ছবি সংগৃহীত
তরিকার উৎপত্তি-ক্রমবিকাশ ও প্রসিদ্ধ চার তরিকা পরিচিতি
আপডেট: ১১ আগস্ট ২০১৬, ০২:৫২
তরিকা একটি ইসলামী পরিভাষা। ইসলামের আগমনের ফলে জ্ঞানের যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল তার বিভিন্ন বিভাগ ও শাখার মধ্যে এলমে তাসাউফ অন্যতম। এলমে তাসাউফের বিশেষ পরিভাষা হলো তরিকা। তরিকা আরবি শব্দ। এটি এক বচন, বহু বচন হলো তারাইক। প্রখ্যাত আরবি অভিধান লিসানুল আরবে এর অর্থ লেখা হয়েছে সিরাত, মাজহাব, অবস্থা। (লিসানুল আরব দশম খ-, ২২১ পৃষ্ঠা)। আল মুজামুল ওয়াফি অভিধানে (৬৫৮ পৃষ্ঠায়) এর আরও কতগুলো অর্থ লেখা হয়েছে, যেমন- পদ্ধতি, রীতি, উপায়, রাস্তা, পথ মত, মাধ্যম, স্তর। পরিভাষায় তরিকার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে জুরজানি বলেছেন, আল্লাহর পথের অনুসারীদের বিভিন্ন মানজিল অতিক্রম করে উঁচু স্তরে উন্নীত হওয়ার জন্য যে বিশেষ রীতি-পদ্ধতি তাই হলো তরিকা। (আত্তারিফাত লিল আল্লামা জুরজানি, পৃ. ১৪১)। ইসলামী জ্ঞানের অন্যান্য শাখায় যেমন পদ্ধতিগত ভিন্নতা রয়েছে তেমনি এলমুল কালামের ক্ষেত্রে আশরারি ও মাতুরিদি মতবাদ, ইলমে ফিকহের ক্ষেত্রে হানাফি, মালেকি, শাফেঈ ও হাম্বলি মাজহাব, ঠিক এলমে তাসাউফের ক্ষেত্রেও এ বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের ভিন্ন ভিন্ন রীতি-পদ্ধতি রয়েছে- এটাকেই বলা হয় তরিকা। এলমে ফিকহের ক্ষেত্রে যেমন প্রসিদ্ধ চার মাজহাবের ইমামদের নামানুসারেই মাজহাবের নামকরণ করা হয়েছে, তেমনি এলমে তাসাউফের তরিকাগুলোকেও বিশেষ সুফিসাধকদের নাম দ্বারা নামকরণ করা হয়েছে। যেমন চিশতিয়া তরিকা, কাদিরিয়া তরিকা, নকশেবন্দিয়া তরিকা, মোজাদ্দেদিয়া তরিকা। তবে এগুলো সংশ্লিষ্ট সুফিসাধকদের আবিষ্কৃৃত কোনো বিষয় নয়। এর মূল শিক্ষা রাসূলে পাক (সা.) থেকেই প্রমাণিত। সুতরাং তাসাউফের এসব তরিকাকে নব আবিষ্কৃত বেদাত বলার কোনো অবকাশ নেই। ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন ধারা রাসূলে পাক (সা.) এর সময়ে বর্তমানের মতো সুবিন্যস্ত ও গ্রন্থিত আকারে ছিল না। এগুলোকে সুবিন্যস্ত স্বতন্ত্র শাস্ত্রে রূপ দেয়ার জন্য উম্মতে ওলামায়ে কেরাম কঠোর শ্রম দিয়েছেন। রাসূলে পাক (সা.) এর জীবদ্দশায় তো কোরআন শরিফই গ্রন্থাকারে সঙ্কলিত হয়নি। হজরত আবু বকর ছিদ্দিক (রা.), হজরত ওমর (রা.) এর পরামর্শক্রমে একে মুসহাফ বা গ্রন্থাকারে একত্রিত করেন। এরপর একে চূড়ান্ত রূপদান করেন হজরত ওসমান (রা.)। এজন্য তাকে জামেউল কোরআন তথা কোরআন একত্রকারী উপাধি দেয়া হয়। এর অর্থ এই নয় যে, তার আগে কোরআন সঙ্কলিত হয়নি। হাদিস শরিফ সঙ্কলিত হয়েছিল ১০০ হিজরির পরে হজরত ওমর ইবনে আবদুুল আজিজের নির্দেশে ইমাম জুহরি কর্তৃক। এর অর্থ এ নয় যে, এর আগে হাদিসের কোনো সঙ্কলন ছিল না। তখন হাদিসের সঙ্কলন ছিল অসম্পূর্ণ ও অবিন্যস্ত। অধিকাংশ হাদিস ছিল অলিখিত। তিনি এগুলোকে লিখিত রূপ দান করেন। এলমে ফিকহকে সুবিন্যস্ত রূপদান করেন ইমাম আবু হানিফা (রহ.)। প্রথম এলমে উসুলে ফিকহ সঙ্কলন করেন ইমাম শাফেঈ (রহ.)