নির্মাণাধীন ভবন থেকে নির্মাণসামগ্রী পড়ে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে অন্তত ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। গ্রাফিক্সটি এআই-এর সহায়তায় তৈরি।

মাথার ওপর মৃত্যুর ঝুঁকি, অবহেলায় প্রাণহানি

এস এম রিয়াদ রহমান
প্রিয় নিউজ
প্রকাশিত: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:০৩
আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:০৩

গুলশান রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকা। যেখানে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার মান সর্বোচ্চ থাকার কথা, সেখানেই ঘটল বিপত্তি। গত ২২ জানুয়ারি দুপুরের খাবার খেয়ে অফিসে ফেরার পথে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন বহুজাতিক কোম্পানির কর্মকর্তা আশফাক চৌধুরী। হঠাৎ ওপর থেকে নেমে এলো মৃত্যু। নির্মাণাধীন বহুতল ভবন থেকে খসে পড়া লোহার রড সরাসরি আঘাত হানে তার মাথায়। মুহূর্তেই সব শেষ।

শুধু আশফাক নন, ২০২৬ সালের প্রথম মাসেই ঢাকায় নির্মাণাধীন ভবন থেকে রড, পাইপ বা ইট পড়ে অন্তত তিনটি তাজা প্রাণ ঝরে গেছে। এর আগে ১৫ জানুয়ারি মগবাজার মোড়ে নির্মাণাধীন ১৩ তলা ভবন থেকে লোহার পাইপ পড়ে প্রাণ হারান নির্মাণশ্রমিক তাইজুল ইসলাম (২০)। তিনি ভবনের নিচে বালুর কাজ করছিলেন। তারও আগে ৫ জানুয়ারি তুরাগ এলাকায় ১০ তলা ভবন থেকে পড়ে আসা ইটের আঘাতে মারা যান জান্নাতুল ফেরদৌস (১৮)। সেদিন সকালে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ইটটি তাঁর মাথায় পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভবনটিতে কোনো সুরক্ষা জাল বা নিরাপত্তা বেষ্টনী ছিল না।

এই মৃত্যুগুলো কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড? নগর পরিকল্পনাবিদ ও আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি ঘটনাই প্রতিরোধযোগ্য ছিল। কিন্তু তদারকি সংস্থা রাজউক এবং প্রভাবশালী আবাসন কোম্পানিগুলোর চরম অবহেলায় ঢাকা আজ এক ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়েছে।

আইনে রয়েছে সুরক্ষা, কিন্তু বাস্তবে মৃত্যুফাঁদ

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ২০২০ অনুযায়ী, নির্মাণাধীন ভবনে শক্তিশালী সেফটি নেট, সুরক্ষা বেষ্টনী এবং পথচারী সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮–এ জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে কাজ বন্ধ ও শাস্তির বিধান রয়েছে।

বিএনবিসি অনুযায়ী, নির্মাণাধীন ভবনের চারপাশ এবং ওপরের অংশ এমনভাবে জাল দিয়ে ঘিরতে হবে, যাতে কোনো বস্তু ছিদ্র গলে বাইরে না আসতে পারে। জালের ছিদ্রের আকার ছোট হতে হবে। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, নির্মাণাধীন ভবনের আশপাশে তেমন কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী ও সেফটি নেট (জাল) নেই। কোথাও কোথাও জালের পরিবর্তে জোড়াতালি দেওয়া চট ব্যবহার করতে দেখা গেছে।

