ছবি সংগৃহীত
আমার এক হাতে সংসার আরেক হাতে লেখালেখি: সেলিনা হোসেন
আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০৭:৫০
সেলিনা হোসেন। ছবি: শামছুল হক রিপন, প্রিয়.কম।
(প্রিয়.কম) একটি মেয়ে, তাকে পরিবারের সবাই ক্ষ্যাপাতো ‘বাপের লেজ’ বলে। কারণ তিনি বাবার খুব আদরের ছিলেন। বাবা সরকারি কর্মকর্তা হবার কারণে বিভিন্ন জায়গায় বদলি হতেন। আর এই ছোট মেয়েটি বাবার পিছু নিতেন। বাবা যেখানেই যেতেন, মেয়েটি একটি পুঁটলি বানিয়ে গাড়ির পেছনে উঠে বসে থাকতেন। গাড়িতে চড়ার সময় বাবাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে পাগল করে দিতেন। ‘বাবা তোমার চুল সাদা হয়ে যাচ্ছে কেন? বাবা তুমি আমাকে মারো না কেন? আমি কী তোমার খুব ভালো মেয়ে?’ বাবা কিছুই বলতো না। অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতো। হ্যাঁ, বলছি আমাদের সবার প্রিয় কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের কথা। সম্প্রতি তিনি তার সাহিত্য এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলেন প্রিয়.কম এর সঙ্গে।

সেলিনা হোসেন। ছবি: শামছুল হক রিপন, প্রিয়.কম
প্রিয়.কম: লেখালেখিতে আসা কী আপনার আব্বার ইচ্ছাতেই? আপনার ছোটবেলা সম্পর্কে কিছু বলুন।
সেলিনা হোসেন: না। আসলে আমার লেখক হওয়ার কোনো স্বপ্ন ছিল না। কোনো কিছুই হওয়ার স্বপ্ন ছিল না। আমি খুবই দূরন্ত ছিলাম। প্রকৃতির প্রতি দুর্বল ছিলাম। আব্বার কলিগদের বাচ্চারা মিলে তিন-চার জনের একটা দল ছিলাম। সারাক্ষণ নদী, ধানক্ষেত, পেয়ারা গাছ আর পুকুর পাড়ে ঘুরে বেড়াতাম। টুনটুনির বাসা থেকে ডিম নিয়ে আসতাম। সেই ডিম দেখে আব্বা বকা দিতেন। বকা খেয়ে আবার ডিম বাসায় রেখে আসতাম। শামুক এর ডিম টিপে দেখতাম, ভেতরে কী আছে। এসব করতে আমার কী-যে ভালোলাগতো। পেয়ারার গাছের মগডালে উঠতাম পাকা পেয়ারা পাড়ার জন্য। যখন দেখতাম আব্বা অফিস থেকে আসছে, সেখান থেকে লাফিয়ে পড়তাম মাটিতে। গিয়ে আব্বাকে জড়িয়ে ধরতাম। আব্বু বাসায় ফেরার সময় কিছু না কিছু হাতে করে নিয়ে আসতেন। আমি সেগুলো বেশিরভাগটা রেখে তারপর অন্যদের দিতাম। আমি এই দু’মাস আগে করোতোয়া নদীর পাড়ে যখন দাঁড়ালাম, আমার বুকের ভেতর ব্যথা শুরু হয়ে গেল। দেখলাম নদীটা শুকিয়ে একদম এতটুকু হয়ে গেছে।
প্রিয়.কম: ‘নদীটির ঘুম ভেঙেছে’ তো আপনার লেখা একটি উপন্যাস। এটা কোন এলাকার ঘটনা নিয়ে লিখেছিলেন?
সেলিনা হোসেন: এটা দিনাজপুরের একটি ঘটনা। মাটি ফেটে পানি উঠছে। আমি এই ব্যাপারটিকে এভাবে দেখতে চেয়েছি যে, এই এলাকায় একটি নদী শুকিয়ে গিয়েছিল, নদীটি এখন জেগে উঠেছে। এটি একটি বাস্তব ঘটনা। মানুষের দস্যুপনার কারণে আজ নদীগুলোর এই অবস্থা। আমি এই উপন্যাসটি বাংলাদেশের নদীকে কেন্দ্র করে লিখেছি।
প্রিয়.কম: আমাদের নদীগুলোকে বাঁচাতে কী করা উচিৎ?
