ছবি সংগৃহীত

সৎভাবে বেশি উপার্জন করতে ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিকল্প নেই : মো. ইকরাম

প্রিয় ডেস্ক
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবর ২০১৬, ০২:৫৮
আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০১৬, ০২:৫৮

৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই সীমানা ছাপিয়ে বহিঃবিশ্বের ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোসিং জগতে যে কয়জন বাঙালি সন্তান সুনাম অর্জন করেছেন- মো. ইকরাম তাদের অন্যতম একজন। নানামুখি ফ্রিল্যান্সিং কাজের পাশাপাশি মো. ইকরাম ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে দক্ষ জনশক্তির তৈরির জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম এবং লেখালেখির সাথে যুক্ত রয়েছেন। ভার্চুয়াল পৃথিবীতে দক্ষ জনবল তৈরি করার নেশায় কাজ করছেন প্রায় এক যুগ যাবত। Genesisblogs ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা এডমিনের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি তিনি জড়িত রয়েছেন দেশের বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য আইটি কোম্পানির কনসালটেন্ট হিসেবে। বাংলাদেশ কয়েকটি স��বনামধন্য আইটি প্রতিষ্ঠানের আজকের অবস্থানের পিছনে তার নামটি স্বগর্বে জড়িয়ে আছে।
বর্তমানে মো. ইকরাম ন্যাশনাল আইটি ইন্সটিটিউটের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফ্রিল্যান্সিং ও ফ্রিল্যান্সার এবং আউটসোর্সিং ও আউটসোর্সারের পরিচয়, এই সেক্টরের ইনকাম বৈধ-অবৈধ হওয়া না হওয়ার নানাবিধ পথ ও পদ্ধতি এবং বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের ফ্রিল্যান্সিং ইন্ডাস্ট্রির অনেক অজানা, মুখরোচক ও চেপে যাওয়া অধ্যায় উঠে এসেছে গুণী এই ব্যক্তিত্বের আলাপচারিতায়।
প্রিয়.কমের পক্ষ থেকে তার মূল্যবান সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন প্রিয় ইসলাম বিভাগের এডিটর ইনচার্জ মাওলানা মিরাজ রহমান ও কন্টেন্ট রাইটার মাওলানা মনযূরুল হক

প্রিয়.কম : প্রথমেই আমরা জানতে চাচ্ছি, ফ্রিল্যান্সিং ও ফ্রিল্যান্সার এবং আউটসোর্সিং ও আউটসোর্সার- এই চারটা শব্দ বলতে আসলে কী বোঝায় ?
মো. ইকরাম : ফ্রিল্যান্সিং বলা হয়, যে কাজটা আপনি ফ্রিলি করেন। যেমন- আপনি ফ্রিলি ফটোগ্রাফারের কাজ করছেন। তো আপনি একজন ফ্রিল্যান্সার। আর আউটসোর্সিং বলতে আমরা বুঝি, দেশের বাইরের কোনো কাজ যদি আমরা এখানে বসে সার্ভ করি, সেটাকেই আউটসোর্সিং বলে থাকি। আর যে এই কাজটা করে, তাকে বলা হয় আউট সোর্সার।

প্রিয়.কম : তাহলে এটা ইন্টারনেটভিত্তিক বা এর মতো আইটি সেক্টর কেন্দ্রিক নির্দিষ্ট কোনো কাজ না ?
মো. ইকরাম : না। এটা এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে বা যারা কাজ করেন, তাদের ক্ষেত্রে প্রচুর ব্যবহার হয়ে থাকে- এটা ঠিক। তবে এটা আইটি সেক্টরের বা শুধুমাত্র ইন্টারনেটভিত্তিক সম্পত্তি না। আইটি সেক্টর আসার আগেও ফ্রিল্যান্সিং ছিলো। ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফি, ফ্রিল্যান্স রাইটিং অনেক প্রাচীন ফ্রিল্যান্সিং। আইটি সেক্টর চলে আসার পরে ফ্রিল্যান্স শব্দটার কিছু মিস-ইউজও হচ্ছে। মানুষ এখন ভাবছে, ফ্রিল্যান্সিং মানে আইটি রিলেটিভ স্পেশাল কোনো যোগ্যতা। অথচ আপনার যে-ই স্কিল বা যোগ্যতা আছে, সেটাকে ব্যবহার করেই যদি আপনি কোনো অফিসে না গিয়ে ঘরে বসে সাপোর্ট দেন, তবে সেটাকেই বলবে ফ্রিল্যান্সিং। এটা যে-কোনো ধরনের কাজই হতে পারে। এটা খারাপ বিষয়ও হতে পারে এবং ভালো বিষয়ও হতে পারে। আর যে এই সাপোর্টটা দেবে, সে-ই ফ্রিল্যান্সার। মোটকথা ফ্রিল্যান্সিংয়ের মূল বিষয়টা হলো, ইনডিভিজুয়ালিজম। অফিসের কোনো নিয়মতান্ত্রিকতায় বাধা না থেকে ইন্ডিপেন্ডেটলি বা স্বাধীনভাবে কাজ করে।

প্রিয়.কম : বর্তমানে যে ই-কমার্সের বিজনেসটা হয়েছে, এটাকে কি আমরা ফ্রিল্যান্সিং বলতে পারি ?
মো. ইকরাম : এখানে একটা বিষয় হলো, আপনি যদি নিজে ব্যবসা করেন, তবে কিন্তু আপনি ফ্রিল্যান্সার না। কিন্তু যদি আপনি কারও অধীনে কোনো কাজ আনঅফিসিয়ালি সাপোর্ট দেন, তবে সেটা ফ্রিল্যান্সিং। ই-কমার্সটাও তো আপনার একটা বিজনেস। কেননা, ই-কমার্স হলো, ধরুন আপনার একটা দোকান। আগে যেখানে আপনি বাইরে একটা দোকান দিয়ে ব্যবসা করতেন, এখন সেখানে আপনি অনলাইনে দোকান দিয়ে ব্যবসা করছেন। এটা ফ্রিল্যান্সিং না, এটাকে আউটসোর্সিং বলতে পারেন।

