ছবি সংগৃহীত

প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র বাঁশি

nusrat jahan champ
লেখক
প্রকাশিত: ০৫ মে ২০১৩, ১০:১২
আপডেট: ০৫ মে ২০১৩, ১০:১২

বাঁশি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্র। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বজুড়ে বাঁশি সমাদৃত। এটি প্রাচীনতম বাদ্যযন্ত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক ও পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন ও তথ্যে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে বাঁশি বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সিন্ধু সভ্যতা, মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর বিহার ও ময়নামতিতে প্রাপ্ত টেরাকোটায় বাঁশির নমুনা দেখতে পাওয়া যায়। পুরাণেও রয়েছে বাঁশির উল্লেখ। পৌরাণিক হিন্দু দেবতা শ্রীকৃষ্ণের সাথে বাঁশি যেন অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত। বাঁশ থেকে তৈরি হয় বলেই বোধহয় এই বাদ্যযন্ত্রের নাম বাঁশি! বাঁশির তৈরির উপকরণ খুবই সাধারণ। তরলা অথবা মাকলা বাঁশের সরু একটি 'পোড়' হলেই চলে। এতে ছিদ্র করে বিভিন্ন প্রকারের বাঁশি তৈরি করা হয়। সাধারণ বাঁশির পরিমাপ এক হাত বা আঠারো ইঞ্চি। তবে প্রয়োজনে এই পরিমাপ কম বা বেশিও হতে পারে। ময়মনসিংহ থেকে সংগৃহীত একটি সারিগানে 'আষ্ট আঙুল' পরিমাপের বাঁশির উল্লেখ পাওয়া যায়। কাকলি ধারার বাঁশি আট ইঞ্চি থেকে ছত্রিশ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের তৈরি বিশেষ বাঁশিও বেশ লম্বা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বাইরে বাঁশের পাশাপাশি হাড়, কাঠ, হাতির দাঁত, যে কোনো ধাতু এমনকি সোনা, রুপা ও প্লাটিনাম দিয়েও বাঁশি তৈরি হয়। ধাতব বাঁশির মধ্যে নিকেল, টিন ও দস্তার সঙ্কর ধাতু দিয়ে বাঁশি তৈরি হলে তার সুর অনেক শ্রুতিমধুর হয়। বাংলাদেশে কয়েক ধরনের বাঁশি প্রচলিত। এদের নামও রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন। যেমন - আড়বাঁশি : বাঁশির মধ্যে আড়বাঁশি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। মাথায় গিঁট রেখে বাঁশ কাটতে হয়, যাতে এর এক প্রান্ত বন্ধ থাকে। এর অপর প্রান্ত থাকে খোলা। খোলা দিকে একই রেখায় কাছাকাছি ছয়টি গোল ছিদ্র করা হয়। বাজানোর সময় আঙুলে ছিদ্রগুলি চেপে বন্ধ করে অথবা ছেড়ে দিয়ে সুর তোলা হয়। বন্ধ দিকে একই সমান্তরালে একটি ছিদ্র করা হয়। এতে ফুঁ দিয়ে বাঁশি বাজানো হয়। এই বাঁশি মোহনবাঁশি, মুরলী, বেণু ইত্যাদি নামেও পরিচিত। কদবাঁশি : আড়বাঁশির মতো কদবাঁশিতেও নিচের দিকে ছয়টি ছিদ্র থাকে। তবে মাথার কাছে কোনো ছিদ্র থাকে না। গিঁট সমেত মাথা তেরছাভাবে কেটে বাঁশের পাতলা খিল দেওয়া হয়। ছয়টি ছিদ্রের বিপরীতে একটি অতিরিক্ত ছিদ্র করা হয়। তেরছা অংশটুকু মুখে পুরে ফুঁ দিয়ে কদবাঁশি বাজাতে হয়। কলমবাঁশি, লয়াবাঁশি, মুখবাঁশি, খিলাবাঁশি নামেও কদবাঁশি পরিচিত। টিপরাবাঁশি : টিপরাবাঁশির দুই দিকেই খোলা থাকে। এর গায়ে আটটা ছিদ্র থাকে। উভয় প্রান্ত খোলা বলে শুধু ফুঁ দিলেই বাজে না। অভিজ্ঞ লোক ছাড়া টিপরাবাঁশি বাজানো বেশ কঠিন কাজ। হরিণবাঁশি : হরিণবাঁশি বাঁশের চিকন কঞ্চি দিয়ে তৈরি করা হয়। এটি প্রায় নয় ইঞ্চি লম্বা হয়। ফুঁ দিলে হরিণ শাবকের ডাকের মতো শব্দ হয়। এ কারণেই বোধহয় এর নাম হরিণবাঁশি। পাতবাঁশি : তালপাতা বা নারকেল পাতা দিয়ে এ বাঁশি তৈরি করা হয়। এটি একেবারেই লৌকিক বাদ্য। ভেঁপু : আমের আঁটির অঙ্কুর গজিয়েছে অথবা চারাগাছ সামান্য বড় হয়েছে এমন অবস্থায় আঁটিটি মাটি থেকে তুলে বাইরের শক্ত খোল ছাড়িয়ে নেয়া হয়। এরপর আঁটির একদিকে তেরছা ভাবে মাটির বা ইটের দেয়ালে ঘষে মুখ তৈরি করা হয়। এই তেরছা অংশের মুখে ফুঁ দিয়েই শব্দ তৈরি করা হয়। এটি গ্রামীণ শিশুদের জন্য তৈরি বাদ্য। সাধারণত বড়রা এটা ব্যবহার করেন না। নানা উত্‍সবে ও সঙ্গীতের সাথে বাঁশি বাজানো হয়ে থাকে। তবে বাঁশি বাজানোর জন্য সব সময় কোনো উপলক্ষের প্রয়োজন হয় না। অবসরে, কাজের ফাঁকে মানুষ মনের আনন্দে বাঁশি বাজিয়ে থাকে। ছবি- ফ্লিকার ডট কম