ছবি সংগৃহীত
গুগল প্লাস ব্যবহারে আপনাকে বাধ্য করবে গুগল
আপডেট: ০৪ জানুয়ারি ২০১৩, ০৯:৩৪
গুগলের সাম্প্রতিক সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইট চালুর করার বিষয়টি আজ কারোরই অজানা নয়। কমবেশি অনেকেই গুগল প্লাস ব্যবহার করে দেখেছেন। কিন্তু বন্ধুদের বেশিরভাগই অনুপস্থিত থাকায় সিংহভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই জমে ওঠেনি গুগল প্লাস ফিড। আর এ কারণেই অ্যাকাউন্ট খোলার পর খুব একটা সক্রিয় থাকছেন না অধিকাংশ মানুষ।
কিন্তু গুগল তাদের এই নেটওয়ার্ক নিয়ে বেশ আশাবাদী। কেবল আশাবাদীই নয়, তারা এতোটাই শক্তিশালী যে, ব্যবহারকারীদের প্রয়োজনে গুগল প্লাস ব্যবহারে বাধ্য করবে তারা। শুনতে একটু বেমানান লাগলেও আসলেই তাই। যে কেউ জিমেইল, ইউটিউবসহ অন্য যে কোনো গুগল সেবায় নিবন্ধন করলেই গুগল তার জন্য গুগল প্লাস অ্যাকাউন্ট তৈরি করে নিচ্ছে।
গুগল এসবের শুরুটা করে ফেসবুককে দমিয়ে দিতে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেসবুককে প্রধানত মাথায় রেখেই গুগল প্লাস তৈরি করে গুগল। কেননা, তারা চায়নি ফেসবুক সোশাল নেটওয়ার্কিং-এ শীর্ষস্থানে থাকুক।
গুগল ও ফেসবুক এই দুই প্রতিষ্ঠানেরই প্রধান আয়ের উৎস হচ্ছে বিজ্ঞাপন। গুগলের আয় আরও বেশি, কেননা বিজ্ঞাপন ছাড়াও তাদের অনেক প্রিমিয়াম সেবা রয়েছে। কিন্তু ফেসবুকের এমন একটি জিনিস রয়েছে যা গুগলের নেই। আর তা হলো ফেসবুকের বিশাল ডেটাবেস।
ফেসবুক জানে ইন্টারনেটে ভ্রমণকারী প্রায় সবার আসল নাম। কেবল তাই নয়, সেই নামধারী ব্যক্তির বন্ধু-বান্ধব কারা, তাদের কার কী বিষয়ে আগ্রহ ইত্যাদি প্রচুর ব্যক্তিগত তথ্য রয়েছে ফেসবুকের নাগালে। আর এ বিষয়টিই গুগলকে ঈর্ষান্বিত করে তুলেছে। আর এ কারণেই এই কোম্পানি কেবল গুগল প্লাসকে জনপ্রিয় করার জন্যই নয়, বরং এর ব্যবহারকারী বাড়াতে "প্রাণপণ" চেষ্টা করে যাচ্ছে।
আর যখন গুগল বলে "প্রাণপণ" চেষ্টা করছে, তখন সাধারণ ব্যবহারকারী অনেক ক্ষেত্রেই নিরুপায়।
ব্যক্তিক ব্যবহারে গুগল প্লাস
স্যাম ফোর্ড নামের ২৬ বছর বয়সী এক আমেরিকান নৌ-সেনা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, তিনি তার অ্যান্ড্রয়েড ফোন থেকে গুগল প্লাস অ্যাকাউন্টের জন্য নিবন্ধন করেন ইন্সট্যান্ট ফটো আপলোড সুবিধার জন্য। এই সুবিধার আওতায় যে কোনো ছবি তোলামাত্রই গুগল প্লাস একটি "প্রাইভেট" অ্যালবামে ছবিগুলো আপলোড করে নেয়। এতে করে ব্যবহারকারী পরবর্তীতে ছবি কম্পিউটারে ট্রান্সফার বা আপলোডের ঝামেলা থেকে রেহাই পান।
কিন্তু স্যাম ফোর্ড পরে জানিয়েছেন, তিনি আশ্চর্যান্বিত হন যখন গুগল প্লে স্টোরে তার লেখা একটি অ্যাপ্লিকেশন রিভিউ তার গুগল প্লাস অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। প্রসঙ্গতঃ গুগল সম্প্রতি তাদের প্লে স্টোরের সব অ্যাপ্লিকেশন রিভিউ লেখকের গুগল প্লাস অ্যাকাউন্ট থাকা বাধ্যতামূলক করেছে। যদি ব্যবহারকারী প্লে স্টোরে ঢোকেন, তাহলে তার ইতোমধ্যেই গুগল অ্যাকাউন্ট রয়েছে আর সেই অ্যাকাউন্টে সাইন ইন করাও রয়েছে। আর কোনো সমস্যায় পড়লে ব্যবহারকারী রিভিউ লিখবেনই। আর তখনই সেই রিভিউ তার গুগল প্লাস অ্যাকাউন্টের সঙ্গে লিংক হয়ে যাবে।
এই অভিজ্ঞতার পর সেই নৌ-বাহিনী কর্মকর্তার অভিমত, গুগল প্লাস প্রাণপণে চেষ্টা করছে ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন তথ্য গুগল প্লাসে শেয়ার করাতে। আর যদি ব্যবহারকারী স্বেচ্ছায় শেয়ার না করে, গুগল তাদের অনিচ্ছায় শেয়ার করাবে!"
