ছবি সংগৃহীত
শাহজালাল মাজারে জমজমাট অর্থের ভাগবাটোয়ারা
আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ০৫:২০
(প্রিয়.কম) সিলেটের হজরত শাহজালালের (রহ.) মাজারে চলছে জমজমাট অর্থের ভাগবাটোয়ারা। শাহজালালের মাজারে, দর্শনী, মানত ও দান-খয়রাত হিসেবে প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকা জমা পড়ে আর তা খাদেম পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বন্টন হয়ে যায়। কিন্তু হজরত শাহজালালের স্মৃতি সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। শাহজালাল (রহ.) মাজারের দান-খয়রাতের বিপুল অংকের টাকা, মানত হিসেবে আসা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গরু, ছাগলসহ অন্যান্য গবাদিপশু, এমনকি শাহজালালের স্মৃতিবিজড়িত তরবারি, খড়ম ও তার ব্যবহৃত বিভিন্ন তৈজসপত্রও নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিচ্ছেন মাজারের খাদেম পরিবারের সদস্যরা। যুগ ধরে চলে আসা এই ‘ভাগবাটোয়ারা’ সংস্কৃতির সার্বিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে খাদেম পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আবার রয়েছে লিখিত চুক্তি। মাজারে জমা পড়া এই অর্থ-সম্পদকে খাদেম পরিবারের সদস্যদের কাছে ‘বারি’ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় ইসলামি চিন্তাবিদ ও আলেম সমাজ বলছেন, শাহজালালের মাজার কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এভাবে মাজারের টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়া বড় ধরনের দুর্নীতিও। এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা। এদিকে খাদেম পরিবারের সদস্যরা বলছেন, মাজারের সম্পদ এভাবে ভাগবাটোয়ারাতে অন্যায়ের কি আছে? শাহজালালের মৃত্যুর পর থেকেই বংশপরম্পরায় এই রেওয়াজ চলে আসছে। স্থানীয় এলাকাবাসীদের অভিযোগ, হজরত শাহজালালের স্মৃতি সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই, শাহজালালের আধ্যাত্মিক সাধনা ও ইসলামের প্রতি তার নিষ্ঠা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ কোনো গবেষণাও হয়নি, ঐতিহাসিক এই মাজার ও এর সংলগ্ন স্থাপনার উন্নয়ন না করে তারা রীতিমতো মাজার ব্যবসা খুলে বসেছেন খাদেম পরিবারের সদস্যরা। হজরত শাহজালালের প্রতি সাধারণ মানুষের ভক্তি ও শ্রদ্ধাকে ব্যবহার করে তারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। জানা যায়, সিলেটের হজরত শাহজালালের খাদেম পরিবারগুলোতে আড়াইশ’র মতো সদস্য আছেন। মাজারের আশপাশের বিশাল জায়গাজুড়ে এসব খাদেম পরিবার বাস করে। এই এলাকাটির নামই দরগাহ মহল্লা। এই আড়াইশ’ সদস্যের মধ্যে মাজারের বারি বা সম্পদ বণ্টিত হয়। অর্থসম্পদ বণ্টনের জন্য প্রতি বছর একটি তালিকা প্রণয়ন করা হয়। খাদেম পরিবারের সদস্যরা জানান, শাহজালালের জীবদ্দশাতে তার ভক্ত ও আশেকরা যেসব উপঢৌকন নিয়ে আসতেন সেগুলো যেভাবে তিনি বণ্টন করতেন, তার ধারাবাহিকতায় এখন মাজারের বারি বণ্টন হচ্ছে। বারি বণ্টন নিয়ে খাদেম পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কোনো ধরনের মনোমালিন্য হয়নি। প্রতি মাসে নির্ধারিত কয়েকটি দিনে জমা পড়া বারি বণ্টন না করে মাজার তহবিলে জমা রাখা হয়। এই অর্থ দিয়ে মাজার রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত কর্মচারীদের বেতনভাতাসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটানো হয়। শাহজালালের মাজারের মূল অংশে ঢোকার মুখেই দর্শনী ও দান-খয়রাত গ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে। খাদেম