ছবি সংগৃহীত

সিনেমার গানেই কলকাতার বাংলাদেশ জয়

Mitul Ahmed
লেখক
প্রকাশিত: ১৪ মার্চ ২০১৫, ১৪:৫২
আপডেট: ১৪ মার্চ ২০১৫, ১৪:৫২

(প্রিয়.কম) হালের তারুণ্যের কাছে বাংলা গান মানে বাংলা গানই। ইন্টারনেট আর যোগাযোগের সহজ এ জগতে কাঁটাতার মানছে না সংগীত অনুরাগী কেউই। তাই কলকাতার গান এখন আমাদের দেশে আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সিনেমার গানেই কলকাতা জয় করছে বাংলাদেশ। কলকাতার এ সময়ের গান নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন মিতুল আহমেদ। বাংলাদেশে যেমন সোলস,ফিডব্যাক সংগীতের জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে; কলকাতা বাংলায় এই কাজটি করে 'মহীনের ঘোড়াগুলি' নামের একটি ব্যান্ড দল। কলকাতা সংগীতের চেহারাই আমূল পাল্টে দেয় তারা। পরবর্তীতে যোগ হোন কবির সুমন,অঞ্জন দত্ত, আর নচিকেতার মতো অসম্ভব প্রতিভাবান শিল্পীরা। তাদের স্পর্শে বাংলা গান শুধু সমৃদ্ধই হয় না, বরং খুঁজে পায় নতুন দিশা। অবশ্য কলকাতা বাংলা গানের এইসব পুরোধা ব্যক্তিত্বের সমসাময়িক কিংবা অল্প পরে কিছু ব্যান্ড দলও খুব কার্যকরি ভূমিকা পালন করে। ভিন্নধর্মী গান আর চমৎকার সব বিষয়বস্তু নিয়ে বাংলা সংগীতের জগতে আবির্ভাব ঘটে চন্দ্রবিন্দু, ভূমি, দোহার, কলকাতা, কালপুরুষ ও ফসিলসের মতো গানের দলগুলোর।

তাদের গান দুই বাংলাতেই সমানভাবে গ্রহনযোগ্যতা অর্জন করে নেয়। তবে ব্যান্ড দলগুলোর থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয়তা পায় সিনেমার গানগুলো। সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতা বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় গান আর শিল্পীদের নিয়ে আলোচনার প্রয়াস রইলো এই লেখায়। বাণিজ্যিক বলুন আর আর্ট ফিল্মই বলুন, সব সিনেমাতেই গান থাকে। যারা সিনেমাতে কন্ঠ দেন, বহুপ্রচারের ফলে তারা জনমানুষের কাছে পৌঁছে যান খুব দ্রুত, তাই তাদের জনপ্রিয়তাও ক্রমাগত বর্ধনশীল। যেমন ধরুন অরিজিৎ সিংয়ের কথা। বয়সে তরুণ হওয়ার পরও প্লেব্যাক সিঙ্গার হওয়ার ফলে খুব দ্রুত উত্থান ঘটে তার। ২০০৫ সালে প্রতিভা অন্বেষণের একটি টিভি রিয়েলিটি শো’য়ের মাধ্যমে তার মিডিয়ায় আগমন। বর্তমান সময়ে শুধু বাংলা নয় পুরো ভারতীয় সংগীতের একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব তিনি। বলিউড আর টালিগঞ্জের সিনেমায় গান মানেই অরিজিৎ সিং! আশিকি-২ সিনেমায় গান গেয়ে অসংখ্য জাতীয় পুরষ্কারে ভূষিত হওয়া এই শিল্পী জনপ্রিয় প্রচুর বাংলা গানের গায়ক। তার গাওয়া বাংলা গানের মধ্যে বোঝে না সে বোঝে না,কী করে তোকে বলবো তুই যে আমার,নারে না না ইত্যাদি গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়।
