ছবি সংগৃহীত

দীনি শিক্ষাসেবা ব্যবসার ক্ষেত্র হতে পারে না : প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি

প্রিয় ডেস্ক
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর ২০১৬, ১৭:৫৮
আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০১৬, ১৭:৫৮

(প্রিয়.কম) প্রিন্সিপাল মাওলানা আবু সালেহ রহমানি সমকালীন আলেমদের মধ্যে বহুমুখী প্রতিভাধর একজন ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধারে একজন গুণী লেখক, শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক, ইসলামি চিন্তাবিদ ও প্রাজ্ঞ ভাষাবিদ। তার লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয় বাবা মাওলানা ফজলুর রহমান (রহ.)-এর কাছে; যিনি লক্ষ্মীপুরের একজন নিভৃতচারী আলেমে দীন ও আধ্যাত্মিকপুরুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং এদেশে যাদের মাধ্যমে ইসলামের প্রাথমিক প্রচার-প্রসার সূচিত হয়েছে, তাদের অন্যতম বাগদাদ থেকে আগত শায়খ কামালুদ্দিন (রহ.) ও শায়খ জামালুদ্দিন (রহ.)-এর অধস্তন পুরুষ ছিলেন তিনি। ছাত্রজীবনে মাওলানা রহমানি কোরআন হিফজ করেন হাফেজ্জি হুজুর [রহ.] প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা-ই-নূরিয়া থেকে এবং ১৯৯৫ সালে দেশের শীর্ষস্থানীয় দীনি প্রতিষ্ঠান জামেয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকা থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। এরপর উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ইসলামি বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে হাদিস শাস্ত্রের উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। এ ছাড়াও পরবর্তীকালে তিনি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নতক ও স্নাতকোত্তর পাশ করেন।


কর্মজীবনে মাওলানা রহমানি ‘আল-মাহাদুল ইসলামি’ ও ‘মাদরাসাতুল কাওসার’-এ কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন। একই সময়ে পত্রিকায় লেখালেখি ও সম্পাদনার কাজও আঞ্জাম দিয়েছেন। অবশেষে ২০০০ সালে ঢাকার উত্তরায় প্রতিষ্ঠা করেন একটি কওমি মাদরাসা- মাদরাসাতুল হিকমাহ আল-ইসলামিয়া। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে তিনি এই মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং মাদরাসার পরিবেশ, প্রযুক্তির ব্যবহার, আধুনিক সিলেবাস ও নানান গবেষণাধর্মী কার্যক্রমের মাধ্যমে দীনি শিক্ষা জগতে এক বৈপ্লবিক আবহের সূচনা ঘটিয়েছেন।


মাওলানা রহমানি মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারেও অংশগ্রহণ করেন এবং তিনি শিক্ষা ও গবেষণা উপলক্ষে সৌদিআরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, মালয়েশিয়া, সাদ, থাইল্যান্ড, ইথিওপিয়া, লিবিয়া, উগাণ্ডা, নাইজার, ভারত ও মৌরিতানিয়াসহ প্রায় ২১টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। দীর্ঘ সময় যাবত তিনি ঢাকার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মসজিদে খাতিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ইতোমধ্যে তিনি বাংলা, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় বেশকিছু গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং শিক্ষা বিষয়ক কয়েকটি গ্রন্থও রচনা করেছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে ‘আল-আরাবিয়া লিস-সিগার’, ‘ইংলিশ ইন ইজি ওয়ে’ ও ‘হজের সফর’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, আরো বেশ কিছু গ্রন্থ প্রকাশিতব্য। প্রিয়.কমের পক্ষ থেকে ইসলামি শিক্ষা, শিক্ষা বাণিজ্য, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা বিষয়ে এই গুণীব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন প্রিয় ইসলাম বিভাগের এডিটর ইনচার্জ মাওলানা মিরাজ রহমান ও কনটেন্ট রাইটার মাওলানা মনযূরুল হক

প্রিয়.কম : আপনি কেনো একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করলেন?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : বেশ কিছু উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রসর হয়েছি। আমার মাদরাসা প্রতিষ্ঠার নেপথ্যের একটি উদ্দেশ্য হলো, কওমি মাদরাসার খেদমতের ব্যপ্তি অনেক বিশাল। কিন্তু ব্যবস্থাপনাগত কিছু ত্রুটির কারণে বিশাল একটি শ্রেণির লোক দীনি শিক্ষা গ্রহণ করলেও অন্য এক শ্রেণি দীনি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। বঞ্চিত শ্রেণির মধ্যে সমাজের অভিজাত ও ধনী শ্রেণিটি উল্লেখযোগ্য। সামগ্রিকভাবে এই শ্রেণির লোকদের সন্তানদের ইলমে দীন শিক্ষার ব্যবস্থাপনা আমাদের কওমি মাদরাসায় নেই বললেই চলে। তাই প্রথম থেকে আমার প্রচেষ্টা ছিলো- সাধারণ শ্রেণির মানুষসহ অভিজাত ও ধনী লোকদের সন্তানরা যেনো কুরআন ও সুন্নাহের ইলম থেকে বঞ্চিত না হয়। এই লক্ষ্যেই আমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছি।