সেলিনা হোসেন: আমরা দেরি করে ফেলেছি। আমি বলবো, বর্তমানে সরকারকে আরো দ্রুত নদীর অস্থিত্ব রক্ষার জন্য কাজ করা উচিৎ। নদী ছাড়া কিন্তু বাংলাদেশ বিপদে পড়ে যাবে। যার প্রমাণ মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে।
প্রিয়.কম: যা বলছিলেন, ছোটবেলার গল্পটা কিন্তু এখনও শেষ হয়নি….
সেলিনা হোসেন: আমি আমার আব্বার খুব কাছে কাছে থাকতাম। বাবার কাছে গ্রামের অনেক মানুষ আসতো। গ্রামে চিকিৎসার তেমন ব্যবস্থা ছিল না। বাবা বই পড়ে হোমিও চিকিৎসা কীভাবে করে তা শেখার চেষ্টা করতেন। আর আমি পাশে বসে থাকতাম। বাবা আমাকে ছোট ছোট কাগজের টুকরা দিয়ে পুরিয়া বানাতে দিতেন। বলতেন, ‘নাক্স ভোম বড়ি তিনটা দাও।’ সন্ধ্যাবেলায় অফিস শেষে বাড়ির সামনে হারিকেন জ্বালিয়ে আব্বাকে ঘিরে বসতো গ্রামবাসী। তারা শুধু ঔষধ নিতে আসতেন এমন না। নিজেদের বিভিন্ন সমস্যার কথা নিয়েও আব্বার কাছে আসতেন। একদিন এক বুড়ো মা এসে আব্বাকে বললেন, ‘আমার ছেলে আমাকে ভাত দেয় না।’ আব্বা তো সেই রেগে গেলেন। ছেলেকে খবর দেয়া হলো। ছেলে আসার পর কয়েকজনকে বললেন, ‘ওর পেটে একটি কাঁঠাল বেঁধে দিয়ে ঘোরাও পুরো গ্রামে। দেখুক ভার বইতে কী কষ্ট।’ এবং লোকজন তাই করলেন। এই যে মানুষে মানুষে সম্পর্ক, মানুষের সংকট, এগুলো আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। এগুলো আমাকে ভাবিয়েছে, শিখিয়েছে। কিন্তু আমি যখন বড় হয়ে মার্কস এ্যাঙ্গেলের বই পড়লাম তখন আমার মনে হয়েছে, নাহ্, আব্বা কাজটা ঠিক করেননি। অর্থনীতির কাছে মায়ের প্রতি ভালোবাসা এখানে মার খেয়েছে। ঐ ছেলেটি বলেছিল, ‘আমারই তো ভাত জোটে না, আমি মাকে কী করে চালাবো।’ ওর একটা বাচ্চা ছিল। স্নেহ নিম্নগামী। ওর মনে হয়েছে, মায়ের চেয়ে আমার এই শিশুটিকে খাওয়ানো বেশি জরুরি। এই সম্পর্কগুলো আমি আব্বার পায়ের কাছে বসে আবিষ্কার করতে পেরেছি। ঐ-যে ছোটবেলার সঞ্চয়। আমার সোনালী শৈশব থেকে পাওয়া মানুষের গল্প থেকে মনে হয়েছে আমার লিখতে হবে। না লিখতে পারলে আমি বাঁচবো না। আমি তো প্রথম কবিতা দিয়ে শুরু করেছিলাম। পরে মনে হয়েছে, নাহ্ আমার আরো বড় ক্যানভাস দরকার। তখন একটা গল্প লিখলাম। ১৯৬৪ সালে রাজশাহী ডিভিসনের একটা সাহিত্য সংঘ, একটি সাহিত্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। তখন আমি একটা গল্প জমা দিয়েছিলাম। আমার লেখাটা প্রথম হয়েছিল।
প্রিয়.কম: আপনার বাসায় শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি। কার লেখা পড়ে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন বেশি?
