ছবি সংগৃহীত

১০টি সেরা মনস্তাত্বিক চলচ্চিত্র

শামীমা সীমা
সহ সম্পাদক
প্রকাশিত: ১৪ জানুয়ারি ২০১৬, ০৬:৫১
আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০১৬, ০৬:৫১

ছবি: সংগৃহীত
(প্রিয়.কম)  অনুভূতি প্রকাশের সেরা মাধ্যম বলা হয় চলচ্চিত্রকে। মানুষের বিরতিহীন কৌতূহল এবং আবেগের অজানা ও অদ্ভুত রাজ্যকে জানার একমাত্র ক্ষেত্র সিনেমার সহজ সাবলীল ভাষা।

যখন আমরা সিনেমা দেখি, মনের অজান্তেই আমরা এর গভীরে চলে যাই। ছবির চরিত্র ও কাহিনীর সঙ্গে এমনভাবে মিশে যাই যে তখন সিনেমা শুধু বিনোদন ও উপভোগের ব্যাপার থাকে না। এর সঙ্গে জুড়ে যায় সীমাহীন আবেগ, ভালোবাসা। সিনেমার পরিচালক তাঁর দৃষ্টিকোন থেকে আমাদের যা দেখান, তার সঙ্গে মিশে যায় আমাদের ভেতরের সত্তাটিও।

সবার আলাদা নিজস্ব সহজাত ভাবনা থাকে। সব ভাবনা মিলিয়ে যা সৃষ্টি হয়, সেটিই মানুষের আকর্ষণ কেড়ে নেয়। একমাত্র সিনেমাই পারে জগতের দুঃখ-দুর্দশা ও বাস্তবতার কঠিন সত্যের সঙ্গে আমাদের মুখোমুখি করতে। আবার মাঝে মাঝে নিষ্ঠুর সময়কে ভুলতেও সহায়তা করে সিনেমা।

কোন সিনেমা বানানোর সময়ে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার বিষয়টিও খেয়াল রাখেন নির্মাতারা। এই ব্যাপারগুলোর সঙ্গে দর্শকদের যোগাযোগ স্থাপনের জন্য, এবং দৃশ্যটি বাস্তব বোঝানোর জন্য মাঝে মাঝে পরিচালক অনেক কঠিন দৃশ্যের অবতারনা করেন। 

সিনেমাকে উপভোগ্য বানাতে যে উন্মাদনা এবং নিষ্ঠুরতা দেখান নির্মাতারা, তা দেখে অনেক সময় আবেগ ধরে রাখতে পারেন না দর্শকরা। এবং এতেই একজন পরিচালক তার কাজের সার্থকতা খুঁজে পান।

বেইজ মোয়া

ফরাসি ভাষায় নির্মিত এই ছবিটি মুক্তি পায় ২০০০ সালে। ইংরেজীতে ভাষান্তর করলে এই সিনেমার নাম হয় ‘রেইপ মি’। ভার্জিনি ডাসপেন্টেসের মূল উপন্যাস থেকে একই শিরোনামে সিনেমাটি পরিচালনার ভার নেন কোরাইলি ট্রিন থি।

এই ছবির কাহিনীতে দুজন পর্ণ অভিনেত্রীর গল্প বলা হয়েছে। জীবনের তাগিদে এই পেশায় নামতে বাধ্য হয় তাঁরা। দুজনের পৃথিবীতে কঠিন জীবন যাপনের কাহিনী বলা হয়েছে ‘বেইজ মোয়া’ ছবিতে। সিনেমার লেখক ও পরিচালক দুজনই গল্পের চরিত্রদের বেদনার অংশটুকু বোঝাতে চেয়েছেন দর্শকদের।  

অ্যামোর

মাইকেল হেনেকা পরিচালিত ‘অ্যামোর’ ছবিটি ২০১২ সালে মুক্তি পায়। জীবনের শেষ সীমানায় থাকা মানুষের জীবনযাপন নিয়ে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি। পরিচালকের মা বাবার জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ছবিটি তৈরি করেছেন তিনি। অবসরপ্রাপ্ত মিউজিক শিক্ষক দম্পতি জর্জ এবং অ্যান জীবনের দ্বারপ্রান্তে এসে দেখতে পান, পেশাগত কারণে তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত সময় হারিয়েছেন। নিজেদের কাজে এতো বেশি ডুবে ছিলেন যে একজন আরেকজনের জন্য কোন সময় ব্যয় করেন নি। একদিন অ্যানের কথিন অসুখ হয়। জর্জ নিজেও বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। কিন্তু তিনি নিজের শারীরিক কষ্ট উপেক্ষা করে স্ত্রীর সেবায় মন দেন।

