মসজিদে মুফতি-ই-আজম। ছবি : সংগৃহীত।
মসজিদে মুফতি-ই-আজম : এক মনীষীর ছায়ায় জেগে ওঠা পবিত্র ঘর
আপডেট: ২১ জুন ২০১৭, ১৭:১০
(প্রিয়.কম) একটা সময় কলুটোলা মসজিদ ছাড়া যেই মসজিদের আর কোনো পরিচিতি ছিল না, এখন সেই মসজিদ ঢাকার বিখ্যাত মুফতি-ই-আজম মসজিদ। ব্রিটিশ আমলে অনেক মসজিদেই নামাজ ও আজান কিছুই হতো না। তেমনি একটি মসজিদ ছিল পুরান ঢাকার কলুটোলা মসজিদ। অবস্থা এমন ছিল, এটা যে মসজিদ তাও বোঝার কোনো উপায় ছিল না। নামাজ আদায় করার মতো কোনো পরিবেশও ছিল না। ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গায় এই মসজিদে মুফতী-এ আযম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন এটি যে কোন মসজিদ ছিল তা সনাক্ত করা ছিল দুরুহ।
মসজিদটির এই দৈন্যদশা দেখে এক ব্যক্তি নোমান বারাকাতীকে জানালেন; তিনি জানালেন বড় ভাই মুফতি আমিমুল ইহসানকে (রহ.)। মসজিদটির দুরবস্থার কথা জানতে পেরে বেশ বিচলিত হয়ে পড়েন মুফতি আমিমুল ইহসান (রহ.)। মসজিদের শহর ঢাকার বুকে 'আল্লাহর ঘরে'র এমন দুর্দশা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি। মসজিদের শহর ঢাকায় মসজিদের এমন দুরবস্থার কথা শুনে ১৯৪৮ সালে মেজ ভাই নোমান বারাকাতী, ভাতিজা মুহাম্মদ লোকমান এবং তার ভাগিনা সালেম ওয়াহিদীকে সঙ্গে নিয়ে দেখতে গেলেন মসজিদটি। গিয়ে দেখেন বাস্তবতা আরও কঠিন। নানা ধরনের মন্তব্য উপেক্ষা করে মসজিদটি পরিষ্কার করা হলো।
পরিষ্কারের সময় ময়লার স্তূপ থেকে মসজিদ প্রতিষ্ঠার সন-তারিখ লেখা আরবি এক শিলালিপিও পাওয়া গেল। অলৌকিকভাবে এটিই হলো মসজিদকে 'আল্লাহর ঘর' বলে প্রমাণ করার প্রধান দলিল। এরপর নোমান বারাকাতীর কণ্ঠে আজান এবং মুফতি আমিমুল ইহসানের ইমামতিতে দীর্ঘকাল পর নামাজ আদায় হলো। আর এভাবেই দুইশ' বছর আগে নির্মিত অস্তিত্ব হারাতে বসা কলুটোলা মসজিদটি রক্ষা পায় ধ্বংসের হাত থেকে।
পুরান ঢাকার সূত্রাপুর থানার অন্তগর্ত ৬০ নং তনুগঞ্জ লেনে কলুটোলা এলাকায় এই মসজিদের অবস্থান। দিল্লির শেষ বাহাদুর শাহ-এর সময়ে আকবরে শাহ সানী (দ্বিতীয়)-এর যুগে এর স্থাপনা হয়। মসজিদে যে ঐতিহাসিক শিলা স্থাপিত হয়েছে তাঁতে ফার্সি ভাষায় এই কথা লিখা আছে। বর্তমানে মসজিদটি 'মসজিদে মুফতি-ই-আজম' নামে সমধিক পরিচিত।
আরবি শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১২৩২ হিজরি মোতাবেক ১৮১২ সালে নির্মিত হয় মসজিদটি। জনমুখে কলুটোলা মসজিদ বলেই পরিচিতি ছিল তখন। মসজিদ নির্মাণের ইংরেজি সাল নিয়ে কয়েকটি মতামত পাওয়া যায়। কোথাও প্রতিষ্ঠাকাল ১৮১২ খ্রিস্টাব্দ উল্লেখ করা হলেও মুফতি আমিমুল ইহসানের জীবনীকারগণ লিখেছেন, ১৮২২ সালে এ মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
১৯৫০-৭৪ সালে মসজিদের প্রাথমিক উন্নয়ন সম্পাদিত হয় দুই ভাইয়ের মাধ্যমে। মসজিদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ও এটাকে পূর্ণরূপে মসজিদ রূপে পরিচয় এর কাজ আরও এগিয়ে যায় যখন কলুটোলায় তাশরীফ নিয়ে আসেন নারিন্দার মরহুম পীর সাহেব হযরত সাইয়্যেদ শাহ আবদুস সালাম (রহ.)। তাঁর সাথে মুফতী সাহেব হুজুরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এই দুই কীর্তিমান ব্যক্তি মসজিদের প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নের জন্য এগিয়ে আসেন এবং তাঁদের এই কাজে শরীক হোন মরহুম সাইয়্যেদ মুহাম্মদ নোমান বারকাতী ও মসজিদের বর্তমান সভাপতি মাওলানা মুহাম্মাদ সালেম ওয়াহেদী। এই সময়ে মুফতী সাহেব হুজুর নিজের বসবাসের জন্য মসজিদের পাশেই নিজের জন্য একটি ঘর ক্রয় করেন।

মসজিদে মুফতি-ই-আজমের ভেতরের দৃশ্য। ছবি : সংগৃহীত
