এক ডোজেই মুক্তি মিলবে তীব্র বিষণ্নতা থেকে: গবেষণা
আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫:১৯
‘মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার’ বা তীব্র বিষণ্নতায় ভোগা রোগীদের চিকিৎসায় সাইকোথেরাপির পাশাপাশি সাইকেডেলিক ড্রাগ ‘ডাইমিথাইলট্রিপটামিন’ (ডিএমটি)-এর একটি মাত্র ডোজ দ্রুত এবং দীর্ঘস্থায়ী উন্নতি ঘটাতে পারে। চিকিৎসকরা সাম্প্রতিক গবেষণায় এমন তথ্যই জানিয়েছেন।
৩৪ জন ব্যক্তিকে নিয়ে করা একটি ছোট ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, সাইকেডেলিক-সহায়তা থেরাপির ফলে বিষণ্নতার লক্ষণগুলো দ্রুত কমেছে। ওষুধের প্রভাব শেষ হওয়ার অনেক পরেও এর সুফল বজায় ছিল, এমনকি কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ছয় মাস পরেও উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং এই ট্রায়ালের প্রধান গবেষক ডা. ডেভিড এরিটসো বলেন, “এটি তাৎক্ষণিক অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট (বিষণ্নতারোধী) প্রভাব ফেলে, যা তিন মাস ধরে উল্লেখযোগ্যভাবে বজায় থাকে। এটি খুবই আশাব্যঞ্জক, কারণ মানসিক সহায়তার (সাইকোলজিক্যাল সাপোর্ট) পাশাপাশি ওষুধের মাত্র একটি সেশনই এর জন্য যথেষ্ট।”
যদিও এটি প্রাথমিক ফলাফল, তবে এটি সেই ক্রমবর্ধমান প্রমাণকে আরও জোরালো করে যে, সাইকোথেরাপির সাথে সাইকেডেলিক ওষুধ ব্যবহার করলে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ বিষণ্নতা থেকে মুক্তি পেতে পারেন—বিশেষ করে যারা প্রচলিত অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা থেরাপিতে সাড়া দিচ্ছেন না।
বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ১০ কোটি মানুষ ‘ট্রিটমেন্ট-রেজিস্ট্যান্ট ডিপ্রেশন’ বা প্রচলিত চিকিৎসায় নিরাময়যোগ্য নয় এমন বিষণ্নতায় ভুগছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সংজ্ঞামতে, অন্তত দুটি অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধে কাজ না হলে তাকে এই ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক মানুষ তাদের দৈনন্দিন কাজও ঠিকমতো করতে পারেন না।
‘নেচার মেডিসিন’ জার্নালে প্রকাশিত এই ট্রায়ালটি মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার ট্রিটমেন্ট-রেজিস্ট্যান্ট বিষণ্নতায় আক্রান্তদের ওপর চালানো হয়। অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেককে ১০ মিনিট ধরে শিরাপথে ২১.৫ মিলিগ্রাম ডিএমটি দেওয়া হয়। বাকি অর্ধেককে প্লাসিবো (ওষুধহীন নকল ডোজ) দেওয়া হয়। সবার ক্ষেত্রেই সাইকোথেরাপি এবং ফলো-আপ মূল্যায়ন করা হয়েছিল।
একটি মানদণ্ডভিত্তিক বিষণ্নতা প্রশ্নাবলীর স্কোরে দেখা গেছে, প্লাসিবো গ্রুপের তুলনায় ডিএমটি গ্রহণকারী রোগীদের অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। এই অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট প্রভাব তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।
