ছবি সংগৃহীত
প্রসঙ্গ : নজরুল, ভাষাতর্কে গুরু-শিষ্য
আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০১৬, ১২:০৪
গ্রাফিক্স : আকরাম হোসেন ও কাজী তারিফ।
(প্রিয়.কম)জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আজ প্রয়াণ দিবস। এ দিনে তাকে নিয়ে লিখেছেন কবি, প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক মজিদ মাহমুদ।
সাহিত্য-ভাষায় শব্দ প্রয়োগ বিতর্ক নিয়ে কবিগুরুর প্রতি বিদ্রোহী কবি প্রথমবারের মতো কিছুটা শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেছিলেন। সম্ভবত শব্দ প্রয়োগের অধিকার ভিন্ন দুই কবির মধ্যে সম্পর্ক অবনতির এমন মর্মান্তিক কাল উপস্থিত হয়নি। সাহিত্যের নন্দন বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথের কাছে নজরুলের প্রাপ্য যা-ই হোক না কেন, বিদ্রোহী কবি সারাজীবন কবিসম্রাটকে গুরু বলেই সম্বোধন করেছেন। তবে সুধীন্দ্রনাথ, অমিয় চক্রবর্তী কিংবা তিরিশের প্রধান কবিদের রবীন্দ্র-সাহচার্য ও ঘনিষ্টতার সৌভাগ্য নজরুলের ঘটেনি। তিরিশের কবিরা যদি পঞ্চপাণ্ডব হন, তবে নজরুল ছিলেন বাস্তবিক অর্থেই অচ্ছুত একলব্য। দ্রোণাচার্যের পাঠশালায় তার শর-শিক্ষার অধিকার জোটেনি; কিন্তু গুরু দক্ষিণায় তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। গুরু-মূর্তি প্রতিষ্ঠা ও অর্ঘ্য দানের মাধ্যমে তিনি শব্দ-শর-শিক্ষায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। রবীন্দ্র ভালোবাসায় কেবল মানসিক নয় শারীরিক দক্ষিণাও তাঁকে দিতে হয়েছিল বলে নজরুল জীবন থেকে আমরা জানতে পারি। নজরুল যখন পল্টন থেকে ফিরে আসেন তখন তাঁর সুটকেসে যে দুএকটি সম্পদ পাওয়া গিয়েছিল তার অধিকাংশই ছিল রবীন্দ্র-সঙ্গীতের স্বরলিপি। তিনি একের পর এক রবীন্দ্র-সঙ্গীত গাইতে পারতেন। বন্ধুরা তাঁকে রবীন্দ্র-সঙ্গীতের ‘হাফেজ’ বলতেন। নজরুলের নিজের জবানিতেও আমরা জেনেছি- ‘বিশ্বকবিকে আমি শুধু শ্রদ্ধা নয়, পূজা করে এসেছি সকল হৃদয় মন দিয়ে, যেমন করে ভক্ত তার ইষ্টদেবতাকে পূজা করে। ছেলেবেলা থেকে তাঁর ছবি সামনে রেখে গন্ধ-ধূপ-ফুল-চন্দন দিয়ে সকাল সন্ধ্যা বন্দনা করেছি।’
বিদ্রোহী কবির প্রতি রবীন্দ্রনাথেরও স্নেহের কমতি ছিল না। আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে নজরুল যখন অনশন-ক্লিষ্ট, তখন রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম পাঠিয়ে সমবেদনা জানিয়েছিলেন। এই নোবেল বিজয়ী কবি ২৪ বছরের তরুণ কবিকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, কোনো অর্থেই তার মরা চলবে না, আমাদের সাহিত্যে নজরুলের মতো প্রতিভার দরকার আছে। বলেছিলেন, our literature claims you. কিন্তু জীবনরক্ষাকারী এই বার্তাটি সেদিনের ঔপনিবেশিক ডাক বিভাগ প্রাপকের কাছে পৌঁছে দিতেও গড়িমসি করেছে। নজরুল কতখানি বিদ্রোহী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে সেটি বড় নয়, নজরুল-সাহিত্যের গুরুত্বই রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করেছে। পারিবারিক-বলয়ের বাইরে বই উৎসর্গ করেও তিনি সেই স্বীকৃতি ঘোষণা করেছিলেন। এই ঘটনা যুগপৎ রবীন্দ্র-ভক্ত ও নজরুল-ভক্ত উভয়কেই হতাশ করেছিল। রবীন্দ্রনাথের দূরদর্শীতা ও ইতিহাস চেতনার গুরুত্ব নজরুলের ক্ষেত্রে প্রকীর্ণ হয়ে আছে।