। এলমে নাহু প্রথম সঙ্কলন করেন তাবেঈ আবুল আসওয়াদ দুয়াইলি। অথচ এসব শাস্ত্রের মূল উপাত্ত রাসূলে পাক (সা.) এর সময়েই বিদ্যমান ছিল। রাসূলে পাক (সা.) এর সময়ে এগুলো সঙ্কলিত হয়নি বলে যদি কেউ এগুলোকে অগ্রহণযোগ্য মনে করেন তাহলে এটা তার বোকামির পরিচায়ক এবং বাস্তবতাকে অস্বীকারের নামান্তর। একইভাবে তাসাউফের তরিকাগুলোর মূল উপাত্ত রাসূলে পাক (সা.) থেকেই সংগৃহীত। প্রতিটি তরিকার সিলসিলা বা ক্রমধারা রাসূলে পাক (সা.) পর্যন্ত সংযুক্ত রয়েছে। সুতরাং কোরআন পাকের নির্দেশিত আত্মশুদ্ধির জন্য সুফিসাধকদের সুবিন্যস্ত তাসাউফের তরিকাÑ যার প্রতিটি নিয়মকানুন হাদিস ও সাহাবিদের আমল দ্বারা প্রমাণিত, তা গ্রহণ করা নিঃসন্দেহে বেদায়াত হতে পারে না। আমরা যদি তরিকার উৎপত্তি সন্ধান করতে যাই তাহলে দেখব, তার অস্তিত্ব রাসূলে পাক (সা.) এর সময়েই প্রমাণিত। রাসূলে পাক (সা.) এর অবস্থা ও স্তরভেদে সাহাবিদের একেকজনকে একেক অজিফা বাতলে দিতেন। হজরত আলী (রা.) রাসূলে পাক থেকে নফি-ইসবাত ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ জিকির রপ্ত করেছিলেন। আর হজরত আবু বকর (রা.) রপ্ত করেছিলেন ইসমে মুফরাদ তথা ‘আল্লাহ’ জিকির। পরে এ দুটি ধারা বা তরিকা ‘তরিকায় আলুবিয়া’ এবং ‘তরিকায় বকরিয়া’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। এরপর এ দুটি ধারা গিয়ে একত্রিত হয় ইমাম আবুল কাসিম জুনাইদ (রহ.) এর কাছে। পরবর্তীকালে স্তরগুলো গিয়ে এ ধারা আবার দু’ভাগে ভাগ হয় ‘খালওয়াতিয়া’ (মুহাম্মাদ খালওয়াতি) এবং ‘নকশেবন্দিয়া’ (বাহাউদ্দিন নকশেবন্দি)। এ ধারা চলতে থাকে। পরে তাসাউফের চার দিকপালের আবির্ভাব হয়। তারা ওই ধারাকে আরও পরিমার্জিত ও সুগঠিত করেন। এ চারজন হলেন ১. সাইয়েদ আহমাদ রিফায়ি (রহ.) ২. সাইয়েদ আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) ৩. সাইয়েদ আহমাদ বাদাবি (রহ.) ৪. সাইয়েদ ইবরাহিম আদ্দাসুকি (রহ.)। পরবর্তীকালে তাদের তরিকা আরও বহু শাখায় বিভক্ত হয়েছে। উইকিপিডিয়াতে বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বে বহুল প্রচলিত ২৫টির মতো তরিকার উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ প্রথম খ-ে ৪১১ থেকে ৪১৫ পৃষ্ঠায় বিভিন্ন তরিকা ও তার শাখা-প্রশাখার একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাতে ১৮০টির মতো তরিকার নাম পাওয়া যায়। তবে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে তাসাউফের চারটি তরিকা সবিশেষ প্রসিদ্ধ। এগুলো হলো- কাদেরিয়া তরিকা : এ তরিকার ইমাম হলেন শায়খ মহিউদ্দিন আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)। তিনি পারস্যের জিলানে ৪৭০ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সাইয়েদ আবু সালেহ। তিনি হজরত ফাতেমা (রহ.) এর বংশধর ছিলেন। মাজহাবগত দিক দিয়ে তিনি হাম্বলি ছিলেন। ৫৬১ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার নামানুসারে এ তরিকাকে কাদেরিয়া তরিকা বলা হয়। তার থেকে ১৭ মধ্যস্থতায় এ তরিকা রাসূলে পাক (সা.) এর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এ তরিকার বহুল প্রচলন রয়েছে সিরিয়া, ইরাক, মিসর, পূর্ব আফ্রিকা, মরক্কো, বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে। নকশেবন্দিয়া তরিকা : এ তরিকার ইমাম হলেন হজরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দ আল বোখারি (রহ.)