প্রিয়.কম : তাহলে ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং এক নয় ?
মো. ইকরাম : কিছু ক্ষেত্রে এক, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক নয়। ফ্রিল্যান্সিং হলো আপনি ইনডিভিজুয়াল বিজনেসম্যান না। বরং আপনি কারও কোম্পানী থেকে বেতন নিচ্ছেন, তার কোম্পানির কাজ বাইরে থেকে সাপোর্ট দিয়ে। আর আউসোর্সিং-এর ক্ষেত্রে আপনি ইনডিভিজুয়াল বিজনেসম্যানও হতে পারেন। বা আরেকজনের কোনো প্রডাক্ট সেল করছেন, সেটাও আউটসোর্সিং হতে পারে। আবার বাইরের দেশ থেকে কোনো কাজের সাপোর্ট দিয়ে আপনি বেতন নিচ্ছেন, সেটাও আউটসোর্সিং হতে পারে। অর্থাৎ কোথাও কোথাও ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং মিলে যাচ্ছে, আবার কোথায় মিলছে না।

প্রিয়.কম : বাংলাদেশে কী কী কাজ ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিয়ের মাধ্যমে হচ্ছে ? এবং আরও কী কী কাজ করা সম্ভব ?
মো. ইকরাম : আমরা খুব কমনলি দেখি যে, গ্রাফিক ডিজাইন ও ওয়েব ডিজাইনসহ আইট সেক্টরের বিভিন্ন কাজ ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে হচ্ছে। কমনলি দেখার কারণে ভেবে নিই যে, ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং এইটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আসলে এইটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হলিউডের বিভিন্ন কার্টুনের আউটপুট বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছে। অ্যানিশেনগুলো বিভিন্ন দেশ থেকে নেয়া হচ্ছে। এমনকি হলিউডের অনেক সিনেমার ভিডিও এডিটিংয়ের কাজ বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছে। ফোর্ট কোম্পানির ডিজাইন বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছে, এখানকার ফ্রিল্যান্সাররা করছে। ক্লিপিং পণ্যের কাজ তো হচ্ছে অহরহ। আরেকটু হাই লেভেলের কথা যদি বলি, অনেক কোম্পানির পুরো বিজনেস কনসালেটেন্সিটাই বাংলাদেশ থেকে করা হচ্ছে। এমনকি কোম্পানি ডেভেলপের পুরো প্ল্যানিংটাই বাংলাদেশ থেকে করা হচ্ছে। মাকেংটিং সেক্টরেও অনেক ডাইভারসিটি তৈরি হয়েছে। কেউ ই-মেইলের মাধ্যমে মার্কেটিং করছে, কেউ করছে ভিডিও মার্কেটিং, সোস্যাল মিডিয়া মার্কেটিং ইত্যাদি। ওয়েবের ক্ষেত্রেও অনেক বড় বড় কাজ হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে এই ডাইভারসিটির দিকে আপনার খেয়াল রাখতে হবে। এই ডইভারসিটিটা যদি আপনি বুঝতে পারেন, তাহলে আপনি অনেক বড় কিছু কল্পনা করতে পারবেন। আর যদি, সেটা আপনি বুঝতে না পারেন, তাহলে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজগুলো শিখলেও আপনি সাকসেস হবেন না। ধরুন, আপনি গ্রাফিক্স শিখছেন, এর মানে শুধু বিজনেস কার্ডটা তৈরি করাই কিন্তু গ্রাফিক্স না। আমার জানা এমন ফ্রিল্যান্সারও আছে, যে প্রতি মাসে ২৪-২৫ শত ডলার আয় করে। সে শুধু মোবাইলের অ্যাপসের যে আইকনগুলো আছে, সেগুলোর ডিজাইন করে। শুধু বিজনেস কার্ড বা লোগো ডিজাইন করাই ফ্রিল্যান্সিংয়ের একমাত্র কাজ না। এ ছাড়া আরও বিশাল একটা জায়গা আছে, আর্টিকেল রাইটিং। এই মার্কেট প্লেসের একনম্বর জায়গায় আছে আর্টিকেল রাইটিং। আপনি বাংলা লিখতে পারেন, তো শুধু আপনি বাংলাটাই লিখেন। তারপর একজন ইংলিশ ট্রান্সলেটর রাখেন। শুধুমাত্র ইংরেজি জ্ঞান থাকলেই যে সে আর্টিকেল লিখতে পারবে, তা কিন্তু না। এ ছাড়া নতুন করে ভিডিওর একটা ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। নিজেরা ভিডিও বানিয়ে সেটা সেল করা হয়। এর ডিমান্ডও বেশ। ডিজাইনের ক্ষেত্রে আরও রয়েছে টি-শার্টের ডিজাইন। এটাও আন্তর্জাতিকভাবে বেশ ডিমান্ডেবল।