তবু এই দুই মহান কবির মধ্যে একটি সময় সম্পর্কের কিছুটা টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল। এই টানাপোড়েনের হেতু ছিল সাহিত্য-ভাষার শব্দ প্রয়োগ। বর্তমান আলোচনাটি ভাষা নিয়ে উভয় কবির ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি কিছুটা আলোকপাত করা। এর অন্যতম প্রধান কারণ, বর্তমান সময়ে, এমনকি সাম্প্রতিক অতীতে সৃষ্টিশীল লেখকদের মধ্যে ভাষার উৎকর্ষ বা অপকর্ষতা নিয়ে সমবায়ী চেতনার তেমন প্রতিফলন দেখা যায় না। কিন্তু সাহিত্যের একমাত্র মাধ্যম ও বাহন ভাষা। বাহন শক্তিশালী না হলে কিংবা তার স্বাস্থ্য সম্বন্ধে উদাসিন থাকলে যাত্রা খুব সুখকর হয় না। আমরা আজ যে ভাষায় সাহিত্য রচনা করছি কিংবা এর লেখ্যরূপটি গড়ে তুলেছি, তা একদিনে অর্জিত হয়নি। বাংলা সাহিত্যের প্রধান লেখকরা সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি ভাষার শ্রীবৃদ্ধিতে নিরন্তর শ্রম দিয়ে গিয়েছেন।কিন্তু বর্তমান ভাষা নিয়ে আলোচনা কেবল ভাষা তাত্ত্বিকদের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাষা একটি চলমান প্রক্রিয়া। একদিনে যেমন ভাষা সৃষ্টি হয়নি, তেমনি একদিনে ভাষার সমৃদ্ধি কিংবা ধ্বংসও সম্ভব নয়। ভাষার শ্রীবৃদ্ধি কখনো ভাষা তাত্ত্বিকের ওপর নির্ভর করে না, ভাষার শক্তিমান লেখকগণ ভাষাকে অনেকদূর এগিয়ে দিতে পারে। ভাষাতাত্ত্বিক কেবল পারেন ভাষার শৃঙ্খলা নিরূপণ এবং বিবর্তনের ইতিহাসসমূহ নির্ণয়ে সহায়তা করতে। সুতরাং ভাষার টেকসই ও সমৃদ্ধি আনয়নে সৃষ্টিশীল লেখকের বিকল্প নেই।বিতর্ক যা-ই থাকুক না কেন, ব্রিটিশ কলনিয়লদের বর্তমান গদ্যভাষার লেখ্যরূপটি সংগঠিত করার কালে কিংবা তৎপরবর্তীকালে বাংলাভাষার প্রধান লেখকগণ বিষয়টি নিয়ে বিস্তর ভাবনা-চিন্তা এবং বাস্তব-সম্মত প্রয়োগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। রবীন্দ্র-নজরুল এর ব্যতিক্রম নন।
রবীন্দ্রনাথ স্বীকৃত অর্থে ভাষাতাত্ত্বিক ছিলেন না। কিন্তু লেখক জীবনের প্রায় সমগ্র সময় ধরে তিনি ভাষা নিয়ে ভেবেছিলেন এবং সেই ভাবনাগুলো লিখিতভাবে প্রকাশ করেছিলেন। যার পরিমাণ ও মূল্য বাংলাভাষার সমৃদ্ধির ইতিহাসে ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ। একক কোনো ভাষাতাত্ত্বিকের পক্ষে ভাষা নিয়ে তাঁর সমগ্র চিন্তা স্পর্শ করা প্রায় অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথের ভাষার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে তার সাহিত্য জীবনের প্রায়োগিক ক্ষেত্র থেকে। তিনি নিজেই ভাষা প্রয়োগের পরীক্ষাগার হিসেবে নিজের সাহিত্য জীবনকে মেলে দিয়ে ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিকের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে তাঁর দুএকটি মত অগ্রহণযোগ্য হলেও চিন্তার জগতে তিনি বিপ্লব এনেছেন। তাঁর শব্দতত্ত্বের ওপর কাজ হওয়ার অবকাশ আছে।