সেলিনা হোসেন: আমি তোরবীন্দ্রনাথ ছাড়া কিছু বুঝি না। যদিও আমি তেমন করে বলি না। তাহলে তো অনেক কিছু হয়ে যাবে। তার জ্ঞানের যে পরিধি কী বলবো…! ছিন্নপত্র পড়লে বুঝতে পারবেন। একজন জমিদার কী করে এতো বৈচিত্র্যময় হতে পারে। গরিব মানুষের প্রতি তার যে মায়া। হরি চরণ দাস তার জমিজমার দেখভাল করতেন। তাকে চিঠি লিখেছেন, ‘যাদের ফসল নষ্ট হয়েছে তাদের সবার খাজনা মাফ।’ প্রকৃতির প্রতি তার যে টান! চিঠিতে লিখেছেন, ‘প্রবল বন্যায় ভেসে গেছে, নদীতে গ্রামের বধুরা বাচ্চাদের গোসল করাচ্ছে। পাশে গাছের ডালে একটি সাপ লিকলিক করছে। তিনি ফিরে এসে চিঠিটা শেষ করলেন এভাবে যে, মানুষের জীবনে দুর্যোগ তিনটি। এক. প্রকৃতি, দুই. রাষ্ট্র ব্যবস্থা, তিন. শাস্ত্র বা ধর্ম। ধর্মের কারণে আজ সমাজে এই শ্রেণি বিন্যাস। এই তিনটা জিনিস পড়ার পরে আমি মনে করেছি, আমার আর জ্ঞানের দরকার নাই, জ্ঞানের জন্য আমার আর কোথাও যাওয়ার দরকার নাই।
প্রিয়.কম: কবি থেকে কথা সাহিত্যিক। আপনার কথার প্রেমে কেউ পড়েছিল?
সেলিনা হোসেন: বুঝলাম না।
প্রিয়.কম: আপনার প্রেমে কেউ পড়েছিলেন?
সেলিনা হোসেন: একটু হেসে…, এগুলো তো ছিলই। তবে আমি তো সব সময় পড়াশোনা-লেখালেখি নিয়ে পড়ে থাকতাম। কেউ সাহস পেত না। আমি তখন ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। তো দলের একজন আমাকে একদিন একটি চিঠি দিয়েছিল। আমি চিঠিটা ছিঁড়ে তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলাম।

সেলিনা হোসেন। ছবি: শামছুল হক রিপন, প্রিয়.কম।
প্রিয়.কম: সে নাছোড়বান্দা ছিলেন না?
সেলিনা হোসেন: না। সে রকম ছিলেন না। কারণ একই দলে কাজ করতাম তো। আর আমি ক্লাস শেষে লাইব্রেরিতে চলে যেতাম। আড্ডা দিতাম কম।
প্রিয়.কম: আপনার কী কারো প্রতি ভালোলাগা কাজ করতো না?
সেলিনা হোসেন: না, একদম না।
প্রিয়.কম: কলেজ লাইফে শুধু পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন?
সেলিনা হোসেন: নাহ্, আমি গিটার বাজিয়েছি, নাচ করেছি। আমাকে ছাড়া কলেজে কোনো অনুষ্ঠান হবে আমি ভাবতেই পারতাম না।
প্রিয়.কম: গতকাল ২১ ফেব্রয়ারি ছিল। আপনার ‘যাপিত জীবন’ আর ‘মীর আজীমের দুর্দিন’ ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা। ভাষা আন্দোলন নিয়ে কিছু বলুন…
প্রিয়.কম: হ্যাঁ। তখন তো আমার পাঁছ-ছয় বছর বয়স। বগুড়ার একটা গ্রামে বাস করতাম। আমি মনে করেছি আমাদের ঐতিহাসিক উপকরণগুলো কী? ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতাকে হারানো এইগুলোই তো। তরুণ প্রজন্ম যেন একটা গল্পের মাধ্যেমে আমাদের ইতিহাসটাকে জানতে পারে। তাদের হয়তো একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ পড়লে ভালো লাগবে না। সে জন্য অনেক ঘেঁটেঘুঁটে কাজগুলো করেছি।
প্রিয়.কম: ‘আগস্টের একরাত’ ও ‘গায়ত্রির সন্ধ্যা’ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা। বঙ্গবন্ধু আপনার লেখাকে কেমন প্রভাবিত করেছে?
