বামদিকে থেকে অ্যালেন গিনসবার্গ ও যশোর রোড। ছবি: সংগৃহীত।

কেন গুরুত্বপূর্ণ ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’

সিফাত বিনতে ওয়াহিদ
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ২০:০০
আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ২০:০০

(প্রিয়.কম)শত শত চোখ আকাশটা দেখে, শত শত শত মানুষের দল/যশোর রোডের দুধারে বসত, বাঁশের ছাউনি, কাদামাটি জল/কাদামাটি মাখা মানুষের দল, গাদাগাদি হয়ে আকাশটা দেখে/আকাশে বসত মরা ঈশ্বর, নালিশ জানাবে ওরা বলো কাকে’ - মৌসুমী ভৌমিকের কণ্ঠে যশোর রোড গানটির এই কথাগুলো আমরা কম-বেশি সকলেই শুনেছি। গানটি মূলত ইংরেজি কবিতা সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড-এর বাংলা অনুবাদ। ইংরেজি কবিতাটি লিখেছিলেন অ্যালেন গিনসবার্গ।

আরউইন অ্যালেন গিনসবার্গ। সারা বিশ্বের কাছে তার পরিচয় মার্কিন কবি, লেখক ও গীতিকার হিসাবে। বাংলাদেশে গিনসবার্গের পরিচয় শুধু মার্কিন কবি হিসাবেই নয়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন পরম বন্ধু হিসাবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বাংলাদেশের পাশে থেকেছেন কলমের মাধ্যমে। লিখেছেন বিখ্যাত সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড কবিতা।

গিনসবার্গের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে যশোরে শরণার্থী শিবির দেখে সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড কবিতার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থী লক্ষ লক্ষ মানুষের অমানবিক কষ্ট ও দুর্দশার মানবেতর চিত্র এঁকে বিশ্ব বিবেককে তিনি জাগাতে চেয়েছিলেন।

কয়েকদিন ধরেই পত্র-পত্রিকায় আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে গিনসবার্গের কবিতায় উল্লেখিত বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সেই যশোর রোড। যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার জন্য ঐতিহাসিক যশোর রোডের শতবর্ষী পুরনো গাছগুলো কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারি দপ্তর। একটি-দুটি গাছ নয়, যশোর শহর থেকে বেনাপোল পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য রাস্তার দুই পাশে রয়েছে দুই হাজার ৩১২টি গাছ, যার মধ্যে দুইশটিরও অধিক গাছের বয়স প্রায় ১৭০ বছর। ঐতিহাসিক এ গাছগুলোর সঙ্গে শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদেরই নয়, বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের আবেগ বিজড়িত স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

উত্তাল ১৯৭১। জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশ থেকে স্বজন হারানো, সম্ভ্রম হারানো, স্বামী-সন্তান-গৃহ হারানো লাখ লাখ শরণার্থী এই যশোর রোড দিয়েই ছুটে গিয়েছেন কলকাতার বনগাঁয়ের দিকে। কী মানবেতর জীবন! মৃত্যু ভয়, স্বজন হারানো যন্ত্রণা এবং ক্ষুধার সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে তারা মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন শরণার্থী ক্যাম্পে। মহাপ্রলয়ের সে এক অদ্ভুত তাণ্ডবনৃত্য দেখেছে বিশ্ব।

মহান মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে ছিল অধিকাংশ শক্তিশালী রাষ্ট্র। বিশ্বের প্রবল শক্তিশালী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর মধ্যে অন্যতম। দেশটির তৎকালীন শাসকরা সে সময় বাংলাদেশের মুক্তির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে সে সময় বিশ্বের যে ক’জন খ্যাতনামা সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ যশোর রোডের এ দুর্দশা স্বচোখে দেখতে হাজির হয়েছিলেন, অ্যালেন গিনসবার্গ তাদের মধ্যে অন্যতম। ইতিহাসের কলঙ্কজনক এ অধ্যায় দেখার জন্য সুদূর আমেরিকা থেকে ছুটে এসেছিলেন এ কবি। তিনি ভারতীয় সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাংলাদেশী শরণার্থী শিবিরগুলোতে ঘুরে বেড়িয়েছেন। শুনেছেন ঘরহারা মানুষের আর্তনাদ।

সীমান্তবর্তী শহর বনগাঁতে এসে গিনসবার্গ স্তম্ভিত হয়ে যান এ কথা শুনে- শরণার্থী শিবিরগুলোয় নাকি সপ্তাহে কেবল বৃহস্পতিবার খাবার দেওয়া হয় এবং সপ্তাহে শুধু এই একবারই রেশন দেওয়া হয়। যেতে যেতে গিনসবার্গ তার সমস্ত অনুভূতির কথা টেপ রেকর্ডারে বন্দী করেন।

