ছবি সংগৃহীত
সুন্নাতের পরিচয়
আপডেট: ২৯ ডিসেম্বর ২০১৫, ০৩:২০
অভিধানে সুন্নতের অর্থ করা হয়ে থাকে, উম্মতের প্রতি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশিত কাজ, কর্মপদ্ধতি ও আচরণবিধি। তবে আক্ষরিক অর্থে সুন্নতের আরেকটি অর্থ হলো, আল্লাহর বিধান। সে মতে, সুন্নত কয়েক ধরনের। একটি আল্লাহর সুন্নত অপরটি রাসুলের সুন্নত, এ দুই সুন্নত ছাড়াও আরও একটি সুন্নত আছে, সাহাবিদের সুন্নত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা আমার সুন্নত ও খোলাফায়ে কেরামের সুন্নতকে মজবুতভাবে আকড়ে ধরো এবং তার ওপর অটল থাক।' (তাহাবি : ৯৯৮)। ওই হাদিসের অর্থ এই নয়, তোমরা আল্লাহর সুন্নত (বিধান) বাদ দিয়ে শুধু আমার ও খোলাফায়ে কেরামের সুন্নত আকড়ে ধরবে। কারণ আমি নিজেও আল্লাহর সুন্নতের ওপর অটল, অবিচল। আয়েশা (রা.) এর প্রসিদ্ধ একটি হাদিস আছে। সাদামাটা ভাষায় হাদিসটি এরূপ। একবার সাহাবিরা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর অন্যতম স্ত্রী বিবি আয়েশা (রা.) কে জিজ্ঞেস করলেন এরকম- 'আপনি রাসুলুল্লাহর জীবনপদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন।' বিবি আয়েশা (রা.) অতি সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন। উত্তরটি ছিল, আপনারা কি কোরআন পড়েন না; আপনারা কি কোরআনের বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবহিত নন? তাঁর জীবনপদ্ধতি কোরআনেরই ছবি।' (মুসনাদে আহমদ)। সর্বসম্মতভাবে কোরআন হলো আল্লাহর প্রত্যক্ষ বিধান। আর সেই কোরআনের প্রতিচ্ছবি হলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। শুধু তিনিই নন; তাঁর আগে যত নবী-রাসুল পৃথিবীতে এসেছিলেন, প্রত্যেকেই ছিলেন কোরআনের প্রতিচ্ছবি, কোরআনের একনিষ্ঠ অনুরক্ত। পবিত্র কোরআনে এসেছে, 'আল্লাহ নবীর জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তা পালনে কোনো দোষ নেই। আগে যেসব নবী-রাসুল অতীত হয়ে গেছেন তাদের ক্ষেত্রেও এটাই ছিল আল্লাহর সুন্নত (বিধান)। আর আল্লাহর বিধান সুনির্ধারিত। (সূরা আহজাব : ৩৮)। আল্লাহর সুন্নত : আল্লাহর সুন্নতের অর্থ হলো, আল্লাহর নিয়মকানুন, রীতিনীতি বা অমোঘ বিধান। যেমন- তিনি নিয়ম করে দিয়েছেন, আগুনে হাত দিলে পুড়ে যাবে, পানিতে হাত দিলে ভিজে যাবে। পৃথিবীর যে দিকেই তাকাই, দেখা যাবে সব কিছুই কোনো না কোনো নিয়মের অধীন। যুবক শিশু হতে পারে না, বৃদ্ধও হতে পারে না যুবক। দিবা-রাত্রি, চাঁদ-সুরুজসহ ধরণীর সৃষ্ট সব কিছু একই নিয়মে চলে, সেই নিয়ম আল্লাহর। আদি থেকে চলছে নিরবধি। সব কিছুই যেন নিজ নিজ কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান। মহান আল্লাহ বলেন, (ভাবার্থ) 'আমি আদিকাল থেকে পৃথিবীর সবকিছুই একটা নিয়মের মাধ্যমে করি। এর বিপরীত কখনও হবে না।' (সূরা বনি ইসরাঈল : ৭৭)। সেই নিয়মগুলো হচ্ছে আল্লাহর সুন্নত; রাসুলের সুন্নত নয়। তবে রাসুল (সা.) এসব নিয়মের পুরোপুরি অনুবর্তী ছিলেন। রাসুলের সুন্নত আল্লাহর সুন্নতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়; উভয়ের মধ্যে রয়েছে গভীর সম্পর্ক। রাসুলের সুন্নত : রাসুলের সুন্নত বলতে যা বুঝি, হাদিসোক্ত কর্মপদ্ধতি ও