গুগল প্লাসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গুগল প্লে স্টোরে প্রকাশিত রিভিউ-এর মান বাড়াতেই গুগল প্লাস অ্যাকাউন্টের প্রয়োজনীয়তা চালু করা হয়। এতে করে ব্যবহারকারীরা তাদের গুগল প্লাস সার্কেলে থাকা বন্ধুদের রিভিউও সহজে দেখতে পারবেন।
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে গুগল প্লাস
ব্যক্তিগতভাবে গুগলের এসব পদক্ষেপ অনেকেরই পছন্দ নয়। বিশেষ করে গুগলের নতুন গোপনীয়তার নীতিমালা (প্রাইভেসি পলিসি) চালু হওয়ার সময় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে কোম্পানিটি। ব্যবহারকারী চাইলেই গুগলের পরিবর্তে বিং ব্যবহার করতে পারেন। জিমেইলের পরিবর্তে ইয়াহু বা আউটলুক ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। মালিকের ব্যক্তিগত পছন্দ যা-ই হোক, ব্যবসার স্বার্থেই তাকে গুগলের সেবাসমূহে যুক্ত থাকতে হবে। কেননা, বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই সার্চ করার জন্য গুগলকে বেছে নেন। আর এই গুগলের সার্চ পাতায় শুরুর দিকে থাকতে হলে গুগলের দিক-নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য ফেসবুক পেজের মতো গুগল প্লাস পেজ চালু করে গুগল। গুগল জানায়, যে কোনো প্রতিষ্ঠত ব্র্যান্ডের নামের আগে প্লাস চিহ্ন দিয়ে গুগল সার্চ করতে গেলে ব্যবহারকারী সরাসরি সেই প্রতিষ্ঠানের গুগল প্লাস পেজে চলে যেতে পারবেন। এতে করে প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ আপডেট যেমন ব্যবহারকারীরা তাদের অফিসিয়াল পেজ থেকে পেতে পারেন, তেমনি প্রতিষ্ঠানও অধিক ফলোয়ার পেতে পারেন।
আবার এখানেই সবকিছু শেষ নয়। সব ব্যবহারকারী হয়তো জানেন না যে নামের আগে + দিয়ে নিলে সর্বশেষ আপডেট পাওয়া যাবে। উদাহরণস্বরূপ কেউ যদি কেবল Toyota লিখে সার্চ করেন, তাহলে টয়োটার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের লিংক তো আসবেই, সঙ্গে সঙ্গে তাদের গুগল প্লাস পেজ থেকেও বিভিন্ন তথ্য প্রথম পাতায়ই দেখাবে। সেই সঙ্গে একটি ফলো বাটনও রাখা হয়েছে যাতে ব্যবহারকারী হোমপেজ থেকেই নতুন আপডেট পেতে টয়োটার গুগল প্লাস পেজকে ফলো করতে পারেন।
পাঠক নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝতেই পারছেন কেন কোম্পানিগুলো নিজেদের স্বার্থেই গুগল প্লাসে পেজ খুলতে বাধ্য হচ্ছেন।
একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক
গুগল প্লাসের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, গুগল প্লাস একটি ব্যাপক বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। গুগল প্লাসে ঢোকার প্রচুর পথ রয়েছে। আর এটি গুগলের প্রচুর সেবার সঙ্গে যুক্ত করে রাখা হয়েছে।