প্রিয়.কম : আপনি ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিংয়ের যতগুলো সেক্টরেরই কথা বললেন, বেশিরভাগই দেখা যাচ্ছে আইটি বা ডিজাইন সম্পর্কীয়। এর বাইরে কোনো ক্ষেত্র আছে কি না?
মো. ইকরাম : আইটির বাইরেও রয়েছে। যেমন ধরেন, অ্যাকাউন্টিংও এখন ফ্রিল্যান্সিং হচ্ছে। এ ছাড়া সুইডেনের বিশাল একটা ব্রিজ তৈরি হয়েছে, সেই ব্রিজের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের কাজ বাংলাদেশের একজন ইঞ্জিনিয়ার করেছেন। তিনি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান ওডেস্কের মাধ্যমে কাজটি পেয়েছেন। ভদ্রলোক ব্যক্তিগতভাবে আমার পরিচিত। একজন ডাক্তার, সে-ও ফ্রিল্যান্সার হতে পারে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনসালটেশনে সে জড়িত হতে পারে এখানে থেকেই। আমাদের যারা ফ্র্যিলান্সিং করছেন, তারা বেশিরভাগ খুব ছোটো জায়গা থেকে করছেন বলে বড় লেভেলটাকে আমরা সামনে দেখি না। আসলে আমরা এই সেক্টরের ক্ষেত্রে বুঝতে ভুল করি। আমরা মনে করি, কেবল গ্রাফিক ডিজাইন, আইটি এইসবই হলো ফ্রিল্যান্সিং। যারা আমাদের কাজ দেয়, তারা কিন্তু এটা মনে করে না। তারা বরং আরও হাই লেভেলের কাজ চায়। এক কথায় ট্র্যাডিশনাল বিজনেসে যা-ই চলে সবগুলোকেই ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে করা সম্ভব।

প্রিয়.কম : একটা কোম্পানির ব্যাবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তো নিজস্ব কর্মীদের দ্বারাই কাজ করাতে পারেন। আউসোর্সারদের কাছে কেনো দেন ?
মো. ইকরাম : এর কারণ সম্পর্কে বলতে গেলে আমি আমার অতীতের একটা কথায় যাই। ফ্রিল্যান্সিংয়ের শুরুর দিকে একবার অস্ট্রেলিয়ার একটা কোম্পানির ওয়েবের কাজ করে দিয়েছিলাম আমি। যদ্দুর মনে পড়ে, তখন আমাকে ১৫০০ ডলার দেয়া হয়েছিলো। আমি যদি বাংলাদেশি কোনো ক্লায়েন্টের এই কাজটি করে দিতাম, তাহলে আমাকে ২০ হাজার টাকার বেশি দেয়া হতো না নিশ্চিত। অথচ সে-সময় ১৫শ ডলার মানে ৯০ হাজার টাকা। আমি তো খুব এক্সাইটেড ছিলাম। পরবর্তীতে ক্লায়েন্ট আমার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে প্রতিমাসে এক জবের স্যালারি ধরে কাজ দিয়েছিলো। তো তাদের সাথে কাজ করতে গিয়ে একটা পারপাস আমি জানতে পারলাম, যেই কাজটা আমি ১৫শ ডলারে করেছি, সেই কাজের জন্যে তাদের বাজেটই ছিলো ৩ হাজার ডলার। কিন্তু আমি তাদের কাছে চাইছিই ১৫শ ডলার। তারা আমার ডিমান্ডের কথা শুনে কনফিউশনে পড়ে গিয়েছিলো যে, কাজটা আমি করতে পারবো কি না। যে কাজটার বাজেট ছিলো ৩ হাজার ডলার, সেটা তারা ১৫শ ডলারে করাতে পেরেছে। এটা হলো আউটসোর্সারদের কাছে কাজ দেয়ার একটা প্রধান কারণ ও সুবিধা। অর্থাৎ আউটসোর্সারদের মাধ্যমে কাজ কম খরচে উঠানো সম্ভব।
এটা দিন দিন আরও বাড়বে। ইকোনোমিস্ট পত্রিকার কথা আপনারা জানেন। সেখানে একটা রিপোর্টে দেখলাম যে, ইউরোপে অর্থনৈতিক অবস্থা মন্দার দিকে যাচ্ছে। তারা তাদের অফিসের কর্মী ছাটাই করছে। অর্থাৎ সিচুয়েশন কঠিন হয়ে যাওয়ায় কর্মীদের বেতন দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ইউএসএ-তেও একই অবস্থা। এবং সামনে আরও খারাপ অবস্থার আশংকা করছে তারা। এ কারণে তারা বিকল্প হিসেবে তৃতীয় বিশ্বের ফ্রিল্যান্সার বা আউটসোর্সার দিকে ঝুঁকছে। মোটাদাগে ফ্রিল্যান্সার বা আউটসোর্সারদের মাধ্যমে কাজ করানোর কিছু সুবিধা হলো- এক. এখানে কম খরচ. দুই. প্রতিমাসে পারমেন্যান্টলি বেতন দিয়ে কর্মী রাখতে হচ্ছে না। তিন. ফ্রিল্যান্সার বা আউসোর্সারদের মাঝে কাজ নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়, তাই অনেক ভালো মানের কাজ পাওয়া যায়।

প্রিয়.কম : আপনি বলতে চাচ্ছেন যে, ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিংয়ের জন্যে ইউরোপীয়ান বা আমেরিকানরা বাংলাদেশকে বেছে নিচ্ছে, কেননা, তারা এখান থেকে কম খরচে ভালো কাজটা পাচ্ছে...
মো. ইকরাম : শুধু কম খরচ না। বাংলাদেশের মানুষের স্কিলও অনেক ভালো এবং তুলনামূলক কাজের মানও ভালো। এটা তাদেরই বক্তব্য, আমাদের না।