সেলিনা হোসেন: [বঙ্গবন্ধু… (শব্দটি উচ্চারণ করেই অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন)] বঙ্গবন্ধু একজন মানুষ যাকে নিয়ে একটা পুরো সাহিত্য জগৎ তৈরি করা যাবে। আমি তার রাজনীতি করিনি। আমি বাম রাজনীতি করেছি। আমি মার্কসবাদ পড়েছি। শুধু আমার লেখায় কেন, বঙ্গবন্ধু একটি জাতির জীবনকে প্রভাবিত করেছে।
প্রিয়.কম: বাংলাদেশ তো তিতুমীর, লালন ও প্রীতিলতার দেশ। ধর্মান্ধতা আর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে দেশে এসব কী হচ্ছে, এ বিষয়ে কিছু বলবেন?
সেলিনা হোসেন: সংস্কৃতিকে যতক্ষণ আমরা বুকে ধারণ না করবো ততক্ষণ এইসব হতেই থাকবে। আমাদের বুঝতে হবে আইডিন্টিটা কী। আমি কী খাচ্ছি, কী পরছি, আমার শেকড় কী। ততক্ষণ পর্যন্ত এই জঙ্গিবাদ, জাতিভেদ এবং সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। আমাদের ছেলে কেন আজ জিন্সের ভেতর বোমা রাখবে! কেন সে নিজেদের মানুষকে কোনো কারণ ছাড়াই মারবে। সবারই একটা ধর্মপালনের জায়গা থাকবে। মানুষের ধর্ম এবং দর্শনকে সম্মান করতে হবে। এই যে অপশক্তিগুলো এগুলো শক্ত হাতে রুখে দিতে হবে। এই যে হলি বেকারিতে ঘটনাটা ঘটে গেল এর দায় কার? এই দায় আমার, আমাদের রাষ্ট্রের, আমাদের সবার। আজ সিয়েরালিওনে বাংলা ভাষাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা করা হয়েছে। যেখানে আমাদের ভাষার সংস্কৃতি দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে যাচ্ছে সেখানে এগুলো কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। ব্লগারদের হত্যা করা হচ্ছে, লেখকদের হত্যা করা হচ্ছে, সাওতালদের বাড়ি ঘর পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। কেন করা হচ্ছে এসব? তারা তো আমাদের জাতির বৈচিত্র্য!

সেলিনা হোসেন। ছবি: শামছুল হক রিপন, প্রিয়.কম
প্রিয়.কম: এই অপশক্তিগুলোকে রুখতে রাষ্ট্রের কী চ্যালেঞ্জ নেয়া উচিৎ বলে আপনি মনে করেন?
