ছবি সংগৃহীত

তথ্যপ্রযুক্তিতে নামকরণে জটিলতা

Sayeed Islam
লেখক
প্রকাশিত: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৩, ১৩:৫৪
আপডেট: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৩, ১৩:৫৪

আমরা অনেকে সুযোগ পেলেই সরকারকে নানাভাবে দোষারোপ করে থাকি। অথচ মজার ব্যাপার হল, আমাদের দেশে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, প্রত্যেক সরকারই চায় উন্নয়নমূলক কাজ করতে। এসবের মধ্যে কিছু কাজ থাকে প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য আর কিছু কাজ থাকে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য। এপর্যন্ত সরকার কর্তৃক যত উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, উন্নয়নমূলক উদ্যোগ অপরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন। এর উদাহরণ অনেকেরই জানা। বিগত কেয়ারটেকার সরকার আমলের একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ হল, ভোটার আইডি কার্ড যা পরে জাতীয় পরিচয়পত্র বা ন্যাশনাল আইডি নামধারণ করে। শুরুতেই জাতীয় পরিচয়পত্র নামকরণ কেন করা হল না, তার উত্তর আমার জানা নেই। তবে, এটিকে এখনো অনেকেই ভোটার আইডি বলে থাকে। কারণ কার্ডটির নামকরণ ও প্রচারণা পরিকল্পনায় ভুল ছিল। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হল, আমাদের এখন একটি ন্যাশনাল ডেটাবেইজ আছে, যা অনেকক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে এবং ভবিষ্যতেও রাখবে। বর্তমানে প্রায় সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এখন ন্যাশনাল আইডি কার্ডের ব্যবহার অবধারিত, যাদের এটি নেই তাদের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট হল এর বিকল্প। তথ্য প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে এমআরপি বা মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট তৈরি করা হয়। এমআরপি পাসপোর্ট এর একটি বিশেষ পাতা স্বয়ংক্রিয় মেশিনে অপটিক্যাল সেন্সরের মাধ্যমে পড়ে পাসপোর্ট-বাহকের বিশেষ কিছু তথ্য সংগ্রহ করে। যেসব তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো হল, বাহকের পাসপোর্ট নম্বর, সারনেম বা লাস্টনেম, গিভেন নেম বা সারনেম ব্যতিত বাকি নাম গুলো, লিঙ্গ, জন্ম তারিখ, জন্মস্থান, জাতীয়তা, পাসপোর্ট প্রদানকারী দেশ বা প্রদানকারী কার্যালয়ের নাম, পাসপোর্ট প্রদানের তারিখ ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ। এসব ব্যতিত এই স্বয়ংক্রিয় মেশিন আর কোন তথ্য যেমন পিতার নাম, মাতার নাম, স্বামীর নাম, ঠিকানা, ইত্যাদির কোনটিই সংগ্রহ করে না বা সংগ্রহের প্রয়োজনও মনে করে না। যা আমাদের এমআরপি পাসপোর্টের একটি অতিরিক্ত পাতায় দেখা যায়, সাথে সাক্ষর ও স্বাক্ষরকারীর সিল (উন্নত বিশ্বে সিলকে স্ট্যাম্প বলা হয়)। এখানে উল্লেখ্য যে, উন্নত বিশ্বে এই তথাকথিত সিল বা স্ট্যাম্পের ব্যবহার নেই বললেই চলে অথচ আমাদের দেশের কাগজপত্রে যত বেশি সিল তার মূল্যায়ন ততই বেশি। এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানেই দেখা যায় অনর্থক নামবহনকারী সিল ব্যবহারের। যাদের জানা নেই, লাস্টনেম বা সারনেম হল বংশীয় পদবি অথবা বংশগত নাম আর ফার্স্ট নেম