প্রিয়.কম : যতভাবে ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিংয়ের কাজ হচ্ছে, এর কোনো প্রক্রিয়া বা পদ্ধতিতে কি ধোঁকাবাজি, ঠগবাজি বা অবৈধ কোনো পন্থা আছে কি না ?
মো. ইকরাম : আছে। এ রকম অনেক কাজের অফার আমরা পাই, যদিও সেগুলো আমরা করি না। যেমন- আপনার মার্কেটিং সাইটে প্রচুর ভিজিটর এনে দিতে হবে, বা আপনার ফেসবুক পেজে প্রচুর লাইক এনে দিতে হবে। একটা কোম্পানি লাইক কেনো চায়? তাদের বিজনেস বেনিফিটের জন্যে লাইক চায়। তাদের অরিজিনালি লাইক দরকার। আপনি করলেন কি, তাদের লাইক দেখাচ্ছেন ঠিক, কিন্তু সেটা নিজের ফেইক অ্যাকাউন্ট দিয়ে সেই লাইক দেখাচ্ছেন। অবশ্যই এটা তাকে ঠকাচ্ছেন। সুতরাং এর বিনিময় টাকা নেয়া অবশ্যই হারাম হবে। এখানে এক ধরনের মোনাফেকি হচ্ছে। আপনি তো ভেতরে সবই জানেন, কিন্তু সে হয়তো জানে না। সে-তো আপনার ওপর হানড্রেড পার্সেন্ট স্যাটিসফাইড।
আরেকটা হলো, বাংলাদেশে আজকাল প্রচুর তরুণরা এই সেক্টরে আসছে, যারা টাকার নেশায় পড়ে বিভিন্ন ধরনের অ্যাডাল্ট কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং করছে। যদিও তারা এটাকে অ্যাডাল্ট বলে না, তারা বলে ডেটিং। অর্থাৎ যে বেড পার্টনার খুঁজছে এবং তাকে আপনি হেল্প করছেন। এই পন্থায় আজকাল অনেকেই দ্রুত ধনী হয়ে যাচ্ছে। এসব পন্থায় ইনকাম করা আমার মনে হয় বৈধ হবে না।
এ ছাড়া আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রাইভেট ভার্সিটির মেয়েরা এখন কলগার্ল হিসেবে আন্তর্জাতিক নানা মাধ্যমে নাম দিয়ে টাকা ইনকাম করছে। যদিও তারা মনে করছে যে, এখান থেকে তাদের দেহ বিক্রি করতে হচ্ছে না। কিন্তু ফোনে তারা ঠিকই সেক্সুওয়াল কনভার্সেশনের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছে।

প্রিয়.কম : বাংলাদেশে আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিং সেক্টর ডেভেলপ হওয়ার ক্ষেত্রে আমরা আপনাকে একজন পথিকৃৎ বলতে পারি। প্রশ্ন হলো, ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিয়ের ক্ষেত্রে যে-সব ঠগবাজি বা অবৈধ কার্যক্রম চলছে, একজন মুসলমান হিসেবে সেগুলো বন্ধ করার কোনো চেষ্টা করেছেন কি না ?
মো. ইকরাম : আমাকে আপনারা আর্টিকেল রাইটার বা ব্লগার হিসেবেও চেনেন নিশ্চয়ই। সেই জায়গা থেকে বলি, আমার প্রথম লেখাটা ছিলো, ডোল্যান্সার নামে একটা প্রতিষ্ঠান ক্লিকের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের যে বিজনেস শুরু করেছিলো, তাদের বিরুদ্ধে। তাদের কাজটা আমার কাছে হানড্রেড পার্সেন্ট ধোঁকাবাজি মনে হয়েছে। আমি লিখেছিলাম যে, একটা ওয়েবসাইটের মালিক আপনাকে বলছে ভিজিটর এনে দিতে, আর আপনি আপনার ছেলেদের দিয়ে কিছু মিথ্যা অ্যাকাউন্ট করিয়ে তার মাধ্যমে তার সাইটে ঢুকছেন এবং দেখাচ্ছেন যে, এই দেখেন আপনার কত ভিজটর। এটা ১০০ ভাগ ধোঁকাবাজি। এইটার বিরুদ্ধে তখন আমি ধারাবাহিক অনেক লেখালেখি করেছি। বিভিন্ন সেমিনারেও এইসব ঠগবাজি ও ধোঁকাবাজির বিরুদ্ধে আমি কথা বলেছি, এখনও বলি। মার্কেটিং সেক্টরে আমার যারা স্টাফ আছে, তাদেরকে আমি এ বিষয়ে সতর্ক করি। অনেকের ২-৩টা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থাকে। আমার মনে হয়, এটাও এক ধরনের ধোঁকা। এ জন্যে আমার স্টুডেন্টদেরও আমি বলি, যত ধরনেরই যুক্তি দেখাও, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট একটার বেশি রাখা ঠিক হবে না; দুই নম্বরি হবে।

প্রিয়.কম : আপনি যে এই কাজগুলো করেছেন, তা কি আপনি কোনো ধর্মীয় বোধ থেকে করেছেন, নাকি এমনিই মানবিক দৃষ্টিতে মনে হয়েছে যে এগুলো করা ঠিক না, তাই এর বিরোধিতা করেছেন ?
মো. ইকরাম : ধর্মীয় বোধ তো অবশ্যই কাজ করেছে। আমি ছোটোবেলা থেকেই একটা ধর্মীয় অনুশাসনময় পরিবেশে বড়ো হয়েছি। এ কারণে পারিবারিকভাবে কিছু নৈতিকবোধ সবসময়ই আমার মধ্যে ছিলো। একটি মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে আমার মধ্যে এমন কিছু নৈতিক বোধ জন্ম নিয়েছে, যা এখনও আমার মধ্যে কাজ করে এবং অনৈতিক কাজ দেখলে সেটা বিবেকে বাধে।

