ছবি সংগৃহীত
গ্রাফিক্স ট্যাবলেট বৃত্তান্ত
আপডেট: ০৯ জুন ২০১৬, ২০:০২
ডিজিটাল আর্টিস্টদের কাছে খুবই প্রিয় একটি ডিভাইস হচ্ছে গ্রাফিক্স ট্যাবলেট যা পেন ট্যাবলেট, ড্রয়িং ট্যাবলেট বা ডিজিটাইজার নামেও পরিচিত। তবে,'শুধু কি গ্রাফিক্স ট্যাবলেট ডিজিটাল আর্টিস্টরাই ব্যবহার করে থাকেন?' না, চমৎকার এই ডিভাইসটি শুধুমাত্র ডিজিটাল আর্টিস্টদের কাজেই আসেনা বরং গ্রাফিক্স ডিজাইনার থেকে শুরু করে ফটোগ্রাফার, শখের আঁকিয়ে, স্থপতি এমনকি একজন বেসিক কম্পিউটার ব্যবহারকারীর বিভিন্ন কাজেও আসতে পারে।
এপর্যন্ত লিখবার পর আমার হঠাৎ করেই পড়ল যে আমাদের দেশে এখন পর্যন্তও এই ডিভাইসটি কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের মাঝে খুব বেশি পরিচিত নয়। আর এজন্যে আমার একেবারে শুরু থেকেই শুরু করা উচিত, কি বলেন? তাহলে চলুন, একেবারে শুরু থেকেই না হয় শুরু করা যাক আজ; গ্রাফিক্স ট্যাবলেট সম্পর্কে যখন লিখতেই বসলাম তবে আগাগোড়াই লিখে ফেলা যাক। আজকের লেখায় আমি যে সকল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব সেগুলো হচ্ছে,
- গ্রাফিক্স ট্যাবলেট কী?
- গ্রাফিক্স ট্যাবলেট মূলত কাদের জন্য
- জনপ্রিয় কিছু গ্রাফিক্স ট্যাবলেটের ব্র্যান্ড
- গ্রাফিক্স ট্যাব কেনার সময় যে সব বিষয় মাথায় রাখা উচিত (সংক্ষেপে)
- আপনার কি একটি গ্রাফিক্স ট্যাবলেট প্রয়োজন?
- প্রাপ্তিস্থান
গ্রাফিক্স ট্যাবলেট কী?
গ্রাফিক্স ট্যাবলেট হচ্ছে এক ধরণের হার্ডওয়্যার ইনপুট ডিভাইস যা প্রধানত ডিজিটাল আর্টিস্টরা ব্যবহার করে থাকেন। এই হার্ডওয়্যার ইনপুট ডিভাইসগুলোতে একটি শক্ত প্ল্যাস্টিকের টাচ-সেন্সেটিভ ড্রয়িং সার্ফেস থাকে যা মাউস বা স্টাইলাসের মুভমেন্টকে মনিটরে প্রেরণ করে। এই টাচ-সেন্সেটিভ ড্রয়িং সার্ফেসের উপরে থাকা মাউস বা স্টাইলাসটি সরাসরি মনিটরের কার্সরকে নিয়ন্ত্রণ করে বিভিন্ন রকম কাজ সম্পাদন করতে সক্ষম। ডিভাইসটি চমৎকার হলেও নতুন অবস্থায় গ্রাফিক্স ট্যাবলেটের সাথে মানিয়ে নিতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যেতে পারে আপনার তবে আপনি যখন এই ডিভাইসটির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে সক্ষম হবেন তখন আমি বাজি ধরে বলতে পারি এই টাচ-সেন্সেটিভ আর্টিফিশিয়াল ড্রয়িং সার্ফেসে স্টাইলাস দিয়ে কোন কিছু আঁকাকে একদমই খাতা কলমের উপর পেন্সিল বা কলম দিয়ে কিছু একটা আঁকার মতই স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করবে আপনার কাছে।