জীবনাচার। এখানে সামান্য বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে। হাদিসোক্ত কর্মপদ্ধতি ও জীবনাচার উম্মতের প্রতি নির্দেশিত (আদেশ-নিষেধ) হয়ে থাকলে তবেই সেটা সুন্নত বলে বিবেচিত। রাসুলের সুন্নত আবার দুই ধরনের। এক ধরনের সুন্নত হলো তরিকা বা নিয়ম। এই অর্থে নামাজ, রোজা, হজও সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত, যদিও ইসলামের প্রত্যক্ষ বিধানমতে এসব ফরজে আইন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজ পড়তেন। এটি তাঁর নিয়ম ছিল। তাই নিয়ম অর্থে নামাজ, রোজা, হজ সুন্নত। মোটকথা, ইসলামের সব আমলই হোক তা ফরজ কিংবা নফল, আল্লাহর রাসুল পালন করেছেন তাই এগুলো তাঁর তরিকা বা আমলগত সুন্নত, যা ফরজ বা ওয়াজিবের পর্যায়ে পড়ে। আরেক ধরনের সুন্নত হলো, ফরজ নামাজের আগে-পিছে দুই-চার রাকাত সুন্নত। এই সুন্নত হলো আমলের একটি বিশেষ পর্যায় বা পজিশন। আমলের বিভিন্ন স্তর বা পর্যায় আছে। একটি স্তরের নাম সুন্নত। এ অর্থে দাড়ি রাখা সুন্নত নয়। আমলের যেই পর্যায়ের নাম সুন্নত, দাড়ি রাখা সেই পর্যায়ে পড়ে না। এটি যেই পর্যায়ে পড়ে সেটি ফরজ অর্থাৎ আমলগত সুন্নত। অনেকে বলে, দাড়ি রাখা সুন্নত; না রাখলে অসুবিধা কী? দাড়ি রাখা সুন্নত তো বটেই, তবে এখানে সুন্নত অর্থ সুন্নতে রাসুলের প্রথম ধরন অর্থাৎ তরিকা বা নিয়ম। তাই নিয়মানুগ অর্থে দাড়ি রাখা সুন্নত হলেও আমলের পর্যায় হিসেবে এটি ওয়াজিব। এ কারণে শরিয়ত ও ফেকাহর দৃষ্টিতে দাড়ি রাখা ওয়াজিব; সুন্নত নয়। সাহাবায়ে কেরামের সুন্নত : সাহাবিদের সুন্নত। এটি রাসুল (সা.) এর সুন্নত নয়। যেমন হাদিসে এসেছে, ওয়াজ এসেছে, আর যেসব রাসুলের যুগে ছিল না। পরবর্তীকালে সাহাবিদের যুগে ইসলামের কল্যাণের নিমিত্তে সব সাহাবির ঐকমত্যের ভিত্তিতে পালিত হয়ে থাকে, সেগুলোকে সাহাবিদের সুন্নত মানা হয়। মূলত সাহাবিরা রাসুলের কর্মপদ্ধতি ও জীবনাচারের প্রতি সুনিবিড় পর্যবেক্ষণ করেই এ ধরনের সিদ্ধান্তে বাধিত হয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ তারাবির নামাজ। কত রাকাত হবে, এ নিয়ে সংশয় দেখা দিলে সব সাহাবির ঐকমত্যের ভিত্তিতে ২০ রাকাত নামাজ চূড়ান্ত হয়। অতএব রাসুল (সা.) এর সুন্নত ভিন্ন আর সাহাবাদের সুন্নত ভিন্ন। এমন নয়, রাসুল (সা.) এর সুন্নত আর সাহাবার সুন্নত একই জিনিস। দুইটি ভিন্ন ভিন্ন সুন্নত। আর দুইটিই মানা জরুরি। কারণ রাসুলের উপরোক্ত স্বঘোষিত হাদিসই একথার প্রমাণ করে যে, 'তোমরা আমার সুন্নত ও খোলাফায়ে কেরামের সুন্নতকে মজবুতভাবে আকড়ে ধরো এবং তার ওপর অটল থাক।' আমরা জানতে পারলাম, কোরআন মহান আল্লাহর অমোঘ বিধান। আর সেই কোরআনের প্রতিচ্ছবিই ছিল রাসুলের জীবনাচার। এ দিক বিবেচনা করলে রাসুলের সুন্নত হলো আল্লাহর সুন্নতের বিশ্লেষক। আর রাসুল (সা.) নিজের সুন্নতসহ সাহাবিদের সুন্নতকে দাঁতের মাড়ি দিয়ে যেভাবে কোনো বস্তু কামড়ে প্রকটভাবে ধরা যায় সেভাবে আকড়ে ধরতে বলেছেন। তাই উপরোক্ত তিন ধরনের সুন্নতই মানা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। আল্লামা মাহমূদুল হাসান অনুলিখন : রিদওয়ান হাসান সৌজন্যে : দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