ছবি সংগৃহীত

পাপ ও পাপীর শেষ ঠিকানা জাহান্নাম

মিরাজ রহমান
সাংবাদিক ও লেখক
প্রকাশিত: ২৪ ডিসেম্বর ২০১৪, ১০:৪১
আপডেট: ২৪ ডিসেম্বর ২০১৪, ১০:৪১

ভালো কাজের প্রতিদান স্বরূপ মানুষকে যেমনি জান্নাতের প্রতিশ্র“তি প্রদান করছেন আল্লাহ তায়ালা, খারাপ কাজ এবং খারাপ মানুষের জন্য তেমনি তিনিই সৃষ্টি করেছেন জাহান্নাম। জাহান্নাম তথা দোজখ হলো আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে জঘণ্য, সবচেয়ে ভয়ংকর, নিকৃষ্ট এক সৃষ্টি। বিভীষিকা, কষ্ট, শাস্তি আর শাস্তি থাকবে জাহান্নামে। কোনো আশা কোনো চাহিদাই পূরণ হবে না সেখানে। যারা সীমা লঙ্ঘনকারী, অবাধ্য, তাওহিদ, রিসালাত ও আখেরাতে অবিশ্বাসী, পাপাচারী, কপট, যারা শিরক করে, যারা সৃষ্টির প্রতি এবং নিজের প্রতি জুলুম করে, যারা অবিশ্বাসী তাদের জন্য জাহান্নাম। পবিত্র কোরানে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, আর সীমা লঙ্ঘনকারীদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্টতম নিবাস-জাহান্নাম, সেখানে তারা প্রবেশ করবে, কত নিকৃষ্ট তাদের বিশ্রামস্থল। [সুরা ছাদ : ৫৫-৫৬] জাহান্নামীদের মুখমণ্ডল আগুনে বেষ্টিত থাকবে। তাদের জামা হবে আলকাতরার। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরানের মাধ্যমে আমাদের জানিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, তাদের জামা হবে আলকাতরার এবং আগুন তাদের মুখমণ্ডল আচ্ছন্ন করবে। [সুরা ইবরাহিম : ৫০] হজরত আবু হুরায়রা [রা.] থেকে বর্ণিত, রাসুল [সা.] বলেছেন, এই যে আগুন তোমরা জ্বালাও, তা হলো জাহান্নামের আগুনের উত্তাপের সত্তর ভাগের এক ভাগ মাত্র। সাহাবিগণ বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহর শপথ এ আগুনই তো যথেষ্ট। তিনি বললেন, একে আরো সত্তর গুণ বাড়ানো হবে। আর প্রতিটি গুণের উত্তাপ এর উত্তাপের সমান হবে। [মুসলিম] জাহান্নাম পরিচিতি চির দুঃখ-কষ্ট-পেরেশানী, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, অপমান, বিড়ম্বনা, দুর্ভাগ্য, লজ্জা-শরম, ক্ষুধা-পিপাসা, আগুন, অশান্তি, হতাশ-নিরাশা, চীৎকার-কান্নাকাটি, শাস্তি, অভিশাপ, আযাব-গযব ও অসন্তোষের স্থান হলো জাহান্নাম। শান্তির লেশমাত্রই সেখানে নেই। হাত-পা ও ঘাড়-গলা শিকলে বেঁধে বেড়ি পরিয়ে দলে দলে জাহান্নামের অতল গহবরে নিক্ষেপ করা হবে। যেখানে শুধু অতিবেশি তেজ ও দাহ্য শক্তিসম্পন্ন আগুন ছাড়া আর কিছু নেই। দোযখের অগ্নিশিখা তাদেরকে উপর, নীচ এবং ডান ও বাম থেকে স্পর্শ করবে, জ্বালাতে-পোড়াতে থাকবে। একবার চামড়া পুড়ে গেলে আবারো নুতন চামড়া গজাবে যেন বার বার আগুনের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। পিপাসায় প্রাণ পেটের নাড়ি-ভূঁমি গলে যাবে। এ হচ্ছে, আজাবের উপর আযাব। তাতে পিপাসা না কমে আরো তীব্র হবে। অতি দুর্গন্ধময় যাক্কুম এবং কাঁটাযুক্ত ঘাস ও গিসলিন হবে তাদের খাদ্য। ক্ষুধার তাড়নায় জঠর জ্বালায় তা ভক্ষণ করতে গেলে পেটের ভেতরে আরো যন্ত্রণা বাড়াবে। খাদ্য এবং পানীয় হবে আযাবের অন্যতম উপকরণ। অতিশয় ঠান্ডা ও হিম প্রবাহ দ্বারাও আরেক প্রকার