ভারত-নিউজিল্যান্ড ম্যাচে রান আউট হয়ে ফিরছেন ধোনি। ছবি: সংগৃহীত

দল জিতলেই হয়তো অবসরের ঘোষণা দিতেন ধোনি

শুভ্র মুখোপাধ্যায়
জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া সাংবাদিক, কলকাতা, ভারত
প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০১৯, ১৯:৩৯
আপডেট: ১১ জুলাই ২০১৯, ১৯:৩৯

বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে করুণতম দৃশ্যের মধ্যে ডন ব্র্যাডম্যানের শূন্য রানে আউট হওয়া সবার আগে আসবে। ইংল্যান্ডের এরিক হোলিসের বলে ডনের স্টাম্প নড়ে গিয়েছিল। ক্রিকেট দুনিয়ার রোমান্স নিয়ে যারা মেতে থাকেন, তাদের কাছে অগ্রগণ্য ‘ভিলেন’ হলেন সেই হোলিস। তাদের অদৃশ্য বার্তা ছিল, ‘ওহে এক অনামী বোলার, তুমি কেমন হে! ডনকে আর চারটে রান করতে দিলে না? দিলে তো উনি শেষ করতে পারতেন ১০০ রানের গড় নিয়ে।’

জীবনের শেষ ম্যাচে কেউ সফল হয়েছেন, কেউ বা ব্যর্থ। কত সব নামী তারকা। কাদের ছেড়ে কাদের কথা বলব। গ্যারি সোবার্স লর্ডসে করেছিলেন অপরাজিত ১৫০রান। ভিভ করেছিলেন শেষ ম্যাচে ৬০ রান, সানি গাভাসকার করেছিলেন ৯৬ রান, শচীন করেছিলেন ৭৪ রান। গোলার্ধে কিংবদন্তিদের কী আর শেষ রয়েছে। নক্ষত্রপুঞ্জের ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছে কতসব কর্মী ক্রিকেটার। ক্রিকেট ইতিহাসে তাদের লড়াইও জায়গা করে নিয়েছে, একটু অন্যভাবে।

এরপরেই এম এস ধোনির নামটা নিয়ে এলাম বলে ভাববেন না তিনি সাধারণ এক কর্মী ক্রিকেটার। এম এস ধোনি হলেন ক্রিকেটের জাত সৈনিক। তার ধমনীতে রাজপুত রক্ত বইছে। বুধবার ম্যাঞ্চেস্টারে তার ৫০ রান কী তার ক্রিকেট জীবনের শেষ রান সংখ্যা? এই নিয়ে চর্বিতচর্বণ চলবে এখন প্রতিদিন। যত দিন না এম এস জানাচ্ছেন তার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা, তত দিন ভাঙা গ্রামাফোন রেকর্ডের মতো বাজতে থাকবে, আর কবে অবসর নেবেন? ভারতীয় ক্রিকেটে এটি এক নিষ্ঠুর চিত্রনাট্য। এই দেশ কাউকে ছাড়েনি দেওয়াল লিখনের বার্তা দেওয়ার জন্য। বিশেষ করে ভারতীয় ক্রিকেটের প্রাক্তন মহাতারকাদের। সানি, কপিল ছাড় পাননি। তারপর বাকিদের ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে, এবার মানে মানে কেটে পড়ো। শচীন টেন্ডুলকারের মতো ক্ষণজন্মা ক্রিকেটারকে শুনতে হয়েছে, ‘বলের সামনে পা যাচ্ছে না, বা শর্টপিচ ডেলিভারিতে মাথাটা ঠিক জায়গায় ছিল না!’

এ দেশের ঘরে ঘরে রমাকান্ত আচরেকর (শচীনের কোচ), কেশব ব্যানার্জিরা (এম এস ধোনির কোচ) রয়েছেন। তারা জানেন ক্রিকেটের আইনকানুন থেকে ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিংয়ের ব্যাকরণ। তাই তো পাড়ার নাড়ুদা’ও বলে বসেন, এবার ধোনিটাকে যেতে বলো ভাই, আর সহ্য হচ্ছে না! জানি না, তিনি ক্রিকেট খেলা বলতে কী বোঝেন। হয়তো এটাই জানেন ফি বছর ক্রিকেটের বিনোদন নামে যে আসর এপ্রিল-মে মাসজুড়ে হয়, সেটাই। যেখানে ২০ ওভারে ২০০ রান ওঠে মুড়ি-মুড়কির মতো। পাড়ার ক্লাবে যে খেলা দেখে উঠে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলতে পারেন, ‘যাই বলো ভাই, ঋষভ প্যান্ট ২১ বছর বয়সে যে ব্যাটিংটা করছে, তা এম এস ধোনি এত দিনেও খেলেননি!’ তিনি বা তারা জানেন না এম এস ধোনির সেই শুরুর জীবনে ভাইজাগ ম্যাচের স্কোর কত ছিল, কিংবা জয়পুরে সেই সোয়ান মান সিং স্টেডিয়ামের ইনিংস কেমন ছিল। বেশি প্রশ্ন করলে তারা আরও বিশেষজ্ঞ হয়ে যান, ‘ভাই দিনকাল বদলেছে, আধুনিক ক্রিকেট আরও বেশি টাফ, বুঝলে তো?’