দক্ষিণ আমেরিকায় শামানিক আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত ‘আইয়াহুয়াস্কা’ পানীয়র একটি সক্রিয় উপাদান হলো ডিএমটি। এই ড্রাগটি শক্তিশালী এবং প্রায়শই রহস্যময় হ্যালুসিনোজেনিক (বিভ্রম সৃষ্টিকারী) অনুভূতি তৈরি করে। এটি মানুষের সময় ও স্থান সম্পর্কে ধারণা বদলে দিতে পারে, নিজের অস্তিত্বের অনুভূতি বিলীন করে দিতে পারে এবং অলৌকিক সত্তার সাথে সাক্ষাতের মতো অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
ট্রায়ালের দ্বিতীয় ধাপে সকল অংশগ্রহণকারীকেই থেরাপির সাথে ডিএমটি দেওয়া হয়। তবে গবেষকরা দেখেছেন, যারা মোট দুইবার ডোজ নিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কোনো সুবিধা পাওয়া যায়নি। এতে বোঝা যায়, একটি ডোজই চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। এই ট্রায়ালটির নকশা, অর্থায়ন এবং পৃষ্ঠপোষকতা করেছে নিউরোসাইকিয়াট্রিক প্রতিষ্ঠান ‘সাইবিন ইউকে’।
এর আগে ‘ম্যাজিক মাশরুম’-এর সক্রিয় উপাদান সিলোসাইবিন নিয়ে করা একটি ইতিবাচক ট্রায়ালের ধারাবাহিকতায় এই গবেষণাটি এলো। আশা করা হচ্ছে, চলতি বছরের শেষের দিকেই বিষণ্নতার চিকিৎসায় সিলোসাইবিনের অনুমোদন মিলতে পারে।
ধারণা করা হয়, সাইকেডেলিক ওষুধগুলো মানুষের বদ্ধমূল এবং নেতিবাচক চিন্তার ধরণ ভাঙতে সাহায্য করে সাইকোথেরাপির প্রভাব বাড়িয়ে তোলে। ডা. এরিটসো বিষয়টিকে পাহাড়ের ওপর জমে থাকা বরফ নাড়াচাড়া করে সমান করে দেওয়ার সাথে তুলনা করেছেন, যাতে মানুষ সহজেই নতুন পথ খুঁজে পায়। তিনি বলেন, “আপনি বরফগুলো নতুন করে সাজিয়ে দেন, ফলে নতুন পথে চলা সহজ হয়। কারণ পুরো ভূখণ্ডটিই তখন সমতল হয়ে যায়।”
ট্রায়ালে ব্যবহৃত মাত্রায়, সিলোসাইবিনের চেয়ে ডিএমটি কম সময়ের জন্য কিন্তু অনেক বেশি তীব্র অনুভূতির সৃষ্টি করে। সিলোসাইবিনের প্রভাব যেখানে কয়েক ঘণ্টা থাকে, ডিএমটির অভিজ্ঞতা স্থায়ী হয় প্রায় ২৫ মিনিট। এর ফলে ক্লিনিকগুলোতে ডিএমটি-সহায়তা থেরাপি প্রদান করা সহজ হতে পারে। তবে অত্যন্ত তীব্র অভিজ্ঞতার পর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে রোগীদের বেশি সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।
কিংস কলেজ লন্ডনের কনসালট্যান্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. জেমস রাকার, যিনি সিলোসাইবিন ট্রায়ালে কাজ করেছিলেন, বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যদি যুক্তরাজ্যে বিষণ্নতা চিকিৎসায় সাইকেডেলিক অনুমোদন দেয়, তবে শুরুতে এটি সম্ভবত কেবল প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতেই পাওয়া যাবে।
প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে বাণিজ্যিক চাপের কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে এবং রোগীদের ক্ষতি হতে পারে—এমন আশঙ্কার প্রেক্ষিতে গত বছর ‘ফিল্ডিং কমিশন’ গঠন করা হয়। সাইকেডেলিক-সহায়তা থেরাপির নিরাপদ, নৈতিক এবং ন্যায়সঙ্গত প্রবর্তন নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য।
ডা. রাকার বলেন, “অর্থনৈতিক কঠোরতা, সামাজিক অপবাদ এবং ‘সাইকোঅ্যাক্টিভ’ শব্দটি ঘিরে যে ভীতি রয়েছে—তার মাঝে এই ওষুধগুলো কীভাবে নিজেদের জায়গা করে নেবে, তা আমি জানি না। এই প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারাটা কৌতূহলুদ্দীপক, কিন্তু ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন।”