প্রিয়.কম : আপনি কেনো এবং কিভাবে এই সেক্টরের সাথে জড়িত হলেন ?
মো. ইকরাম : ছোটোবেলা থেকেই আইটি সেক্টরের প্রতি আলাদা একটা ইন্টারেস্ট আমার ছিলো। তাই ১৯৯৯ সাল থেকে আইটি সেক্টরের সাথে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত হয়ে পড়েছি। তখন থেকেই মনে হয়েছে যে, এই সেক্টরে বড় কিছু করা সম্ভব। এ ছাড়া আমি জন্মগতভাবেই একটু অলস টাইপের। এ কারণেই মূলত আইটি সেক্টরকে আমি বেছে নিয়েছি, যেনো কোথাও যেতে না হয়, ঘরের মধ্যে থেকেই নির্ঝঞ্ঝাটে কাজ করতে পারি।

প্রিয়.কম : ফ্রিল্যান্সিংয়ে কাজ করা বা এসিও নিয়ে কাজ করার পেছনে আপনার বড় কোনো লক্ষ্য বা মিশন ছিলো কি না ?
মো. ইকরাম :  না, বড় কোনো মিশন ছিলো না। আসলে একটু নিরিবিলি নির্ঝঞ্ঝাটেই থাকতে চেয়েছিলাম সবসময়। কিন্তু না চাইলেও সেটি করা হচ্ছেনা। ফ্রিল্যান্সিং অনেক প্রতিষ্ঠানের সাথে এবং গর্ভমেন্টের সাথে জড়িত থাকার কারনে ঘরের বাইরে অনেক বেশি থাকতে হচ্ছে।

প্রিয়.কম : আমরা দেখেছি, ফ্রিল্যান্সিং ও আউসোর্সিং যতো কাজ আছে, সবই কিন্তু ইন্টারনেট প্রযুক্তি নির্ভর। কখনো কি ভেবে দেখেছেন, যদি ইন্টারনেট না থাকে তাহলে কী হবে?
মো. ইকরাম :  না তো, এভাবে কখনো ভাবি নাই। কারণ ইন্টারনেট ছাড়া তো এ কাজ সম্ভবই না। যদিও এই ইন্ডাস্ট্রি একেবারে শেষ হয়ে যাবে না। কিছু কাজ বাকি থাকবে। তবে আমি এইটুকু ভাবছি যে, আমাকে এভাবে কাজ করতে হবে, যেনো একটা পর্যায় গিয়ে অটোমেটিক্যালি সেই কাজটা ফল দেয়। আর বিশ্ব তো দিনদিন প্রযুক্তির দিক থেকে আরও উন্নত হচ্ছে, পিছনে চলে যাচ্ছে না। সুতরাং যেটা আবিষ্কার হচ্ছে, সেটাকেই আরও আপডেট করা হচ্ছে, শেষ হয়ে যাচ্ছে না। ইন্টারনেট এখন আছে, হতে পারে আরও উন্নত কিছু তৈরি হবে, তখন আর ইন্টারনেটের প্রয়োজনই থাকবে না। তবে ইন্টারনেট থাকবে না, এমনটা মনে হয় কখনো হবে না।

প্রিয়.কম : কাজ যিনি দেন এবং যিনি সম্পাদন করেন, তাদের মধ্যে লেনদেনজনিত কী কী পদ্ধতিতে আছে ? অর্থাৎ কাজটা কীভাবে সম্পাদিত হয় ?
মো. ইকরাম :  ইন্টারন্যাশনালি এসব ব্যাপারে সবচে’ বেশি ব্যবহৃত হয় পেপাল। পেপালকে সিলেক্ট করার কারণ হলো, যেহেতু ক্লায়েন্ট ও বিজনেসম্যান দুজনেই অপরিচত। এখন ক্লায়েন্ট হয়তো টাকাটা ব্যাংকের মাধ্যমে দিয়ে দিলো। কিন্তু কাজটা যদি আপনি তাকে ঠিকমতো না দেন, তাহলে ক���লায়েন্ট আপনাকে কিভাবে খুঁজে পাবে ? পেপাল এখানে গ্যারান্টি দেয় যে, ৪৮ দিনের মধ্যে তার টাকা তাকে ফেরত দেবে। আননন হিসেবে তাই তারা পেপালকে সবচে’ বেশি আস্থাভাজন মনে করে। তবে পাইওনিয়্যারও  বর্তমানে খুব ভালো সার্ভিস দিচ্ছে। পেপ্যালের ভালো বিকল্প হিসেবে পাইওনিয়্যারকে নিশ্চিন্ত মনেই ব্যবহার করা যায়।

প্রিয়.কম : পেপাল আসলে কী ?
মো. ইকরাম : পেপাল হলো একটা থার্ড পার্টি, যে ক্লায়েন্টের সাথে ব্যাংকের মাধ্যমে সংযোগ ঘটিয়ে দেয়। পেপাল নিজে কোনো ব্যাংক না। এটাকে আপনি লেনদেনের সংযোগ ঘটানোর একটা থার্ডপার্টি বলতে পারেন। এটাকে আপনি অনেকটা বিকাশ ধরে নিতে পারেন, যে এই লেনদেনের কারণে একটা সার্ভিস চার্জ নেয়।