সচ্ছল লোকদের সন্তানরা মাদরাসায় এলে ভিন্ন একটি উপকারিতাও রয়েছে। তা হলো, একজন নিম্নবিত্ত লোকের সন্তান দীনের কথা যতটা জোর দিয়ে বলতে পারবে, তার চেয়ে অনেক সৎ সাহস নিয়ে বলতে পারবে একটি সচ্ছল ঘরের সন্তান।
আমার মাদরাসা করার আরো একটি উদ্দেশ্য হলো, এ দেশের কওমি মাদরাসাগুলো সাধারণত পরিচালিত হয় জাকাত, ফেতরা, সাদাকাহ, মান্নত ও কোরবানির পশুর চামড়া দানের অর্থ দিয়ে। ধনী শ্রেণির সন্তানরা মাদরাসায় ভর্তি হলে অনেক সময় তাকেও সেই অর্থের খাবার ও ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হয়, অথচ এই অর্থ সকল শ্রেণির লোকের গ্রহণ করা জায়েজ নেই। ইলমে দীন হচ্ছে একটি নূর আর জাকাতসহ অন্যান্য দান-সাদাকাহর টাকা হচ্ছে নূরের বিপরীত বিষয়। তাই মাদরাসাতুল হিকমাহর সূচনা থেকে আমরা চেষ্টা করছি এই ধরনের কোনো অর্থ গ্রহণ না করে স্বনির্ভর একটি দীনি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে।

প্রিয়.কম : আপনি কোথায় কোথায় কী কী পড়াশুনা করেছেন এবং কোথায় কোথায় কী কী চাকরি করেছেন?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি: আমার পড়াশুনা জীবনের হাতেখড়ি হয়েছে আমার বাবার কাছে। এরপরে চট্টগ্রামে হাইলধর মাদরাসাতে ভর্তি হয়েছি। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মূলত আমার প্রাথমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরু হয়। কুরআন হেফজ করি ঢাকাস্থ জামেয়া নূরিয়া মাদরাসাতে ১৯৮৭ সালে। এরপরে মাদরাসাতুল মদিনাতে জালালাইন জামাত পযর্ন্ত পড়ি। মালিবাগ জামিয়া শারইয়্যা থেকে মেশকাত ও দাওরা শেষ করি। দারুল উলুম দেওবন্দ গিয়ে দাওরাতুল হাদিসের ক্লাসটি আবার পড়ি। সাথে সাথে হাদিস বিষয়ে উচ্চতর লেখাপড়া করি। এসবের পাশাপাশি সরকারি মাদরাসা থেকে দাখিল ও আলিম পরীক্ষা দিয়েছি। দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজে অনার্স করেছি ও মাস্টার্স করেছি। এই সব একাডেমিক লেখাপড়ার পাশাপাশি আমি বাংলা সাহিত্য নিয়ে বিভিন্ন ওস্তাদের কাছে পড়েছি। বিশেষ করে ড. কাজী দীন মুহাম্মাদ স্যারের কাছে বাংলা সাহিত্যের চর্চায় বেশ সময় ব্যয় করেছি।
আমি কোনো মাদরাসাতে চাকরি করিনি। ‘মাদরাসাতুল কাউসার আল ইসলামিয়া’তে কিছুদিন খেদমত করেছি। এর আগে মাওলানা ইয়াহইয়াহ ইউসুফ নদভি প্রতিষ্ঠিত ‘আল মাহাদুল ইসলামী বাংলাদেশ’-এ কিছুদিন খেদমত করেছি। আর চাকরি করেছি ‘মাসিক আর্দশ মা’ নামের একটি পত্রিকাতে। সেখানে নির্বাহী সম্পাদক হিসাবে তিন বছর ছিলাম।

প্রিয়.কম : প্রাসঙ্গিকক্রমেই প্রশ্নটি করছি- মাদরাসা বা মসজিদের কর্মগুলোকে আলেম-ওলামা জব বা চাকরি বলতে নারাজ। তারা বলেন আমরা খেদমত করছি। আপনিও বললেন, আমি কোনো মাদরাসাতে চাকরি করিনি খেদমত করেছি। আবার বললেন, পত্রিকাতে চাকরি করেছি। বিষয়টি যদি একটু বুঝিয়ে বলতেন।
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : জি, আমি কথা দুটি বুঝে এবং সচেতনতার সাথেই বলেছি। একজন আলেম একটি মাদরাসাতে বা একটি মসজিদে যে পরিমাণ সময়, শ্রম ও মেধা ব্যয় করেন; তুলনামূলকভাবে তিনি সেখান থেকে সেই পরিমাণের আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা-সহযোগিতা গ্রহণ করেন না। চাকরি বা জবের ক্ষেত্রে একজন কর্মীর আর্থিক সুবিধা বা সহযোগিতার বিষয়টি থাকে মুখ্য আর একটি মাদরাসা বা মসজিদে একজন আলেমের সংযুক্ত থাকার নেপথ্যে দীনের খেদমত করার মানসিকতা থাকে মুখ্য। সুতরাং মাদরাসা বা মসজিদের কর্মকে জব বা চাকরি বলা উচিতও না, যৌক্তিকও না।   

প্রিয়.কম : আমরা দেখি আলেমরা সাধারণত আরবি-উর্দূ ভাষা নিয়ে কাজ করেন এবং এ ভাষাতেই বিভিন্ন বই লেখেন। আপনাকে দেখছি, আলেম হয়েও ইংরেজি বই লিখেছেন, এর উদ্দেশ্য কী?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, মাদরাসার শিক্ষার্থীদের ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজন অনেক বেশি। মাদরাসার শিক্ষার্থীদের প্রধানত আরবি ভাষাটা ভালোভাবে শিখতেই হবে। মাতৃভাষা হিসেবে বাংলাটাও ভালোভাবে জানবে এবং সাথে সাথে ইংরেজি ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তাও অপরিসীম। এই প্রয়োজন আমি অনুভব করেছি, তাই মাদরাসাতুল হিকমাহর সূচনা থেকে আরবি বাংলার পাশাপাশি গুরুত্ব সহকারে ইংরেজি পড়ানোর ব্যবস্থা রেখেছি এবং নিজে এই পথে অগ্রসর হয়েছি।

