ছবি সংগৃহীত

খাস জমি বন্দোবস্ত নীতিমালায় যে সমস্ত দুর্বলতা তুলে ধরলো ‘আভাস’

priyo.com
লেখক
প্রকাশিত: ২১ ডিসেম্বর ২০১৫, ১১:৩২
আপডেট: ২১ ডিসেম্বর ২০১৫, ১১:৩২

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত অতিথিদের একাংশ, ছবি: প্রিয়.কম
(অপূর্ব লাল সরকার, আগৈলঝাড়া, বরিশাল)  বাংলাদেশে খাস জমি বন্দোবস্ত নীতিমালার বেশ কয়েকটি দুর্বলতা তুলে ধরে নারী কৃষকবান্ধব ভূমিনীতি প্রণয়নের দাবিতে বরিশালে সংবাদ সম্মেলন করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন ‘আভাস’।


সোমবার দাতা সংস্থা  গ্রো এবং অক্সফ্যাম এর আর্থিক সহায়তায় বরিশাল প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।


এতে খাস জমি বন্দোবস্ত নীতিমালার বেশ কয়েকটি দুর্বলতা চিহ্নিত করে তুলে ধরা হয়। তাদের মতে ওই নীতিমালায় যেসব দুর্বলতা রয়েছে সেগুলো হলোঃ


১.খাস জমি বিতরণ নীতিমালা ১৯৮৭ অনুসারে নারী প্রধান ভূমিহীন পরিবারকে খাসজমি বিতরণে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতদসংক্রান্ত এক সংশোধনী আইনে নিম্নোক্ত তিনটি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে- (১) তাকে বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা হতে হবে, (২) তার একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুত্র থাকতে হবে এবং (৩) ওই পু কে কাজ করার উপযুক্ত হতে হবে। ১৯৯৭ সালের সংশোধিত কৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালার ১৯৯৭, ১১(গ) ভূমি নীতিতেও এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে। লক্ষণীয় এখানেও পরোক্ষভাবে এটাই বোঝানো হয়েছে নারী এককভাবে ভূমি অধিকারে রাখার যোগ্য নয়।


২. একজন ভূমিহীন শহীদ অথবা পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা পরিবারে যদি কর্মক্ষম পুরুষ সদস্য থাকে এবং তিনি বা তারা যদি কৃষি শ্রমিক/বর্গাচাষী হিসেবে নিয়োজিত থাকেন তবে তারা কৃষিখাস জমি প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার পাবেন। এখানেও সক্ষম নারীকে বা নারী সদস্যকে ভূমি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।


৩. খাসজমি বন্দোবস্ত নীতিমালায় চিরকুমারী অথবা নিঃসন্তান ভূমিহীন নারীর দরখাস্ত করার কোন বিধান নাই।


৪. ৯০’র দশকে খাসজমি স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে বরাদ্দ রাখার বিষয়ে একটা আইন হয়। স্বামী কোন কারণে স্ত্রীকে ছেড়ে গেলে সে জমি পুরোটা স্ত্রীর নামে থাকবে। বর্তমানে নিয়ম করা হয়েছে যে এক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হলে বরাদ্দকৃত খাসজমির স্বামীর অংশ আবার রাষ্ট্রের কাছে চলে যাবে।


৫. কৃষিখাস জমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা ১৯৯৭ এর আর্টিকেল নং ৩ এবং ৪ এ জাতীয় এবং জেলা পর্যায়ে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে কিন্তু এই কমিটিতে নারী প্রতিনিধি রাখার কোন প্রবিশন রাখা হয় নাই।


৬. বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮(২) ধারায় বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবেন। বস্তুত: সংবিধান সমাজ ও জনজীবনে নারী-পুরুষের সমতা এবং বৈষম্য রোধের ওপর জোর দিলেও ব্যক্তিগত তথা পারিবারিক জীবন নিয়ে স্পষ্ট কোন কথা বলেনি। তাই যখনই নারীর ব্যক্তিগত/পারিবারিক কোন সমস্যার বিষয় সামনে আসে, তখনই তার সমাধানের জন্য বিভিন্ন সম্প্রদায়ের স্ব স্ব ধর্মকে আশ্রয় করে প্রণীত ব্যক্তিগত বা পারিবারিক আইনের আশ্রয় নেয়া হয়। আর আইনের এই ভিন্নতা তথা বৈষম্যের ফলে মূলত: বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী  নারীদেরই বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়।