প্রিয়.কম : নতুন যদি কেউ ফ্রিল্যান্সার বা আউটসোর্সার হতে চায় প্রাথমিকভাবে তার কী কী যোগ্যতা থাকতে হবে?
মো. ইকরাম : এজন্য সর্বপ্রথম তাকে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়টা কী, সেটা বুঝতে হবে। আমাদের দেশে এটাকে একটা স্পেশাল ওয়ার্ড বা টার্ম মনে করা হয়। অনেকে তার ডেজিগনেশনে লিখছে যে, সে ফ্রিল্যান্সার। এইটার অর্থ যদি আপনি বোঝেন, তখনই দেখবেন যে, আপনার যেই লোকাল যোগ্যতা আছে, সেটাকে ইন্টারন্যাশনাল মানে উন্নীত করতে হবে। দ্বিতীয় হলো, আপনি যেই ইন্ডাস্ট্রির কাজ করবেন, তাদের কালচারটা আপনাকে বুঝতে হবে। কেননা, প্রত্যেকটা দেশের কালচার ভিন্ন ভিন্ন। যেমন- গ্রাফিক ডিজাইনের কথা বলি। এখানে কালার ব্যবহারের ক্ষেত্রে লক্ষ করবেন যে, মালয়েশিয়ায় লাল রঙের ব্যবহার বেশি করা হয়। কিন্তু ইউএসও দেখবেন একেবারে সাদা কালার তাদের পছন্দ। এমনকি বিজনেস কার্ড করলেও দেখবেন, কোনো ডিজাইন নেই, সাদার মধ্যে কালো অক্ষরে লিখে দিয়েছেন- এটাই ওদের কাছে স্ট্যান্ডার। আবার আপনি যদি নেদারল্যান্ডের কাজ করেন, তবে মনে রাখতে হবে, তারা বেশি কমলা কালার পছন্দ করে। এভাবে ক্লায়েন্টের পছন্দ-অপছন্দ আপনার বুঝতে হবে। মার্কেটিং, ওয়েব ডিজাইন, এসিও সব ক্ষেত্রেই এই কালচারটা বোঝা আপনার জন্যে জরুরি।
তৃতীয় হলো, আপনাকে ফ্রিল্যান্সার গ্রুপে থাকতে হবে। বিভিন্ন দেশে এই কাজগুলো যারা করে, তাদের ফেসবুক বা সোস্যাল মিডিয়ার নানা গ্রুপ আছে, সেগুলোর খোঁজ-খবর রাখতে হবে। চতুর্থত, অবশ্যই আপনাকে আপটুডেট থাকতে হবে। প্রত্যেক মুহূর্তে কোন দেশে এ নিয়ে কী হয় না হয়, সেগুলো আপনার জানা থাকতে হবে। এ জন্যে আপনার স্টাডির মধ্যে থাকতে হবে। সুতরাং স্টাডির অভ্যাস যার না থাকবে, সে এই সেক্টরে টিকতে পারবে না। পঞ্চম আরেকটা বিষয় দরকার, সেটা হলো ইংলিশ। তবে অনেকে ইংলিশের ব্যাপারে বেশ ভয় লাগিয়ে দেয় যে, ইংলিশে একেবারে সুপার হতে হবে। এটাও একটা ভুল ধারনা। ইংলিশ আপনার ততটুকু অবশ্যই লাগবে, যতটুকুতে ক্লায়েন্টের চাহিদাটা বুঝে নেয়া যায় এবং তাকেও আপনার কথাটা বেঝানো যায়। তা ছাড়া বাইরের কান্ট্রির লোকজন জানে যে, ইংলিশ তাদের মতো আমাদের হওয়া সম্ভব না। হ্যাঁ, কিছু কিছু সেক্টরে ইংলিশে আপনার সুপার এক্সপার্ট হতে হয়। কিন্তু কিছু সেক্টর আছে, আপনি ইংলিশ মোটামুটি হাই-হ্যালো-হাউ আর ইউ টাইপের জানলেই চলে। এমনও হতে পারে যে, আপনি কাজ জানেন, কিন্তু ইংলিশ জানেন না, সুতরাং আপনি একজন ইংলিশ জানা লোক আপনার কাজের সহযোগিতার জন্যে রেখে কাজ চালিয়ে গেলেন।
ষষ্ঠ নম্বর হলো, অমুকে অমুক কাজে ফ্রিল্যান্সিং করে এত টাকা কামাই করেছে, আমারও এটা করতে হবে- এই বিষয়টা ছাড়তে হবে। বরং আপনার কোন কাজের যোগ্যতা আছে সেটা বুঝেই আপনার কাজে নামা উচিত। তাহলেই আপনি সাকসেস হতে পারবেন। সবশেষ কথা হলো, স্কিলের কোনো বিকল্প নেই। স্কিলটা সবসময়ই ডেভেলপ করে যেতে হবে।

প্রিয়.কম : অনেকেই ভাবেন, ফ্রিল্যান্সিং করে তারাই, যাদের ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার যোগ্যতা নেই, কিংবা যারা চাকরি পায় না। এই মন্তব্যের উত্তরে আপনি কী বলবেন ?
মো. ইকরাম :  না, এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফ্রিল্যান্সিংয়ের সুবিধা হলো, আপনি স্বাধীনভাবে ঘরে বসে কাজ করতে পারবেন। এর মানে এটা নয় যে, স্কিলের দিক থেকে আপনি কম হলেও চলবে। বরং আপনার আরও হাই স্কিল লাগবে, যেহেতু আপনাকে এখন আন্তর্জাতিকমানের কাজ করতে হবে। পার্থক্য হচ্ছে যে, আপনার যে যোগ্যতা আছে, তা নিয়ে এতদিন আপনি কেবল বাংলাদেশে জবের জন্যে আবেদন করতে পেরেছেন, কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং ইন্ড্রাস্ট্রিটা আপনাকে বলে দিচ্ছে যে, আপনি চাইলে ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ডে অ্যাপ্লাই করতে পারেন। বাংলাদেশে হয়তো আপনার কাজের জন্যে ১২টা কোম্পানি ছিলো, কিন্তু ইন্টারন্যাশনালি আপনি দেখবেন যে, এই কাজ নিয়ে বসে আছে ১২ হাজার কিংবা ১২ লাখ কোম্পানি।