প্রিয়.কম : আপনার ইংরেজি বইটা কি শুধু মাদরাসার ছাত্রদের ইংরেজি শেখার জন্য?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : এই বইটা সবারই উপকার আসবে। তবে আমি বইটা রচনা করার সময় বিশেষত মাদরাসার ছাত্রদের কথা বিবেচনা করে রচনা করেছি। কেননা, বইটিতে গ্রামারের বিষয়গুলো শেখার ক্ষেত্রে আমি আরবিকে ফলো করেছি। যার ফলে বইটি মাদরাসার ছাত্রদের জন্য সহজ হবে।

প্রিয়.কম : মাদরাসাতুল হিকমাহ আল ইসলামিয়াহর ইতিহাস তথা পথচলা বিষয়ে যদি কিছু বলতেন ?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : মাদরাসাতুল হিকমাহ আল ইসলামিয়াহর চিন্তাগত-পরিকল্পনাগত সূচনা হয়েছে মূলত আমার ছাত্রজীবন থেকেই। ছাত্রজীবনে পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন লালন করেছি এবং প্রতিদিনের ডায়েরির পাতায় এর প্রতিফলনও ঘটিয়েছি কমবেশি। শিক্ষাজীবনের প্রাতিষ্ঠানিক সমাপ্তিক্ষণে মালিবাগ মাদরাসায় শিক্ষকতার প্রস্তাব পেয়েও আমি সেখানে যোগদান করিনি। ছোট্ট পরিসরে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছি। মাদরাসাতুল হিকমাহর প্রতিষ্ঠাগত চিন্তাভাবনার শুরু হয় ১৯৯৪ সাল থেকে আর এর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম চালু হয় ২০০০ সালে।

প্রিয়.কম : যে-কোনো শিক্ষা প্রদানের সেবা বা ব্যবস্থাপনাকে হালাল ব্যবসা হিসাবে গ্রহণ করা যাবে কিনা?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : এই বিষয়টা একটি গভীর বিষয় এবং দীর্ঘ আলোচনারও বিষয়। তার সাথে দৃষ্টিভঙ্গিরও একটা বিষয় যুক্ত রয়েছে। প্রথমত: শিক্ষা হচ্ছে একটি মৌলিক ও নাগরিক অধিকার। প্রতিটি রাষ্ট্রের উচিৎ সব নাগরিকের শিক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র যদি তার দায়িত্বে এই কাজ করে, তাহলে এই খাতে ব্যবসার কোনো প্রকার সুযোগ থাকে না।
দ্বিতীয়ত: আমরা এমন একটি রাষ্ট্রে বাস করি যেখানে সাধারণভাবে শিক্ষার জন্য স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। আমরা যারা প্রাইভেটভাবে মাদরাসা পরিচালনা করছি এবং সেখানে ইলমে দীন শিক্ষা দিচ্ছি, তারা এই দীন শেখানোর প্রক্রিয়াটিকে বাণিজ্য হিসাবে নেবো কি নেবো না এই ক্ষেত্রে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে। তবে আমার দৃষ্টিভঙ্গি হলো এটাকে ব্যবসার খাত বানানো ঠিক হবে না। অবশ্য কেউ যদি এটাকে ব্যবসার খাত বানায় তাহলে হালাল হওয়ার জন্য তাকে কিছু বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। একজন ছাত্র যে বেতন দেবে তার বিপরীতে যদি ইলম শিক্ষা দেয়া যথেষ্ট হয়; তাহলে সেখান থেকে কিছু আর্থিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা যেতে পারে। এইভাবে করলে হারাম হওয়ার কিছু দেখি না। তবে এখানে নীতি-নৈতিকতার একটা বিষয় থেকে যায়। অনেকে বলে থাকেন বা বলতে পারেন তাহলে কী আতর, টুপি, পাঞ্জাবী বা কিতাব-পত্রের ব্যবসা করা যাবে না? আমি তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই- ইসলামি বা ইলমি বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা এবং শিক্ষা বা ইলমি সেবা প্রদান ব্যবসাকে একদৃষ্টিতে দেখা ঠিক হবে না।

প্রিয়.কম : আমরা দেখতে পাই সাহাবা আজমাইন, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনদের সময়ে যারা ইলমে দীন শিক্ষা গ্রহণ করতেন, তাদের খরচ শিক্ষকরা বহন করতো। কিন্তু বর্তমানে দেখছি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে খরচ নিচ্ছে। আমরা তো সাহাবিদেরকেই পথ প্রর্দশক হিসাবে মানি, তাহলে শিক্ষাসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে তাদের আর আমাদের মধ্যকার এই বৈপরীত্য কেনো?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : আমাদের পূর্বসূরি আকাবিরদের সময় পড়ালেখার বিষয়টা এখনকার মতো ছিলো না। তখনকার দিনে শিক্ষা গ্রহণ বা প্রদানের এমন প্রাতিষ্ঠানিক রূপও ছিলো না। তখন একজন শিক্ষার্থী একজন শিক্ষকের কাছে নির্দিষ্ট কোনো বিষয় দুই অথবা তিন বছরের জন্য পড়তে যেতো। এসময় শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের গবাদি পশু পালন ও কৃষি জমির কাজসহ নানান কাজ করে দিতো। এককথায় একজন শিক্ষার্থী তখন শিক্ষকের পরিবারভুক্ত সদস্য হিসেবে থাকতো এবং শিক্ষা গ্রহণ করতো। তাই শিক্ষকরা তাদের খাবারের বিষয়টা দেখতেন। এটা কোনো শর্তের মধ্যে ছিলো না। এখনকার প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়েছে। আর এই প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের নেপথ্যে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও রয়েছে।

