ছবি সংগৃহীত

বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ষাট গম্বুজ মসজিদ

মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান
লেখক
প্রকাশিত: ১১ মে ২০১৩, ১০:৫৯
আপডেট: ১১ মে ২০১৩, ১০:৫৯

বাংলাদেশের দক্ষিণের একটি জেলা বাগেরহাট। আর এই বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ। প্রাচীন এই মসজিদটির গায়ে কোন শিলালিপি নেই। কিন্তু মসজিদটি যে খান জাহান আলী (র:) নির্মাণ করেছিলেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। খান জাহান আলী (র:) খলিফাবাদ রাজ্য গড়ে তোলেন। তিনি মসজিদটি নির্মাণ করতে প্রচুর অর্থ খরচ করেন। মসজিদটি নির্মাণে অনেক পাথর ব্যবহার করা হয় এবং পাথর গুলো আনা হয় রাজমহল থেকে। ষাট গম্বুজ মসজিদ এক অপূর্ব স্থাপত্যকলার নিদর্শন। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো এই সম্মান প্রদান করে, বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিশাবে ঘোষিত হয় এই অপূর্ব এই মসজিদ।

ষাট গম্বুজ মসজিদ:

বাংলাদেশের বৃহত্তম আয়তাকারে (১৬০' × ১০৮') অপূর্ব কারুকার্য খচিত পাঁচশত বৎসরের ও অধিক কালের প্রাচীন এই মসজিদ। স্থাপত্য কৌশলে ও লাল পোড়া মাটির উপর লতাপাতার অলংকরণে মধ্যযুগীয় স্থাপত্য শিল্পে নির্মিত এই মসজিদ এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। যদিও এটি ষাট গম্বুজ মসজিদ নামে বর্তমানে পরিচিত, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চতুষ্কোণের বুরুজের উপর চারটি গম্বুজ সহ এখানে সর্বমোট ৮১টি গম্বুজ আছে এবং পূর্ব ও পশ্চিমে মধ্যের সারিতে বাংলা চালের অনুরূপ ৭টি চৌচালা গম্বুজ রয়েছে।
বিশেষ ভাবে লক্ষণীয় যে, ভিতরের অংশের নকশাকৃত চৌচালা ছাদ ও গম্বুজ গুলির অধিকাংশ পাথরের নকশাকৃত ষাটটি স্তম্ভ/খাম্বার দ্বারা সমর্থিত খিলানের উপর নির্মিত। মসজিদের পূর্বদিকে বিশাল আকারের ১১টি খিলান যুক্ত দরজা আছে। এছাড়াও উত্তর ও দক্ষিণ দিকে আরও ৭টি করে দরজা আছে। ইমারতটির গঠন বৈচিত্র্যে পঞ্চদশ শতাব্দীর এ দেশীয় ও তুর্কী স্থাপত্যের বিশেষ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। প্রাচীন ইটের বিরাট বিরাট দেওয়াল। পোড়ামাটির ফলকে কেবলা দেওয়ালে অপূর্ব নকশাকৃত ১০টি মেহরাব বক্র কার্নিশ ও পশ্চিম দেওয়ালের পৃথক একটি প্রবেশপথ ষাট গম্বুজ মসজিদের অনন্য বৈশিষ্ট্য। মসজিদের অভ্যন্তরে ৬০টি পিলার বা স্তম্ভ আছে। এখানে ৬ সারিতে ১০টি করে স্তম্ভ সজ্জিত। সম্ভবত এটি ছিল প্রাচীন রাজধানী শহরের (খলিফাবাদ) প্রশাসনিক কেন্দ্র তথা দরবার হল, জামে মসজিদ। আনুমানিক ১৪৫৯ খ্রিষ্টাব্দের কিছু পূর্বে খানূম আজম উলুঘ খান জাহান ( আলাইহির রহমতুল্লা ওয়াল গফরান) ইসলামের সাধক ও এক মহাপুরুষ এই বিখ্যাত মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। ব্রিটিশ আমলে লর্ড কার্জনের সময় হইতে ২০০২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এই মসজিদটি সংস্কার করা হয়। বর্তমানে এটি একটি বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত অন্যতম ঐতিহাসিক ঐতিহাসিক সংরক্ষিত প্রত্ন নিদর্শন।

জাদুঘর:

ষাট গম্বুজ মসজিদ কম্পাউন্ডের ভিতরে একটি জাদুঘর অবস্থিত। খান জাহান আলী (রহঃ) এর আমলের নিদর্শন সমূহ জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। মোট ২৮টি গ্যলারী নিয়ে জাদুঘরটি সজ্জিত। জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে খান জাহান আলী (রহঃ) পোষা কুমীর ধলা পাহার এর দেহাবশেষ। এছাড়াও বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাপ্ত মাটির তৈরি খেলনা, পোড়া মাটির ফলক, কাঁচ ও বিভিন্ন ধাতুর তৈরি তৈজসপত্র, অস্ত্র, আরও অনেক নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী। জাদুঘরটি শনিবার এবং সব সরকারী ছুটির দিনে বন্ধ থাকে। জাদুঘরটি সকাল ৯.০০টা থেকে বিকেল ৫.০০টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