(Wacom Bamboo Spark, চিত্রটি গুগল থেকে সংগ্রহীত)
জনপ্রিয় কিছু গ্রাফিক্স ট্যাবলেটের ব্র্যান্ড
প্রযুক্তি বাজার ঘুরলে আপনি বেশ কিছু চমৎকার ব্র্যান্ডের অসাধারণ সব গ্রাফিক্স ট্যাবলেটের মডেল দেখতে পাবেন তবে আমি সেরা কিছু ব্র্যান্ড নিয়ে এই সেকশনে আলোচনা করতে চেষ্টা করছি।
- Wacom - বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গ্রাফিক্স ট্যাবলেট প্রযুক্তি বাজারে থাকলেও জনপ্রিয়তার দিক থেকে Wacom বর্তমানে এক্ষেত্রে সব থেকে এগিয়ে আছে। Wacom এর Bamboo সিরিজের গ্রাফিক্স ট্যাবলেটগুলো মূলত তৈরি করা হয়েছে হোম এবং অফিস ইউজারদের লক্ষ্য করে এবং এটিই সম্ভবত wacom এর বেসিক এবং সাশ্রয়ী মূল্যের গ্রাফিক্স ট্যাবলেট সিরিজ। Bamboo সিরিজের মধ্যে রয়েছে the Connect, the Splash, the Capture এবং the Create এর মত চমৎকার সব পেন ট্যাবলেট। এছাড়াও Wacom এর প্রফেশনাল লাইন-আপের মধ্যে রয়েছে তাদের Intuos সিরিজ যা মূলত তৈরি করা হয়েছে ডিজিটাল আর্টিস্ট এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনারদের কথা মাথায় রেখেই। প্রতিটি Intuos ট্যাবলেটে রয়েছে টাচ রিং কনট্রোল, এক্সপ্রেস কী, অ্যাডভান্স পেন টিপ সেন্সর সহ আরও বেশ কিছু সুবিধা। এছাড়াও Intuos 5 ট্যাবলেটগুলোতে রয়েছে মাল্টি-টাচ সার্ফেস। যার ফলে ব্যবহারকারীরা গেসচার ব্যবহার করে ডিভাইসটিতে নেভিগেট করতে পারবেন যেমনটি বর্তমানে আমরা স্মার্টফোনে করে থাকি।
Wacom এর টপ লাইন-আপে রয়েছে Cintiq এর কিছু মডেল যে গ্রাফিক্স ট্যাবটিতে টাচ-সেন্সেটিভ প্ল্যাস্টিক ড্রয়িং সার্ফেসের পরিবর্তে ব্যবহারকারীরা সরাসরি এইচডি স্ক্রিনের উপর আঁকতে পারবেন। বলা চলে এটি একেবারেই ট্র্যাডিশনাল মিডিয়াতে ড্রয়িং বা পেইন্টিং করার মতই একটি ব্যাপার! তবে টেকনিক্যালি Cintiq-কে গ্রাফিক্স ট্যাবলেট বলা যায় না! এর চাইতে বরং একে একটি ইনটের্যাক্টিভ পেন ডিসপ্লে বললেই ভালো মানায়। তবে হ্যাঁ, সুবিধার সাথে সাথে এই ট্যাবলেটগুলোর দামও কিন্তু বেশ বেশি!

