামসুল হক সাহেব স্টেশন রোডস্থ রেস্ট হাউসের আওয়ামী লীগ কার্যালয় পরিদর্শনে এলে আমি তাঁকে কোতোয়ালী থানায় তখনো কালো পতাকা না তোলার অভিযোগ করলে তিনি দ্রুত কোতোয়ালী থানায় গিয়ে ওসি খালেক সাহেবকে পতাকা তুলতে নির্দেশ দেন।’ ইদিস আলম আরও জানাচ্ছেন, ‘২৫ মার্চের পর কোতোয়ালীর ওসি খালেক সাহেবকে হানাদার বাহিনী গুলি করে মেরে জিপের পেছনে তাঁর লাশ বেঁধে সারা শহর ঘোরায়। শামসুল হক সাহেবকে সার্কিট হাউসে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে তাঁর লাশ গুম করে ফেলা হয়। তাঁর স্ত্রী ছিলেন আমাদের সিটি কলেজের অধ্যাপিকা। এই সময়ে আমি ছিলাম ছাত্র সংসদের সম্পাদক। ফলে, স্বামী-স্ত্রী দু’জনের সঙ্গেই হৃদ্যতা ছিল। বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করার পর শামসুল হক সাহেবের স্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রীর সেক্রেটারিয়েটে নিয়োগ দেন’। শহীদ নাজমুল হক পিপিএম নাজমুল হকের বাড়ি নওগাঁ জেলায়। ইংরেজি সাহিত্যে এমএ ও আইনে ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি পাকিস্তান পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন ডেপুটি পুলিশ সুপার হিসেবে, ১৯৫০ সালে। ১৯৬৭ সালে তিনি পিপিএম পদক পান। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন দুর্নীতি দমন বিভাগের চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক। বাসা ছিল সার্সন রোডে। অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও এসপি শামসুল হকসহ পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটনের পক্ষে ভূমিকা রাখেন। ২৫ মার্চ যুদ্ধ শুরুর পর তিনি দামপাড়া পুলিশ লাইনে অবস্থান করছিলেন। শত্রু বাহিনীর হাতে শহরের পতন ঘটার পর তিনি সার্সন রোডের বাসায় অবস্থান করছিলেন। ৭ এপ্রিল বিকেলে শত্রু বাহিনীর লোকজন তাঁকে প্রথমে সার্কিট হাউস এবং পরে সেনানিবাসে নিয়ে অন্য ৭ বন্দির সাথে হত্যা করে। অমানবিক নির্যাতনে হত্যা আর আই আকরাম হোসেনকে একাত্তরে আকরাম হোসেন ছিলেন দামপাড়া পুলিশ লাইন্সের রেঞ্জ ইন্সপেক্টও (আর আই)। বাড়ি পাবনা জেলায়। একাত্তরের মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই ছিলেন স্বাধীনতাকামী। তিনি রাঙামাটি পুলিশে থাকার সময় থেকে তাঁকে কাছে থেকে দেখেছেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষিকা মিনহাজুন্নিছা (বর্তমানে লেখক)। ২৫ মার্চ দিনগত রাতের ঘটনার বর্ণনা করে তিনি জানান, আকরাম হোসেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক ছিলেন। রাতে প্রচণ্ড গোলাগুলির এক পর্যায়ে আকরাম হোসেন তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এক লরিতে করে মিনহাজুন্নিছার বাবার বাকলিয়ার বাসায় যান এবং তাঁর তিন মেয়েকে সেখানে রেখে ছুটে যান দামপাড়ার যুদ্ধক্ষেত্রে। তিনি এসপি শামসুল হকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছেন হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে। ২৬-২৭ মার্চ শহরের পরিস্থিতি খারাপ হলে মিনহাজুন্নিছা আকরাম হোসেনের মেয়েদের নিয়ে স্বামীর সঙ্গে তাঁদের চুনতির বাড়িতে চলে যান। এদিকে পাকিস্তানিদের সঙ্গে টিকতে না পেরে আকরাম হোসেন এপ্রিলের প্রথমে বাকলিয়ায় মিনহাজুন্নিছার বাবার বাসায় এবং পরে চুনতিতে পরিবারের কাছে চলে যান। কিন্তু ৯ এপ্রিল তিনি আবার শহরে ফিরে আসেন এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের সংগঠিত করে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার চেষ্টা চালান। কিন্তু ১২ এপ্রিল তিনি ধরা পড়েন এবং এসপি শামসুল হকের মতো তাঁকেও অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। কয়েকদিন পর তাঁর পরিবারের সদস্যরা স্থানীয়দের কাছ থেকে মিনহাজুন্নিছার বাবার জোগাড় করে দেওয়া বোরকা পরে অনেক কষ্টে পাবনা চলে যান। হাত-পা কেটে এবং চোখ উপড়ে হত্যা ও সি খালেককে চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি খালেক নামেই পরিচিত) আবদুল খালেকের বাড়ি ছিল ঢাকা জেলার বৈদ্যেরবাজার থানার মুচার চর গ্রামে। কিন্তু বড় হয়েছেন চট্টগ্রামের পশ্চিম মাদারবাড়ি এলাকায়, তাঁর নি:সন্তান চাচা করম আলীর বাসায় থেকে। পড়ালেখা করেছেন চট্টগ্রামের কলেজিয়েট