ছবি সংগৃহীত

সৎ সঙ্গ গ্রহণ করার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম

মিরাজ রহমান
সাংবাদিক ও লেখক
প্রকাশিত: ১৮ নভেম্বর ২০১৪, ০২:০৪
আপডেট: ১৮ নভেম্বর ২০১৪, ০২:০৪

সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। খুবই পরিচিত বহুল শ্র“ত একটি বাক্য। খুব সহজ এবং ছোট বাক্য হলেও এর বেশ গুরুত্ব প্রদান করেছে ইসলাম। সৎ বন্ধু, মুমিন ও ভালো সঙ্গী নির্বাচন করার ব্যাপারে সাহাবায়ে আজমাইনদের ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করতেন নবিজি [সা.]। মানবজীবনের একটি অপরিহার্য বিষয় হলো, এক বা একাধিক ব্যক্তিকে সঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করা। কারণ মানুষ সামাজিক জীব। কোনো মানুষ একা বাস করতে পারে না; সঙ্গী-সাথি, পাড়া-প্রতিবেশী মিলেই মানুষের বসবাস। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তার দ্বীন, তার রাসুল এবং মুমিনদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার বিধান দিয়েছেন; যেমনটি তিনি নির্দেশ দিয়েছেন তার ও তার রাসুলের অপছন্দনীয় যাবতীয় কাজকর্ম থেকে বিরত থাকতে। বন্ধু বা সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নির্ধারণ করে এরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের বন্ধু কেবল আল্লাহ, তার রাসুল ও মুমিনরা, যারা নামাজ কায়েম করে এবং জাকাত প্রদান করে বিনীত হয়ে। [সুরা আল মায়েদা: ৫৫]। সৎ সঙ্গ সফলতার চাবিকাঠি বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান সে যে উত্তম ও ভালোদের সঙ্গে ওঠাবসা করে। এ জাতীয় লোকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও অন্তরঙ্গতা বাড়ায়। না জেনে কোনো ভিনদেশির সঙ্গে বন্ধুত্ব করো না। না বুঝে ও না শোনে এবং কারও কাজ না দেখে ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ হয়ো না। কারণ মানুষ তার নিকটজনের মাধ্যমেই পরিচিত হয়। সঙ্গী-সাথীদের গুণেই গুণান্বিত হয়। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন, 'ব্যক্তি তার বন্ধুর দ্বীনের মাধ্যমেই পরিচিত। তাই কাকে বন্ধু গ্রহণ করছ তা দেখা চাই।' (আবু দাউদ ও তিরমিজি)। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে কারও সঙ্গে মেশার ক্ষেত্রে একটু চিন্তাভাবনা করা চাই। যদি আপন দ্বীন ও চরিত্রের ব্যাপারে সে সন্তুষ্ট হয় তাহলে তাকে গ্রহণ করবে, অন্যথায় তাকে পরিত্যাগ করবে। কেননা, সঙ্গীর মাধ্যমে মত ও পথ পরিবর্তন হয়। আর অসৎ সঙ্গী পথভ্রষ্ট করে। কবি খুব সুন্দর বলেছেন, 'যদি চাও বন্ধু তবে যাচাই কর তাকে, খুঁজে দেখ তার কৃতকর্ম, যদি পাও মুত্তাকি ও আমিন গ্রহণ করো বন্ধু, বাড়িয়ে দাও হাতখানি।' আবু মুসা আশআরি বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন, 'সৎ ও অসৎ বন্ধুর উদাহরণ আতর বিক্রেতা ও কামারের ন্যায়। আতর বিক্রেতা হয়তো তোমাকে একটু আতর লাগিয়ে দেবে, অথবা তুমি তার কাছ থেকে আতর ক্রয় করবে, অথবা তুমি তার কাছে আতরের ঘ্রাণ পাবে। আর কামার হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে নয়তো তার কাছ থেকে খারাপ গন্ধ পাবে।' (বোখারি ও মুসলিম)। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'এবং শয়তান যার সাথী হয় সে হলো নিকৃষ্টতর সাথী।' (সূরা নিসা : ৩৮)। কবি খুব সুন্দর বলেছেন, 'কাক যদি কারও গাইড বা নির্দেশক হয় তাহলে তাকে দুর্গন্ধযুক্ত স্থানে নিয়ে যাবে।' অন্য এক কবি বলেন, 'অন্ধ যদি পথ দেখায়, পথ যে আর না ফুরায়।' আরবি প্রবাদে রয়েছে, 'ধনসম্পদ মানুষের উত্তম সঞ্চিত বস্তু নয়, বরং বিশ্বস্ত বন্ধুই উত্তম সঞ্চয়।' ইবনুস সাম্মাককে জিজ্ঞেস করা হলো, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থায়ী করা উত্তম? তিনি বললেন, 'যার দ্বীন পরিপূর্ণ, বিবেক পরিপক্ব, কাছে থেকে তোমায় বিরক্ত করবে না আর দূরে গিয়ে ভুলে যাবে না। তুমি কাছে ডাকলে আসে আর দূরে থাকলে তোমার খেয়াল রাখে। যদি তুমি শক্তি চাও তাহলে তোমাকে শক্তিশালী করে আর কোনো প্রয়োজনে সাহায্য করে।' সৎসঙ্গ অবলম্বন এবং ব্যক্তি জীবনে তার প্রভাব মানুষ সঙ্গীবিহীন একাকী জীবনযাপন করতে পারে না। সে কারণেই মানুষকে সামাজিক জীব বলা হয়। মানবপ্রকৃতি সঙ্গী তালাশ করে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা আদম আ. এর জন্য