এ ছাড়াও বিএনবিসি কোড অনুযায়ী, যদি কোনো নির্মাণকাজ রাস্তার ১.৫ মিটারের মধ্যে হয়, তবে সেখানে পথচারীদের জন্য ২.৪ মিটার (প্রায় ৮ ফুট) উঁচু বেষ্টনী দিতে হবে। ফুটপাতের ওপর দিয়ে কাজ চললে অবশ্যই মজবুত ছাদযুক্ত ‘ওয়াকওয়ে’ তৈরি করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে সাধারণত এই ধরনের ওয়াকওয়ে দেখা যায় না। কোথাও কোথাও বাঁশের চাটাই দিয়ে মাচা তৈরি করতে দেখা যায়, যা পথচারীদের জন্য নিরাপদ নয়। ওপর থেকে ইট বা রড পড়লে তা ভেদ করে পথচারীকে আঘাত ঠেকাতে পারে না। ফলে ফুটপাত বা সড়ক দিয়ে পথচারীরা মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছেন। তবে কিছু নির্মাণাধন ভবনের নিচে ফুটপাতের ওপরে মজবুত মাচা দেখা গেছে। যদিও সেখানে কিছু পড়লে ছিটকে সড়কে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে অধিকাংশ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৩০৪(ক) ধারায় ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’র মামলা হয়। এটি একটি জামিনযোগ্য অপরাধ এবং এর সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র ৫ বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড। ফলে বড় কোম্পানিগুলো সহজেই জামিন পেয়ে যায় এবং অল্প কিছু ক্ষতিপূরণ দিয়ে আপস করে ফেলে। কিন্তু দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

কেন নিয়ম মানা হচ্ছে না?

ভবন নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করার মূল কারণ গাফিলতি ও অবহেলা বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিক-উর রহমান। তিনি বলেন, “অনেক নির্মাণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মনে করেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিলে অতিরিক্ত খরচ হবে। অথচ মোট নির্মাণ ব্যয়ের তুলনায় এ খরচ খুবই সামান্য। সামান্য বাড়তি সময় ও ঝামেলা এড়াতেই অনেক সময় নিরাপত্তা ছাড়াই কাজ শেষ করা হয়।”

আইনের শিথিল প্রয়োগও বড় কারণ জানিয়ে এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, “আইন সম্পর্কে জানা থাকলেও অনেকেই তা মানেন না, কারণ বাস্তবে শাস্তির নজির কম। নিয়ম না মানলে দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা হলে এমন প্রবণতা কমে আসত বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, আইন থাকা সত্ত্বেও কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবেই নির্মাণ খাত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।”

শফিক-উর রহমানের মতে, নির্মাণনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন বা ব্যয়বহুল কিছু নয়। অল্প উদ্যোগেই নির্মাণস্থলে শ্রমিক ও পথচারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে ভবন নির্মাণ হোক বা অগ্নিনিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই একধরনের খামখেয়ালিপনা দেখা যায়। এর পেছনে দুটি কারণ রয়েছে উল্লেখ করেন তিনি। প্রথমত, ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা; দ্বিতীয়ত, আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের অভাব। নিয়ম না মানলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমন বার্তা স্পষ্ট না থাকায় অবহেলা চলতেই থাকে। এর ফলেই নির্মাণাধীন ভবন থেকে নির্মাণসামগ্রী পড়ে পথচারীদের ঝুঁকি বাড়ছে।

রাজউকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বলেন, “নকশা অনুমোদনের পর নির্মাণকাজ সেই নকশা অনুযায়ী হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। বাস্তবে অভিযোগ না এলে অনেক সময় পরিদর্শন হয় না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নজরদারি না থাকলে নিয়ম মানার প্রবণতাও কমে যায়।”

তিনি বলেন, যেকোনো নির্মাণকাজের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের দায়িত্ব শ্রমিক ও পথচারী—দুই পক্ষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে দুর্ঘটনার পরও অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায় না। তাঁর মতে, সমাজে এখনো এমন মানসিকতা রয়েছে—‘নিজের ক্ষতি না হলে সমস্যা নেই’, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

ভবিষ্যতে যেন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এমন অবহেলা করার সাহস না পায়, সে জন্য সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান শফিক-উর রহমান।

এ বিষয়ে কথা বলতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামের মুঠোফোনে গত তিন দিন ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

শহরজুড়ে এই অরক্ষিত নির্মাণযজ্ঞ চলতে থাকলে, আশফাক বা জান্নাতুলের মতো আরও কত প্রাণ অকালে ঝরবে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।