প্রিয়.কম : কেউ যদি শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান করে তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিৎ? শিক্ষা কারিকুলাম কেমন হওয়া উচিৎ? পড়ালেখার মান এবং খাওয়-দাওয়াসহ যাবতীয় পরিবেশটা কেমন হওয়া উচিৎ?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : এই বিষয়গুলো স্থান-কাল-পাত্র ভেদে পরিবর্তন হবে। প্রথমত মুসলমানদের সকল কাজের উদ্দেশ্য হওয়া প্রয়োজন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। শিক্ষা কারিকুলাম কেমন হবে এটা আসলে প্রতিষ্ঠাতার চিন্তাচেতনার ওপর নির্ভর করবে। কেউ যদি মনে করে শুধু দীনি শিক্ষা রাখবেন সেটাও রাখতে পারবেন। আবার কেউ যদি মনে করে যে দীনি শিক্ষার সাথে সাথে আধুনিক শিক্ষা রাখবেন সেটাও রাখতে পারবেন। পড়ালেখার, খাওয়া-দাওয়াসহ যাবতীয় পরিবেশটা কেমন হবে, এই প্রশ্নের উত্তরে বলেবো- এটা একটা আপেক্ষিক বিষয়। তবে শিক্ষার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ হওয়া প্রয়োজন। একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য সুন্দর ক্লাসরুমের প্রয়োজন আছে, পাঠাগারের প্রয়োজন আছে, এমনকি খেলার মাঠেরও প্রয়োজন আছে। এই বিষয়গুলোকে আমি অনেক বেশি অনুভব করি। খাবারের বিষয়টা ভালো হওয়া বাঞ্ছনীয়। প্রধানত: একটি আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ্য শিক্ষকম-লীর থাকার কোনো বিকল্প নেই।

প্রিয়.কম : আপনার প্রতিষ্ঠানের নাম মাদরাসাতুল হিকমাহ আল ইসলামিয়াহ কেনো রাখলেন?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ‘হিকমাহ’ শব্দটি বারবার ব্যবহার করেছেন এবং প্রত্যেক নবীকেই হিকমাহ দেয়া হয়েছে। এই ক্ষেত্রে আমার কাছে আদর্শ আয়াত হচ্ছে- ‘আল্লাহ যাকে চান তাকে তিনি হিকমাহ দান করেন এবং যাকে হিকমাহ দান করা হয়, সে প্রভূত কল্যাণের অধিকারী হয়।’ (সূরা বাকারা, আয়াত ২৬৯)
মাদরাসাতুল হিকমাহ আল-ইসলামিয়াহর ছাত্রদের আমরা যদি এই হিকমাহর সামান্য কিছুও দিতে পারি তাহলে আল্লাহর ঘোষণা মতে তারা সব থেকে বড় কিছু পেয়ে গেলো। এটা হলো আমাদের প্রধান বিষয়। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের নাম নির্বাচন করার ক্ষেত্রে পৃথিবীর ইতিহাসের সব থেকে বড় ইলমি বাতিঘর ‘বায়তুল হিকমাহ’র ইতিহাসটাও আমার মাথায় ছিলো।

প্রিয়.কম : বর্তমানে বাংলাদেশে কত ধরন বা ধারার ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা আছে?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : বাংলাদেশে চলমান মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত। এক. আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা। দুই. দরসে নেজামি বা কওমি মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা। তবে কওমি মাদরাসার মাঝেও আবার কয়েকটা ধরন-পদ্ধতির প্রতিষ্ঠান আছে। একটা হচ্ছে মাদানি নেসাব, আরেকটা হচ্ছে দরসে নেজামি বা পুরনো নিসাব। এখন আবার কেজি ও ক্যাডেট মাদরাসাও বেশ দেখা যাচ্ছে।

প্রিয়.কম : আপনার মাদরাসাকে আপনি কোন ধারায় পরিচালিত করছেন এবং কেনো করছেন?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : আমি মূলত দারুল উলুম দেওবন্দের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মাদরাসাতুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠা করেছি। আসল কথা হচ্ছে- এই মাদরাসার প্রতিষ্ঠা হয়েছে তাকওয়ার উপর ভিত্তি করে। সাথে সাথে এখন সময়ের প্রয়োজন পূরণ করার চেষ্টা করছি। সাহাবিদের মতাদর্শ ও আকাবিরের মানহাজকে সামনে রেখে আমি বাংলা, ইংরেজি ও গণিত শিক্ষার ব্যবস্থা করেছি। মূলধারার শিক্ষাকে ঠিক রেখে আমি কিছু সংযোজন ও বিয়োজন করেছি মাত্র। আল্লাহ প্রদত্ত খেলাফতের দায়িত্ব পালন করার জন্যে অনেক কিছু শিক্ষার প্রয়োজন আছে। তাই আমার ছাত্রদের আমি সরকারি পরীক্ষা দিতে দিই, তবে এটা মাদরাসাতুল হিকমাহর মূল উদ্দেশ্য নয়। বরং এটা মানাজিলে মাকসাদের পৌঁছার একটি সিঁড়ি মাত্র।