সেলিনা হোসেন: রাষ্ট্রের যা করা উচিৎ বলে মনে হয় তাই করতে হবে। এগুলো হবে কেন? নাসিরনগরের হিন্দুদের বাড়ি ঘর পুড়লো কেন? রাষ্ট্র কোথায়? প্রকাশ্যে পেটানো উচিৎ ওদের, যারা এই কাজগুলো করছে।
প্রিয়.কম: আচ্ছা, এবার আবার আপনার বইয়ের প্রসঙ্গে আসি। ‘আণবিক আঁধার’-এ নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে বলেছেন। পরকীয়া ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলেন…
সেলিনা হোসেন: একজন নারী বা পুরুষ, যদি সংসারের ভেতরে থাকে তাহলে থার্ড সম্পর্কটাকে আপনি পরকীয়া বলতে পারেন। শুধু চোখের ভালোলাগা থেকে যদি নোংরামি করতে যান তাহলে পরকীয়া হবে। আমি এই উপন্যাসটিতে ‘প্রশান্তি’ চরিত্রটি তৈরি করেছি, একজন অটিস্টিক সন্তানের মাকে কী করে বেঁচে থাকতে হয়, মানসিক অশান্তি থেকে কী করে স্বপ্ন দেখতে হয়, সেটা বোঝানোর জন্য। প্রত্যেকটা মানুষের একটা ফ্যান্টাসি থাকে। যেটা তাকে মানসিকভাবে বাঁচিয়ে রাখে। মানুষকে ভালো থাকতে হবে, সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে হবে। তার স্বামী অটিস্টিক সন্তানের কারণে তাকে প্রতিনিয়ত দোষারোপ করে যাচ্ছে। এই সমস্ত প্রতিবন্ধকতা থেকে কীভাবে একজন নারী জীবনকে মোচড় দিয়ে ফিরিয়ে নিতে পারে সেটা দেখানোর জন্য। যেখানে সে বিঞ্চিত হচ্ছে। আপনাকে জীবনের শিল্পবোধটা বুঝতে হবে। জীবনের যে বিচিত্ররুপ, যে ভালোলাগার জায়গা, সেখানে যদি অন্য কেউ হাত বাড়িয়ে দেয় তাহলে কেন সে গ্রহণ করবে না!
প্রিয়.কম: আর কোন কোন ক্ষেত্র নিয়ে আপনার লেখার ইচ্ছে আছে?
সেলিনা হোসেন: আরো অনেকগুলো কাজ করে যেতে চাই। আমি সেগুলোর তথ্য-উপাত্য সংগ্রহ করে ফেলেছি। আমার মনে হয়, এই কাজগুলো আমার করে ফেলা উচিৎ।
প্রিয়.কম: জানতে পারি লেখার বিষয়গুলো কী?
সেলিনা হোসেন: যেমন রোহিঙ্গা ইস্যু, কাপ্তাইয়ের চাকমাদের নিয়ে একটি উপন্যাস লিখবো, হরিজন সম্প্রদায় নিয়ে লিখবো। এরকম আরো দশটা বিষয় নিয়ে লেখার ইচ্ছা আছে। দেখি আল্লাহ-পাক কী করেন।
প্রিয়.কম: এতো কাজ করেও সংসার সামলান কীভাবে?
সেলিনা হোসেন: আমার এক হাতে সংসার আরেক হাতে লেখালেখি। আমার সংসারিক দায়িত্বকে কখনোই আমি অবহেলা করিনি। আমার মেয়ে লারা’র বয়স যখন দুমাস তখন আমি বাংলা একাডেমির চাকরিটা পেয়েছি। বাসায় কাজের মেয়ের কাছে রেখে অফিস করেছি আবার বিকেলে বাসায় এসে তাদের আদর-যত্ন করেছি। তারা কী খেতে পছন্দ করে রান্না করে দিয়েছি। বিকেলে তাদের আব্বুর সাথে যখন তারা বেড়াতে যেতো তখন আমি টেবিলে বসে দু’পৃষ্ঠা লিখে ফেলেছি। আমি শ্বশুর-শাশুড়ির যত্নও করেছি। আর আমি সবার আগে আমার বাচ্চাদের খেয়াল রেখেছি। তারা যেন সুন্দরভাবে গড়ে উঠতে পারে। মানুষ তাদেরকে যেন অবহেলা না করতে পারে, সেদিকে খেয়াল রেখেছি।
প্রিয়.কম: সেদিক থেকে পুরুষ মানুষগুলো তো একটু ফাঁকিবাজ থাকে…
সেলিনা হোসেন: আমি অবশ্য ঢালাওভাবে এই কথা বলবো না। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক স্বামী আছেন যাদের হাতের রান্না তাদের স্ত্রীদের চেয়েও সুস্বাদু।
প্রিয়.কম: এখন জীবনটাকে কীভাবে দেখেন?
সেলিনা হোসেন: এখন খুব বিষণ্ণ হয়ে যাচ্ছি। এখন মনে হয়ে আমার আর বেঁচে থাকার দরকার নাই।
প্রিয়.কম: মন খারাপ হয় কোনো কিছু নিয়ে?