রবীন্দ্রনাথ যে নিয়মমাফিক ভাষাপণ্ডিত নন, কেবল ভাষার প্রতি দরদের কারণেই যে তিনি এ পথে ব্রতী হয়েছেন তা তাঁর রচনার মধ্যেও প্রকাশ পেয়েছে- ‘যদি পণ্ডিত মহাশয়ের এই রায়ই পাকা হয় যে, সংস্কৃত ভাষায় মহামহোপাধ্যায় না হইলে বাংলা ভাষায় কলম ধরা ধৃষ্টতা, তবে যাদের সাহস আছে, প্রকৃত বাংলার জয় পতাকা কাঁধে লইয়া তাদের বিদ্রোহ করিতে হইবে।’ ভাষা পণ্ডিতদের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের বিদ্রোহের আরো একটি উদাহরণ দেয়া যাক : ‘আগে যেখানে লিখতাম ‘সেহ’ এখন সেখানে লিখি ‘সেও’, অথচ পণ্ডিতের ভয়ে ‘কেহ’কে ‘কেও’ অথবা ‘কেউ’ লিখতে পারি না। ভবিষ্যৎবাচক ‘করিহ’ শব্দটাকে ‘করিয়ো’ লিখিতে সংকোচ করি না, কিন্তু তার বেশি আর একটু অগ্রসর হইতে সাহস হয় না।’
এ থেকে দেখা যাচ্ছে শব্দ ও ভাষার গাঁথুনি ক্রিয়া পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের খুব একটা শুচিবায়ুগ্রস্ততা কিংবা রক্ষণশীলতা ছিল না। তবু রক্তের বদলে নজরুলের ‘খুন’ শব্দ ব্যবহারে রবীন্দ্রনাথের আপত্তিকে কেন্দ্র করে দুই কবির মধ্যে কিছুদিন ‘শির দেগা নাহি দেগা আমামা’ অবস্থা তৈরি হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের এই ভাষা-বিতর্ক নিয়ে তৎকালে এবং বর্তমান সময়েও অনেক উদ্দেশ্যবাদী আলোচনা চোখে পড়েছে। কিন্তু এ আলোচনার উদ্দীষ্ট ও গতিপথ সে দিকে নয়, ভাষা আলোচনার মধ্যেই সীমায়িত। ভাষা বিতর্ক মূলত ভাষার সঞ্চারণশীলতার লক্ষণ। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে এ বিতর্ক অপেক্ষাকৃত কম হলেও বিরল নয়। তারানাথ বাচস্পতির রক্ষণশীলতার জবাব দিতে যেয়ে বিদ্যাসাগর এ ভাষাকে যুক্তির এবং প্রায় মুখের ভাষার কাছাকাছি নিয়ে এনেছিলেন।
মুসলমানী শব্দ ব্যবহারে রবীন্দ্রনাথের আপত্তি ছিল এমন প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, ‘বস্তুত বাংলা ভাষা যে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই আপন তার স্বাভাবিক প্রমাণ ভাষার মধ্যে প্রচুর রয়েছে।যত বড়ো নিষ্ঠাবান হিন্দুই হোক-না কেন ঘোরতর রাগারাগির দিনেও প্রতিদিনের ব্যবহারে রাশি রাশি তৎসম ও তদ্ভব মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করতে তাদের কোনো সংকোচ বোধ হয় না।এমন-কি সে সকল শব্দের জায়গায় যদি সংস্কৃত প্রতিশব্দ চালানো যায় তাহলে পণ্ডিতী করা হচ্ছে বলে লোকে হাসবে। বাজারে এসে সহস্র টাকার নোট ভাঙানোর চেয়ে হাজার টাকার নোট ভাঙানো সহজ। সমনজারি শব্দের অর্ধেক অংশ ইংরেজি, অর্ধেক পারসী, এর জায়গায় ‘আহ্বান প্রচার’ সাধু সাহিত্যেও ব্যবহার করার মতো সাহস কোনো বিদ্যাভূষণেরও হবে না।’
রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, ভাষা হলো বৃষ্টির বর্ষণের মতো ঢাল অনুসারে জলাশয়ের দিকে ধাবিত হবে। বন্যার পানিকে জোর করে বেধে রাখা যায় না। ভাষা মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম। মানুষ অপরপক্ষের সঙ্গে সবচেয়ে সহজ পদ্ধতিতে তার যোগাযোগ গড়ে তুলতে চায়। অবশ্য যে ভাষা আজ লেখ্য অর্থাৎ বইয়ের ভাষায় রূপ নিয়েছে তাও বিশেষভাবে এবং বিশেষ শ্রেণির হাতে পরিপুষ্ট লাভ করেছে তবু জলাশয়ের ঢালটি সেদিকেই তাক করা। কিন্তু জোর করে ভাষার শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ঘোর আপত্তি ছিল। তার মতে ‘শিশুপাঠ্য বাংলা কেতাবে গায়ের জোরে আরবীফারসীআনা করাটাকেই আচারনিষ্ঠ মুসলমান যদি সাধুতা বলে জ্ঞান করেন তবে ইংরেজি স্কুলপাঠ্যের ভাষাকেও মাঝে মাঝে পারসী বা আরবী ছিটিয়ে শোধন না করেন কেন?’ রবীন্দ্রনাথের যুক্তির যথেষ্ট সারবত্তা সত্ত্বেও ‘বঙ্গ-সাহিত্যে খুনের মামলা’ একটি প্রশ্ন বোধক হয়ে আছে। আরবী ফারসী শব্দ গ্রহণে রবীন্দ্রনাথের আপত্তি না থাকলেও তিনি বলেছেন ‘রক্ত অর্থে খুন শব্দকে ভাষা স্বীকার করেনি।’ রবীন্দ্রনাথের এ বিতর্কের প্রায় সত্তর বছর পরেও এ কথা সত্য কিন্তু নজরুলের কবিতায় ‘খুন’ আর ভাষার শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে খুনের ব্যবহার দুটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। রবীন্দ্রনাথ হয়তো ভাষার শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকতার চেয়ে অর্থগত ব্যবহারে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু নজরুল সাহিত্যের শৈলির কথা বিবেচনা করলে তার বৈশিষ্ট্যের অন্যতম প্রধান দিক এই ভাষা প্রয়োগ, যা থেকে আলাদা করলে নজরুলের নিজস্ব পরিচয় ক্ষুণ্ন হয়। নজরুলের ‘লা শারিক আল্লাহ’র মতো আরবী বাক্য ও একই সঙ্গে মুসলিম আকিদা ব্যবহার যদি মোহিতলাল মজুমদারের মতো বিশুদ্ধবাদীর কাছে অশেষ প্রশংসার দাবিদার হয়ে থাকে তাহলে ‘খুন কিয়া খুনিয়া’র মতো বাক্য নজরুলের কাব্যভাষার জন্য অসহনীয় হয় কী করে। রবীন্দ্রনাথ ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংস্কৃতআনাকেও পুরোপুরি মেনে নেননি। বিষ্ণু-দের কবিতা নিয়ে তিনি বলেছিলেন- ‘তোমার রচনাকে এমন দুর্ভেদ্য কেল্লায় বাসা দিয়েছ যে আমার মন দেয়ালে ঠেকেই ফেরে।’ বিষ্ণু দের কাব্য ভাষার দুএকটি নমুনা দেয়া যায়, ‘অলাতচক্রে চক্রমণ/ সোৎপ্রাসেপাশে বলি নাকো তাই কথা’ ‘বুদ্ধি আমার অপাপবিদ্ধমস্নাবির, জড়কবন্ধ অন্ধকর্মে ফুৎকার করি চর্মাচারে, ‘নীরন্ধ অবীচি আর দুর্গন্ধ রৌরব।’ এ ধরনের শব্দজাত কবিতার অর্থ উদ্ধারে রবীন্দ্রনাথকেও গলদঘর্ম হতে হয়েছে কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এই ভাষার প্রয়োগকে ভাষার প্রতি বলাৎকার হিসেবে মনে করেননি। কারণ এই ভাষার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল রবীন্দ্রনাথের জন্য অপরিচিত ছিল না। কিন্তু নজরুলের ধ্বনি শৈলি ও শুদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক ভিন্নতার কারণে রবীন্দ্র-কান এ ধরনের শব্দ গ্রহণে অভ্যস্ত ছিল না। তবু রবীন্দ্রনাথ আবুল ফজলকে লেখা চিঠিতে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, ‘শক্তিমান মুসলমান লেখকরা বাংলা সাহিত্যে মুসলমান জীবন-যাত্রার বর্ণনা যথেষ্ট পরিমানে করেননি, এ অভাব সম্প্রদায় নির্বিশেষে সমস্ত সাহিত্যের অভাব। এই জীবন যাত্রার যথোচিত পরিচয় আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক। এই পরিচয় দেবার উপলক্ষ্যে মুসলমান সমাজের নিত্য ব্যবহার্য শব্দ যদি ভাষায় স্বতই প্রবেশ লাভ করে তবে সাহিত্যের ক্ষতি হবে না, বরং বল বৃদ্ধি হবে, বাংলা ভাষার অভিব্যক্তির ইতিহাসে তার প্রমাণ আছে।’
প্রেসিডেন্সি কলেজে রবীন্দ্র-পরিষদের অভ্যর্থনার উত্তরে রবীন্দ্রনাথ অতি আধুনিক বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে বক্তৃতা প্রদান করেন। ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের ৪ পৌষ সাপ্তাহিক ‘বাংলার কথা’য় ছাপা হয়। নজরুল ইসলাম এর জবাবে ‘বড়র পিরীতি বালি বাঁধ’ প্রবন্ধটি রচনা করেন। এ রচনায় নজরুল রবীন্দ্রনাথকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। অবশ্য আক্রমণের চেয়ে অভিমানই বেশি ছিল। কবিগুরুর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে মনে করে কিংবা তার ভালোবাসার মধ্যে সূক্ষ্ণ চাতুর্য রয়েছে, এই ভেবে তিনি যারপর নেই কষ্ট পেয়েছিলেন। নজরুলের গদ্য রচনার বৈশিষ্ট্য হিসেবে যথেষ্ট আবেগের আধিক্য থাকা সত্ত্বেও তার ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে যুক্তিও কম ছিল না। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন- ‘এই আরবি-ফার্সি শব্দ প্রয়োগ কেবল আমিই করিনি। আমার বহু আগে ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ প্রভৃতি করে গেছেন।’ নজরুল বলেছিলেন, আমি একটা জিনিস কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করে আসছি। সম্ভ্রান্ত হিন্দু বংশের অনেকেই পায়জামা-শেরওয়ানি-টুপি ব্যবহার করেন, এমনকি লুঙ্গিও বাদ যায় না। তাঁতে তাদের কেউ বিদ্রূপ করে না, তাঁদের ড্রেসের তখন নাম হয়ে যায় ‘ওরিয়েন্টাল’ কিন্তু ওইগুলো মুসলমানরা পরলে তারা হয়ে যায় মিয়া সাহেব।’
এ লেখায় নজরুলের আরো একটি যুক্তি ছিল, তিনি মনে করতেন বিশ্ব কাব্যলক্ষীর একটি মুসলমানি ঢং আছে। শব্দ প্রয়োগে মুসলমানি জীবন প্রতিফলিত হওয়ার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের আপত্তি না থাকলেও সম্ভবত মুসলমানি ঢংয়ের বিষয়ে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন না। ভাষা মানুষের জন্মগত সার্মথ্য। সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে মস্তিস্ক ভাষা ব্যবহারের সূত্র গড়ে তোলে। নজরুল বলেছেন, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে রচিত তার গানটিই হয়তো তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যেখানে তিনি বলেছেন, ‘উদিবে যে রবি আমাদেরই খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।’ নজরুল বলেছেন, এখানে খুনের বদলে রক্ত ব্যবহার করলে কবিতার শক্তি অর্ধেক কমে যেতো। নজরুলের কবিতার জন্য কথাটি সর্বৈব সত্য। খুন এবং খুনের মতো কিছু শব্দ নজরুল কবিতাকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দান করেছে।
