ছবি সংগৃহীত

পৃথিবী থেকে মশা নির্মূলে কী প্রভাব পড়তে পারে?

মিজানুর রহমান
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ২৮ জানুয়ারি ২০১৬, ১৭:৪০
আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০১৬, ১৭:৪০

(প্রিয়.কম) মশা এ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাণী, যার মাধ্যমে বিভিন্ন রোগে প্রতিবছর বিশ্বে দশ লাখেরও বেশি মানুষ মারা যায়। সম্প্রতি মশাবাহিত জিকা ভাইরাসের কারণে দক্ষিণ আমেরিকায়, বিশেষ করে ব্রাজিলে হাজার হাজার শিশু অপরিণত মস্তিষ্ক নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। এমন পরিস্থিতিতে ভাবা হচ্ছে, মশা নামক এই প্রাণীকে পৃথিবী থেকে চিরতরে নির্মূল করলে কী প্রভাব পড়তে পারে? কিংবা এই সিদ্ধান্ত ভুল কি-না?

তবে মশা নির্মূলের বিষয়ে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের কথা বলছেন। অনেকে বলছেন, ভয়াবহ রোগবাহী এই মশাকে নির্মূল করা উচিত। আবার অনেকে বলছেন, এতে হয়তো একটা এলাকায় ধ্বংস করা সম্ভব কিন্তু সারাবিশ্বে সম্ভব নয়। এছাড়া মশার জায়গায় তখন অন্য কোনো প্রাণী এসে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।

তবে এ নিয়ে এখনও চলছে গবেষণা।

বিবিসি-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রজাতির মশার অস্তিত্ব আছে বিশ্বজুড়ে। কিন্তু এদের অধিকাংশই মানুষের জন্য ক্ষতিকর কিছু নয়। অধিকাংশ প্রজাতিই ফুলের মধু ও শস্য দানার উপর নির্ভরশীল।

মাত্র ৬ শতাংশ নারী প্রজাতির মশাই শুধু মানুষের রক্ত পান করে। এদের মধ্যে অর্ধেক এমন প্যারাসিট বহন করে, যেগুলো মাুনষের বিভিন্ন রোগের কারণ। কিন্তু এই ১০০ প্রজাতির মশাই পৃথিবীর জন্য বড় বড় বিপদ বয়ে আনছে।

‘ইউনিভার্সিটি অব গ্রিনউইচ এর ন্যাচারাল রিসোর্স ইনস্টিটিউট’র গবেষক ফ্রান্সিস হকস মন্তব্য করেছেন, ‘এই মুহূর্তে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ মশাবাহিত রোগের হুমকিতে রয়েছে। মানব সম্প্রদায়ের দুর্দশার পেছনে তাদের অবর্ণনীয় ভূমিকা আছে।’

প্রতিবছর মশাবাহিত ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও হলুদ জ্বরের মতো রোগে আক্রান্ত হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়, এদের বেশিরভাগই গরিব দেশের মানুষ।

কিছু প্রজাতির মশা জিকা ভাইরাস বহন করে। প্রথমে মনে করা হচ্ছিল, এ ভাইরাসের প্রভাবে হালকা জ্বর হতে পারে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এটি একটি অত্যন্ত ভয়াবহ ভাইরাস, যার প্রভাবে মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে! এরই মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকায় বিশেষ করে ব্রাজিলে হাজার হাজার শিশু এ ভাইরাসের প্রভাবে অপরিণত মস্তিষ্ক নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে।

মশার হাত থেকে নিস্তার পেতে মশারির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য বহুদিন ধরেই জোর প্রচারণা চলে আসছে। কিন্তু একটি ধ্বংসাত্মক রোগ বহনকারী প্রজাতিকে ঠেকানোর জন্য মশারিই কী একমাত্র উপায় হতে পারে?

জীববিজ্ঞানী ওলিভিয়া হাডসন প্রায় ৩০ প্রজাতির মশাকে জীনগতভাবে পরিবর্তন করার পক্ষে। নিউইয়র্ক টাইমস-কে তিনি বলেন, ‘এটি করলে অন্তত দশ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচবে এবং এ মশাদের প্রজনন ক্ষমতা ১ শতাংশে নেমে আসবে। আমাদের অবশ্যই এসব প্রজাতির মশাদের চিরতরে ধ্বংস করতে হবে।’


ব্রিটেনে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং বায়োটেক ফার্ম অক্সটেক যৌথভাবে পুরুষ প্রজাতির ‘এডিস এজেপটি’ মশাকে জীনগতভাবে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। এ প্রজাতির মশা ডেঙ্গু জ্বরের জন্য দায়ী এবং জিকা ভাইরাসের বাহক। পরিবর্তিত এ পুরুষ মশাটি এমন একটি জিন বহন করবে, যেটি সঠিকভাবে তাদের বংশবৃদ্ধিতে বাধা দেবে এবং এর ফলে সুস্থ মশক প্রজন্ম জন্মলাভ করবে না। যার প্রভাব পড়বে পরবর্তী প্রজন্মে। অর্থাৎ পরবর্তী প্রজন্মের মশাগুলো তাদের শরীরে কোনো রোগের জীবানু বহন করার ক্ষমতা অর্জনের আগেই মারা যাবে।  

২০০৯ এবং ২০১০ সালে ব্রিটেনের কায়মান দ্বীপে জীনগতভাবে পরিবর্তিত নতুন এ প্রজন্মের অন্তত ত্রিশ লাখ মশা ছাড়া হয়েছে। এরপর পরিস্থিতির বিষ্ময়কর উন্নতি হয়েছে। অক্সিটেক তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, নতুন এ মশাগুলো ছাড়ার পর কায়মান দ্বীপ ও আশপাশের অঞ্চলে মশার উৎপাদন ৯৬ শতাংশ কমে গেছে। ঠিক এ পরীক্ষাটিই এখন চলছে জিকা ভাইরাস আক্রান্ত ব্রাজিলে। দেশটিতে মশার উৎপাদন কমে গেছে ৯২ শতাংশ।