সেলিনা হোসেন: না। সেরকম কোনো ব্যাপার নেই মন খারাপ হওয়ার মতো। জীবনে অনেক সম্মান পেয়েছি। এবার ১১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বভারতী গিয়ে জানলাম একজন মেয়ে, আমার লেখা নিয়ে পিএইচডি করেছে। ১৯৯১ সালে আমার ‘নিরন্তন ঘণ্টা ধ্বনি’ জাদবপুর ইউনিভার্সিটতে কমপারেটিভ লিটারেচারে পাঠ্য হয়েছে। রবীন্দ্রভারতী ডিলিট দিল। ত্রিপুরা ইউনিভার্সিটিতে আমার ‘যাপিত জীবন’ পাঠ্য। আসাম ইউনিভার্সিটিতে আমার লেখায় এমফিল করেছে, যখন তপতী ভট্টাচার্য ভিসি ছিলেন। প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে-ও আমার লেখা পাঠ্যবই আছে। এগুলো যখন দেখি তখন মনে হয় আমার দেশের চাইতে অন্যরাই আমাকে বেশি সম্মানিত করেছে। একদিন পীর হাবিবুর রহমান বলছিলেন, উনি নাকি প্রণব মুখার্জির পড়ার টেবিলে দেখেছেন আমার ‘আগস্টের এক রাত’।

সেলিনা হোসেন। ছবি: শামছুল হক রিপন, প্রিয়.কম
প্রিয়.কম: সাহিত্যের চর্চা ও সংকট নিয়ে কিছু বলেন?
সেলিনা হোসেন: সাহিত্যের চর্চার জায়গায় কোনো ঝামেলা নেই। কারণ সাহিত্যটা একজন লেখক ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা জাতীয়, যেকোনো দিক থেকে করতে পারে। আর সংকটের কথা কী বলবো? লেখকদের হত্যা বা ব্লগারদের হত্যার কথা বলছেন? সেটা থাকবে। একজনকে হত্যা করার পর সেটার সংখ্যাটা যেন না বাড়ে সেই দিকে রাষ্ট্রের খেয়াল রাখতে হবে। এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
প্রিয়.কম: লেখক নির্বাসনের ব্যাপারে কী বলবেন তাহলে?
সেলিনা হোসেন: যারা ধর্ম নিয়ে বেফাঁস কথাবার্তা বলে বা লেখে সেগুলো বর্জন করা উচিৎ। কারণ ধর্ম এমন একটি বিষয় যেটা একজন মানুষের পবিত্র বিশ্বাস, এটা সে তার বুকে ধারণ করে, মাথায় ধারণ করে। আমার অধিকার নাই তাকে সেই জায়গায় আঘাত করা। তসলিমা নাসরিনের ব্যাপারে আমি একটি কথা বলতে চাই। তুমি নারীবাদি ইস্যুতে অনেক কথা বলো, পুরুষতান্ত্রিক ঘরানার কথা বলো, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলো, ছেলেদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য লেখো তবু এভাবে আক্রমণ করে কিছু বলো না।
প্রিয়.কম: প্রিয় পাঠকদের কিছু বলতে চান?
সেলিনা হোসেন: আমি তরুণদের বলবো, তোমরা শুধু একটা দিনকে কেন্দ্র করে ভাষার দিনটা পালন করো না। রাস্তায় যখন একটা ভুল বানানে সাইনবোর্ড দেখি, খুব খারাপ লাগে। সেই তরুণ সমাজ সবকিছু তোলপাড় করে সেই ভুল বানানটাকে ঠিক করি না কেন? সবাই এক হয়ে তার প্রতিবাদ করি না কেন? বাধ্য করি না কেন তাদের ভুল বানানটা ঠিক করতে!
প্রিয়.কম: ধন্যবাদ আপনাকে আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।
সেলিনা হোসেন: প্রিয়.কম এবং তোমাকেও ধন্যবাদ।
সম্পাদনা: ফারজানা রিংকী/গোরা