তারো আগে শ্রেয়া ঘোষাল ঠিক একইভাবে টিভি রিয়ালিটি শো’ ‘সা রে গা মা পা’ মাধ্যমে ভারতীয় সংগীত জগতে প্রবেশ করেন। সঞ্জয় লীলা বানসালির চোখে ধরা পড়ে মধুর কন্ঠের গায়িকা শ্রেয়া ঘোষালের সংগীত প্রতিভা। ফলে ‘দেবদাস’ সিনেমায় প্লেব্যাক হয় তার। এরপর পর থেকে এখন অবধি প্রায় চারশো ভারতীয় সিনেমায় কন্ঠ দিয়েছেন এই সংগীত মহিয়সি। পিতৃভিটা বাংলাদেশে হলেও তার জন্ম পশ্চিমবঙ্গে। তার সুরের ঝলকে সমস্ত ভারতবর্ষ আজ মোহিত। ‘অন্তহীন’ সিনেমায় ‘যাও পাখি বলো হাওয়া ছলছল, আবছায়া জানালার কাচ/আমি কি আমাকে হারিয়েছি বাকে, রূপকথা আনাচ কানাচ’ বা অটোগ্রাফ সিনেমায় ‘চল রাস্তায় সাজে ট্রাম লাইন’ গান সবশ্রেনির শ্রোতাভক্তের কাছে বহুল জনপ্রিয়তা পায়। শুধু বাংলা ভাষাভাষি মানুষের কাছে নয়, সমস্ত ভারত বর্ষের মানুষের কাছে আরেকজন তরুণ সংগীত শিল্পী ও সংগীত পরিচালক আছেন , নাম জিৎ গাঙ্গুলী। আশিকি-২ এর মিউজিক পরিচালনার মাধ্যমে সমস্ত ভারতে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিম বাংলায় হিট সিনেমা মানেই জিৎ গাঙ্গুলীর মিউজিক ডিরেকশন! তার ক��া মিউজিক মানেই সিনেমা হিট! ‘বোঝেনা সে বোঝে না, সেতো আজো বোঝে না’,‘সুন্দরী কমলা’ গানে রয়েছে তার কন্ঠ।
দুরন্ত কিশোর, যার কাছে বিরক্তিকর ঠেকে শৈশবের ক্লাসরুম;বিজ্ঞান,গণিত আর কর্কশ ব্যাকরণ। এবং সে বসে বসে ভাবে সবাই পড়ে গাড়ি চড়বে, আর সে বসে বসে ঘাস কাটবে! এমন দুরন্তপনা কার না জীবনে এসেছে; এইরকম দুরন্ত কিশোরদের নিয়ে গেয়েছেন,লিখেছেন অনুপম রায়। ক্লাসের ভেতর হাঁসফাস করা সেই শৈশবের অনুভূতি নিয়ে গেয়েছেন,‘আছে গভীর দীর্ঘশ্বাস, আছে শিক্ষার পরিহাস/ আছে ফেল, আছে পাশ; বিরক্তি বারো মাস/ ওরা বড়ো হয়ে চড়বে গাড়ি, আর আমি কাটবো ঘাস।’বর্তমান সময়ে বাংলা সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পী অনুপম রায়, তার গাওয়া বেশিরভাগ গানের কথাও তার। তিনি পুরোদস্তুর একজন ইঞ্জিনিয়ার, পড়াশুনার পর এটিকে তিনি পেশা হিসেবেও নিয়েছিলেন; কিন্তু যার পেশন থাকে অন্যকোথাও তাকে কি কোনো ছক বাধা প্রফেসনে আটকে রাখা সম্ভব! ফলত দেখা যায়, অনুপম গান লিখেন,কবিতা লিখেন,গানের সুর করেন, নিজে গান। সৃজিত মূখার্জীর ‘অটোগ্রাফ’ সিনেমায় ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও, আমি নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি’ গানটি গেয়ে এবং ‘বেঁচে থাকার গান’ গানটি রচনা করে কলকাতা সংগীতের দুয়ারে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন। এরপর একে একে অনুপম নিজের গান দিয়ে নিজেকেই ছাড়িয়ে যেতে থাকেন। ‘বসন্ত এসে গেছে’ ‘বোবা টানেল’ –এর মতো অসম্ভব জনপ্রিয় কিছু গান গ্রহনযোগ্যতা পায়। তার গানের মূল শক্তি হচ্ছে গানের কথায়।
সস্তা কোনো গীত রচনা নয়, বরং তার এক একটা গান যেনো শুদ্ধতম কবিতা। চলো পাল্টাই সিনেমায় ‘বাড়িয়ে দাও তোমার হাত’, হেমলক সোসাইটিতে ‘এখন অনেক রাত’ বাইশে শ্রাবন সিনেমায় ‘যে ক’টা দিন’ ও ‘গভীরে যাও, আরো গভীরে যাও’ গানগুলো ছাড়াও প্রচুর জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা অনুপম। তার একাধিক একক অ্যালবামের মধ্যে ‘দূরবীণে চোখ রাখবো না’ এবং ‘বাক্যবাগীশ’ খুব জনপ্রিয়। উঠতি নারী কন্ঠশিল্পীদের মধ্যে সোমলতা একজন অসাধারণ শিল্পী; তার গায়কী শক্তিই অন্যদের থেকে তাকে আলাদা করে দেয়। বেডরুম সিনেমায় রবীন্দ্র সঙ্গীত ‘মায়াবন বিহারিনী হরিণী’ গেয়ে ভিন্ন স্বাদ দিয়েছিলেন দর্শকদের। তারপর অঞ্জন দত্তের ‘রঞ্জনা আমি আর আসব না’ সিনেমায় ‘জাগরণে যায় বিভাবরী’ এবং ‘একলা অনেক দূর’ গানদুটিতেও কন্ঠ দিয়ে নিজের সামর্থ বুঝিয়ে দিয়েছেন। সোমলতা আমাদের ময়মনসিংহে জন্ম নেয়া এক জমিদার পরিবারের মেয়ে। তার ব্যান্ডের নাম ‘সোমলতা এন্ড এসেস’।
কলকাতা বাংলা গানের বাজারে আরো যাদের কন্ঠে আপনি সুর মেলাতে পারেন, বা নতুনত্ব খুঁজে পাবেন তাদের মধ্যে রূপম ইসলাম, রপঙ্কর বাগচি,মিকা সিং,প্রিয়ম মূখার্জী,অন্বেষা দত্ত গুপ্ত,মোনালি ঠাকুরে নাম নেয়া যেতে পারে। এছাড়াও প্রচুর প্রতিভাবান শিল্পী আছেন, যাদের জনপ্রিয়তাও কোনো অংশে কম যায় না। এরমধ্যে সম্প্রতি দুই বাংলার যৌথ প্রযোজনার ‘রোমিও ভার্সেস জুলিয়েট’ সিনেমায় শাদাব হাশমির গাওয়া ‘বেখায়ালি মন’ ও একই সিনেমায় সংগীত পরিচালক আকাশের গাওয়া ‘ফেসবুকে ফটো দেখে প্রেমে পড়েছি’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সংগীতকে বলা হয় শ্রবনযোগ্য কলা! এর কোনো সীমানা নেই, প্রাচীর নেই; থাকতে পারে না। তাইতো দেখি ৭১'এর মুক্তিযুদ্ধে বাংলার মানুষের পাশে দাঁড়াতে 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' নাম দিয়ে সুদূর আমেরিকায় রবি শঙ্কর,জর্জ হ্যারিসনরা গেয়ে উঠেন। শাহবাগের আন্দোলনকে উদ্দীপনা দিতে লাখো তরুণের উদ্দেশ্যে গেয়ে উঠেন কবির সুমন কিংবা উপমহাদেশের প্রখ্যাত ব্যান্ড ‘দোহার’। তাছাড়া সাম্প্রকিত বাংলা গানের কথায় এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, কন্ঠ আর সুরেও অন্যরকম ফ্লেভার! সব মিলিয়ে কলকাতার বাংলা গান এখন বাংলা ভাষাভাষি মানুষের কাছেই তৈরি করেছে এক অন্যরকম আবেদন। ফলে দেখা যায় কাঁটাতার উপেক্ষা করে বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কলকাতা শিল্পীদের গান। ইতিমধ্যে গ্রহনযোগ্যতাও অর্জন করে নিয়েছেন বেশকিছু সংগীত শিল্পী। বাংলা গান যারা শুনেন, নিশ্চয় পরিচয় আছে তাদের সাথে! শিল্প আর শিল্পীর এই মিথস্ক্রিয়ায় পৃথিবী একাকার হয়ে যাক; জয় হোক বাংলা সংগীতের…