প্রিয়.কম : একজন শিক্ষিত ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন তরুণ গতানুগতিক চাকরি বা ব্যবসা না করে কেনো ফ্রিল্যান্সিংয়ের পথে আসবে ?
মো. ইকরাম :  এখানে জব ফিল্ডটা অনেক বড়। অন্য ইন্ডাস্ট্রিতে আমি যত কোম্পানিতে অ্যাপ্লাই করতে পারবো, তার থেকে এখানে অ্যাপ্লাই করার সুযোগ অনেক বেশি। তাই কাজও অনেক বেশি। আরেকটা হলো, আমি যদি জব-সার্ভিস করে ৫০-৬০ হাজার কিংবা ১ লাখ টাকা উপার্জন করতে চাই, দেখা যাবে ওই জায়গায় পৌঁছতে আমার ১০-২০ বছরও লেগে যেতে পারে। তা-ও হয়তো অনেক সময় সম্ভব হয় না। কিন্তু যদি আপনি ফ্রিল্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে এটা ভাববেন, তখন দেখা যাবে, ৩ মাস থেকে ১ বছর পর থেকেই সে পরিমাণ আয় করা আপনার পক্ষে সম্ভব। সুতরাং আপনি যদি সৎভাবে বেশি উপার্জন করতে চান, তবে সেটা স্বল্প সময়ে একমাত্র ফ্রিল্যান্সিংয়েই সম্ভব। আরেকটা বিষয় হলো, ফ্রিল্যান্সিং করলে ফ্যামিলিকে অনেক বেশি সময় দিতে পারবেন। এ ছাড়া আমাদের দেশে যাতায়াত ব্যবস্থাটা খুবই বিরক্তিকর। রাস্তায় যে পরিমাণে জ্যাম, তাতে আপনার শরীরের অ্যানার্জি ও সময় দুইটাই নষ্ট হয়। প্রতিদিন অফিসে যাতায়াতে ৪-৫ ঘণ্টা নষ্ট হয়, যে-সময়টাতে অনেক কাজ করা সম্ভব। আরও সুবিধা হলো, ফ্রিল্যান্সিংয়ে আপনি যা ইনকাম করবেন, তাতে আপনাকে আয়কর দিতে হবে না। তা ছাড়া আপনি যখন বাংলাদেশের কোনো কোম্পানিতে টপ লেভেলে কাজ করতে যাবেন, কোথাও না কোথাও আপনাকে অনৈতিকতার আশ্রয় নিতে হয়। ফ্রিল্যান্সিংয়ে আপনি এসব ঝঞ্ঝাট থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন। এরকম আরও অনেক সুবিধা আছে।

প্রিয়.কম : কিছু নির্দিষ্ট কোম্পানির নাম যদি আমাদের বলতেন, যাদের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ করা সম্ভব ?
মো. ইকরাম : আপওয়ার্কের কথা তো মোটামুটি সবাই জানে। তবে এ ছাড়াও আছে ফাইভার, থিমফরেষ্ট, গ্রাফিক রিভার, ফ্রিল্যান্সার.কম, গুরু.কম, মাইক্রোওয়ার্কাস ইত্যাদি। এমন আরও কিছু প্রতিষ্ঠান আছে। এগুলো কাজ করতে করতেই পরিচয় হয়ে যায়।

প্রিয়.কম : ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্যে সরকারি কোনো নিবন্ধন বা লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় কি না ?
মো. ইকরাম :  না। কোনো লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না। এর কারণ হলো, ফ্রিল্যান্সিং তো আসলে কোনো প্রতিষ্ঠান না। এটা আপনার ঘরে বসে ব্যক্তিগত কাজ করার মতোই একটা কাজ। হ্যাঁ, যদি আপনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজটা করেন, তাহলে আপনাকে হয়তো সরকারীভাবে একটা অফিসের অনুমোদন নেয়া লাগতে পারে।

প্রিয়.কম : বাংলাদেশে এই পেশার সম্ভাবনা কতটুকু বলে আপনার মনে হয় ?
মো. ইকরাম : বাংলাদেশে এ কাজের সম্ভাবনা বলতে অনেক। এর কারণ হলো, প্রচুর তরুণ এখানে জবের জন্যে হণ্যে হয়ে ঘোরে, কিন্তু জব পায় না। কারণ এখানে জবের ক্ষেত্রটার তুলনায় মানুষ অনেক বেশি। এ ছাড়া এখানকার তরুণরা অন্য অনেকে দেশের তুলনায় মেধাবী হয়ে থাকে। তারা যদি একটু স্থির হয়ে মার্কেটের দিকে একটু খেয়াল রাখে এবং নিজেদের স্কিল ডেভেলপ করে, তাহলেই গেইন করতে পারবে। আমাদের দেশের মানুষের কাজও অন্য দেশের কাছে অনেক পছন্দের। সে-হিসেবে আমি মনে করি, এ কাজের সম্ভাবনা অনেক।