মা হাওয়া কে সৃষ্টি করেন, যাতে তিনি তার কাছে মানসিক প্রশান্তি লাভ করতে পারেন। তিনি তাকে একা রাখেননি। তিনি ইরশাদ করেন ‘তিনিই সে সত্তা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে এবং তার থেকে বানিয়েছেন তার সঙ্গিনীকে, ’ (সূরা আল আরাফ : ১৮৯)। অতএব মানবজীবনের একটি অপরিহার্য বিষয় হলো, এক বা একাধিক ব্যক্তিকে সঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করা, যে বা যারা তাকে ভুলে গেলে স্মরণ করিয়ে দিবে, অমনোযোগী হলে সতর্ক করবে এবং কোনো কিছু না জানলে শিখিয়ে দিবে। সৎ ও মুমিন ব্যক্তিদেরকেই বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা। যারা অসৎ এবং আল্লাহ ও রাসূলের শত্র“ তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করা। মানুষ যেমন বাঘ থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে ঠিক তেমনি বুদ্ধিমান লোকেরা সব সময় খারাপ ও অসৎ লোকদের থেকে দূরে অবস্থান করে। কেননা খারাপ ও অসৎ লোকদের মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। শুধু তাই নয়, অসৎ ও মন্দলোকেরা এমন এক হতভাগার দল, যাদের সাথে উঠাবসাকারীরাও হতভাগায় পরিণত হয়। ইরশাদ হয়েছে, আর সেদিন যালিম নিজের হাত দু’টো কামড়িয়ে বলবে, ‘হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে কোন পথ অবলম্বন করতাম’! ‘হায় আমার দুর্ভোগ, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম’। ‘অবশ্যই সে তো আমাকে উপদেশবাণী থেকে বিভ্রান্ত করেছিল, আমার কাছে তা আসার পর। আর শয়তান তো মানুষের জন্য চরম প্রতারক’ (সূরা ফুরকান : ২৭-২৯)। লুকমান আ. তার সন্তানকে উপদেশ দিয়ে বলেন, প্রিয় বৎস! উলামায়ে কিরামের সাথে উঠাবসা করো এবং তাদের সঙ্গ অবলম্বনকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো। কেননা আল্লাহ তাআলা হেকমতের নূর দ্বারা অন্তরসমূহকে সজীব করেন যেমন সজীব করেন আকাশের বৃষ্টি দ্বারা মৃত যমীনকে। তিনি আরো বলেন,তুমি তাদের সঙ্গদেওয়ার সময় হয়তো আল্লাহর রহমত তাদেরকে স্পর্শ করবে, আর তাদের সাথে তোমাকেও তা স্পর্শ করবে। এটা হলো তাকওয়া ও পরহেজগারিতে অগ্রণী ব্যক্তিদের সঙ্গ অবলম্বনের ফলাফল। কোনো এক আলেমের উদ্ধৃতি দিয়ে আল্লামা আইনী রহ. বলেন, যাদের কাছে বসলে তোমার দীনী উপকার হয়, ইলমী ও আমলী ফায়েদা হয়, চরিত্র সুন্দর হয়, এমন লোকদের মজলিসে বসার নির্দেশ লুকমান আ.-এর বক্তব্যে রয়েছে। অতএব কোনো মানুষ যখন এমন কোনো লোকের কাছে বসে, যার কাছে বসলে আখেরাতের কথা স্মরণ হয় তখন তার উচিত খুব বেশি পরিমাণে ও বেশী সময় এ ধরনের লোকের কাছে বসা। সর্বোপরি যিকির ও কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলাকে সঙ্গী বানিয়ে নেয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সৎসঙ্গ অবলম্বন করার এবং অসৎসঙ্গ থেকে বিরত থাকার তাওফীক দিন। আমীন। সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত সৎ ও মুমিন ব্যক্তিদেরই বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা এবং যারা অসৎ এবং আল্লাহ ও রাসুলের শত্র“ তাদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। মানুষ যেমন বাঘ বা হিংস কোনো প্রাণী থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে ঠিক তেমনি বুদ্ধিমান লোকরা সব সময় খারাপ ও অসৎ লোকদের থেকে দূরে অবস্থান করে। কেননা খারাপ ও অসৎ লোকদের মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। নবি করীম [সা.] একদিকে যেমন সৎ সঙ্গী গ্রহণ করার প্রতি উৎসাহিত করেছেন, ঠিক অন্যদিকে তেমন অসৎ সঙ্গী থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। হজরত আবু মুসা [রা.] থেকে বর্ণিত এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হলো আতর বহনকারী ও আগুনে ফুঁকদানকারী কামারের মতো। আতরওয়ালার কাছে গেলে সে হয়তো তোমাকে বিনামূল্যে কিছু আতর হাদিয়া দেবে অথবা তার কাছ থেকে তুমি আতর ক্রয় করবে অথবা তার কাছ থেকে সুঘ্রাণ পাবে। পক্ষান্তরে কামারের কাছে গেলে হয়তো তোমার কাপড় পুড়বে নতুবা তোমার নাকে দুর্গন্ধ লাগবে। [বোখারি] আল্লাহ আমাদের সবাইকে কোরান ও হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী সৎ সঙ্গী নির্বাচন করা এবং তাদের সঙ্গে সৎ জীবনযাপন করার তওফিক দান করুন। আমিন। মাওলানা মিরাজ রহমান