ছবি সংগৃহীত

রাসুলের (সা.) সত্যায়িত অনন্য সম্মানের অধিকারী দশ সাহাবি

priyo.Islam
লেখক
প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ০৮:০৪
আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ০৮:০৪

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাহাবিদের সংখ্যা কত ছিল এর সঠিক সংখ্যা নিরূপিত নয়। লাখের উপরে তো অবশ্যই হবে, দেড় লাখ পর্যন্তও হতে পারে বলে অনেকে অনুমান করেন। সব সাহাবি পবিত্র এবং বিতর্কের ঊর্ধে। চিরকালের উম্মতের মধ্যে সাহাবিদের মর্যাদা রাসুল (সা.)-এর পরেই। এর পরে তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনদের মর্যাদা। তবে রাসুল (সা.) ১০ জন সাহাবিকে বিশেষ মর্যাদায় সত্যায়িত করেছেন তাঁদের জীবদ্দশায়। বলা হয়ে থাকে, তাঁদের জান্নাতি বলে সুসংবাদ দিয়েছেন রাসুল (সা.) নিজে। বিষয়টা শুধু মৃত্যুর পরে বেহেশতের সুখবর দেওয়ার নয়, বরং বাস্তব জীবনের কর্ম ও সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকার ক্ষেত্রে গুরুত্বকেন্দ্রিক। সুখবরপ্রাপ্ত ১০ জনের (প্রথম থেকে চতুর্থ) চারজন রাসুলের ইন্তেকালের পর 'আমিরুল মোমেনিন' বা খলিফা হিসেবে শাসনকাজ পরিচালনা করেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) একাধারে আল্লাহর রাসুল এবং মদিনা রাষ্ট্র বা মুসলিম রাষ্ট্রের কর্ণধার ছিলেন। আশারায়ে মুবাশশিনের মূল গুরুত্ব এই জায়গায় যে, এই ১০ জনকে রাসূল (সা.) সুনির্দিষ্টভাবে নাম ধরে তাঁদের জীবদ্দশাতে তাঁর দ্বীন ও আদর্শের ওপর অবিচল আছেন এবং থাকবেন বলে সত্যায়িত করে গেছেন। চার আমিরুল মোমেনিন বা খোলাফায়ে রাশেদিনের ২৪ বছরে আশারায়ে মুবাশশিরিনের অপর চার সদস্য ইন্তেকাল করেন। সর্বশেষ খলিফা হজরত আলীর আমলে মুসলমানদের আত্মবিনাশী গৃহযুদ্ধ উটের যুদ্ধের সময় আশারায়ে মুবাশশিরিনের দুই সদস্য হজরত তালহা এবং হজরত যুবায়ের (রা.) যুদ্ধের ময়দান থেকে নিজেদের সরিয়ে আনেন এবং মুসলিম রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিতে নিজেদের অপারগতা প্রকাশ করেন। আর এভাবেই 'খোলাফায়ে রাশেদীন' যুগের সমাপ্তি ঘটে। এখান থেকেই এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, একাধারে ধর্ম ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেওয়ার যুগ আশারায়ে মুবাশশিরিনের তিরোধানের পর থেকেই শেষ হয়ে যায়। রাসূল (সা.) নিজেও তাঁর এ সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীতে এর পরবর্তী যুগ সালতানাৎ বা রাজার শাসনের যুগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই হলো আশারায়ে মুবাশশিরিনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। বিষয়টির তাৎপর্য পরিষ্কার করার জন্য এর রাজনৈতিক গুরুত্বের প্রশ্নটা আরেকটু পরিষ্কার করা দরকার। খোলাফায়ে রাশেদিন এবং পক্ষান্তরে আশারায়ে মুবাশশিরিনের শাসনামলের সমাপ্তি ঘটে চরম রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং তিক্ততার মধ্য দিয়ে। এরপর মুসলিম দুনিয়া চলে যায় সাবেক রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ভেতর। সেই শাসন ব্যবস্থা ছিল রাজতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক এবং কিছুটা ধর্মনিরপেক্ষ ধাঁচের। অর্থাৎ শাসকরা নিজেদের করতলগত রাষ্ট্রের অধিপতি বলে দাবি করেন, ধর্মের অধিপতি বা ধর্মগুরু নয়। ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্য কোনো নির্ধারিত বৈধ কর্তৃপক্ষের স্বীকৃতি দেয় না ইসলাম। বরং ধর্মানুশীলনের একনিষ্ঠতার উপরই উন্মুক্ত আছে ধর্মীয় নেতৃত্ব। মুসলিম দুনিয়ায় এ ব্যবস্থা চলেছে প্রায় চৌদ্দ শ বছর ধরে। আধুনিককালে মানবসমাজে আধুনিক রাষ্ট্র গঠন ও গণতন্ত্রের সূচনা ঘটেছে। মুসলিম সমাজ এই আধুনিক ধারার সঙ্গে ধীরে ধীরে হলেও তাল মিলাচ্ছে। তবে আধুনিক গণতান্ত্রিক ধারার পাশাপাশি মুসলিম দুনিয়ায় ইসলামী শাসন বা ইসলামী দল গঠনের হিড়িকও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এ অবস্থায় রাসুল (সা.)