বাস্তবেও আমরা তাই দেখতে পাই। নৌবাহিনীর ওই কর্মকর্তা গুগল প্লাসে ঢুকেছেন ইন্সট্যান্ট ফটো আপলোড সুবিধা পাবার স্বার্থে। কিন্তু সেটা ব্যবহৃত হয়েছে তার অ্যাপ্লিকেশন রিভিউ লেখা শেয়ারের কাজে। ঠিক তেমনি কেউ ইউটিউবে ঢুকলেও তার গুগল প্লাস অ্যাকাউন্ট হয়ে যাবে। কিংবা সবচেয়ে জনপ্রিয় ইমেইল সেবা জিমেইলে ঢুকলেও তিনি আপনা-আপনিই ঢুকে যাবেন গুগলের সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে।
ফেসবুকের বিস্তৃতি যে কম তেমনটা মোটেই বলা যায় না। যত ওয়েবসাইটে ফেসবুকের শেয়ার বা লাইক বাটন রয়েছে, সবগুলোই ফেসবুকের সঙ্গে সংযুক্ত। কিন্তু এগুলোর মাধ্যমে ব্যবহারকারী ফেসবুকে ঢুকছেন না। অন্যদিকে গুগলের +১ বাটনও ওয়েবসাইট মালিকরা নিজেদের স্বার্থেই সাইটে বসাচ্ছেন। কেননা, গুগলের মতে, এই +১ দিয়েই যাচাই করা হবে একটি ওয়েবসাইটের সামগ্রী কতটুকু মানসম্পন্ন আর সেই অনুপাতে তা সার্চ ফলাফল পাতায় প্রদর্শিত হবে।
বলা বাহুল্য, +১ বাটনে ক্লিক করতে হলেও আপনার লাগবে গুগল প্লাস অ্যাকাউন্ট।
নতুন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গেও গুগল প্লাস জুড়ে দেয়া হচ্ছে। প্রজেক্ট গ্লাসের কথা হয়তো অনেকেই শুনেছেন যেটি একটি চশমা যার মাধ্যমে আপনি সোশাল নেটওয়ার্কিং করতে পারবেন, ছবি তুলে শেয়ার করতে পারবেন ও ভিডিও কল করতে পারবেন। আর এসব সুবিধাই পাবেন একটি গুগল প্লাস অ্যাকাউন্ট দ্বারা।
এসব কিছু ছাড়াও গুগল আর ফেসবুক মোটামুটি দুই ধরনের দু'টি সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইট। যেখানে ফেসবুক অপরিচিত মানুষকে বন্ধুত্বের আবেদন পাঠাতে নিরুৎসাহিত করে, সেখানে গুগল প্লাস অপরিচিতদের সঙ্গেও সংযুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। তাই এই দুই নেটওয়ার্কের পার্থক্য এভাবেই দেয়া যায় যে, ফেসবুক হলো বন্ধুদের সঙ্গে সংযুক্ত হতে আর গুগল প্লাস হলো নতুন বন্ধু খুঁজে নিতে।
তবে পার্থক্য যাই থাকুক, গুগল প্লাস একসময় বিশাল এক নেটওয়ার্কে পরিণত হবে। ওয়েব জগতে গুগলের রাজত্বই এই নেটওয়ার্কের বৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা রাখবে। তবে জোরপূর্বক হোক আর যেভাবেই হোক ব্যবহারকারীকে নেটওয়ার্কে ঢুকাতে পারলেই সব শেষ হয়ে যায় না। কেননা, ইতোমধ্যেই অনেক ব্যবহারকারী থাকা সত্ত্বেও ফেসবুকের তুলনায় অতি নগণ্য সময় গুগল প্লাসে ব্যয় করেন ব্যবহারকারীরা। যেখানে গড়ে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী মাসে ৪০০ মিনিট ফেসবুকে ব্যয় করেন, সেখানে একজন গুগল প্লাস ব্যবহারকারী গড়ে মাসে ব্যয় করেন মাত্র ৩ মিনিট।
তাই ব্যবহারকারী বাড়ানোর পাশাপাশি কীভাবে সাইটে অ্যাকটিভিটি বাড়ানো যায় তা নিয়েও ভাবতে হবে গুগলকে। ২০১৩ সালে হয়তো সেটাই হচ্ছে গুগলের প্রধান টার্গেট।