বাংলা ভাষা ‘খুন’কে রক্ত অর্থে গ্রহণ করেনি কিন্তু কবিতায় দিব্যি গ্রহণ করেছে। আলোচনাটি কবিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ভাষার সামাজিক প্রয়োগের দিকে চলে গেছে। যার ফলে ভাষার ব্যবহার নিয়ে আমরা বেশকিছু যুক্তিপূর্ণ লেখার সংস্পর্শে আসতে পেরেছি। নজরুলের লেখার জবাবে প্রমথ চৌধুরী বীরবল নামে আত্মশক্তিতে ‘বঙ্গসাহিত্যে খুনের মামলা’ নামে প্রবদ্ধ লিখেছিলেন। অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ এ লেখায় প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘আরবি ফার্সি শব্দ যদি ত্যাগ করতে হয় তাহলে আমাদের সর্বাগ্রে ‘কলম’ ছাড়তে হয়। কারণ ও-শব্দটি কেবল আরবি নয়, এমন অনির্বচনীয় আরবি যে ও-শব্দ হা কণ্ঠমূল থেকে হা করে উদগিরণ করতে হয়। ও ‘ক’ কিন্তু হিন্দু জবানে বেরয় না এক কাশি ছাড়া।’ তবে প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, অভিধানে খুন আর রক্ত এক হতে পারে কিন্তু ব্যাকরণে তা নয়। রক্তও বিশেষ্য, খুনও তাই। কিন্তু রক্ত উপরন্তু বিশেষণ, খুন তা নয়। অপর পক্ষে খুন ক্রিয়া রক্ত তা নয়। বলাবাহুল্য, প্রমথ চৌধুরীও রক্ত অর্থে খুন প্রয়োগের পক্ষে রায় না দিলেও বলেছেন, ‘যদি খুন বাদ দিতে হয় তাহলে reason-এর খাতিরে rhyme-কে তালাক দিতে হয়। আর কে না জানে reason-এর খাতিরে rhyme-এর সাত খুন মাপ।
শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথকে আপাত উদার মনে হলেও তার অজান্তেই একটি রক্ষণশীলতা তার ওপর ভর করেছিল। তা হলো তৎকালীন ভাষা-সংগঠনকালে রবীন্দ্রনাথ যে শ্রেণি থেকে উঠে এসেছিলেন সেই শ্রেণির মুখের ভাষাই লেখ্য ভাষায় রূপ নিচ্ছিল। রবীন্দ্রনাথ তার শ্রেণির মুখের ভাষাকেই লেখ্য ভাষায় ব্যবহারের কৃতিত্ব দেখিয়ে ভাষার জগতে বিপ্লব আনতে পেরেছিলেন। কিন্তু সর্বসাধারণের মুখের ভাষা সর্বত্র লেখ্য ভাষা হয়ে উঠতে পারেনি। এবং একজন অক্ষর শিক্ষিত মানুষ তার মুখের ভাষার পাশাপাশি লেখ্য ভাষার ধরণ রপ্ত করতে থাকে। এই প্রক্রিয়া যুগপৎ ঘটায় একজন শিক্ষার্থীর জন্য তা কখনো আলাদা পরিশ্রমে কষ্টকর হয়ে ওঠে না। সুতরাং ভাষার সাংস্কৃতিক অধিকারের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার এই দুই প্রধান কবির দাবি সত্য ছিল। তাই বলে এই দাবি দুই কবির সম্পর্কের ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদি বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি। তবে এ আলোচনা এখানে নয়।
- ট্যাগ:
- প্রবন্ধ
- সাহিত্য
- প্রয়াণ দিবস