প্রিয়.কম : সারাবিশ্বের ফ্রিল্যান্সিংয়ের ইন্ডাস্ট্রিতে বাংলাদেশিদের অবস্থান কেমন ?
মো. ইকরাম : আমি বলবো যে, তুলনামূলক ভালো। একেবারে হাই লেভেলের না হলেও মোটামুটি ভালো অবস্থানে আছে। এই সেক্টরে প্রথম অবস্থানে আছে ইন্ডিয়া। আমাদের দেশে সমস্যা হলো, মানুষ এখনও ফ্রিল্যান্সিংটা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে নি এবং নিয়ে কিছু ভুল ধারণা আছে। আবার কিছু ছেলেরা বিভিন্ন উল্টাপাল্টা কাজ করে কাজের ক্ষেত্রই নষ্ট করছে। এ জন্যে আমরা একটু পিছিয়ে আছি। তবে এভারেজে অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশিদের অবস্থান অনেক ভালো।

প্রিয়.কম : এই সেক্টরে কাজ করতে গিয়ে আপনারা কী কী সমস্যার মুখোমুখী হচ্ছেন ?
মো. ইকরাম : সমস্যার মধ্যে প্রধান হলো, আমাদের এই কাজ তো অনেকটা ইন্টারনেট নির্ভর। দেখা যাচ্ছে, ইন্টারনেট সার্ভিস ভালো না হলে আমরা বেশ সমস্যায় পড়ে যাই। অনেক সময়ই দেখা যায় যে, জরুরি কাজের মুহূর্তে কোনো এক ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলছি, এ সময় হুট করে ইন্টারনেট কাজ করছে না। কিংবা কারেন্ট চলে গেলো। আরেকটা সমস্যা হলো, লেনদেনের বিষয়টা। আমাদের দেশে তো পেপালের কোনো শাখা নেই। তারা কী করে একটা ব্যাংকে আমাদের টাকাটা দেয়। তো অ্যামাউন্ট একটু বেশি হয়ে যায়, সে-ক্ষেত্রে ব্যাংকের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়, ইত্যাদি। আমাদের অনেক তরুণদের নিয়েও সমস্যা হয়। দেখা যায়, যে ছেলেটা কখনো ১০ হাজার টাকা একসাথে হাতে পায় নাই, সে যখন দেখে যে, এক কাজেই সে ৫ হাজার ডলার পাচ্ছে, তখন সে ভড়কে যায়। আবার অনেকের চিন্তাই থাকে যে মাসে ২০ হাজার কামাই করতে পারলেই হবে। সুতরাং সে ক্লায়েন্টের কাছে চায়ই কম। যার ফলে ক্লায়েন্ট অনেক সময় তাকে কাজই দেয় না। ক্লায়েন্ট ভাবে, এত কম চেয়েছে মানে, সে প্রফেশনালি কাজটা করতে পারবে না।

প্রিয়.কম : যেহেতু ফ্রিল্যান্সিং সেক্টরে অবাধ অর্থ উপার্জনের সুযোগ। তো সেক্ষেত্রে আপনার কী মনে হয় না যে, এটা তরুণদেরকে অনেকটা অর্থের লিপ্সা উস্কে দিচ্ছে ?
মো. ইকরাম : হ্যাঁ, সেটাও হয়। আমি চাঁদপুরের একটা ছেলের কথা জানি। সে এতবেশি কাজ করতো যে, নেশার মতো হয়ে গিয়েছিলো তার কাছে। প্রতি মাসে সে ২ হাজার ডলারের মতো উপার্জন করতো। তাতেও যেনো তার হয় না, আরও দরকার, এরকম। কিন্তু পরে দেখা গেছে, সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং প্যারালাইজড হয়ে গেছে। এগুলোর দিকেও খেয়াল রেখে চলতে হবে। কেননা, আপনার জীবন তো ৬০-৭০ বছরের জীবন। আপনাকে এমনভাবে কাজ করতে হবে, যেনো আপনি ৬০-৭০ বছর সারভাইভ করতে পারেন। এখন যদি আপনি একসাথে সব করে ফেলতে চান, তাহলে তো সমস্যা হবেই।

প্রিয়.কম : ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং পেশায় ধোঁকাবাজি বা হারাম উপার্জনের সুযোগ অবারিত। একজন মুসলিম হিসেবে আপনি কি মনে করেন যে, যদি কেউ ইসলামি জীবন বিধান পরিপালনে অভ্যস্ত থাকে বা এই জীবন বিধানের প্রতি তা শ্রদ্ধা থাকে, তবে এই শ্রদ্ধাবোধ তাকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে হারাম উপার্জনের পথে বাধা হবে কি না ?
মো. ইকরাম : আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে আসলেই ধর্মীয় নীতিবোধ থাকা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। আর এটা গড়ে উঠতে পারে একমাত্র পরিবারের মাধ্যমে। মা-বাবারই লক্ষ্য রাখতে হবে, তার ছেলে কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে সে অর্থ উপার্জন করছে। আমাদের দেশে বড় বড় ফ্যামিলিতে দেখা যায়, পারবারিক বন্ধনটা খুব মজবুত নয়। আর ধর্মের শিক্ষা তো আরও নেই। যার ফলে ছেলেরা তরুণ বয়সে নষ্ট হয়ে যায়। শুধু ফ্রিল্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে নয়, কোনো ক্ষেত্রেই তো একজন মুসলিমের হারাম উপার্জনের পথে যাওয়া উচিত নয়। তার আয় যদি হালাল না হয়, তাহলে তার কোনো ইবাদতই তো বিশুদ্ধ হবে না। এ জন্যে ধর্মীয় বিধিবিধানের প্রতি তো লক্ষ রাখতেই হবে এবং পরিবারের সদস্যদেরও লক্ষ্য রাখতে হবে অন্য সদস্যদের ওপর।

প্রিয়.কম : দীর্ঘসময় ধরে আমাদের সময় দেয়ার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ।
মো. ইকরাম : এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্যে আপনাদেরকেও ধন্যবাদ এবং প্রিয়.কম পরিবারের সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা।