ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশের আদিবাসী অলংকার (১ম পর্ব)

nusrat jahan champ
লেখক
প্রকাশিত: ৩০ মার্চ ২০১৩, ০৯:৫৩
আপডেট: ৩০ মার্চ ২০১৩, ০৯:৫৩

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আদিবাসীদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। বাংলাদেশের প্রায় সকল আদিবাসী সম্প্রদায় পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করেন। সমতলে তাদের বসবাস নেই বললেই চলে। তাদের আচার-অনুষ্ঠান, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য খুব আলাদার রকম বলে বাঙালিরা তাদের জীবনযাপ সম্পর্কে খুবই আকর্ষণবোধ করে। তাদের অলংকার এর বাইরের কিছু নয়।

আদিবাসী নর-নারী সবাই নানান ধরনের অলংকার পরে থাকেন। তবে আদিবাসী সমাজে পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে অলংকারের ব্যবহার বেশি। তারা রূপা, তামা, লোহাসহ বিভিন্ন ধাতু ও ফুল, ফলের বিচি দিয়ে তৈরি নানা ধরনের অলংকার তারা পরে থাকেন। সবচেয়ে বেশি অলংকার পরে উঁসুই ও তঞ্চংগ্যা রমণীরা এবং সবচেয়ে কম অলংকার পরে মারমা সম্প্রদায়ের রমণীরা। চাকমা রমণীদের অলংকারে সিন্ধু-সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। রূপার তৈরি হাঁসুলি, চন্দ্রহার, বাজুবন্ধ, কানের দুল, কোমরের বিছা, খাড়ু, মল, হাতের নানা অলংকার আদিবাসী রমণীদের বেশ শৌখিনতার সাথে ব্যবহার করতে দেখা যায়। জুম ক্ষেতে কাজ করতে যাবার সময় আদিবাসী রমণীরা হাতে রূপার তৈরি বিশেষ ধরনের পেঁচানো বালা কুঁচিখারু ব্যবহার করে থাকে যা দেখতে অনেকটা পেঁচানো সাপের মতো। এটা তাদের ঐতিহ্যের অংশ। তবে আদিবাসী অলংকারের বৈশিষ্ট্য সাধারণ বাঙালি সমাজ থেকে ভিন্ন। আদিবাসী অলংকারগুলো হয় সাধাসিধে প্রকৃতির, খুব বেশি কারুকার্য তাতে থাকে না। এই অলংকারগুলোর ডিজাইন, মোটিফ, তারের কাজ, খোদাই কাজ, ছাঁচের কাজ ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য নজর কড়তে সক্ষম সহজেই। তবে আদিবাসী সমাজের লোকেরা নিজের সম্প্রদায়ের কাউকে দিয়ে অলংকার তৈরি করতে পারেন না, এজন্য তাদের নির্ভর করতে হয় অন্যদের (সেকরা) উপর। আদিবাসী অলংকারগুলো যেমন অত্যন্ত আকর্ষণীয় তেমনি এর নামগুলোও হয় চমত্‍কার। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের জন্য রয়েছে বিভিন্ন নামের অলংকার। যেমন - *টংকি মুডাম বা টাকা মুডাম হলো এক ধরনের আংটি, যা সাঁওতাল সম্প্রদায় ব্যবহার করে। *শুলাক হলো এক ধরনের খোঁপার কাঁটা। এটা সাঁওতাল রমণীরা ব্যবহার করে। *হারহারা হলো কোমর বিছা, এটাও সাঁওতাল রমণীদের অলংকার। *সাঁওতাল রমণীদের পায়ের অলংকারের নাম হলো লিপুর। এটা ঠিক বাঙালিদের নুপূরের মতো। *সোকমাখা হলো সাঁওতাল পুরুষদের বাহুবালা। *নাকিচ নামের এক ধরনের কাঠের চিরুনি সাঁওতাল রমণীরা ব্যবহার করে। এই চিরুনির দুই পাশেই চিকন চিকন শলাকা থাকে। বিশেষ করে বিয়ের সময় বিশেষ ধরনের চিরুনি নাকিচ ব্যবহার করে সাঁওতাল রমণীরা। *কগাসিল অনেকটা মাথার মুকুটের মতো। ভ্রূ-সংলগ্ন কপাল ঘেঁষে মাথায় ব্যবহার করা। সাধারণত নৃত্য উত্‍সবে গারো মেয়েরা মাথায় কগাসিল পরিধান করে। এর পাতের মধ্যে লতাপাতার নকশা ডিজাইন করা থাকে। *বলাহার গারো মেয়েদের অলংকার। এর নিচে বলযুক্ত ঝুলন থাকে। *গুরুভার বালা হলো রূপার তৈরি হাতের অলংকার। এর গায়ে ডায়মন্ড কাট, বুটি কাটা কাজে অলংকরণ থাকে এবং তিনটি চূড়া থাকে। গুরুভার বালা গারো রমণীরাই ব্যবহার করে সাধারণত। *রিরবক হলো গারো সম্প্রদায়ের মালা। বন্যপ্রাণীর হাড়ের গুটি তৈরি করে তা দিয়ে এই মালা তৈরি করা হয়। এটি গারোদের ঐতিহ্যবাহী অলংকার। *বেশ কয়েক ধরনের পুঁতির মালা ম্রৌ সম্প্রদায়ের নারীরা ব্যবহার করে। এর মধ্যে একনড়ি ও দুইনড়ির ঠাসবুনটের মালা বেশি প্রচলিত। *চ্রাইওয়াখং হলো পুঁতির তৈরি কানের অলংকার। পুঁতির সাথে কড়ি ও কাঁচের গুটিও ব্যবহার করা হয়। *বমকম হলো এক ধরনের কবজির অলংকার। এটা সাধারণত মুরং মেয়েরা পরে। *লক হচ্ছে পুঁতির তৈরি গলার মালা। সতেরোটি বিভিন্ন রঙের গুচ্ছ মালা সংযুক্ত করে ম্রৌ রমণীরা গলায় পরিধান করে। *পুটি হলো বিভিন্ন রঙের পুঁতির সমন্বয়ে তৈরি কোমরবন্ধনী। সাদা পুঁতির ফল আকৃতির ডিজাইন, সবুজ পুঁতি দিয়ে তৈরি জ্যামিতিক ডিজাইন ইত্যাদি ডিজাইনের পুটি দেখতে হয় খুবই দৃষ্টিনন্দন। পুটি মূলত গারো সম্প্রদায়ের অলংকার।