। তার প্রকৃত নাম মুহাম্মাদ ইবনে মোহাম্মাদ আল বোখারি। তার জন্ম হয় ৭১৮ হিজরি মহররম মাসে। তিনি ইন্তেকাল করেন ৭৯১ হিজরির ৩ রবিউল আউয়াল। বোখারা থেকে তিন মাইল দূরে কাছরাই আরকান নামক গ্রামে তার মাজার অবস্থিত। তার থেকে ২২ মধ্যস্থতায় এ তরিকায় রাসূলে পাক (সা.) এর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তার নামানুসারে এ তরিকার নামকরণ করা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশসহ মধ্য এশিয়া এবং সিরিয়ায় এ তরিকার অধিক প্রচলন রয়েছে। চিশতিয়া তরিকা : এ তরিকার ইমাম হলেন সুলতানুল হিন্দ গরিবে নেওয়াজ খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)। তিনি ৩৩৬ হিজরিতে ইরানের সিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন। তার ইন্তেকাল হয় ৬৬১ হিজরিতে ভারতের আজমির শরিফে। আনিসুল আরওয়াহ ও দলিলুল আরেফিন তার লিখিত তাসাউফবিষয়ক অনবদ্য ২টি কিতাব। তার নামানুসারে এ তরিকার নামকরণ করা হয়। তার থেকে ১৫ মধ্যস্থতায় এ তরিকা রাসূলে পাক (সা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে। এ তরিকার অধিক প্রচলন রয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশে। মোজাদ্দেদিয়া তরিকা : এ তরিকার ইমাম হলেন ইমামে রাব্বানি মুজাদ্দেদে আল ফেসানি শায়খ আহমাদ ফারুকি সরহিন্দি (রহ.)। তিনি ওমর ফারুকের বংশধর। ৯৭১ হিজরির ১৪ শাওয়াল তার জন্ম হয়। তিনি ইন্তেকাল করেন ১০৩৪ হিজরির ৮ সফর। ভারতের সরহিন্দে তার মাজার শরিফ অবস্থিত। তার লিখিত মাকতুবাত ৩ খ-ে প্রকাশিত হয়েছে। তার নামানুসারে এ তরিকার নামকরণ করা হয়। তার থেকে ২৮ মধ্যস্থতায় এ তরিকা রাসূলে পাক (সা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে। এ তরিকার অধিক প্রচলন রয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশে। তাসাউফের ক্ষেত্রে এসব তরিকার কোনো বিকল্প নেই। ফেরকায়ে নাজিয়া তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অন্তর্গত চার মাজহাবের ইমামরা কোনো না কোনো তাসাউফের তরিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ইমান তথা আকাইদের ক্ষেত্রে যেমন আমরা আশয়ারি বা মাতুরিদি আকিদায় বিশ্বাসী, ইসলাম তথা শরিয়তের ক্ষেত্রে মালেকি, হানাফি, শাফেঈ বা হাম্বলি মাজহাব অনুসরণকারী, তেমনি ইহসান তথা তাসাউফের ক্ষেত্রেও কোনো হক তরিকা অবলম্বন করা অপরিহার্য। লিখেছেন : মাওলানা মুহাম্মাদ সিরাজুম মুনীর গ্রন্থনা ও সম্পাদনা : মাওলানা মিরাজ রহমান সৌজন্যে : দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