ছবি সংগৃহীত

মহাসড়কের সিএনজি এখন ঢাকায়

Nazmul Hasan Shanto
লেখক
প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট ২০১৫, ০৩:১৩
আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০১৫, ০৩:১৩

(প্রিয়.কম) গুলশানের উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য সিএনজি চালিত অটোরিকশা খুঁজছিলাম বাংলামটর মোড় থেকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা মিললো একটি ফাঁকা সিএনজির। ঈশারা দিতেই সিএনজি নিয়ে এগিয়ে এলেন চালক। জানতে চাইলেন কোথায় যাব? বললাম গুলশান-১ নম্বর গোলচত্বরের কথা। ভাড়া কত লাগবে জিজ্ঞেস করতেই তার উত্তর, ৪৫০ টাকা। এতো বেশি কেন; জানতে চাইলে চালক বলেন, ‘আমি আসলে জানি না। এখান থেকে গুলশানে ভাড়া কত। দিয়েন, আপনি সবসময় যত দিয়ে যান।’ জানতে চাইলাম আপনি কি প্রথম সিএনজি চালাচ্ছেন? ‘না’ উত্তর দেন চালক সোবহান। ‘আমি তিন-চার বছর ধরে সিএনজি চালাই। আগে বিক্রমপুরে সিএনজি চালাতাম।’ ঢাকায় তিনি তিন-চার দিন ধরে সিএনজি চালাচ্ছেন বলে জানালেন এই প্রতিবেদককে। হঠাৎ ঢাকায় আসলেন কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে সোবহান বলেন, ‘সরকার মহাসড়কে সিএনজি চলাচল নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু আমাদের তো খেয়ে-পরে বাঁচতে হবে।’ এখন হঠাৎ করে সিএনজি চালানো ছেড়ে দিয়ে নতুন এমন কি কাজ করবো; উৎকণ্ঠিত চোখে প্রতিবেদকের কাছে প্রশ্ন রাখেন তিনি।

এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই একজন যাত্রী পেয়ে গেলেন সোবহান। যাত্রী আনিসুর রহমান তার পরিবার নিয়ে আগারগাঁও যাবেন। এবার সোবহান ভাড়া হাঁকলেন ২০০ টাকা। দর কষাকষি করে ১৫০ টাকায় উভয়পক্ষ রাজি হলেন। ভাড়াটা একটু বেশি কিনা জানতে চাইলে আনিসুর রহমান প্রিয়’র প্রতিবেদককে বলেন, কিছু করার নাই। আমার একটু তাড়া আছে। ‘আগারগাঁওয়ে আমরা একটি অনুষ্ঠানে যাচ্ছি। এমনি অনেক দেরি করে ফেলছি। তাই ভাড়া একটু বেশি হলেও ওঠে গেলাম।’ জানান ওই যাত্রী। আরও কিছুক্ষণ সোনারগাঁও মোড়, ফার্মগেট ও আসাদগেট এলাকায় ঘুরে দেখা মিললো এমন আরও কিছু সিএনজি চালকের। প্রিয়’র প্রতিবেদককে তারা জানান, আগে মহাসড়কে সিএনজি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন কিন্তু জীবন বাঁচানোর তাগিদে ঢাকায় চলে আসছেন। এসব সিএনজিতে নেই কোনো মিটার এবং চালকদের নেই কোনো সুনির্দিষ্ট পোশাক। তারা বিভিন্ন রঙের শার্ট এমনকি লুঙ্গি পরে সিএনজি চালাচ্ছেন।
বসুন্ধরা সিটির সামনে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে আছেন এমনই একজন সিএনজি চালক ইদ্রিস। কোথায় যাচ্ছেন? ভাড়া কত নিচ্ছেন? প্রতিবেদকের এসব প্রশ্নের জবাবে ইদ্রিস জানান, এখান থেকে সদরঘাট যাচ্ছেন। ভাড়া নিচ্ছেন ২০০ টাকা। ‘আগে নরসিংদীতে চালাতাম। ঢাকায় আসছি দুই-তিন দিন হলো।’ কোনো পুলিশি ঝামেলায় পড়তে হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গতকাল আমি গুলশানে গেলে পুলিশে ধরছিল। পরে আমার নামে মামলা দেয়।’ ৩ হাজার টাকায় পুলিশের কাছ থেকে ছাড়া পেয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। ঐ সিএনজিতে করেই যাচ্ছিলেন রাইসুল ইসলাম। ওই যাত্রী প্রিয়.কম কে জানান, বসুন্ধরা সিটি থেকে সদরঘাটের ভাড়া নিচ্ছে ২৮০ টাকা। ‘ভাড়া তো সিএনজি চালকরা সবসময় বেশি নেই। মিটার থাকলেও সেটা কেউ মানে না। দেখা যায় মিটারের চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া দিতে হয়। আর তার তো কোনো মিটারই নেই।’ যাত্রী রাইসুল জানান, বিপদে পড়লেই সিএনজিতে উঠতে বাধ্য হন তারা।
এমনি করে সারাদেশের মহাসড়কে নিষিদ্ধ হওয়া সিএনজিগুলো এসে ভীড় করেছে ঢাকায়। যদিও ট্রাফিক পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক বিভাগ, উত্তর) মো. আবু ইউসুফ প্রিয়.কম এর কাছে দাবি করেন, ঢাকার বাইরের সিএনজিগুলোর ঢাকায় চলে আসার কোনো তথ্য তাদের জানা নেই। তিনি বলেন, ‘যদিওবা ঢাকার বাইরে থেকে সিএনজি এসে থাকে, সেগুলোর সংখ্যা বেশি না।’ আবু ইউসুফ জানান, তারা দু’টি বিষয়ে প্রাধান্য দিচ্ছেন। মহাসড়কের সিএনজি ও প্রাইভেট সিএনজি। ‘এরকম সিএনজি পেলেই আমরা কাগজপত্র চেক করি। যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায় আমরা সাথে সাথে মামলা দিয়ে রেকারিং ও ডাম্পিং করি। প্রাইভেট সিএনজিগুলোতে প্রাইভেট লেখা আছে কিনা এবং তারা যাত্রী পরিবহণ করে কিনা তা আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান চালাই এবং এসব সিএনজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করি।’ জানান এই ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা।
এদিকে পথে আরও দেখা মিললো এমন কিছু সিএনজির যেগুলোর নম্বর প্লেটে ঢাকা মেট্রো লেখা নেই। লেখা রয়েছে অন্যকিছু। এমনই একটি সিএনজির দেখা মেলে ফার্মগেটে, যার নাম্বার প্লেটে লেখা রয়েছে ‘গাজীপুর-দ’। সিএনজিটি গাজীপুরের, এমন ধারণা থেকে এই প্রতিবেদক ওই সিএনজির চালকের ঢাকায় আসার কারণ জানতে চাইলে চালক আরশাদ বলেন, এটা প্রাইভেট সিএনজি। প্রিয়’র প্রতিবেদকের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন গিয়ে তিনি দাবি করেন, উপরের লেভেলে মালিকের লোক থাকলে ঢাকায় এসব সিএনজিতে যাত্রী পরিবহন করা যায়। গুলশান যাবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না। কারণ ওখানের সার্জেন্টকে মান্থলি দেয়া যায় না। আমরা এদিক দিয়ে মহাখালী, অন্যদিকে সোনারগাঁও মোড় ও আগারগাঁও মিলে একটা এলাকার জন্য এ এলাকার একজন সার্জেন্টকে প্রতি সিএনজির জন্য মাসে ৫-৬ শত টাকা দিতে হয় ‘ তিনি দাবি করেন, মালিকের বেশি সিএনজি থাকলে সার্জেন্টদের থেকে ভাল সাহায্য পাওয়া যায়।
প্রাইভেট সিএনজিতে যাত্রী পরিবহনের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক রমনা জোনের সার্জেন্ট জাহিদুর রহমান দাবি করেন, প্রাইভেট সিএনজিগুলোকে বিআরটিএ থেকেই রেজিস্ট্রেশন করে দেয়া হয়। সুতরাং তারা ঢাকায় চলার অধিকার রাখে। তবে তাদের যাত্রী পরিবহন করার এখতিয়ার নেই বলে জানান এই ট্রাফিক সার্জেন্ট। তার দাবি, যাত্রী পরিবহনের প্রমাণ পেলেই তারা মামলা করে থাকেন। ‘তারা অবশ্য মাঝে মাঝে আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে যাত্রী পরিবহণ করে।’ সবশেষে মন্তব্য করেন তিনি।