তবে ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটির পতঙ্গবিজ্ঞানী ফিল লুউনিবস মশার বিলুপ্তির কারণে ‘অনাকাঙ্খিত বহু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’র আশঙ্কা করেছেন।

তিনি বলেন, ‘মশারা সাধারণত ফুলের মধু খায়, যা পরাগায়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। পরিণত মশা পাখিদের অন্যতম প্রধান খাদ্য, লার্ভা থাকা অবস্থায় তারা মাছের অন্যতম প্রধান খাদ্য। এখন মশাদের যদি পরিপূর্ণ বিলুপ্তি হয়, তাহলে এসবের সাথে সাথে আরো বহু খাদ্যশৃঙ্খলের উপর তার প্রভাব পড়বে।’

যদিও অনেক গবেষক বলছেন, পরাগায়ন ও খাদ্য হিসেবে মশার উপযোগিতা অন্য কোনো পতঙ্গ সহজেই পূরণ করতে পারবে।

কিন্তু লুইনিবসের মত ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘অন্য কোনো পতঙ্গ দ্রুত মশার স্থান নিতে পারবে, জনস্বাস্থ্যের দিক বিবেচনায় সেটি একেবারেই অবাঞ্চনীয়।’

তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘যে পতঙ্গটি মশার প্রতিস্থাপক হবে, সেটি মশার চেয়েও ভয়ঙ্কর এবং দ্রুতগতিতে রোগ বিস্তার করতে পারে।’

বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক ডেভিড কুয়োমেন মনে করেন, প্রাকৃতিক ধ্বংসযজ্ঞ থেকে মানব সম্প্রদায় ও প্রকৃতিকে রক্ষা করছে মশা। পরাগায়নের মাধ্যমে মশা উষ্ণমন্ডলীয় অঞ্চলে বনায়ন সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। অন্যথায় যেটি আদতে অসম্ভব ছিল।

মানবসৃষ্ট ধ্বংস থেকে বহু বিপন্ন প্রজাতিকে রক্ষা করেছে এসব বনাঞ্চল। অনেক বিপন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীর অস্তিত্ব টিকে আছে শুধু এসব বনাঞ্চলের কারণেই। ডেভিড কুয়োমেন সতর্ক করেছেন এই বলে যে, ‘শুধু মশা ছাড়া অন্য কিছু আগামী এক হাজার বছরের মধ্যে এসব প্রাণী ও উদ্ভিদের বিলুপ্তি ঠেকাতে পারবে না।’

কিন্তু মশার একটি প্রজাতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করাটা ঠিক বৈজ্ঞানিক উপায় হতে পারে না। এর বিরুদ্ধেও সবাক অনেকে। অনেকে বলছেন, মশার একটি প্রজাতি মানুষের জন্য ক্ষতিকর। এজন্য পুরো প্রজাতিকে বিলুপ্ত করে দেওয়া হচ্ছে। অথচ মশার বহু প্রজাতি মানুষের জন্য ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ‘ইউহিরো সেন্টার ফর প্যাকটিক্যাল ইথিকস’-এর জনাথম পুগ বলেন, একটি পুরো মশক প্রজন্মকে ধ্বংস করাকে আমরা নৈতিকতা বিরোধী বলে মনে করি।’

বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের মতো দুঃখ, যন্ত্রনা কিংবা আবেগ মশাদের নেই। তাই তাদের হাত থেকে মুক্তির উপায় খোঁজাটাই উত্তম হবে। কারণ তারাই রোগ-ব্যাধি ছড়ানোর অন্যতম কারিগর। 

কিন্তু এবার মূল যে প্রশ্নটা সামনে এসেছে, সেটি হচ্ছে- এটি করলে জিকা, ম্যালেরিয়া বা ডেঙ্গুর মতো রোগ কতটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে? হয়তো একটা নির্দিষ্ট এলাকায় বা শহরে এর সুফল পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু এ বিশাল বিশ্ব কীভাবে এসব ভয়াবহ ব্যাধি থেকে মুক্তি পাবে? 

মশাকে ঠেকানোর বহু অভিনব উপায় আবিষ্কৃত হয়েছে বিশ্বে। লন্ডনের কিউ গার্ডেনসের বিজ্ঞানীরা এক ধরনের সেন্সর আবিষ্কার করেছেন, যা মশার পাখার গতিবিধি বুঝে এটি কোন প্রজাতির মশা, তা বলে দিতে পারে। কিউ গার্ডেনস ইন্দোনেশিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষদেরকে এ সেন্সরটি সরবরাহ করেছেন, যাতে মানুষজন বুঝতে পারে- কোনটি তাদের জন্য বিপজ্জনক। এ সেন্সর ব্যবহার করে পরবর্তী বিপর্যয়ের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব। 

এদিকে লন্ডন স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা মানুষের শরীরের ঘ্রাণে কীভাবে মশা আকৃষ্ট হয়, তা আবিষ্কার করেছেন। এর ফলে যে জীনের কারণে মশা মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়, বিজ্ঞানীরা এর বিপরীত জীনসম্পন্ন মশা সৃষ্টি করতে পারবেন।  এ আবিস্কারের ফলে এই সমস্যার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করতে পারবেন বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে যদি এমন ধরনের মশা সৃষ্টি করা যায়, যেগুলো রোগ জীবাণুবাহী প্যারাসিট প্রতিরোধী, তাহলেও সাফল্য পাওয়া যাবে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।

তথ্যসূত্র ও ছবি: বিবিসি