শাস্তি দেয়া হবে। বরফের চাইতে শত গুণ ঠান্ডা যামহারীরে তাদেরকে রাখা হবে। সে আযাব হবে করুণ। তারা শাস্তির মধ্যে মৃত্যু কামনা করবে, কিন্তু তা কবুল হবে না। নিরুপায় হয়ে জাহান্নাম থেকে বাইরে যেতে চাইবে। কিন্তু আজ তাদের কোন সাহায্যকারী নেই, নেই কোন সুপারিশকারী। নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা। জাহান্নাম হচ্ছে বিচিত্র রকমের অসহনীয় যাতনার বিশাল কারাগার। জাহান্নাম আজাবের কারণে দৈনিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এমনকি দেহের মধ্যে অবস্থিত হৃৎপিন্ড, নাড়ী-ভূড়ি, শিরা-উপশিরা, অস্থিমজ্জা ইত্যাদি বিকৃতি ঘটবে কিন্তু সেই তীব্র যন্ত্রণা হতে মুক্তি পাবার অথবা পালিয়ে যাবার কোন রাস্তাও খোলা থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন: وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا سَقَرُ ٢٧ لَا تُبۡقِي وَلَا تَذَرُ ٢٨ لَوَّاحَةٞ لِّلۡبَشَرِ ٢٩ عَلَيۡهَا تِسۡعَةَ عَشَرَ ٣٠ المدثر: ٢٧، ٣٠ “আর তুমি কি জানো, জাহান্নাম কি? তা শান্তিতে থাকতে দেয় না আবার ছেড়েও দেয় না। চামড়া ঝলসে দেয়। উনিশজন ফেরেশতা তার প্রহরী হবে।’’ [সূরা মুদ্দাসসির: ২৭-৩০] অন্যত্র বলা হয়েছে: ثُمَّ لَا يَمُوتُ فِيهَا وَلَا يَحۡيَىٰ ١٣ الاعلى: ١٣ ‘‘হে [জাহান্নামে] মরবেও না আবার জীবিতও থাকবে না।’’ [সূরা আ’লা: ১৩] আরো বলা হয়েছে: إِذَآ أُلۡقُواْ فِيهَا سَمِعُواْ لَهَا شَهِيقٗا وَهِيَ تَفُورُ ٧ تَكَادُ تَمَيَّزُ مِنَ ٱلۡغَيۡظِۖ الملك: ٧، ٨ ‘‘তারা [জাহান্নামীরা] যখন সেখানে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন তার ক্ষিপ্রতার তর্জন-গর্জন শুনতে পাবে এবং তা উত্থাল-পাতাল করতে থাকবে, ক্রোধ আক্রোশে এমন অবস্থা ধারণ করবে, মনে হবে তা গোস্বায় ফেটে পড়বে।’’ [সূরা মুলক: ৭-৮] إِذَا رَأَتۡهُم مِّن مَّكَانِۢ بَعِيدٖ سَمِعُواْ لَهَا تَغَيُّظٗا وَزَفِيرٗا ١٢ وَإِذَآ أُلۡقُواْ مِنۡهَا مَكَانٗا ضَيِّقٗا مُّقَرَّنِينَ دَعَوۡاْ هُنَالِكَ ثُبُورٗا ١٣ الفرقان: ١٢، ١٣ ‘‘জাহান্নাম যখন দূর হতে তাদেরকে [জাহান্নামীদের]দেখতে পাবে তখন তারা তার ক্রোধ ও তেজস্বী আওয়াজ [অর্থাৎ তর্জন-গর্জন] শুনতে পাবে। আর যখন তাদেরকে হাত-পা বাধা অবস্থায় জাহান্নামের কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে তখন তারা সেখানে কেবল মৃত্যুকে ডাকতে থাকবে।’’ [সূরা ফুরকান: ১২-১৩] সূরা নাবায়ে বলা হয়েছে: إِنَّ جَهَنَّمَ كَانَتۡ مِرۡصَادٗا ٢١ لِّلطَّٰغِينَ مَ‍َٔابٗا ٢٢ لَّٰبِثِينَ فِيهَآ أَحۡقَابٗا ٢٣ النبا: ٢١، ٢٣ ‘‘নিশ্চয় জাহান্নাম একটি ঘাঁটি। আল্লাহদ্রোহীদের জন্য আশ্রয়স্থল। সেখানে তারা যুগ যুগ ধরে অবস্থান করবে।’’ [সূরা নাবা: ২১-২৩] জাহান্নামের শ্রেণী বিন্যাস মহান আল্লাহ বলেন, لَهَا سَبۡعَةُ أَبۡوَٰبٖ لِّكُلِّ بَابٖ مِّنۡهُمۡ جُزۡءٞ مَّقۡسُومٌ ٤٤ الحجر: ٤٤ ‘‘জাহান্নামের সাতটি দরজা [স্তর] আছে। প্রত্যেকটি দরজার জন্য ভিন্ন ভিন্ন দল নির্ধারিত হয়েছে।’’ [সূরা আল-হিজর: ৪] অর্থাৎ জাহান্নাম হচ্ছে পরলোকের এমন একটি বিশাল এলাকা যেখানে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির জন্য ভিন্ন ভিন্ন এলাকা নির্ধারিত আছে। সেগুলোকে প্রধানত: সাত ভাগে ভাগ করা হয়েছে: যথা: হাবিয়া। জাহীম। সাকার। লাযা। সাঈর। হুতামাহ্ । জাহান্নাম। বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন ধরনের অপরাধীরা শাস্তি ভোগ করবে। যেমন: কাফের, মুশরিক, ব্যভিচারী, সুদখোর, ঘুষখোর ইত্যাদি, সবার জন্যই ভিন্ন ভিন্ন স্তরে শাস্তি নির্দিষ্ট আছে। আবার প্রত্যেকটি স্তরের অনেকগুলো ঘাঁটি আছে। যথা: গাছ্ছাক: একটি হ্রদ। যা জাহান্নামীগণের রক্ত, ঘাম ও পুঁজ ইত্যাদি প্রবাহিত হয়ে সেখানে জমা হবে। গিছলিন: এটা হচ্ছে জাহান্নামীদের মল-মুত্র জমা হওয়ার স্থান। জাহান্নামীরা যখন খুব ক্ষুধা-তৃষ্ণা অনুভব করবে তখন উপরোক্ত দু’জায়গা হতে পানাহার করতে দেয়া হবে। তাছাড়া ‘তীনাতুল খাবাল’’ নামক বিষ ও পুঁজে পরিপূর্ণ আরেকটি কুপের কথাও হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। সাউদ: এটা তীনাতুল খবলের পাড়ে অবস্থিত একটি বিশাল পাহাড়। এক শ্রেণীর জাহান্নামীদেরকে ঐ পাহাড়ের উপর উঠায়ে সজোরে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলা হবে, পূণরায় উঠানো হবে এবং ফেলা হবে এভাবে শাস্তি দেয়া হবে। ইরশাদ হচ্ছে: سَأُرۡهِقُهُۥ صَعُودًا ١٧ المدثر: ١٧ ‘‘সহসা-ই আমি তাকে সাউদ নামক পর্বতে চড়াবো।’’ [সূরা মুদ্দাসসির: ১৭] যুববুল হযন: এটা জাহান্নামীদের আরেকটি ঘাঁট। এখানে রিয়াকার ও অহংকারী লোকদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। গাই: এটা জাহান্নামের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা। কেননা ‘গাই’য়ের ভীতিজনক হুংকার শ্রবণে জাহান্নামের অন্যান্য স্থান প্রতিদিন ‘গাই’ হতে চারশত বার আশ্রয় প্রার্থনা করে। পরিশেষ হজরত ইবনে উমর [রা.] থেকে বর্ণিত, মহানবি [সা.] বলেছেন, অবিশ্বাসীরা জাহান্নামে তাদের জিহ্বাকে এক ফারসাখ দুই ফারসাখ [মাইল] স্থান পরিমাণ বিছিয়ে রাখবে, আর লোকেরা তা পদদলিত করবে। [তিরমিজি] হজরত আবু হুরায়রা [রা.] থেকে বর্ণিত, রাসুল [সা.] বলেছেন, দুই শ্রেণীর জাহান্নামী আমি দেখিনি [অর্থাৎ আমার পরে তাদের আবির্ভাব ঘটবে]। এক শ্রেণীর লোক হবে, যাদের হাতে গরুর লেজের মতো চাবুক থাকবে, তা দিয়ে মানুষকে অন্যায়ভাবে প্রহার করবে। আর এক শ্রেণীর নারী হবে, যারা পোশাক পরেও থাকবে নগ্ন এবং হেলে-দুলে চলবে। এরা মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং মানুষকে নিজদের প্রতি আকৃষ্ট করবে। তাদের মাথার চুল লম্বা ঘাড়বিশিষ্ট উটের হেলে-থাকা কুঁজের মতো। এরা জান্নাতে যেতে পারবে না, জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। বিভিন্ন প্রকার কষ্ট, শাস্তি আর ভোগান্তির বিভীষিকাময় এক রূপের নামই জাহান্নাম। যেখানে প্রবেশ করার পর থেকে শুরু হবে শাস্তি। কত প্রকারের আর কত পরিমাণের শাস্তি-কোনো মানুষের পক্ষে তা আন্দাজ বা কল্পনা করা সম্ভব নয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিজ গুণে জাহান্নামের পরিণতি থেকে মুক্তি দান করুন। আমিন। মাওলানা মিরাজ রহমান