(Intuos 5 Touch, চিত্রটি গুগল ইমেজ থেকে সংগ্রহীত। )
- Huion - Wacom এর পর পরই সম্ভবত Huion ব্র্যান্ডটি ব্যবহারকারীদের কাছে এতটা জনপ্রিয়তার কুড়িয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। আবার অনেকের মতেই বেশ কিছু দিক দিয়ে Wacom এর চাইতেও Huion ব্র্যান্ডটি ভালো! তবে এই 'ভালোর' পেছনে থাকা কারণগুলোর মধ্যে সম্ভবত এই ব্র্যান্ডটির গ্রাফিক্স ট্যাবলেটগুলোর সাশ্রয়ী মূল্যই বেশি কাজ করে থাকে। কেননা, চমৎকার সব সুবিধা বিশিষ্ট Huion ব্র্যান্ডের ট্যাবগুলো দামের তুলনায় Wacom থেকে বেশ কম। আর সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে শুধুমাত্র প্রফেশনালরাই নন বরং যে কোন পেশার মানুষের কাছেই এই 'গ্রাফিক্স ট্যাব' ডিভাইসটি পৌছতে সক্ষম হচ্ছে। বর্তমানে Huion-এর রয়েছে সর্বমোট প্রায় ১৭টি গ্রাফিক্স ট্যাবলেট এবং ৪টি পেন ট্যাবলেট মনিটর।
- অন্যান্য - Wacom এবং Huion ছাড়াও PenPower, VisTablet, Adesso, Genius, Artisul, Xp-pen ইত্যাদি ব্র্যান্ডের গ্রাফিক্স ট্যাবগুলোও বেশ জনপ্রিয় ব্যবহারকারীদের মধ্যে। আমি এই ব্র্যান্ডগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত লিখছি না কিন্তু আগামীতে এই ব্র্যান্ডগুলোর সেরা কিছু গ্রাফিক্স ট্যাব নিয়ে লেখার আমার ইচ্ছে আছে এবং শীঘ্রই সেই লেখাটি লিখতে বসব ইনশাআল্লাহ্।
গ্রাফিক্স ট্যাব কেনার সময় যে সব বিষয় মাথায় রাখা উচিত
ধরে নিচ্ছি আপনি গ্রাফিক্স ট্যাবলেট সম্পর্কে এই লেখাটি থেকেই জানতে পেরেছেন এবং আপনি এখন একটি গ্রাফিক্স ট্যাব কেনার জন্য মনস্থির করে ফেলেছেন। যেহেতু আপনি এই ডিভাইসটি সম্পর্কে কিছুই জানেন না ফলে স্বাভাবিক ভাবেই কোনটি আপনার কেনা উচিৎ সেটা নির্ধারণ করতে আপনি কিছুটা হলেও বিপদে পড়ে যাবেন। তাই আমি কিছু ফিচার আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চেষ্টা করছি যা একটি গ্রাফিক্স ট্যাবলেটে থাকলে আপনার কাজের জন্যেই সেটা সুবিধাজনক হয়ে দাঁড়াবে।
- এক্সপ্রেস কী সমূহ - বর্তমানের বেশির ভাগ গ্রাফিক্স ট্যাবলেটেই এক্সপ্রেস কী সমূহ থেকে থাকে। এই এক্সপ্রেস কী-গুলোকে ইচ্ছেমত কাস্টোমাইজ করে ব্যবহার করা যায়। তাই এক্সপ্রেস কী বিশিষ্ট গ্রাফিক্স ট্যাব কিছুটা হলে কাজের গতি বৃদ্ধি করে থাকে।
- স্টাইলাসের সাইড সুইচ - সব স্টাইলাসের পাশেই দুটি করে বাটন দেয়া থাকে যেগুলোতে ডিফল্টভাবে মাউসের ডাবল-ক্লিক এবং রাইট-ক্লিক নির্ধারণ করা থাকে। তবে কিছু কিছু ট্যাবলেট রয়েছে যেগুলোতে এই স্টাইলাসের সাইড কী-গুলোকেও কাস্টোমাইজ করা যায়। আমার মতে কাস্টোমাইজবল স্টাইলাস সাইড কী সুবিধা সহ গ্রাফিক্স ট্যাব কেনাই শ্রেয়।
- টাচ রিং - আমি উপরেও লিখেছিলাম যে Wacom এর Intuos ট্যাবলেটগুলোতে টাচ রিং ফিচারটি আছে। এই টাচ সেন্সেটিভ এরিয়াটি মূলত বিভিন্ন কাজের জন্য কাস্টোমাইজ করা যায়, যেমন - স্ক্রল অথবা জুম, ব্রাশের আকার পরিবর্তন এবং ইত্যাদি।
- প্রেশার লেভেল - গ্রাফিক্স ট্যাবলেটের প্রেশার লেভেলগুলো মূলত হয়ে থাকে ২৫৬, ৫১২, ১০২৪ এবং ২০৪৮ এর। এই সংখ্যাগুলো মূলত স্টাইলাসের সেন্সেটিভিটি লেভেল রেফার করে। উচ্চ লেভেলের স্টাইলাসগুলো বেশি সেন্সেটিভ হয়ে থাকে এবং সেরা আউটপুট দেয়। আর আপনি যদি স্টাইলাসকে একটি আর্ট টুল হিসেবে ব্যবহার করেন তবে এটি ঠিক বাস্তব জীবনের পেইন্ট ব্রাশ, পেন্সিল বা চকের প্রিন্সিপালেই কাজ করে থাকবে। যত প্রেশার দিয়ে আপনি প্রেস করবেন ততই গাড় এবং মোটা আউটপুট পাওয়া যাবে এবং একই ভাবে হালকা প্রেশারে ততই হালকা এবং চিকন আউটপুট পাওয়া যাবে।
কিছু কিছু হাই এন্ড স্টাইলাসে টিল্ট এবং রোটেশন সুবিধাও থাকে যার ফলে লাইনের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ এবং ব্রাশের অরিয়েন্টেশন করা যায় খুব সহজেই।

আপনার কি একটি গ্রাফিক্স ট্যাবলেট প্রয়োজন?