মাদরাসাতুল হিকমাহ আল ইসলামিয়াহর নিজস্ব একটি শিক্ষা কাঠামো রয়েছে। আমাদের শিক্ষা কাঠামোটা ঠিক এমন- Childrens Gardens (শিশু কানন)। এই বিভাগের কোর্স মেয়াদ তিন বছর। বয়স : ৫ থেকে ৭ বছর। পাঠ্যক্রম- মকতব ও নার্সারী ১,২,৩। শিশুকানন থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর একজন শিক্ষার্থীর জন্য দুটি বিভাগ রয়েছে- যারা কোরআন হিফজ করতে ইচ্ছুক ও সক্ষম তারা ভর্তি হবে Hifzul Quran (হিফজুল কোরআন) বিভাগে। এই বিভাগের কোর্স মেয়াদ তিন বছর। বয়স : ৮ থেকে ১০ বছর। পাঠ্যক্রম- পবিত্র কোরআন হিফজ করা এবং ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণি মানের বাংলা, অংক ও ইংরেজি। শিশু কানন সমাপ্ত করার পর যারা হিফজুল কোরআনে ইচ্ছুক বা সক্ষম নয় তারা ভর্তি হবে Primary Section (ইবতেদায়ী বিভাগ)-এ। এই বিভাগের কোর্স মেয়াদও তিন বছর। বয়স : ৮ থেকে ১০ বছর। পাঠ্যক্রম- ৩য়, ৪থ ও ৫ম শ্রেণি। হিফজুল কোরআন বা ইবতেদায়ী বিভাগ পাশ করার পর একজন শিক্ষার্থী ভর্তি হবে Junior Secondary Section (নিম্ম মাধ্যমিক বিভাগ)-এ। এই বিভাগের কোর্স মেয়াদ ৩ বছর। বয়স : ১১ থেকে ১৩ বছর। পাঠ্যক্রম- জামাতে হেদায়েতুন্নাহু এবং ৬ষ্ঠ, ৭ম ও ৮ম শ্রেণি। এই বিভাগ সমাপ্ত করার পর শিক্ষার্থীরা ভর্তি হবে Secndary Section (মাধ্যমিক বিভাগ)-এ। এই বিভাগের কোর্স মেয়াদ দুই বছর। বয়স : ১৪ থেকে ১৫ বছর। পাঠ্যক্রম- জামাতে শরহে বেকায়াহ এবং নবম ও দশম শ্রেণিসহ দাখিল পরীক্ষা। মাধ্যমিক বিভাগ পাশ করার পর শিক্ষার্থীরা ভর্তি হবে Higher Secndary Section (উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগ)-এ। এই বিভাগের কোর্স মেয়াদ দুই বছর। বয়স : ১৬ থেকে ১৭ বছর। পাঠ্যক্রম- জামাতে জালালাইন এবং আলিম প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষসহ আলিম পরীক্ষা।


মাদরাসাতুল হিকমাহ আল ইসলামিয়াহতে বর্তমানে এই পর্যন্ত পড়াশুনার ব্যবস্থা রয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগ সমাপ্ত করার পর শিক্ষার্থীরা নিজস্ব উদ্যোগে মেশকাত ও দাওরাহ জামাত এবং সাথে সাথে অনার্স ও মাস্টার্স কমপ্লিট করে থাকে। তবে ইচ্ছা রয়েছে খুব শীঘ্রই আমরা আমাদের ব্যবস্থাপনায় মেশকাত, দাওরার ও অনার্সের সমন্বিত ৪ বছর মেয়াদরে কারিকুলাম এবং মাস্টার্সের সাথে তাখাস্সুস বিভাগ চালু করবো, ইনশা-আল্লাহ। 

প্রিয়.কম : মাদরাসাতুল হিকমাহ আল ইসলামিয়াহকে এদেশের প্রচলিত কওমি মাদরাসার সংস্কারের দিক থেকে একটা পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান হিসাবে আমরা জানি। এ বিষয়ে আপনার অনুভূতি কী?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : আমি যে উদ্দেশ্য নিয়ে মাদরাসা শুরু করেছি সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে আরো সময় লাগবে। আমি বুঝতে পারছি আমার উদ্দেশ্যের মাত্র ২০ ভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ৮০ ভাগ এখনো বাকি। যেদিন আমি সেই ৮০ ভাগ পূরণ করতে পারবো, সেদিন মনে করবো আল্লাহ হয়তো আমাকে কিছু সফলতা দিয়েছেন। আমি আরো একটা বিষয় মনে মনে লালন করি, সেটা হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চতর ইসলামি পড়াশুনা করতে যায় কিন্তু অন্য কোনো দেশ থেকে বাংলাদেশে মাদরাসা কেন্দ্রিক পড়াশুনা করতে কোনো শিক্ষার্থী আসে না। আমি চাই মাদরাসাতুল হিকমাহ আল ইসলামিয়াহ এমন একটি প্রতিষ্ঠান হবে, যেখানে বিশ্বের বিভন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা করতে আসবে, ইনশা-আল্লাহ।

প্রিয়.কম : দীনি শিক্ষা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সব ধরনের শিক্ষাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে এখন অনেকেই নিছক ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান বলে থাকে। এ সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : দীনি শিক্ষাসেবা বা সাধারণ শিক্ষাসেবা ব্যবসার ক্ষেত্র হতে পারে না। আর আমি এর যৌক্তিকতা কখনো দেখিনি।

প্রিয়.কম : প্রায় দুই যুগ যাবত আপনি দীনি শিক্ষাসেবা প্রদানে নিয়োজিত রয়েছেন। সুর্দীঘ এই সময়ে আপনার অর্জন এবং অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাই।
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : আসলে যা আশা করেছিলাম তা অর্জন করতে পারি নি। আর যা অর্জিত হয়েছে তাকে আমি খাটো করেও দেখি না। বড় কথা হচ্ছে, আমরা যে উদ্দেশ্য নিয়ে মাদরাসাতুল হিকমাহ শুরু করেছি অর্থাৎ দান গ্রহণ না করে দান করার মানসিকতা তৈরি করা। এই বিষয়টা আমার ছাত্রদের মাঝে আমি শতভাগ দেখতে পাচ্ছি। এটা আমার একটি ভালো অর্জন।
এখানে ভালো অভিজ্ঞতার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। মাদরাসার সূচনার সময় যখন আমি রাতের আঁধারে মাদরাসার বাথরুমগুলো পরিষ্কার করে রাখতাম; তখন আমার অনেক বেশি প্রশান্তি লাগতো। আমি যখন রাত ৩টার সময় উঠে দেখতাম ছেলেরা কুরআন পড়ছে, তখন আমার মন প্রশান্তিতে ভরে যেতো। আর তিক্ততা তো জীবনে থাকবেই। এটাকে ডিঙিয়ে যাওয়াই হলো কাজ।

প্রিয়.কম : বাংলাদেশের প্রচলিত বিভিন্ন ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা এবং বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে প্রচলিত ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : মানের দিক থেকে আমরা কিছুটা পিছিয়ে আছি।  আমাদের সীমাবদ্ধতা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কিছু সীমাবদ্ধতা। কর্মের সীমাবদ্ধতা। আমরা যা শিখেছি, তা প্রয়োগ করার সীমাবদ্ধতা। অন্যান্য দেশে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা অন্য শিক্ষার্থীদের মতোই সমানভাবে রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। তাই বলতেই হয় আমরা পিছিয়ে আছি। যদি শুধু দীনি ইলমের কথা বলা হয়, তাহলে আমরা অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের তুলনায় এগিয়ে আছি। আমি নিজে ২১টি দেশ ভ্রমণ করেছি, আমার কাছে বিষয়টা এমনই মনে হয়েছে।

প্রিয়.কম : একজন ছাত্র মাদরাসা থেকে ফারেগ হওয়ার পরে তার কর্মক্ষেত্র কী হওয়া উচিত?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : মাদরাসার ছাত্রদের কর্মক্ষেত্র সকল সেক্টরেই হওয়া উচিত। কেননা, প্রায় সকল সেক্টরেই ধর্মীয় একটা বিষয় থাকে। যে-কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে একজন ধর্মীয় উপদেষ্টা থাকা প্রয়োজন, যিনি ব্যবসায় হালাল হারামের পার্থক্যটা নির্ণিত করবেন।

প্রিয়.কম : আপনার এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করার ক্ষেত্রে আপনি কোন কোন প্রতিষ্ঠানকে আদর্শ মেনেছেন?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : বাংলাদেশে আমার এই প্রতিষ্ঠান থেকে উন্নত অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু আমি যে চিন্তা-চেতনা লালন করে মাদরাসাতুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠা করেছি, সেটা আমি অন্য কোথাও দেখিনি। তবে আমাদের চিন্তা চেতনার মূল প্রেরণা হলো দারুল উলুম দেওবন্দ।

প্রিয়.কম : কওমি মাদরাসার শিক্ষা সিলেবাসের সরকারি স্বীকৃতি নেওয়া না নেওয়া সম্পর্কে আপনার মতামত বা অবস্থান কী বা কেমন?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : এই বিষয়ে আমার পরিষ্কার মতামত হলো- কওমি মাদরাসা তাদের নিজেদের স্বকীয়তা নিয়েই চলা উচিৎ। সরকারের সাথে কোনো প্রকার সম্পর্কে না জড়ানোই উচিৎ। দেশের স্বাধীনতা সার্বোভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নিজেদের স্বকীয়তা ধরে রেখে চলা উচিৎ। স্বকীয়তা বজায় রেখে যদি সরকারি স্বীকৃতি অর্জন করা যায়, তাহলে সেটা নেয়াতে কোনো অসুবিধা নেই। স্বকীয়তা হচ্ছে, কুরআন সুন্নাহ তথা রাসূলের [সা.] আর্দশ সমাজে বাস্তবায়ন করা। আমাদের দায়িত্বটা অনেক বড়। কেননা, আমরা হলাম ওয়ারিসে নবী। এই উপাধী রাসূল [সা.] আমাদের দিয়েছেন। আমি একটা সার্টিফিকেট অর্জন করতে গিয়ে যদি ওয়ারাসাতে নবী হারিয়ে ফেলি- তাহলে আমার সার্টিফিকেট দিয়ে কী হবে? ওয়ারাসাতে নবীর মান ও আদর্শ ঠিক রাখার জন্য স্বীকৃতিসহ আরো কিছু বর্জন করার প্রয়োজন হলে তা-ও করতে হবে।

প্রিয়.কম : বাংলাদেশের অলিতে গলিতে কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। মাদরাসা প্রতিষ্ঠার এই গতিকে আপনি কি উন্নয়নগতি বলবেন নাকি ভিন্ন কিছু? এতো মাদরাসা প্রতিষ্ঠার কারণে শিক্ষামান ক্ষুণ্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কি না?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : মাদরাসা প্রতিষ্ঠার এই গতিকে আরো ১০০ ভাগ বাড়ানো উচিত। এর কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশের শিক্ষিত জনসংখ্যার শতকরা ৯০ জন স্কুল-কলেজে পড়ে। আর মাদরাসায় পড়া শিক্ষিত পাওয়া যাবে শতকরা ১০ জন। তাই আমি চাই, মাদরাসার সংখ্যা বৃদ্ধি পাক। তবে কেউ যদি শুধু বেকারত্ব ঘোচানোর জন্য মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় মনযোগী হয়, আমি সেটারও বিরোধিতা করি। আমরা জানি, প্রতি ১০ জন লোকের জন্য একজন চিকিৎসক ও একজন আইন উপদেষ্টার থাকার প্রয়োজনকে মৌলিক অধিকার মনে করা হয়। এই প্রেক্ষিত বিবেচনায় আমি বলতে চাই, প্রতি ১০ জন মুসলমানের রূহ ও দিল হেফাযতের জন্য একজন রূহের চিকিৎসক ও একজন শরীয়তের আইন উপদেষ্টা বিদ্যমান থাকাও মৌলিক অধিকার।