বা গিভেন নেম হল যে নামগুলো দেওয়া হয়। উদাহরন হিসেবে দুএকটি নাম ধরা যাক, 'সুশান্ত কুমার রায়' এখানে 'রায়' হল সারনেম বা লাস্ট নেম আর 'সুশান্ত কুমার' হল গিভেন নেম। ফার্স্ট নেম এর ক্ষেত্রে হবে 'সুশান্ত'। একি ভাবে 'ফারুক খান' নামের ক্ষেত্রে 'খান' হবে সারনেম বা লাস্ট নেম আর 'ফারুক' হবে গিভেন নেম বা ফার্স নেম। উন্নত বিশ্বে বা অন্যান্য দেশে মানুষকে তার ফার্স্ট নেম-এ ডাকা হয়। অফিসিয়ালের যোগাযোগের ক্ষেত্রে শুরুতে মিস্টার অতঃপর লাস্ট নেম ধরে ডাকা হয়। যেমন 'সুশান্ত কুমার রায়' এর ক্ষেত্রে তার বন্ধু বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশীরা, অফিস সহকর্মীরা তাকে 'সুশান্ত' বলে ডাকবে আর কোন অফিস থেকে তাকে 'মিস্টার রায়' বলে সম্বোধন করবে। 'ফারুক খান' নামের বেলায় ও 'ফারুক' হবে ডাক নাম আর অফিসিয়াল ক্ষেত্রে হবে 'মিস্টার খান'। আমাদের দেশে লাস্ট নেম অথবা সারনেম-এর ব্যবহার না থাকলেও এর ব্যবহার অনেক পরিবারেই আছে। বিশেষ করে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান পরিবারে এর ব্যবহার উল্লেখ্য। মুসলিমদের ক্ষেত্রে কিছু সংখ্যক পরিবারে এর ব্যবহার আছে, যেমন শেখ, চৌধুরী, কাজী, সৈয়দ, রাহমান, আহমেদ, সর্দার, তরফদার, তালুকদার, খান, ইত্যাদি। শেখ, হুসসেইন, কাজী, মোহাম্মদ বা সৈয়দ এর ক্ষেত্রে বেশ কিছু নামের প্রথমেই এর ব্যবহার হয় যেমন 'সৈয়দ সামসুল হক', 'কাজী নজরুল ইসলাম', 'মোহাম্মদ জাফর ইকবাল' ইত্যাদি। অন্যদিকে রাহমান, আহমেদ, চৌধুরী, খান অথবা তালুকদার এর ব্যাবহার নামের শেষে হয় যেমন 'খসরু চৌধুরী', 'হুমায়ূন আহমেদ', 'সামসুদ্দিন নবাব খান' ইত্যাদি। আমাদের ন্যাশনাল ডেটাবেজে নামের এই অংশসমূহ বিন্যাস করা হয়নি, অর্থাৎ সারনেম বা লাস্টনেম, গিভেন নেম(স) এর ব্যবহার নেই আর মূল তথ্যভান্ডারে এর বিন্যাস থাকলেও কার্ডে কোথাও এর উল্লেখ নেই। এর প্রধান কারণ হল, জাতীয় পরিচয়পত্র প্রকল্প পরিকল্পনায় এটি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এম আর পি পাসপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যেখানে লাস্ট নেম ও ফার্স্ট নেম এর ব্যবহার আছে এবং সাথে জাতীয় পরিচয়পত্র বাঞ্ছনীয় সেখানে নাম ব্যবহারে বেশ বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। ফর্ম পূরণ করার সময় জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম মিলিয়ে হুবুহু ভাবে নাম লিখতে হয়। অর্থাৎ আইডি কার্ডে যদি নাম লেখা থাকে 'কাজি শরমিলা' তাহলে ফর্মে সারনেইমের ঘরে লিখতে হবে 'শরমিলা' আর গিভেন নেম-এর ঘরে বসবে 'কাজি'। 'মোঃ হানিফ' নামের বেলায় 'হানিফ' হয়ে যাবে লাস্টনেম আর 'মোঃ' হবে 'মোহাম্মদ' যা বসবে গিভেন নেমসের ঘরে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে যখন তাঁরা বিদেশ ভ্রমনে যাবেন তাদেরকে যথাক্রমে "কাজি" ও "মোহাম্মদ" বলে ডাকা হবে এবং সেই দেশের এয়ারপোর্ট-এর পাসপোর্ট রিডার তাঁদের নাম এভাবেই পরবে এবং তা সংরক্ষণ করবে। বলা বাহুল্য যে, বিদেশে বেশির ভাগ বাঙালীদের নামই 'মোহাম্মদ'। অনেক মেয়েদের নাম 'মোসাম্মৎ' দিয়ে শুরু হয় সুতরাং সেক্ষেত্রে এমআরপি পাসপোর্ট এর নাম করণ অনুযায়ী বিদেশে 'মোসাম্মৎ রুমানা খাতুন' কে বন্ধু মহলে বা কর্মস্থলে ডাকা হবে 'মোসাম্মৎ' বলে আর অফিসিয়ালি তাকে সম্বোধন করা হবে 'মিস খাতুন' বলে। মজার ব্যাপার হল, বাংলাদেশে তিনি 'রুমানা' নামেই সবার কাছে পরিচিত। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, জন্ম নিবন্ধনের নামের সাথে ন্যাশনাল আইডি কার্ডের নামের হুবুহু মিল না থাকলে মহাবিপদ। বিশেষ করে পাসপোর্টের ক্ষেত্রে এটা অবধারিত। সচেতনা আর সঠিক প্রচারণার অভাবেই এই নামকরণের বিভ্রান্তি যার সাথে আমরা সবাই জড়িত। দেরি হলেও নাম করণের ক্ষেত্রে আমাদের এখনি সচেতন হতে হবে। নিক নেইম বা ডাক নাম কি তা সঠিক ভাবে জানতে হবে। ডাকনাম ও আসল নাম নিয়ে বিভ্রান্ত না হয়ে নামকরণ সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা থাকতে হবে। পরিবার ও বন্ধু মহলে ব্যবহার করা হয় ডাকনাম অথবা নিক নেইম আর 'পুরো নাম' ব্যবহার করা হয় সর্বস্তরে। ডাকনাম বা নিক নেইম কখনো সার্টিফিকেটে বা অন্য কোথাও ব্রাকেটের মাধ্যমে ব্যবহার করা যায় না। নামের পূর্বে 'মোহাম্মদ' যোগ করলে সার্টিফিকেটে, পরিচয় পত্রে বা পাসপোর্টে তা কখনই 'মোঃ' অথবা 'এমডি' হিসেবে লেখা যাবে না কারণ কাগজ পত্রে নামের কখনো সংক্ষিপ্ত রূপ হয় না। বংশগত নাম পুরো নামের প্রথমে ব্যবহার করলেও তা কাগজপত্রে সঠিক ভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ন্যাশনাল আইডি কার্ড আমাদের প্রথম তথ্য প্রযুক্তি ভিত্তিক পরিচয়পত্র। যুক্তি অনুযায়ী এটা আশা করা উচিত জন্ম নিবন্ধন প্রত্যয়ন পত্রের পর অর্থাৎ জাতীয়তা প্রমাণের জন্য জন্ম নিবন্ধন (অথবা ক্ষেত্র বিশেষে অভিবাসন প্রত্যয়ন পত্র) বাঞ্ছনীয় অতঃপর ন্যাশনাল আইডি কার্ড। জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বংশগত নাম ও তার সাথের নামগুলো সঠিক ভাবে উল্লেখ থাকতে হবে, সাথে করে জাতীয় পরিচয়পত্রেও নামকরণ সঠিকভাবে বিন্যাস করতে হবে। সরকার ইতিমধ্যেই অনলাইন জন্ম নিবন্ধন তথ্য ব্যবস্থা (Online BRIS) চালু করেছে ২০০২ সাল থেকে যেখান থেকে সহজেই জন্ম নিবন্ধন করা যাবে কিন্তু মজার ব্যাপার হল সেখানেও নামকরণের ব্যাবহারবিধি নেই। তবে এখানে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতে নাম নিবন্ধনের ব্যবস্থা রয়েছে যা ভবিষ্যতে এটি ব্যবহারে একটি বিশেষ ভূমিকা রাখবে। আমরা যেহেতু তথ্যপ্রযুক্তি দিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ উদ্যোগের প্রথম ধাপে আছি সেহেতু ভবিষ্যৎ চিন্তা মাথায় রেখে মূল জায়গা থেকে নামকরণ পদ্ধতি ঠিক করার এখনি সময়। বেশি দেরি হয়ে গেলে প্রযুক্তিগতভাবে এগোতে আমাদের নানা জটিলার শিকার হতে হবে। কেননা তথ্য প্রযুক্তিতে নাম বিন্যাস ব্যক্তি সনাক্তকরণে বাঞ্ছনীয়। এখনো সচেতন না হলে ভবিষ্যতে উচ্চমূল্যের টেন্ডার পদ্ধতির মাধ্যম দিয়ে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা ছাড়া আর কোন বিকল্প পথ থাকবে না। যে কোন প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্বে প্রকল্পের উপর সঠিক ধারণা ও এর সঠিক পরিকল্পনা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ভাবন বা অনুকরণ কে গুরুত্ব না দিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে সঠিক অনুসরণ ও সঠিক পরিকল্পনা বিশেষ ভূমিকা রাখবে।