সিঙ্গাইর মসজিদ:

সিঙ্গাইর মসজিদটি ষাট গম্বুজ মসজিদের একেবারে সামনে অবস্থিত। আর বাগেরহাট শহর থেকে এর দূরত্ব ৩ মাইল। মসজিদটি খান জাহান আলী এবং তার অনুসারীরা ১৫ শতক ও ১৬ শতকের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে নির্মাণ করেন। মসজিদটি বর্গাকারে নির্মিত। সিঙ্গাইর মসজিদের আয়তন (১২.০৪×১২.০৪) মিটার এবং দেয়ালগুলোর পুরুত্ত গড়ে ২.১০মিটার। এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি লাল ইটের তৈরি। প্রত্যেক কোনে বাইরের দিকে গোলাকারে বর্ধিত একটি করে সংলগ্ন বুরুজ রয়েছে। মসজিদের পূর্ব দেয়ালে ৩টি খিলান যুক্ত দরজার রয়েছে। এটি ছিল মসজিদের প্রধান ফটক। এছাড়াও উত্তর ও দক্ষিণের দেয়ালে রয়েছে ১টি করে খিলান দরজা। মসজিদের ভিতরে পশ্চিম দেয়ালের মাঝা-মাঝি অংশে একটি অলংকৃত মেহরাব আছে। অনুরূপ অলংকৃত পোড়া মাটির সাজ চোখে পড়ে দরজাগুলোর দু’পাশে।

খান জাহান আলী (র:) মাজার:

খান জাহান আলী (র:) এর মাজার ষাট গম্বুজ মসজিদ থেকে কাছেই। ভ্যান অথবা রিক্সাতে ষাট গম্বুজ মসজিদ থেকে যাওয়া যায়। এ মহান সাধক বাগেরহাটে অনেক মসজিদ নির্মাণ করেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ষাট গম্বুজ মসজিদ। তিনি সাথে করে দুটি কুমির নিয়ে এসেছিলেন। ক���মির দুটির নাম ছিল কালা পাহার এবং ধলা পাহার। যার একটি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। তার মাজারের উপর একটি গম্বুজ আছে। মাজারের সামনে একটি বিশাল দিঘী আছে। এখানে গোসল করা সম্পূর্ণ নিষেধ। কারণ সম্প্রতি এখানে মিঠাপানির কয়েকটি কুমির ছাড়া হয়েছে। হযরত খান জাহান আলী (র:) অক্টোবর ২৫, ১৪৫৯ তারিখে (মাজার শরীফের শিলালিপি অনুযায়ী ৮৬৩ হিজরি ২৬শে জিলহাজ্ব) ষাট গম্বুজ মসজিদের দরবার গৃহে এশার নামাজরত অবস্থায় ৯০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

যাতায়াত:

ঢাকা থেকে খুলনা হয়ে বাগেরহাট যাওয়া ভাল। প্রতিদিন অসংখ্য বাস ঢাকা থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। সোহাগ পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ ছাড়াও আরও অনেক বাস আছে খুলনা যাবার জন্য। বাসে খুলনা পৌঁছতে ৬-৭ ঘণ্টা সময় লাগে। খুলনা থেকে মাত্র ৫০ মিনিটের পথ ষাট গম্বুজ মসজিদ। এছাড়া ঢাকা থেকে দুটি ট্রেন খুলনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। সুন্দরবন এক্সপ্রেস সকাল ৬.২০ মিনিটে এবং চিত্রা এক্সপ্রেস সন্ধ্যা ৭.০০ মিনিটে ঢাকা থেকে ছেড়ে যায়।

কোথায় থাকবেন:

বাগেরহাটে থাকার তেমন ভাল ব্যবস্থা নেই। তাই বাগেরহাটে থাকার চেয়ে খুলনাতে থাকাই উত্তম। এখানের কিছু উল্লেখযোগ্য হোটেল হল ক্যাসেল সালাম (৭৩০৭২৫), হোটেল রয়্যাল ইন্টারন্যাশনাল (৮১৩০৬৭-৯), দি হোটেল মিলেনিয়াম লি:(৭৩১২৮৩,৮১০৭৯৯,৮১০৮০০), ওয়েষ্টার্ন ইন ইন্টারন্যাশনাল লি: (৮১০৮৯৯,৮১০৯২৮,৭২৪৭৫৪), নিউ হোটেল টাইগার গার্ডেন, সি এস এস রেস্ট হাউজ (041-৭২২৩৫৫), এলজিইডি রেস্ট হাউজ(৭২৩১৮৩,৭২২১৮৯), কারিতাস রেস্ট হাউজ(৭২২৯০৬)। এখানে আপনি ৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকার মধ্যে রাত্রিযাপন করতে পারবেন। প্রায় সবগুলোতেই খাবারের ব্যবস্থা আছে। ছবি- আসিফ শাহরিয়ার