নির্মাতা এই ছবির মাধ্যমে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, জীবনে সুখ দুঃখ, খ্যাতি, প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির সঙ্গে বাস্তব জীবনের একটি অংশ বার্ধক্য। সত্য ও ভালবাসার অপূর্ব সমন্বয়ে নির্মিত হয়েছে ‘অ্যামোর’ ছবিটি। সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী প্রচুর আলোচিত ও প্রশংসনীয় হয়। কান সিনেমা উৎসবে এবং অস্কারে সেরা বিদেশি ভাষার সিনেমা হিসেবে ৭০টিরও বেশি পুরস্কার পায় সিনেমাটি।

শেম

২০১১ সালের সিনেমা ‘শেম’। নিউইয়র্কের একজন সুদর্শন ও সফল পুরুষের গল্প বলা হয়েছে এই সিনেমায়। ব্র্যান্ডন খুবই স্বাভাবিক ও সাধারণ জীবনযাপন করলেও নিজের ভেতর একটি ভয়ঙ্কর সত্য চাপা দিয়ে ভালো মানুষের মুখোশ পরে চলাফেরা করে। সে ভয়াবহ যৌন আসক্তিতে আক্রান্ত। যে কোন কিছুর থেকে তার কাছে প্রাধান্য পায় শারীরিক চাহিদা মেটানোর পরিতৃপ্তি। কিন্তু একসময় তাকে এই কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে হয়। শহরের এক সমস্যায় পরে ব্র্যান্ডনের বোন। সে ভাইয়ের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকা শুরু করে। যার ফলে ব্র্যান্ডনের গোপনীয়তা ও এতো সতর্কতা ব্যাহত হয়। অবশেষে তাকে এই ভয়ানক আসক্তির মোকাবেলা করতে হয়। এমনই এক মানসিক দ্বন্দ্বের সিনেমা ‘শেম’।

অ্যান্টিখ্রাইস্ট

অত্যন্ত চমৎকারভাবে ছবিটির নির্মাণ ও দৃশ্যায়নের উপস্থাপনা করেছেন পরিচালক লারস ভন ট্রেয়ার।২০০৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটির কাহিনী স্বামী স্ত্রীর জীবনের মানসিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।

নিজেদের পাশের ঘরে তাদের ছোট বাচ্চাকে রেখে ভালবাসায় মত্ত ছিল এক দম্পতি। এই সময়ে হঠাৎ এক দুর্ঘটনায় তাদের শিশুটি ঘরের জানালা দিয়ে নিচে পরে মারা যায়। এই ঘটনাটি মেনে নিতে পারে না শিশুটির মা। সন্তান হারিয়ে উন্মাদ মাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। মহিলার মানসিক রোগের ডাক্তার স্বামী নিজেই স্ত্রীর চিকিৎসা করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার স্ত্রীকে ভয়ের মুখোমুখি করতে চাইলেন। তাই তিনি সেই মহিলাকে কাঠের তৈরি সেই বাড়িতে নিয়ে গেলেন, যেখানে আগের বছরে নিজেদের সন্তানের সঙ্গে ছুটি কাটিয়েছিলেন এই দম্পতি। কিন্তু সেখানে গিয়ে মহিলার আরও মস্তিস্ক বিকৃতি ঘটে। সে নিজেকে এবং তার স্বামীকেও আঘাত করতে শুরু করে। এমন গল্পে এগিয়ে যায় ছবিটি।

প্রচুর চমকে ঠাসা এই সিনেমার প্রতিটি দৃশ্য। শিশুর মৃত্যুতে যেমন বেদনার অবতারনা ঘটে, তেমনি যৌন আবেদনময় দৃশ্যেও শিহরিত হয় দর্শক।

স্ক্যামেন আকা শেম

১৯৬৮ সালে মুক্তি পায় ‘স্ক্যামেন আকা শেম’ ছবিটি। ইঙ্গমার বার্গম্যান পরিচালিত সাদাকালো ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যুদ্ধের সময়ে মানুষের মানসিক অবস্থা। পরিচালকের মাস্টার পিস হিসেবে বিবেচিত ‘স্ক্যামেন আকা শেম’ ছবিটি।

দেশে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মানুষ খুবই রুঢ় বাস্তবতার সম্মুখীন হয়। মানুষের মনে চলতে থাকে নানা টানাপোড়েন। যুদ্ধের সময়ে স্বামী স্ত্রীর মানসিক সমস্যার কাহিনী নিয়ে তৈরি হয়েছে ছবিটি।

ম্যান বাইটস ডগ

১৯৯২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি বেলজিয়ামের এক ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলারের কাহিনী নিয়ে বানানো হয়েছে। একদল সাংবাদিক মিলে ছবিটি নির্মাণ করেন। সেই খুনির দৈনন্দিন জীবন এবং খুনের বর্ণনা দেয়া হয়েছে সিনেমায়। বাজেটের অভাবে ছবিটি সাদাকালো করে তৈরি করতে হয়েছে।