-এর রাষ্ট্রনায়কত্ব এবং তাঁর সত্যায়িত সাহায়াবে কেরাম তথা আশারায়ে মুবাশশিরিনের রাষ্ট্রনায়কদের বৈধতার মূল সূত্রটা গভীরভাবে উপলব্ধি করা খুবই জরুরি। আল্লাহর রাসুল প্রশ্নাতীতভাবে আল্লাহ প্রদত্ত ধর্ম ও রাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক ছিলেন। তাঁর ইন্তেকালের আগে মাত্র ১০ জনকেই তিনি সত্যায়িত করে গেছেন এ ধরনের কাজ করার যোগ্যতাসম্পন্ন বলে। সাহাবিগণ সবাই পবিত্র এবং বিতর্কের ঊধর্ে্ব। কিন্তু রাসুল (সা.) একাধারে ধর্ম ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সত্যায়িত করে গেছেন মাত্র ১০ জনকে। এর বাইরে একাধারে ধর্ম ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেওয়ার অধিকার কোনো সাহাবিকেও দেওয়া হয়নি। তাবেঈন বা তাবে-তাবেঈনের মধ্যেও নয়। পরবর্তী উম্মতের মধ্যে তো নয়-ই। আশারায়ে মুবাশশিরিন আসলে আল্লাহর রাসুল কর্তৃক চারিত্রিক সত্যায়নপত্র পাওয়া পবিত্রদের মধ্যেও পবিত্রতম সাহাবি। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) আল্লাহতায়ালার মহান দ্বীনকে প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের চিন্তা-ভাবনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, জীবন ও সম্পদ এককথায় সর্বস্বকে কোরবানি করে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের যে চরম পরাকাষ্ঠা স্থাপন করে গেছেন, তা সব যুগের মানুষের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে অনাগত কেয়ামত পর্যন্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, 'আমার সঙ্গীগণ নক্ষত্রসদৃশ, তোমরা তাঁদের যে কাউকে অনুসরণ করবে হেদায়েত পেয়ে যাবে।' মহান আল্লাহর প্রতি সাহাবায়ে কেরামের দৃঢ়বিশ্বাস ও নির্ভরতা, তাঁর শাস্তির ভয় ও পুরস্কারের আশা, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি তাঁদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আনুগত্য, তাঁকে রক্ষায় ও তাঁর মিশন বাস্তবায়নে তাঁদের সার্বিক সহযোগিতা ও ত্যাগ, আল্লাহর দ্বীনের প্রতি তাঁদের দ্বিধাহীন আনুগত্যই ইসলামকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল। সাহাবায়ে কেরাম হলেন আল্লাহর রাসুল ও উম্মতের মধ্যে প্রথম ও প্রধান যোগসূত্র। তাঁদের জীবন ও মরণ দুটিই ছিল ইসলামের জন্য। রাসুলে করিম (সা.)-এর সাহচর্য তাঁদের আত্দাকে এমনভাবে উৎকর্ষিত করেছিল যে তাঁদের চিন্তা-চেতনা সব সময় আবর্তিত হতো সত্য, সুন্দর সৃষ্টি তথা শান্তির ধর্ম ইসলামকে কেন্দ্র করে। কোনো মলিনতাই তাঁদের আদর্শিক শ্রেষ্ঠত্বকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। তাই তো সারা মুসলিম উম্মাহর মাঝে তাঁদের জন্য এক মহান মর্যাদার আসন তৈরি হয়েছে। পরবর্তী উম্মতগণ মহান আল্লাহর পরিচয় ও তাঁর পবিত্র কালাম, রাসুলের পরিচয় ও তাঁর আদর্শ_এককথায় আল্লাহর দ্বীনের সব কিছু লাভ করেছে সাহাবিগণের মাধ্যমে। অতএব এ প্রথম ও প্রধান সূত্র উপেক্ষিত হবে, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস হারিয়ে ফেললে দ্বীনের মূল ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে, কোরআন ও হাদিসের প্রতি অবিশ্বাস দানা বেঁধে উঠবে। আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ.)-এর পরে সর্বকালীন উম্মতের মধ্যে রাসুলে করিম (সা.)-এর সাহাবিগণের মর্যাদার শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি দ্বিধাহীন হতে হবে প্রত্যেক মুসলিম হৃদয়ে। রাসুলে করিম (সা.)-এর সাহাবিদের সংখ্যা কত ছিল তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয় এ কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। যাঁরা ইমানসহকারে আল্লাহর রাসুলের সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং মুসলমান অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন, তাঁরাই সাহাবি। এমন সাহাবিদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা খুবই দুরূহ ব্যাপার। কারণ মক্কা বিজয়ের পর মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, দশম হিজরিতে মক্কা ও তায়েফে একজনও অমুসলিম অবশিষ্ট ছিল না। সবাই ইসলাম গ্রহণপূর্বক বিদায় হজে অংশগ্রহণ করেন। এমনিভাবে আরবের বহু গোত্র সম্মিলিতভাবে ইসলাম গ্রহণ করে। তাঁদের অধিকাংশই মরুবাসী। হজরত আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতকালে ভণ্ড নবী ও ধর্মাদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকালে অসংখ্য সাহাবি শাহাদাত বরণ করেন, যাঁদের সবার পরিচয় উদ্ধার করা ও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। দশম হিজরি বিদায় হজের সময়ে ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভাষণের সময় প্রায় দেড় লাখ সাহাবি সমবেত হয়েছিলেন। এ সম্পর্কে আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী 'আর রাহীকুল মাখতুম'-এ লিখেছেন, 'সেই সময় নবী করিম (সা.)-এর চারদিকে এক লাখ ২৪ হাজার মতান্তরে এক লাখ ৪৪ হাজার মানুষের সমুদ্র বিদ্যমান ছিল।' ইমাম আবু যারআ আর রাযী (র.) লিখেছেন, 'রাসুল (সা.) যখন ইন্তেকাল করেন, তখন যাঁরা তাঁকে দেখেছেন এবং তাঁর কথা শুনেছেন, এমন লোকের সংখ্যা নারী-পুরুষ মিলে এক লাখেরও ওপরে। তাঁদের প্রত্যেকেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস বর্ণনা করেছেন। তা হলে যেসব সাহাবি কোনো হাদিস বর্ণনা করেননি, তাঁদের সংখ্যা যে কত বিপুল তা সহজেই অনুমেয়।' সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর পারস্পরিক মর্যাদার স্তর ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একজন সাধারণ সাহাবির মর্যাদা যেকোনো যুগের সর্বোচ্চ জ্ঞানী, গুণী, সাধক অপেক্ষা বেশি এ বিষয়ে কোরআন, হাদিস, ইজমা একমত। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'আমার যুগের লোকেরাই সর্বোত্তম। অতঃপর তাঁদের পরবর্তীগণ, এরপর এমন সব লোক আসবে, যাঁরা সাক্ষ্য প্রদানের আগে শপথ করবে অথবা শপথের আগে সাক্ষ্য দেবে।' (তিরমিযি) অপর এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিও না। সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার জীবন। যদি তোমাদের কেউ উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও দান করে, তাহলেও তা তাঁদের কারো এক মুদ্দ বা অর্ধ মুদ্দ দানের সমান মর্যাদাসম্পন্ন হবে না।'জান্নাত লাভের বিষয়েও মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কিছু কিছু আগাম সংবাদ দিয়েছেন। যেমন রাসুলে করিম (সা.)-এর সাহাবিগণ সম্পর্কে সাধারণভাবে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, 'মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যাঁরা অগ্রগামী এবং যাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁদেরকে অনুসরণ করেছেন, আল্লাহ তাঁদের প্রতি প্রসন্ন এবং তাঁরাও তাতে সন্তুষ্ট এবং তিনি তাঁদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে নহর প্রবাহিত, সেখানে তাঁরা চিরস্থায়ীভাবে থাকবেন। (সুরা তাওবা, ১০১ আয়াত) এভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)ও বলেছেন, 'ওই ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না, যে আমার সাক্ষাৎ লাভ করেছে।' অর্থাৎ সব সাহাবি জান্নাতি। ইমাম ইবনে হাজাম (রা.) বলেছেন, 'সাহাবিদের সবাই নিশ্চিতভাবে জান্নাতি।' তারপরও রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষ বিশেষ কোনো সাহাবির নাম উল্লেখ করে তাঁদের জান্নাতি বলে ঘোষণা করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন আশারায়ে মুবাশশিরিন।' বিষয়টি শুধু মৃত্যুর পরে জান্নাত লাভের নয়; বরং বাস্তব জীবনে অসাধারণ ব্যক্তিদের ব্যক্তিত্বের মূল্যায়ন ও সত্যায়ন। আল্লাহর রাসূল কর্তৃক কোনো ব্যক্তিকে জীবদ্দশায় জান্নাতি বলে সত্যায়ন করা অসাধারণ সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপার। হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ থেকে বর্ণিত_রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আবু বকর জান্নাতি, উমর জান্নাতি, উসমান জান্নাতি, আলী জান্নাতি, তালহা জান্নাতি, জুবায়ের জান্নাতি, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ জান্নাতি, সায়াদ ইবনে আবি ওক্কাস জান্নাতি, সাঈদ ইবনে জায়েদ জান্নাতি এবং আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ জান্নাতি। (মেশকাত) উদ্ধৃত হাদিসে উলি্লখিত জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ জন সাহাবি 'আল-আশরাতুল মুবাশশারাই' বা আশারায়ে মুবাশশিরিন নামে খ্যাত। জীবদ্দশায় জান্নাতের শুভসংবাদ পেলেন যাঁরা নিঃসন্দেহে তাঁদের জীবনাচরণ আদর্শের মানদণ্ডে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ। মাওলানা হোসেন আলী সাবেক বিভাগীয় সম্পাদক, ধর্ম, দৈনিক কালের কণ্ঠ