সত্যি কথা বলতে কারোরই গ্রাফিক্স ট্যাবলেটের দরকার নেই। তবে আপনি যদি ডিজিটাল ইলাস্ট্রেশনের কাজ বা ফটো রিটাচিং এর কাজ করে থাকেন তবে একটি গ্রাফিক্স ট্যাবলেট আপনার কাজকে করে তুলতে পারে অনেক সহজ। আপনি স্টাইলাসের সাহায্যে যেভাবে আঁকতে পারবেন বা ইলাস্ট্রেট করতে পারবেন সেই কাজটিই একটি মাউসের সাহায্যে করতে গেলে আপনাকে অনেক বেশি সময় অপচয় করতে হবে। তবে হ্যাঁ, অনেকে এরকমও আছেন যারা মাউস ব্যবহারে বেশ দক্ষ এবং তারা কোন রকম সমস্যা ছাড়াই বড় বড় গ্রাফিক্সের প্রোজেক্ট শেষ করে ফেলছেন। কিন্তু, গ্রাফিক্স ট্যাবলেট সেই কাজগুলোকেই করে তুলতে পারত আরও সহজ! এখন আপনিই চিন্তা করুন এই ডিভাইসটির কোন প্রয়োজন আপনার আছে কি নেই!

(Cintiq 24HD Touch)
প্রাপ্তিস্থান
আপনি চাইলে সহজেই দেশের বাইরে থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যে কোন ধরণের গ্রাফিক্স ট্যাব আনিয়ে নিতে পারেন তবে দেশ থেকে কিনতে চাইলে চলে যেতে পারেন এলিফেন্ট রোডের মাল্টিপ্লানের (কম্পিউটার সিটি সেন্টার) মাল্টিমিডিয়া কিংডমে। আমার জানামতে একমাত্র তাদের কাছেই রয়েছে Wacom, Huion ছাড়াও বেশ কিছু ব্র্যান্ডের গ্রাফিক্স ট্যাব এবং বিভিন্ন ধরণের গ্রাফিক্স কার্ড সম্পর্কিত এক্সেসরিজের বিশাল কালেকশন। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট থেকে আপনার অ্যাভেইল্যাবল গ্রাফিক্স ট্যাবগুলোর মূল্য দেখে নিতে পারেন অথবা তাদের ফেসবুক পেজ থেকেও আপনারা জেনে নিতে পারেন গ্রাফিক্স ট্যাবলেট সম্পর্কিত যে কোন ধরণের তথ্য। এছাড়াও Wacom Bangladesh এবং Huion Bangladesh পেজগুলো থেকেও আপনি Wacom এবং Huion-এর গ্রাফিক্স ট্যাবলেটগুলো সম্পর্কে বিভিন্ন ধরণের তথ্য পাবেন।
এই ছিল আজকের 'গ্রাফিক্স ট্যাবলেট বৃত্তান্ত'। আশা করি কিছুটা হলেও আপনারা নতুন কিছু জানতে পেরেছেন এই লেখাটি থেকে। সবশেষে বলতে চাই গ্রাফিক্স ট্যাবলেট একটি অসাধারণ ডিভাইস এবং আপনি যদি একবার এই ডিভাইসটিকে আয়ত্ত করে ফেলতে পারেন তবে আপনি আর মাউস ব্যবহার করে মজা পাবেন না কখনোই! বিশ্বাস না হলে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন আমার কথাটির সত্যতা। আজ এপর্যন্তই, ভালো থাকুন এবং প্রিয় টেকের সাথেই থাকুন।