সংস্কারকাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনিই ছিলেন এ মসজিদের খতিব। ১৯৬৪ সালে জাতীয় মসজিদের খতিবের দায়িত্ব গ্রহণ করার সময় মেজো ভাই নোমান বারাকাতির কাছে কলুটোলা মসজিদের 'খতিবি' অর্পণ করেন। ১৯৬৪ সালে পবিত্র কাবা ঘরের একটি গিলাফ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রদর্শনের জন্য আনা হয়েছিল। মুফতি আমিমুল ইহসানের ছোট ভাই সাইয়্যিদ গোফরান নোমানীর তত্ত্বাবধানে বায়তুল মোকাররম এবং কলুটোলা মুফতি-ই-আজম মসজিদে সেই গিলাফটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ১৯৯৩-৯৪ সালে পুরনো স্থাপত্যশৈলী ভেঙে নতুনভাবে নির্মাণ করা হয় মসজিদটি। তখন মুফতি আমিমুল ইহসানের স্মৃতিস্বরূপ এলাকাবাসী মসজিদটির নাম রাখে 'মসজিদে মুফতি-ই-আজম'।
১৯৬৭ সালে মসজিদে মুফতী-ই-আজম -এ পুনরায় উন্নয়ন কাজ করা হয়। এই সময় প্রয়োজনীয় চুনকামের কাজ করা হয় এবং মসজিদের ফ্লোরে মোজাইক লাগানো হয়। সে সময় মুফতী সাহেব হুজুর এই মসজিদের নাম দিয়েছিলেন নকশবন্দী মসজিদ।
১৯৭৪ সালের শেষের দিকে মসজিদে মাইকের ব্যবহার শুরু হয়। মসজিদ কমিটির বর্তমান সহ-সভাপতি সাইয়্যেদ মুহাম্মদ ঈযামান সর্বপ্রথম এই মাইক এর ব্যবস্থা করেন। মসজিদে মুফতী-এ আজম-এর এই বিবিধ উন্নয়নের ফলে ও একটি সীমাবদ্ধতা ছিল যে এটা রোদ বৃষ্টি থেকে নিরাপদ ছিল না। যখনই একটু বেশী বৃষ্টি হত তখন মুসল্লীদেরও কষ্ট হত ঠিকমত নামায পড়তে। তাই সে সময়ে মুসল্লীদের নির্বিঘে নামায আদায়ের সুবিধার জন্য মসজিদের বাইরে থেকে লোহার এঙ্গেল ও টিন শেড দিয়ে দোতলা পর্যন্ত ঢেকে দেয়া হয়্ সে সময় মুফতী সাহেব হুজুরের ছোট ভাই মরহুম সাইয়েদ মুহাম্মদ নোমান বারকাতী (রহ.) ও তাঁর পুত্র সাইয়েদ মুহাম্মদ ঈয়ামান এর তত্ত্বাবধানে সার্বিক কাজ সম্পন্ন হয়। সেই সময়ে মহল্লাবাসীদের মধ্যে মরহুম আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম খান, জনাব লুৎফর রহমান খান, জনাব মোহাম্মদ মনিরুদ্দিন (নয়া হাজী), মরহুম জনাব আবদুল গফুর হাজী জনাব মরহুম মঈন আহমেদ সহ প্রমুখ ব্যক্তি এই উন্নয়ন কাজে শরীক ছিলেন।
১৯৯২ সালের মাঝামাঝি পর্যায়ে এই উদ্যোগ নেয়া শুরু হয়। মসজিদ পুনঃনির্মাণের সময় একতলা ও দুইতলার ফ্লোর মোজাইক পাথরের ব্যবহার করা হয়। এছাড়া সুদৃশ্য মেহরাব নির্মাণ করা হয়। মেহরাবের উপরে পবিত্র কালেমা তাইয়্যেবা ও দুই পাশে আল্লাহ ও মুহাম্মদ লেখা আছে। আর নিচের দিকের উভয় অংশে খেজুর বৃক্ষের টাইলস এর ডিজাইন দেয়া হয়েছে। ২০১০ সালে মসজিদের ছাদ ঢালাই করে একে পাঁচ তলায় উন্নীত করা হয়্ বরাবরের মতো মসজিদ কমিটির সদস্যদের তত্ত্বাবধানে এই কাজ পরিচালিত হয়।
ছোট্ট পরিসর এবং পুরনো দিনের স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত সেকালের কলুটোলা মসজিদটি বর্তমানে পাঁচতলা একটি মসজিদ এবং আধুনিক সুবিধাসমৃদ্ধ। মসজিদের নিচতলাকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করা ছাড়াও বৈদ্যুতিক সমস্যা নিরসনে কয়েকটি আইপিএস বসানো হয়েছে। মসজিদে প্রবেশপথের পাশে মুফতি আমিমুল ইহসানের (রহ.) কবর। এছাড়াও মসজিদের প্রবেশদ্বারে স্থাপন করা হয়েছে সেই ঐতিহাসিক শিলাপিলিটিও। মূলত ওই শিলালিপির মাধ্যমেই মুফতি সাহেব এটিকে মসজিদ বলে প্রমাণ করেছিলেন বিরুদ্ধবাদীদের সামনে।
[তথ্যসূত্র : ১. ঢাকার মসজিদ নির্দেশনা।২. একটি পুণ্যময় জীবন, আবুল কাসেম ভূঁঞা তাঁর। ৩. উইকিপিডিয়াভ ৪. দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২৬ ডিসেম্বর ২০১০ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধ।]
প্রিয় ইসলাম/গোরা