স্কুল ও চট্টগ্রাম কলেজে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন মননে ও কাজে স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। অসহযোগ আন্দোলনের সময় থেকে যুদ্ধ শুরুর পর শাহাদাৎ বরণের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর বিশ্বাসের প্রমাণ দিয়েছেন। ২৫ মার্চের পর থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত মুক্তিপাগল তরুণ যোদ্ধাদের অস্ত্র সংগ্রহ এবং লড়াইয়ে উৎসাহ, সাহস ও সহযোগিতা দিয়েছিলেন তিনি। এ ব্যাপারে এসপি এম শামসুল হকের সঙ্গে বোঝাপড়া ও সহযোগিতার সম্পর্ক ছিল ওসি খালেকের। এসব কারণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কোপানলে পড়েন তিনি। ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় এসপি এম শামসুল হকের সঙ্গে অজ্ঞাত স্থানে দেখা করে থানায় ফিরছিলেন, ততক্ষণে থানা এলাকার কর্তৃত্ব নিয়ে ফেলেছে দখলদার বাহিনী। টের পেয়ে ওসি খালেক চলে যান চাচার বাসায়। তাঁর গতিবিধির ওপর নজর রাখছিলেন অবাঙালি পুলিশেরা। তাদের সহযোগিতায় শত্রুসেনারা ওই বাসা ঘেরাও করে ওসি খালেককে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে বিবস্ত্র অবস্থায় একটি খোলা জিপে বিভিন্ন সড়কে ঘুরিয়ে থানায় আনা হয়। সেখান থেকে সেনানিবাসের নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে চালানো হয় চরম অত্যাচার। ১৮ এপ্রিল তিনি চাচার বাসায় ফোন করে চাচাকে অনুরোধ করেন তাঁর মুক্তির জন্য কিছু করা যায় কিনা দেখার জন্য। চাচা করম আলী সেনানিবাসে গেলে তাঁকে গালাগাল দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। ২২ এপ্রিল সকালে চাচার সঙ্গে আবার যোগাযোগ করেছিলেন ওসি খালেক। এরপর একে একে তাঁর হাত-পায়ের আঙ্গুল ও হাত-পা কেটে এবং সবশেষে চোখ উপড়ে ফেলে তাঁকে হত্যা করা হয়। শহীদ স্মরণে নানা উদ্যোগ-আয়োজন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ এম শামসুল হকের অবদান স্মরণীয় করে রাখার জন্য বর্তমানে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা পিপিএম সিলেটের পুলিশ সুপার থাকার সময় (২০১৩-১৪) তাঁর প্রচেষ্টায় পূবালী ব্যাংকসহ সিলেটের দানশীল ব্যক্তিদের সহযোগিতায় প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে ‘শহীদ এসপি এম. শামসুল হক মিলনায়তন’ নামে ১২০০-১৫০০ লোক বসার ধারণ ক্ষমতা একটি মিলনায়তন নির্মাণ করা হয়। মিলনায়তনে মাসিক কল্যাণ সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রীতিভোজসহ জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের অনেক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও মিলনায়তনটি সিলেট জেলা পুলিশ লাইন্সে অবস্থানরত আরআরএফ, এসএমপি ও ৮ম এপিবিএন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যবহার করে থাকে। এ ছাড়া দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে ‘শহীদ এম শামসুল হক সরণী’, ‘শহীদ নজমুল হক ব্যারাক’, আকরাম হোসেনের স্মরণে ‘শহীদ আকরাম হোসেন ব্যারাক’ এবং ‘আবদুল খালেক স্মরণী’ স্থাপন করে তাঁদের সম্মানিত করা হয়েছে। চট্টগ্রামের হালিশহরে জেলা পুলিশ লাইন্সে ‘শহীদ এসপি এম শামসুল হক পাবলিক স্কুল’ শামসুল হকের স্মৃতি বহন করে চলেছে। এ ছাড়া, সমপ্রতি এসপি নূরে আলম মিনার উদ্যোগে শহীদ পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের স্মৃতিকে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে হালিশহর পুলিশ লাইন্সে ‘জাগ্রত ৭১ নামে’ একটি স্মৃতিস্মারক স্থাপন করা হয়েছে। এই স্মৃতিস্মারককে ঘিরে টাইলস ম্যুরাল দিয়ে চিত্রিত করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ, ভাষা আন্দোলন ও ৬ দফা আন্দোলনের ইতিহাস, শহিদ এসপি শামসুল হকের জীবনী এবং একাত্তরের যুদ্ধে শহিদ ৮১ জন পুলিশ সদস্যের নাম। পুলিশ লাইন্সের সব ব্যারাক, আবাসিক ভবন, পাঠাগার ও অভ্যন্তরীণ সড়কসহ সব স্থাপনা এসব শহিদের নামে নামকরণ করা হয়েছে। লেখক: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণাকর্মী, সম্পাদক-ইতিহাসের খসড়া.tdi_3_d92.td-a-rec-img{text-align:left}.tdi_3_d92.td-a-rec-img img{margin:0 auto 0 0} (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত