বিনত বিবির মসজিদ। ছবি : সংগৃহীত

বিনত বিবির মসজিদ: সংস্কারের আড়ালে চাপা পড়া ইতিহাস

মিরাজ রহমান
সাংবাদিক ও লেখক
প্রকাশিত: ০৮ জুন ২০১৭, ০৯:৫৬
আপডেট: ০৮ জুন ২০১৭, ০৯:৫৬

(প্রিয়.কম) ঢাকার ইতিহাস সুপ্রাচীন, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু এই শহর যেমন একদিনে গড়ে ‍ওঠেনি, তেমনি মসজিদের শহর হিসেবে ঢাকার খ্যাতি একদিনে তৈরি হয়নি। ১৮৩২ সালে ঢাকার সেকালের ম্যাজিস্ট্রেট জর্জ হেনরি ওয়াল্টার এক রিপোর্টে উল্লেখ করেন—  সেসময় ঢাকায় মসজিদের সংখ্যা ছিল ১৫৩টি। ক্রমান্বয়ে সংখ্যাটি বাড়তে থাকে এবং দিনে দিনে ঢাকা মসজিদের শহরে পরিণত হয়। এখন মসজিদের শহর আমাদের এই ঢাকা। পাড়া থেকে বন্দর, এ গলি থেকে সে গলি, মসজিদের কোনো অন্ত নেই। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ডিজাইনে তৈরি হয়ে আসছে এসব মসজিদ। যদিও কালের চাকায় চাপা পড়ে হারিয়ে গেছে প্রাচীন অনেক মসজিদ, অনেক ইতিহাস।

বিনত বিবির মসজিদকে একটি মধ্যযুগীয় মসজিদ বলা চলে। গুলিস্তান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরত্বে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে ৬ নং নারিন্দা সড়কে এই মসজিদের অবস্থান। নারিন্দার যে প্রাচীন পুলের উত্তর দিকে মসজিদটি অবস্থিত, বর্তমানে তার নাম হায়াত বেপারির পুল।

বিনত বিবি মসজিদকে অনেকেই ঢাকার সবচেয়ে পুরাতন মসজিদও বলেছেন। আবার অনেকেই মনে করেন, সম্ভবত, বখত বিনত মসজিদটি ঢাকায় টিকে যাওয়া ইমারতগুলির মধ্যে সর্বপ্রাচীন। [বখত বিনত মসজিদ, বাংলাপিডিয়া]

১৪৫৭ খ্রিস্টাব্দে মোগল সেনাপতি ইসলাম খানের আগমনের প্রায় ১৫০ বছর আগে বাংলার স্বাধীন সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলে (১৪৩৬-১৪৫৯ খ্রি.) এ মসজিদটি নির্মিত হয়। মসজিদটির গায়ে উৎকীর্ণ শিলালিপি অনুসারে ৮৬১ হিজরি সালে, অর্থাৎ ১৪৫৭ খ্রিস্টাব্দে সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের শাসনামলে মারহামাতের কন্যা মুসাম্মাত বখত বিনত বিবি এটি নির্মাণ করান। [মুনতাসীর মামুন, ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী, পৃষ্ঠা ১৮০]

সম্ভবত ঢাকায় প্রাপ্ত শিলালিপিসমূহের মধ্যে বখত বিনত মসজিদের শিলালিপিটিই ছিল প্রথম মুসলিম শিলালিপি। শিলালিপিটি মূল মসজিদের প্রধান প্রবেশ পথে লাগানো ছিল, কিন্তু বর্তমানে এটা উত্তর দিক থেকে দ্বিতীয় প্রবেশ পথের মাথায় রয়েছে। ঢাকায় এটিই একমাত্র মসজিদ, যার নাম রাখা হয়েছে একজন নারীর নামে। যদিও আমরা বখত বিনতের পরিচয় জানতে পারিনি।

মসজিদের দেয়ালে স্থাপিত একটি কালো পাথরে ফারসি ভাষায় লিখিত বর্ণনায় রয়েছে—  সে-সময় পারস্য উপসাগরের আশেপাশের এলাকা থেকে লোকজন জলপথে এ অঞ্চলে বাণিজ্যে আসতেন। পুরান ঢাকার এই নারিন্দা-ধোলাইখাল এলাকা দিয়ে তখন বয়ে যেত বুড়িগঙ্গার একটি শাখা, যা বুড়িগঙ্গা হয়ে শীতলক্ষ্যায় গিয়ে মিশেছিল। আরাকান আলী নামক এক সওদাগর সে সময় এ এলাকায় বাণিজ্যের জন্য আসেন এবং এখানে বসবাস শুরু করেন। তিনিই নামাজ পড়ার সুবিধার্থে এখানে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। এখানে বসবাসকালীন আরাকান আলীর মেয়ে বিনত বিবির আকস্মিক মৃত্যু হয়।

মসজিদের পাশেই সমাধিস্থ করা হয় এবং মেয়ের মৃত্যুর শোকে ছয় মাস পর আরাকান আলীর মৃত্যু ঘটলে তাকেও এখানেই কবর দেয়া হয়। পরবর্তীতে বিনত বিবির নামে মসজিদটির নামকরণ করা হয়। বর্তমানে চারপাশে ঘিঞ্জি দোকান-পাট আর অনেক দোকানের মাঝেই একটি দোকানের মতো জায়গা নিয়ে পড়ে আছে আরকান আলি ও তার মেয়ের খুব সাধারণভাবে পাশাপাশি দুটি কবর। কবরের উপরটা চাদরে মোড়ানো।

বিনত বিবির মসজিদের ভেতরের জরাজীর্ণ অবস্থা। ছবি: সংগৃহীত

সুলতানি আমলে সাধারণভাবে আরবি শিলালিপি পাওয়া গেলেও এখানে আরবির সঙ্গে ফার্সি লিপিরও ব্যবহার লক্ষণীয়। মসজিদটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো— এর আককোণবিশিষ্ট পার্শ্ব স্তম্ভ, বর্গাকার কক্ষের ওপর অর্ধ বৃত্তাকার গম্বুজ, উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বদিকে খিলানের ব্যবহার, সাদামাটা অলঙ্করণ, প্লাস্টারে ঢাকা, বাঁকানো কার্নিশ প্রভৃতি।

ছয়-সাত কাঠা জায়গায় গড়ে ওঠা মূল মসজিদটি বর্গাকৃতির এবং এক গম্বুজবিশিষ্ট। এর ভেতরভাগের পরিমাপ প্রতিদিকে ৩.৬৬ মিটার। মসজিদটির ছাদ গোলাকার গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত এবং গম্বুজটি সরাসরি ছাদে স্থাপিত। মসজিদের দেওয়ালগুলি ১.৮৩ মিটার পুরু। এর পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিকে একটি করে মোট তিনটি প্রবেশপথ আছে। পশ্চিম দেওয়ালের পেছনের দিকে একমাত্র মিহরাবটি অভিক্ষিপ্ত। আগে চার কোণে প্লাস্টারবিহীন বক্রাকৃতির ‘ব্যাটেলমেন্ট’-যুক্ত চারটি অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ ছিল।

মসজিদের দুটো গম্বুজের একটির গায়ে আদি ভবন প্রতিষ্ঠার সাল লেখা আছে। আরেকটি গম্বুজের লেখা অনুযায়ী ভবনটি প্রথম সংস্কারের মুখ দেখে ১৩৩৭ বঙ্গাব্দে (১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দ)।

বারবার সংস্কার এবং পরবর্তী সময়ে সংযোজনের ফলে বর্তমানে এর বাইরের প্রকৃত অবয়ব একেবারেই পাল্টে গেছে। পূর্বের বপ্রকে সোজা করা হয়েছে। মসজিদটির দক্ষিণ পার্শ্বে আর একটি এক গম্বুজবিশিষ্ট কক্ষ এবং পূর্ব ও দক্ষিণে একটি বারান্দা সংযুক্ত করা হয়েছে। বারবার পুরু আস্তরণের ফলে মসজিদের পোড়ামাটির অলঙ্করণ এখন আর দেখা যায় না।

মসজিদটির সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হলেও এতে প্রাক-মোঘল সালতানাতের বৈশিষ্ট্যসমূহ বেশ ভালভাবেই লক্ষ্য করা যায়। একথা সত্য যে, এলোমেলোভাবে পরিবর্তন সাধন করার কারণে সালতানাতের নিদর্শনগুলির পরিচয় ও সৌন্দর্য অনেকাংশে হারিয়ে গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, বখত বিনত মসজিদটি তার উৎকর্ষ ও মৌলিকত্বের জন্য টিকে গিয়েছিল। এর স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্যাবলী যেমন, বক্রাকার কার্নিশ ও ব্যাটলমেন্ট এখনও কিবলা দেওয়ালে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এ মসজিদের উত্তর ও পশ্চিম ফাসাদ এবং প্রথম গম্বুজটি মসজিদটির সুলতানি যুগের বৈশিষ্ট্যের পরিচয় বহন করে।

মসজিদটির উত্তর পাশ ব্যতীত বাকি সবদিক সম্পূর্ণ সংস্কার করা হয়েছে। অতি সাম্প্রতিককালে মূল মসজিদের ওপর আরও দুটি তলা করা হয়েছে। বর্তমানে এটা জুমা মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আগে মূল মসজিদটির ভেতরের আয়তন ছিল ৩.২ মিটার, আর দেয়ালের গভীরতা ১ মিটার। উত্তর দেয়াল ও গম্বুজের মোজাইক অলঙ্করণ পরবর্তী সময় সংযোজন করা হয়েছে।

প্রথম সম্প্রসারণে ১৯৩০ সালে দক্ষিণ দিকের দেয়াল ভেঙে মূল মসজিদের সমআয়তন ও গম্বুজ বৃদ্ধি করা হয়। দ্বিতীয় সম্প্রসারণ আরও ব্যাপক আকারে পশ্চিম দিকে সম্পন্ন হয়। মসজিদের পূর্ব দেয়ালে তিনটি প্রবেশ পথ রয়েছে। বর্তমানে পূর্বদিকে একটি বারান্দা যুক্ত করা হয়েছে।

বিনত বিবির মসজিদের সুদর্শন গম্বুজ। ছবি: সংগৃহীত

২০০৬ সালে মসজিদের পুরান ভবনটি ভেঙে নতুন করে আবার নির্মাণের জন্য কাজে হাত দেয় পরিচালনা কমিটি। সে সময় মসজিদের প্রায় সব অংশই ভেঙে ফেলা হয়। তবে এলাকাবাসীর প্রতিরোধে মসজিদের বারান্দাটুকু বেঁচে যায়। ফলে রয়ে যায়, ঢাকার প্রথম মসজিদের এক টুকরো স্মৃতি। 

মসজিদের পুরাতন অংশটুকু সংস্কারের কারণে এর ক্ষতিসাধন হয়। চারটি মিনারের মধ্যে দুটি মিনারের গায়ের প্লাস্টার খসিয়ে নতুন করে প্লাস্টার করা হয়েছে। তবে তা সাধারণ মিস্ত্রি দিয়েই করা হয়েছে। তাতে এতদিনের ঐতিহ্যগুলো নষ্ট হয়ে যাবে। যদিও চারশ বছরের পুরানো যেকোনো স্থাপনা বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সংরক্ষিত থাকার কথা। ১৮৫৪ সালের (১৯৬৯ সালে সংশোধিত) আইন অনুসারে এসব স্থাপনার কোনোরূপ ক্ষতিসাধন, আঁচড় কাটা, লেখা ইত্যাদি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই আদেশ অমান্যকারীদের জরিমানা কিংবা কারাদণ্ড কিংবা উভয় শাস্তির বিধান রয়েছে। এসব বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নীরব ভূমিকাই পালন করছে।

যদিও ধরে নেওয়া হয় যে বিনত বিবির মসজিদ ঢাকার প্রথম মসজিদ; কিন্তু অকাট্যভাবে এ-কথা বলা খুব কঠিন যে এ-মসজিদ নির্মাণের আগে ঢাকায় কোনো মসজিদ নির্মাণ করা হয়নি। কেননা, বাংলার সুলতানরা মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন— এটা ইতিহাসসিদ্ধ কথা। তাই সে আমলে অনেক প্রাচীন মসজিদ যে নির্মিত হয়েছিল, এটা অস্বীকার করা যায় না। তবে হ্যাঁ, হয়তো কাঠামোগতভাবে সেগুলো এখন আর টিকে নেই। এমনকি সম্প্রতি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে যে, হিজরি প্রথম শতাব্দীতেই বাংলাদেশে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। এর আলোকে এ কথাও বলা যায় যে হয়তো ঢাকার অজ্ঞাত কোনো স্থানেও হিজরি প্রথম শতাব্দীতে মসজিদ বা ইবাদতখানা নির্মাণ করা হয়েছিল। [দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১৩ অক্টোবর, ২০১৬]

যখনই নির্মাণ হোক, এই মসজিদ প্রথম ইমারত হোক বা হোক, এটি একদিকে যেমন একটি পবিত্র স্থান এবং কেয়ামত পর্যন্ত এর পবিত্রতা বজায় রাখা মুসলমানদের কর্তব্য; ঠিক তেমনি এটি বাংলাদেশের একটি প্রাচীন ঐতিহ্যও বটে। সুতরাং সরকার ও প্রজা সাধারণ সকলেরই এর সংরক্ষণে এগিয়ে আসা অপরিহার্য।

বিনত বিবির মসজিদটি দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি ঢাকার প্রথম মসজিদ। মোঘল সেনাপতি ইসলাম খানের ঢাকা আগমনের প্রায় ১৫০ বছর আগে বাংলার স্বাধীন সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলে ১৪৫৭ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি নির্মিত হয়।

সম্পাদনা: ফারজানা রিংকী