মূলত এ অনুভূতি নিয়েই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লেখা তার সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড ঝড় তুলেছিল বিশ্বজুড়ে। ১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর কবিতাটি নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত হয়। গিনসবার্গ তার নিজস্বতা ও খাপছাড়া ঢঙে যশোর রোড ভ্রমণের কাহিনী বয়ান করেন- কলকাতা অভিমুখে উদ্বাস্তুদের মিছিল, শরণার্থী শিবিরের নোংরা পরিবেশ, পেট-ফোলা বাচ্চাদের খাবারের জন্য লাইন ধরা ও নবজাতক শিশুদের ডায়রিয়া আক্রান্ত শীর্ণ হাত-পা।

এই মানবিক বিপর্যয়ের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা ও এশিয়াতে তার অন্যান্য ক্ষেত্রে আগ্রহের মধ্যকার তুলনা টানেন তিনি। মার্কিন বিমানসেনা ও নৌবাহিনী সেখানে ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছে না কেন? তারা ব্যস্ত উত্তর লাওসে বোমা বর্ষণ আর নাপাম বোমায় উত্তর ভিয়েতনামকে বরবাদ করায়। কবিতাটি বিশ্ববাসীর স্বরযন্ত্রের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেষ হয়, একই সঙ্গে চিন্তাশীল মার্কিনদের মস্তিষ্কে ভালোবাসার সুর ধ্বনিত হওয়ার আহ্বান জানায়। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে গিন্সবার্গ তার বন্ধু বিখ্যাত সংগীতশিল্পী বব ডিলানের সাহায্যে সেপ্টেম্বর অন যশোর কবিতাটিকে গানে রূপান্তরিত করেন। জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান, রবি শঙ্করকে নিয়ে তিনি অংশ নেন বাংলাদেশের সহায়তায় কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এ। এখানেই তিনি কবিতা থেকে রূপান্তরিত গানটি গেয়ে শরণার্থীদের সাহায্যের উদ্দেশ্যে অর্থ সংগ্রহ করেন। হ্যারিসন ও বায়েজের গানের মতো গিন্সবার্গের কবিতা বিশ্ববিবেকের মস্তিষ্কে, বিশেষত পশ্চিমা বিশ্বে সুরের মূর্ছনা তোলে। তার কবিতা বাংলাদেশের সংকটকে সারা দুনিয়ার তরুণ প্রতিবাদীদের চিৎকারের সঙ্গে একসূত্রে গেঁথে দেয়।

এছাড়াও বাংলাদেশের সমর্থনে ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর নিউইয়র্কের সেন্ট জর্জ চার্চে বাংলাদেশের জন্য মার্কিনীরা নামে একটি কবিতার আসরে তিনি সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনান। এরই মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হিসাবে ইতিহাসে নিজের বিরল স্থান রচনা করেন গিনসবার্গ।

তার সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড পরবর্তীতে বাংলায় অনূদিত হয়। বাংলায় গানটিতে কণ্ঠ দেন ভারতীয় সংগীতশিল্পী মৌসুমী ভৌমিক। তার মায়াবী কণ্ঠে যশোর রোড গানটি কেঁদেছে অজস্র বাঙালি হৃদয়।

উল্লেখ্য যশোর-বেনাপোলের মহাসড়কটি ঐতিহাসিকভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা থেকে যশোর রোড পর্যন্ত বিস্তৃত। বৃটিশ শাসন আমলে এ শহরে একটি বিমানঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছিল। সেই বিমানঘাঁটির সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে অনেকটা আধুনিকভাবে নির্মাণ করা যশোর রোড। এ রোড নির্মাণের আগে শের শাহের গ্রান্ড ট্র্যাঙ্ক নামে রোডটি পরিচিত ছিল।

এ রোডের দু পাশে রেইনট্রিগুলো লাগিয়েছিলেন তৎকালীন জমিদার কালি পোদ্দার। জমিদারের মায়ের মাথার উপর শীতল ছায়া দিতেই নাকি গাছগুলো লাগানো হয়েছিল। সে সময় জমিদারের মা যশোর রোড থেকে কলকাতার গঙ্গাঘাটে পবিত্র স্নানে যেতেন, তাই জমিদার কালী পোদ্দার এ বন্দোবস্ত করেন। যদিও কাগজে-কলমে এ রোডটি এখন বেনাপোল সড়ক নামে পরিচিত। কিন্তু ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আজও মানুষ একে যশোর রোড নামেই ডাকেন।

প্রিয় সাহিত্য/গোরা