ম্যাচে হাল ধরেন ধোনি ও জাদেজা। ছবি: সংগৃহীত

ম্যাঞ্চেস্টার ম্যাচ বহু প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে ভারতকে। এই হার বুঝতে শেখাল প্রতিদিন রবিবার হয় না। প্রতিদিন ফিলগুড আবহ থাকে না। প্রতিদিন জীবনে সুখ থাকে না। প্রতিদিন সকালে রোদ ওঠে না। কোনো কোনো দিন সূর্য ঢেকে যায় মেঘের আড়ালেও। হার্দিক ও ঋষভের আউট দেখে মনে হবে তারা ধনী পরিবারের বেহিসেবি ছেলে। তারা জানলই না জীবনের কী মানে, জীবনের আসল কষ্ট। শুধু পরিবারের স্বচ্ছলতা ও বৈভবের মধ্যে থেকে বয়সটাই তাদের যা বেড়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার কোনো ইচ্ছেই হয়নি। তারা জানেই না আইপিএল ও একটা বিশ্বকাপের মধ্যে কী পার্থক্য। তাই সেট হয়ে গিয়েও এভাবে আউট হয়ে ফিরতে পারেন।

এম এস ধোনির কাছে এই দিনটাই ছিল জবাব দেওয়ার দিন। জাদেজাকে দিয়ে যখন স্ট্রাইক রোটেড করে খেলাচ্ছেন, তাকে মনে হবে বাড়ির অভিভাবকের মতো। ছেলেকে আগলে পথ দেখাচ্ছেন। ধোনি ছিলেন বলেই জাদেজা এত সহজে খেলতে পেরেছেন, এত ভালো স্ট্রোক নিয়েছেন। তার দক্ষতা প্রশ্নাতীত, তবুও এম এস-র সান্নিধ্য তাকে আরও অকুতোভয় করেছিল। আজও অনেকে ধোনির বল গুনেছেন ওই টেনশনের মধ্যেও। একবারও ভাবেননি ৫ রানে তিন উইকেট পড়ে গিয়েছে, ২৪ রানে চার ও সর্বোপরি ৭১ রানে পাঁচ উইকেট। ধোনি এসে ইনিংসে স্থিতাবস্থা আনলেন তাই নয়, একটা দিক ধরে রেখে জাদেজাকে যোগ্য সঙ্গত দিলেন, মনের জোর বাড়ালেন।

ভারত জিতে গেলে এই ধোনিকে অনেকে ডন ব্র্যাডম্যানের পরে রাখতেন, হ্যাঁ, তারমধ্যে অনেক সমালোচকও থাকতেন। এও বলতেন, ধোনির স্বেচ্ছাবসর হওয়া উচিত। যত দিন চাইবেন, তিনি খেলে যাবেন, এমন লিখিত চুক্তি হোক! ভাগ্যিস হয়নি, তা হলে সারা দেশজুড়ে (শুধু দেশ কেন, বিদেশেও) ‘ভন্ডামির মহোৎসব’ শুরু হয়ে যেত।

তবুও যারা ক্রিকেট ভালোবাসেন, যারা সত্যিকারের ধোনির প্রতি অনুরক্ত, তাদের খারাপ লাগার কোনো ব্যাখ্যা জানা নেই। ধোনিকেও এমনভাবে হতাশার সাগরে ভাসতে দেখা যায়নি। তিনি আউট হলে মনের ভেতর কী চলে, কেউ টের পায় না। কিন্তু বুধবার রান আউট হয়ে ফেরার সময় ধোনির মুখের জ্যামিতি দেখে পরিষ্কার, আজই হয়তো জিতে গেলে প্রেস কনফারেন্সে সদম্ভে বলে দিতেন, ‘রবিবার ফাইনালটাই আমার শেষ ম্যাচ। এবার আমার যাওয়ার পালা।’ এও প্রমাণিত, ক্রিকেটের মহাকাব্যিক বিচার ঠিক সময় যথার্থ হয় না।

হোলিসের মতো এখানেও একজন ভিলেন রয়েছেন, তিনি মার্টিন গাপটিল। সারা টুর্নামেন্টে ব্যর্থ। কিউই শিবির তাকে নিয়ে আশা ছেড়ে দিয়েছিল, কিন্তু একটা থ্রো-য়ে শুধু ধোনির নয়, ১৩০ কোটি হৃদয়কে বিদীর্ণ করেছেন তিনি। তাই তো খেলা শেষে গাপটিলের প্রতি কেমন একটা রাগ জন্মায়, বলতে ইচ্ছে হয়, ওহে মার্টিন, একটা থ্রো-য়ে ১৩০ কোটির হৃদয়টা ভেঙে দিলে?

আরো পড়ুন