ছবি সংগৃহীত

দেশীয় গল্পের অলৌকিক প্রাণীরা

nusrat jahan champ
লেখক
প্রকাশিত: ০৬ মে ২০১৩, ১৭:০১
আপডেট: ০৬ মে ২০১৩, ১৭:০১

অন্ধকারকে ভয় পাওয়া ও একই সাথে আকর্ষণ অনুভব করা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। শুধুমাত্র অন্ধকার নয়, যেকোনো নেতিবাচক বিষয়ের ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য। যুগ যুগ ধরে লোকসমাজে দেখা যায় নানা ধরনের অলৌকিক প্রাণীর আনাগোনা। এসব প্রাণী লোকবিশ্বাস ও কুসংস্কারের ভেতর দিয়ে লোকসমাজে চলে এসেছে। এমনকি সাহিত্যের পাতাতেও তারা স্থান করে নিয়েছে। রূপকথা, উপকথা, লোককথা, নীতিকথা প্রভৃতি রচনায় বিভিন্ন ধরনের অবাস্তব প্রাণীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব মানুষের ইচ্ছা ও কল্পনার প্রতীকমাত্র। জিন-পরী, ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানব ইত্যাদি শরীরী-অশরীরী জীবরা তো আছেই, এছাড়াও বিমিশ্র দেহধারী কিছু কাল্পনিক প্রাণীর কথা নানান দেশের লোককাহিনীতে পাওয়া যায়। যেমন - ড্রাগন, ফিনিক্স, গ্রিফিন, সেন্টুর, সাইরেন, প্যান, মত্‍স্যকুমারী ইত্যাদি। বাংলাদেশের রূপকথা ও লোককাহিনীতে বেঙ্গমা-বেঙ্গমি, শুকপাখি, পক্ষিরাজ ঘোড়া ইত্যাদি প্রাণীর উল্লেখ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের লোকসমাজের সংস্কারে ও কুসংস্কারে নানা ধরনের অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক জীব অথবা জীবাত্মার বসবাস করে। সবই যে নেতিবাচক তা নয়, ইতিবাচক জীবাত্মার কথাও জানা যায়। আসুন পরিচিত হই এমনই কিছু অলৌকিক জীব বা জীবাত্মার সাথে - ভুলা : ভুলা হলো আলেয়া, আলোর মূর্তি। গ্রাম্যকথায় একে ভুলা বলে। ভুলা নারীভূত। তবে সে যেকোনো ধরনের মূর্তি ধারণ করতে পারে। সাধারণত জলাশয় সংলগ্ন পথে-মাঠে-ঘাটে ভুলার দৌরাত্ম্য বেশি। মধ্যরাত্রিতে ভুলা গৃহস্থকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে সারা রাত তাকে নাজেহাল করে বলে লোকমুখে শোনা যায়। ভুলা পরিচিত মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করে ডেকে নিয়ে যেতে পারে এবং বিপদে ফেলে দেয়। গ্রামাঞ্চলে তাই নিয়ম হলো, রাতে কেউ ডাকলে তিন ডাকের আগে সাড়া দিতে নেই। বোবা : রাতের বেলা ঘুমের মধ্যে মানুষের ওপর ভর করে এমন প্রেতাত্মার নাম বোবা। সাধারণ চিত হয়ে শুলে 'বোবায় পায়' পায়। এ সময় ভয় পেয়ে মানুষ বিকৃত স্বরে গোঙাতে থাকে, কিন্তু সহজে জাগতে পারে না। একেই 'বোবা পাওয়া' বলে। মামদো : মামদো হলো ভূতের শ্রেণীভুক্ত প্রেতাত্মা। এটি পুরুষ ভূত। মামদো ভূত বাতাসে মিশে থাকতে পারে। সে লোকালয়ের কাছে গাছ-গাছড়াকে আশ্রয় করে বাস করে। ভুলার মতো মামদোও অনিষ্টকারী ভূত। কন্ধকাটা : কন্ধকাটা অলৌকিক জীব। অঞ্চল বিশেষ কন্ধকাটা 'গলাকাটা মঙ্গলা' নামেও পরিচিত। কন্ধকাটা মানুষকে আস্ত গিলে খায়, এমন লোকভীতি প্রচলিত আছে। সে পথের পাশে ঝোপ-ঝাড়ে ও গর্তে বসবাস করে। জুজু : জুজু বা জুজুবুড়ি হলো স্ত্রীভূত। বৃদ্ধা পিশাচী। ছোট শিশুদের ভয় দেখানোর জন্য জুজুবুড়ির নাম করা হয়। জুজুবুড়ি ছোট ছোট বাচ্চাদের ধরে নিয়ে যায় বলে প্রচলিত আছে। সংস্কৃত ভাষায় 'জুঃ' শব্দের অর্থ পিশাচী। ফার্সিতেও 'জু' শব্দ আছে, যার অর্থ অনুসন্ধানকারী। আবার, পশ্চিম আফ্রিকার লৌকিক ভাষায় Juju শব্দটি পাওয়া যায়, যার অর্থ ছেলে ধরা। তিন ভাষার শব্দই প্রায় সমার্থবাচক। তবে কোন ভাষা থেকে শব্দটা এসেছে, তা জানা যায় না। শাঁখচুন্নি : শাঁখচুন্নি শাকচুন্নি নামেও পরিচিত। শাঁখচুন্নি সধবা নারীর প্রেতাত্মা। এদের ছোট শিশুর ওপর লোভ থাকে। এরা গাছের আড়ালে আবাডালে থাকে এবং একা পেলেই শিশুর ওপর ভর করে। কোনো শিশু ক্রমশ শুকিয়ে গেলে বা অনবরত কাঁদতে থাকলে ধারণা করা হয় যে, তাকে শাঁখচুন্নি ধরেছে। চোরাচুন্নি এবং সোবোচুন্নিও এই প্রকৃতির নারী প্রেতাত্মা। টাকরা-টাকরি : লোককথায় টাকরা-টাকরি নামক প্রেতাত্মার উল্লেখ পাওয়া যায়। এরা ছোট ছোট শিশুদের ধরে খেয়ে ফেলে বলে প্রচলিত আছে। এরা অশরীরী প্রতাত্মা। ব্রহ্মদৈত্য : ব্রহ্মদৈত্য পরোপকারী জীবাত্মা। অভিশাপগ্রস্ত ব্রাহ্মণরা মারা গেলে ব্রহ্মদৈত্য হয়। এরা দুস্থ ও দুঃখীদের সাহায্য করে। কিচনি ও জলকেওরি : আকাশ ও স্থলের মতো পানিতেও অলৌকিক জীব বাস করে। কিচনি ও জলকেওরি হলো পানির জীব। কিচনি বদ্ধ পুকুর বা জলাশয়ে বসবাস করে। যে জায়গার পানি যত বেশি গভীর ও কালো, সেখানে কিচনি থাকার সম্ভাবনা তত বেশি। কিচনির লম্বা লম্বা কালো চুল থাকে বলে প্রচলিত রয়েছে। জলকাওরি হলো জলকুমারী ধরনের অতিপ্রাকৃত জীব। এরা নদীতে বাস করে। বিভিন্ন রকমের খাদ্য ভোগ দিয়ে কিচনি ও জলকেওরির উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।