প্রিয়.কম : শিক্ষার্থীদের থেকে নেওয়া অর্থ দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার পর যদি কোনো অর্থ উদ্বৃত্ত থাকে তাহলে তা কী করা উচিত? আপনার প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন হলে কী করেন?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : এই বিষয়টা সম্পূর্ণভাবে মাদরাসা প্রতিষ্ঠাতার ওপর নির্ভর করবে। প্রথমে জানতে হবে, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি যে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, তার উৎস কী? এটা যদি তার নিজস্ব অর্থ হয় তাহলে উদ্বৃত্ত অর্থ গ্রহণ করা অনৈতিক কিছু হবে না। আর যদি বিষয়টা এমন হয়, যে-অর্থ দিয়ে তিনি মাদরাসা করেছেন তা ১০ জনের থেকে দান হিসেবে নেওয়া, তাহলে উদ্বৃত্ত অর্থ গ্রহণ করার কোনো সুযোগ তার থাকবে না। তবে আমার মনে হয় উভয় ক্ষেত্রে মাদরাসা পরিচালনার পর উদ্বৃত্ত অর্থ আগামী দিনের শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের পিছনে ব্যয় করা উচিত, যেমনটা মাদরাসাতুর হিকমাহ করে থাকে।

প্রিয়.কম : কেউ যদি বেশি বেশি উদ্বৃত্ত অর্থ গ্রহণ করার মানসিকতায় ছাত্রদের দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাহলে কী হবে?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : প্রতিশ্রুতি দুই ধরনের হতে পারে- এক. সন্তানকে ভালো আদর্শ মানুষ বানানোর প্রতিশ্রুতি। দুই.  ভালো খাওয়ানো এবং ভালো পরিবেশে রাখার প্রতিশ্রুতি। প্রথম প্রতিশ্রুতিটা তো ধরা-ছোঁয়া যায় না এবং কোনো নিয়ন্ত্রকও নেই। এটা কমবেশি হতে পারে। কিন্তু ভালো খাবার ও ভালো আবাসন প্রদানের প্রতিশ্রুতিতে কমবেশি করে টাকা জমানোর চেষ্টা করা জায়েজ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

প্রিয়.কম : নতুন কোনো দ্বীনি শিক্ষা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাকারী নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন!
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : প্রথম উপদেশ হচ্ছে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য মাদরাসা করবে। সাথে সাথে দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য কাজ করবে। ওয়ারিসে নবী তৈরির মানসিকতা নিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবে এবং আমি বলবো কিছুতেই এর মাঝে ব্যবসা করার নিয়ত রাখা ঠিক হবে না।

প্রিয়.কম : অনেক সময় দেখা যায় অনেকে দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করার পর তা বেশি দিন টিকিয়ে রাখতে পারেন না...
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : প্রথম কথা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের মধ্যে ভেজাল থাকলে সেটা বেশি দিন টিকবে না। দ্বিতীয় হচ্ছে, অদূরদর্শিতার কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অল্প দিনেই ভেঙ্গে যায়। একটি মাদরাসা চালাতে যে পরিমাণ অর্থ যোগান দেয়া প্রয়োজন বা লোকবল প্রয়োজন তা ঠিক মতো যোগান দিতে না পারলে বা আয়োজন করতে ব্যর্থ হলে কোনো প্রতিষ্ঠানই বেশিদিন টিকবে না।

প্রিয়.কম : শিক্ষাসেবা দান করাকে কেউ পেশা হিসাবে নিতে পারবে কি?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : শিক্ষা সেবা দান করাকে পেশা হিসাবে নেয়ার মাঝে আমি তো কোনো অসুবিধা দেখি না। একজন মানুষ তার মেধা শ্রম সব দিচ্ছে, এটা এখানে না দিয়ে সে যদি ব্যবসায় ব্যয় করতো, তাহলে তো সে আর্থিকভাবে লাভবান হতো। শিক্ষকদের এক সময় বাইতুল মাল থেকে বেতন দেয়া হতো, এখন তো আর তেমন কিছু নেই। সুতরাং শিক্ষা সেবা দান করাকে পেশা হিসাবে নেয়াতে দোষের কিছু নেই।

প্রিয়.কম : আমরা আলিয়া বা জেনারেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালে দেখতে পাই তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো একটা বোর্ড থেকে পরিচালিত হচ্ছে অথচ কওমি মাদরাসার ক্ষেত্রে দেখা যায় বিভিন্ন বোর্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : আমরা কওমি আলেম সমাজ এক নেই, এটা আসলে একটা দু:খজনক ব্যাপার। আল্লাহ তো বলেছেন- তোমরা এক থাকো, বিচ্ছিন্ন হয়ো না। অথচ এই মূল মন্ত্রটা আমরা ভুলে গেছি। কওমি মাদরাসার মৌলিকভাবে একটা বোর্ড হওয়া উচিৎ। একটি কেন্দ্রীয় বোর্ডে আওতায় আরো ছোট ছোট বোর্ড থাক��ে পারে। তবে কেন্দ্রীয় বোর্ড একটাই হওয়া উচিত। এবং সেখানে একটা গবেষণা কেন্দ্র থাকতে পারে- যারা ভাববে কীভাবে আরো উন্নয়ন করা যায়। যুগের চাহিদা অনুযায়ী সিলেবাসে কী কী পরিবর্তন আসতে পারে। আমরা ইতিহাস থেকে দেখতে পাই, একতাবদ্ধতা ছাড়া কোনো আন্দোলন সফলতার মুখ দেখেনি। তাই আমাদের একতাবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। এই উপলদ্ধি আামাদের মাঝে যতদিন আসবে না, ততদিন আমাদেরই ক্ষতি হবে।