৭. বর্তমানে ভূমি সংশ্লিষ্ট অফিসসমূহ দুটি মন্ত্রালয়ের (আইন ও ভূমি মন্ত্রণালয়) অধিনে থেকে কাজ করছে। যে কারণে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কাজের সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে নারী বান্ধব কৃষকনীতি প্রণয়ণে বেশ কিছু দাবি উত্থাপন করা হয়। সেগুলো হলোঃ
১. সক্ষম কন্যাসন্তানসহ বিধবা নারীদের খাসজমিতে অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং এ লক্ষ্যে নীতিমালা পরিবর্তন করা জরুরী।


২. পাঠ্য পুস্তকে ভূমি সংশ্লিষ্ট বিষয়কে অন্তর্ভূক্ত করার মাধ্যমে সকলের জ্ঞান বৃদ্ধিতে সহায়তা করার ব্যবস্থা করা


৩. উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তন করে ভূমিতে নারী পুরুষের সমান অধিকার দেবার ব্যবস্থাসহ খাসজমিতে নারী প্রধান পরিবারকে প্রাধান্য দিয়ে পূর্বের আইন ফিরিয়ে আনা।


৪.  জাতীয়,জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের খাস জমি বিতরণ কমিটিতে নারী প্রতিনিধি রাখার বিধান করা।


৫.  ভূমিতে নারী পুরুষের সমান অধিকার দেবার ব্যবস্থাসহ খাস জমিতে নারী প্রধান পরিবারকে প্রাধান্য দিয়ে পূর্বের আইন ফিরিয়ে আনা।


৬.  পিতামাতার সম্পত্তিতে ছেলে ও মেয়ের একই রকম অংশগ্রহণ থাকবে।


৭.  সেচযোগ্য কৃষি জমির অধিগ্রহণ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। অকৃষিখাতে উন্নয়নমূলক কাজে ভূমির প্রয়োজন হলে এবং তার জন্য অকৃষি খাসজমি পাওয়া গেলে খাস জমি ব্যবহারকে প্রাধান্য দিতে হবে। প্রয়োজনে নতুন নীতিমালা তৈরি করতে হবে।


৮. খাসজমি বন্টনের জন্য শুধু ভূমিহীন নয়, শিক্ষিত বেকার, রিক্সা-ভ্যানচালক, ভূমিহীন স্বেচ্ছাসেবকদেরও অগ্রাধিকার দেয়া উচিৎ এই শর্তে যে সে কৃষিকাজ করবে।


৯. প্রকৃত নারী এবং পুরুষ কৃষকদের কার্ড দিয়ে আলাদা করা এবং ভূমিতে তাদের অধিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা।


১০. খাসজমি প্রাপ্তিতে হাত উত্তোলন করে সমর্থন দেওয়ার ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে অথবা যারা হাত তুলে সমর্থন দেন তাদের নৈতিকতার বিষয়টি পরিষ্কার হতে হবে।


১১. তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য ভূমি অফিসগুলোতে প্রয়োজনীয় তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে।


১২. বাজার ও বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটিতে নারী কৃষকদের অর্ন্তভূক্ত করার বিধান করা।


১৩. চাষযোগ্য জমিতে ঘরবাড়ি ও শিল্প-কলকারখানা নির্মাণ বন্ধ করা।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি এমএম আমজাদ হোসাইন, হালিমা খাতুন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, বাংলাদেশ বেতারের নগর সংবাদদাতা কাজী মকবুল হোসেন। সভাপতিত্ব করেন আভাস’র নির্বাহী পরিচালক রহিমা সুলতানা কাজল।