ট্রাবল এভরি ডে
ক্লেয়ার ডেনিস পরিচালিত ‘ট্রাবল এভরি ডে’ ছবিটি ২০০১ সালে মুক্তি পায়। শেন এবং জুন নামের আমেরিকান এক দম্পতি প্যারিসে যায় হানিমুন করতে। সেখানে একে অপরকে সময় দেয়ার পরিবর্তে স্ত্রী দেখতে পায় স্বামীর সকল আগ্রহ একটি ক্লিনিকে। মানুষের যৌনতা নিয়ে একটি গবেষণা করছিল শেন। কিন্তু কারো উপর গবেষণাটি প্রয়োগ করতে না পেরে নিজের স্ত্রী জুনকে ব্যবহার করে শেন। কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূল হয় না। জুন দিন দিন ভয়ঙ্কর হতে থাকে। মানসিকভাবে পঙ্গু স্ত্রীকে ঘরে বন্দী করে রাখতে বাধ্য হয় শেন। এমন কাহিনী নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘ট্রাবল এভরি ডে’ ছবিটি।

আন্ডার দ্য স্কিন

জনাথন গ্লেজার পরিচালিত ‘আন্ডার দ্য স্কিন’ ছবিটি ২০১৩ সালে মুক্তি পায়। একজন রহস্যময় নারিকে কেন্দ্র করে গরে উঠেছে ছবিটির কাহিনী। স্কটল্যান্ডের পথে একাকী নিঃসঙ্গ পুরুষ পেলেই তার সঙ্গে যৌনকাজে লিপ্ত হত। ছবিতে মাত্রাতিরিক্ত যৌন আসক্তি দেখানো হয়েছে। মানুষের মনের ভেতরের সত্যিকারের আবেগ ফুটে উঠেছে ছবিতে। এই প্রতিবেদনের তালিকায় থাকা মনস্তাত্বিক সিনেমার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘আন্ডার দ্য স্কিন’ ছবিটি।

পোসেশন

১৯৮১ সালের সিনেমা ‘পোসেশন’। আন্দ্রে উলাস্কি পরিচালিত এই ছবিতে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের টানাপড়েন এবং পরকীয়া বিষয়ক কাহিনী দেখানো হয়েছে। অ্যানা এবং মার্ক দম্পতির মধ্যে একসময় সমস্যা শুরু হয়। অ্যানা পরকীয়ায় জড়িয়ে পরে এবং স্বামী, সন্তানকে ছেড়ে দেয়। বিধ্বস্ত স্বামী মার্ক স্ত্রীর প্রেমিককে খুঁজে বের করে। এই নিয়ে মার্ক এবং অ্যানার মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। একসময় দেখা যায় মার্ক স্ত্রীকে নজরে রাখার জন্য একজন গোয়েন্দা নিয়োগ করে। অ্যানা মানসিকভাবে উন্মাদ হয়ে যায়। নানা ঘটনার পর প্রকাশ পায় অ্যানা শুধু পরকীয়া নয়, আরও বড় কোন ব্যাপার গোপন করছিলো তার স্বামী মার্কের কাছ থেকে। সিনেমার শেষ অংশটি চমকে ঠাসা। মনস্ত্বাত্বিক ঘরানার সিনেমা হিসেবে সেরা ছবি ‘পোসেশন’।

ইরেভারসেবল

২০০২ সালে মুক্তি পায় ‘ইরেভারসেবল’ ছবিটি। গ্যাস্পার নোয়ি পরিচালিত ছবিটি ফ্রান্সের পটভূমিতে বানানো হয়েছে। অনেক অল্প নির্মাতা আছে যারা মানবতার অন্ধকার অধ্যায়কে তুলে ধরতে পারে। ‘ইরেভারসেবল’ সিনেমার পরিচালক তেমন নির্মাতাদের একজন।

সিনেমায় অ্যালেক্সকে ধর্ষণ করা হয়। মেয়েটি আকস্মিক আঘাতে ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়ে। কিন্তু তার প্রেমিক এবং দীর্ঘদিনের বন্ধু এই ঘটনায় মেয়েটিকে সমর্থন করে। কিন্তু সমাজ অপরাধীকে ছেড়ে দেয়। একসময় দেখা যায় ধর্ষককে শাস্তি দিতে তাঁরা দুজনেই পরিকল্পনা করতে থাকে। এমন এক মানবতার গল্প নিয়ে এগিয়েছে ‘ইরেভারসেবল’ সিনেমার কাহিনী।