প্রিয়.কম : মাদরাসাতুল হিকমাহ আল ইসলামিয়াহর ১৬ বছরের অর্জন সম্পর্কে কিছু বলুন?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : আসলে দীনি শিক্ষা সেবা প্রদান করার ক্ষেত্রে মূল অর্জন হচ্ছে আল্লাহ মহানের সন্তুটি এবং এর পাশাপাশি ভালো ও আদর্শ মানুষ তৈরি করা। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। মোটাদাগে যেসব বিষয়কে মাদরাসাতুল হিকমাহ আল ইসলামিয়াহর অর্জন হিসেবে উল্লেখ করা যায়, তহলো- ১. এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ জন হাফেজে কোরআন তৈরি হয়েছে। ২. প্রায় ৫৮০ জন ৫ম সমাপণী উত্তীর্ণ। ৩. ৩১৫ জন জেডিসি উত্তীর্ণ। ৪. ৩৬০ জন দাখিল উত্তীর্ণ। ৫. ১৩২ জন আলিম উত্তীর্ণ। ৬. প্রায় ১৩২ জন দাওরায়ে হাদিস উত্তীর্ণ। ৭. এটিএন বাংলা টেলিভিশন আয়োজিত জানতে চাই ২০১৩ এবং জ্ঞানের আলো ২০১৫ প্রতিযোগিতায় ঢাকার শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জন। ৮. ২০১১ সালে কাতারে এবং ২০১৪ সালে দুবাইতে আয়োজিত আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ। ৯. প্রায় ২০ জন শিক্ষার্থী স্কলারশিপ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। ১০. প্রায় ১০০ জন শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। ১১. এখন পর্যন্ত সকল বোর্ড পরীক্ষায় আমাদের অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট সর্বনিম্ন এ গ্রেড। ১২. আমাদের প্রশাসনিক সকল কার্যক্রম অনলাইন বেইজড সফটওয়্যার দ্বারা পরিচালিত এবং পুরো প্রতিষ্ঠান সিসি টিভি ক্যামেরায় নিয়ন্ত্রিত।   

প্রিয়.কম : বাংলাদেশেও বড় বড় মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছে কিন্তু নারীদের শিক্ষার বিষয়ে বিশেষ কোনো চিন্তা হয়নি। কেনো?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : আমি মনে করি নারীদের শিক্ষার সুস্থ ব্যবস্থা করা খুবই প্রয়োজন। আমাদের আসলে দৈন্যতার শেষ নেই। নারীদের জন্য একটি মাদরাসা করতে হলে যে আয়োজনের প্রয়োজন সে আয়োজন আসলে আমরা কেউই করতে পারছি না। তবে আমি মনে করি এই দিকে আলেম-ওলামাদের বিশেষভাবে দৃষ্টি প্রদান করা উচিত।

প্রিয়.কম : আমাদের মাদরাসার অঙ্গনে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের একটা অভাব লক্ষ্য করা যায়। আপনার এখানে এমন কোনো ব্যবস্থা আছে কি না?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : আমরা মনে করি যারা শিক্ষকতার পেশায় আসতে চান, যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিয়েই তাদের আসা প্রয়োজন। বর্তমানে আমাদের শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রদানগত একাডেমিক কোনো আয়োজন নেই, তবে আভ্যন্তরীণ আয়োজন রয়েছে। আমরা ভবিষ্যতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেবো, ইনশা-আল্লাহ।

প্রিয়.কম : বর্তমানে কওমি মাদরাসায় যে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে, এর কোন ক্লাস পর্যন্ত পড়লে ইলম অর্জনের ফরজিয়াত আদায় হবে?
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : কওমি মাদরাসায় প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন কোনো শ্রেণি বিভাজন তৈরি করা হয়নি। তবে এক বছর বা দুই বছরের একটা ক্লাস এমন রাখা উচিত, যেখানে শুধু ফরজিয়াত পর্যায়ের ইলম শিক্ষা প্রদান করা হবে।

প্রিয়.কম : কওমি মাদরাসায় প্রযুক্তিহীনতার একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু মাদরাসাতুল হিকমাহতে সবকিছু দেখছি প্রযুক্তিময়। এই বিষয়ে যদি কিছু বলতেন!
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : আমি আসলে পরিপূর্ণ প্রযুক্তি নির্ভর লোক নই। আর মাদরাসাতুল হিকমাহর সকল ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি ব্যবহার করেনি। প্রযুক্তি হলো জ্ঞান অর্জনের একটা মাধ্যম। এর দ্বারা ভালো জ্ঞান যেমন অর্জন করা যায়, তেমনি খারাপ জ্ঞানও অর্জন করা যায়। ছাত্রদের প্রযুক্তি ব্যবহার করার খারাপ দিক রয়েছে। কিন্তু আলেম হওয়ার পরে, তাদের চিন্তার পরিপক্কতা অর্জন হওয়ার পরে প্রযুক্তি শিখে ব্যবহার করতে কোনো অসুবিধা নেই বরং তখন এটা জরুরি।


আর প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি নির্ভর হলে বেশ কিছু উপকার রয়েছে। যেমন- মানুষ খেয়ানত করে কিন্তু প্রযুক্তি খেয়ানত করে না। দ্বিতীয়ত: প্রযুক্তি ব্যবহার করে যত নিখুঁত কাজ করা যায়, প্রযুক্তি ছাড়া সেটা সম্ভব না। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক অনেক বেশি লোকবল নির্ভর কাজ প্রযুক্তির ব্যবহার করে অল্প লোকবল দ্বারা সম্পাদন করা সম্ভব।

প্রিয়.কম : আমাদেরকে সুদীর্ঘ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
প্রিন্সিপাল আবু সালেহ রহমানি : গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার জন্য প্রিয়.কম কর্তৃপক্ষকে এবং আপনাদেরকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।