পরিবারের নিযুক্ত বেতনভুক্ত দুই-তিনজন কর্মচারী প্রধান ফটকের পাশে বসে টাকা-পয়সা ও দান-খয়রাত গ্রহণ করেন। যদিও দান-খয়রাত গ্রহণের পর তারা কোনো রসিদ বা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র দেন না। একই সঙ্গে দান ও মানত হিসেবে আসা গবাদিপশু রাখার জন্য মাজার এলাকায় পৃথক একটি কক্ষ রয়েছে। মাজারে প্রতিদিনই শত শত মোমবাতি, আগরবাতিসহ নানা উপকরণ জমা পড়ে। দান হিসেবে প্রতিদিনই জমা হয় কোরআন, হাদিসসহ ইসলামি বইপত্র। দানের বিষয়ে খাদেম পরিবারের সদস্যরা বলেন, মাজারে মানত হিসেবে আসা গরু, ছাগল ও মোরগ-মুরগি ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে অনেকে দিয়ে থাকেন। ‘জানের বদলা জান’ হিসেবে অনেকে এসব প্রাণী মাজারে দিয়ে যান। তাই স্পর্শকাতর এসব দানের প্রাণী জবাই করে মাংস বিতরণ করে দেয়া হয়। অথবা রান্না করে (লঙ্গরখানা) মাজারকে কেন্দ্র করে অবস্থানরত ফকির-মিসকিন ও দরিদ্র মানুষকে খাওয়ানো হয়। বেশি পরিমাণে গবাদিপশু জমা হলে সেগুলো বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ মাজারের রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যয় করা হয়। ধর্মীয় পুস্তকের বিষয়ে বলা হয়, বিভিন্ন মসজিদ মাদ্রাসায় কোরআন শরিফসহ বিভিন্ন ধর্মীয় পুস্তক তারা নিয়মিত পাঠিয়ে থাকেন। যে কেউ চাইলে মাজার থেকে বিনামূল্যে ধর্মীয় পুস্তক সংগ্রহ করতে পারেন। মাজার প্রাঙ্গণ ও এর আশপাশের এলাকার উন্নয়ন হয়নি। মাজার কমপ্লেক্স ও এর আশপাশ অনেকটাই অপরিচ্ছন্ন। অনেকে প্রকাশ্যেই গাঁজা সেবন করেন। মাজারে আসা পর্যটক ও দশনার্থীদের মোবাইল ফোন, জুতা ও হাতব্যাগ ছিনতাইয়ে ঘটছে নিয়মিত। এসব অভিযোগের বিষয়ে শাহজালাল মাজারের বর্তমান সরেকওম বা প্রধান খাদেম ফতেউল্লাহ আল আমান বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে মাজার ও এর সংলগ্ন স্থাপনার তেমন একটা উন্নয়ন তারা করতে পারেননি। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্ত ও পর্যটকদের জন্য মাজার এলাকায় একটি আবাসন ও উন্নত টয়লেট ব্যবস্থা নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন তারা। কিন্তু অর্থাভাবে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। এটি করতে প্রায় আড়াই-তিন কোটি টাকার প্রয়োজন। এত টাকা খাদেম পরিবারের পক্ষে ব্যয় করা সম্ভব নয়। শাহজালাল মাজারের বিষয়ে সিলেট জেলা ওয়াকফ স্টেটের পরিদর্শক আনোয়ার হোসেন সংবাদমাধ্যমকে জানান, শাহজালাল মাজারের আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব খাদেম পরিবারের সদস্যরা সরকারের ঘরে জমা দেন না। এ সংক্রান্ত বিষয়ে হাইকোর্টে একটি রিট চলমান আছে। রিটের রায় না পাওয়া পর্যন্ত মাজারকে নিয়মের মধ্যে আনা যাচ্ছে না। গত ১৫ সেপ্টেম্বর হজরত শাহজালালের ৬৯০তম ওরস (মৃত্যুবার্ষিকী) পালিত হয়। কয়েক লাখ মানুষের আগমন ঘটেছিল উপমহাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে গণ্য শাহজালালের মাজারে। প্রতি বছর হাজার হাজার দর্শনার্থী শাহজালালের মাজার পরিদর্শন করতে সিলেটে ছুটে আসেন। বহুমানুষ নিজেদের মনঃস্কামনা পূর্ণ করার জন্য মাজারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মানত ও দান খয়রাত করে থাকেন। এসব মিলিয়ে মাজারের দর্শনী ও দান-খয়রাতের অংক কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় অথচ বছরের পর বছরও কোন ধরণের উন্নয়ন করা সম্ভব হয়নি। তথ্যসূত্র: যুগান্তর
- ট্যাগ:
- বাংলাদেশ
- দুর্নীতি
- মাজার
- শাহজালাল
- সিলেট জেলা