ছবি সংগৃহীত

কে ছিলেন নবি ইরমিয়া এবং কোথায় এসেছিলেন তিনি?

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর
লেখক
প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০১৫, ০৩:১৬
আপডেট: ১০ আগস্ট ২০১৫, ০৩:১৬

মুসা [আ.] গত হয়েছেন প্রায় ছয়শো বছর হয়ে গেছে। ফিলিস্তিন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বনি ইসরাইল সম্প্রদায় তাদের একেশ্বরবাদের প্রভু আল্লাহকে ভুলে বিভিন্ন দেব-দেবী ও নানা উপাত্তের পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে তাদের মাঝে বেশ কয়েকজন নবি এসেছেন, তারা ইসরাইল সম্প্রদায়কে হেদায়েতের জন্য উপদেশ প্রদান করেন।কিন্তু অবাধ্য বনি ইসরাইলিরা তাদের কাছে প্রেরিত অধিকাংশ নবিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। নবি ইরমিয়া [আ.] জেরুসালেমের নিকটস্থ বিনইয়ামিন এলাকার অনাথোৎ গ্রামে বাস করতেন। তিনি ছিলেন ঈমামদের একজন। তার পিতার নাম ছিল হিস্কিয় বা হিলকিয়া। তিনি একজন ইহুদি ধর্মবেত্তা ছিলেন। নবি ইরমিয়া [আ.]-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির সময় অ্যাসিরীয়, মিসর ও ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই চলছিলো। ইহুদারাজ যোশিয় ইবনে অমোনের তের বছরের রাজত্বের সময় তিনি নবুওয়াত প্রাপ্ত হন। অন্যান্য নবিদের মতো নবি ইরমিয়াও বনি ইসরাইলকে খোদার পথে আনতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ইসরাইলিরা তার আহবানে সাড়া দেয়নি, তাকে মান্য করেনি। বরং তারা তার ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বলেছে, অমঙ্গল তার প্রতিই ঘটবে। কেননা সে ভণ্ড, তার বাণী মিথ্যা। আর তারা নবিকে মান্য করবে কি, তারা তো স্বয়ং তার খোদারই অস্বীকারকারী। নবি ইরমিয়া [আ.] জেরুসালেম রাজ্যের পতনাবধি কাজ চালিয়ে যান। তার জনপ্রিয়তা খুব বেশি না থাকলেও তিনি একজন শক্তিশালী সুফি ছিলেন। পথভ্রষ্ট ইসরাইলিদের সরল পথে ফিরিয়ে আনতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা সরল পথে থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। এ কারণেই খোদা তাদের উপর তলোয়ার, দুর্ভিক্ষ, মহামারী আর অপমান ও লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেন। অত্যন্ত দুঃখের সাথে পরিশেষে নবি ইরমিয়া [আ.] ঘোষণা করেছিলেন- বাদশাহ ইহুদা যেন মিসরের কোন সন্ধির উপর নির্ভর না করে, অবশ্যই ইহুদিদের নির্বাসন ঘটবে এবং ব্যাবিলীয়রা তাদেরকে সত্তুর বছর বন্দী করে রাখবে। কেননা আল্লাহ তায়ালা বনি ইসরাইলিদের অবাধ্যতার কারণে তাদের শাস্তি দিতে চাইলেন। আল্লাহর শাস্তি যেন তার সম্প্রদায়ের ওপর পতিত না হয়, এ কারণে তিনি তার সম্প্রদায়কে সুপথে আনয়নের যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা তো তার কথা শুনেইনি বরং তাকে লোকসমুক্ষে অপমান ও অপদস্থ করতে থাকে। এমনকি তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও অত্যাচারিত হতে হয়েছিলো। তারা নবির হেদায়েতের বাণী শুনতে আগ্রহী নয় বলে তাকে একটি কূয়ার মধ্যে উল্টো করে বেঁধে রাখে। যাতে সে ক্ষুৎ-পিপাসায় ধুঁকতে ধুঁকতে মারা যায়। এ ঘটনায় অপমানিত হয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, লজ্জার জীবন কাটাবার জন্যে আমি কষ্ট ও খেদ দেখতে কেন মায়ের গর্ভ হতে ভূমিষ্ঠ হলাম? ইতিহাস বলছে, নবি ইরমিয়া বন্দী অবস্থায় ৫৮৭ খৃস্টাব্দে ব্যাবীলনের প্রতাপশালী সম্রাট নেবুচাদনেজার জেরুসালেম আক্রমণ করেন এবং তিনি জেরুসালেমের ৭০ হাজার ইহুদি অধিবাসীকে হত্যা করেন। নারী ও শিশুদের বন্দী করে দাস হিসেবে নিয়ে যান। জেরুসালেমে অবস্থিত বনি ইসরাইল ইহুদিদের সমস্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দেন। ধ্বংস করেন নবি সোলায়মান [আ.] নির্মিত উপসনালয়ও। সম্রাট নেবুচাদনেজার নবি ইরমিয়াকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করেন এবং তাকে সসম্মানে মুক্তি দেন। সম্রাট নেবুচাদনেজার জেরুসালেম অধিকার করে আবার নিজদেশে ফিরে যান। নবি ইরমিয়া এরপর জেরুসালেম সংলগ্ন এলাত অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন এবং মৃত্যু অবধি এখানেই আল্লাহর আরাধনায় মগ্ন থাকেন। তাফসিরে ইবনে কাসিরসহ অন্যান্য তাফসিরকারগণ নবি ইরমিয়া [আ.]-কে নিয়ে আলোচনা করেছেন। নবি ইরমিয়ার নাম কুরআনে উল্লেখ না থাকলেও মুফাসসিরগণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন, সুরা বনি ইসরাইলের ৪-৭ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা যে পুণ্যব্যক্তির কথা বর্ণনা করেছেন, তিনিই নবি ইরমিয়া [আ.]। উল্লেখ্য, ইহুদি ও খৃস্টানরাও নবি ইরমিয়াকে মান্য করে। তবে তারা তাকে জেরমিয়াহ বলে সম্মোধন করে থাকে। সূত্র : তাফসিরে ইবনে কাসির, উইকিপিডিয়া, বুক অব জেরমিয়াহ হাফেজ মাওলানা সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর [হাফেজ মাওলানা সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর অনুসন্ধানী তরুণ লেখক। ধর্মদর্শন, ইতিহাস, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় মিথ, ইতিহাসের আড়ালের ইতিহাস নিয়ে কাজ করে থাকেন। ইতোমধ্যেই ইতিহাসভিত্তিক তার লেখা বেশকিছু বই প্রকাশ হয়েছে। প্রকাশের অপেক্ষায় আছে আরও কিছু গ্রন্থ। ইতিহাসের জানালা তার রচিত একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী বই। সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর ২০০৮ সালে জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া থেকে দাওরা হাদিস সম্পন্ন করেন। ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স সম্পন্ন করেছেন দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কর্মজীবনে সহযোগী সম্পাদক ছিলেন সাপ্তাহিক লিখনীতে। বর্তমানে তিনি ফ্রিল্যান্সিং লেখালেখিতেই নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন।]