ছবি সংগৃহীত

কিতাবুল ইমান : প্রবন্ধ নং- ৫ : তৃতীয় প্রকার : তাওহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত

priyo.Islam
লেখক
প্রকাশিত: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ০৪:২৫
আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ০৪:২৫

তৃতীয় প্রকার : আল্লাহর নাম ও গুণাবলিকেন্দ্রিক তাওহিদ সংক্ষেপে তাওহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত হলো- এ ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ তাআলা সকল সিফাতে কামাল তথা পূর্ণাঙ্গ গুণাবলিতে গুণান্বিত এবং সকল অপূর্ণাঙ্গ গুণাবলি থেকে পবিত্র। তিনি এ ক্ষেত্রে অদ্বিতীয় এবং অতুলনীয়। এ প্রকার তাওহিদে বিশ্বাস পোষণের পদ্ধতি হলো- আল্লাহ তাআলা তাঁর নিজের জন্য যেসব নাম ও গুণাবলি তালিকাভুক্ত করেছেন অথবা যেসব নাম ও গুণের কথা উল্লেখ করেছেন- যা কোরান-সুন্নাহয় উল্লিখিত হয়েছে- শব্দে অথবা অর্থে- সে-সবে কোনোরূপ বিকৃতিসাধন, অস্বীকৃতি ও বাতিলকরণ, তার হাকীকত কী তা নির্ণয়করণ ও তার ধরন-ধারণ নির্দিষ্টকরণ, এবং সৃষ্টিজীবের কোনো গুণের সঙ্গে সাদৃশ্যকরণ ব্যতীত তা মেনে নেয়া ও বিশ্বাস করা। উল্লিখিত সংজ্ঞা থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, নাম ও গুণের ক্ষেত্রে তাওহিদ, তিনটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা থেকে বিচ্যুত হলে আল্লাহর নাম ও গুণের ক্ষেত্রে একত্ববাদী হওয়া যাবে না। ভিত্তি তিনটি হলো : প্রথমত : আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিকুলের সাদৃশ্য এবং সকল অপূর্ণতা থেকে পবিত্র বলে বিশ্বাস করা। দ্বিতীয়ত : আল্লাহ তাআলার যেসব নাম ও গুণাবলি কোরান-সুন্নাহয় এসেছে, তাতে কোনো কমবেশ না করে, কোনো বিকৃতি অথবা বাতিলকরণ প্রক্রিয়ার আশ্রয়ে না গিয়ে, যেভাবে আছে সেভাবেই মেনে নেওয়া। তৃতীয়ত : আল্লাহর তাআলার এ সব গুণাবলির কাইফিয়ত তথা ধরন-ধারণ কী, তা জানা সম্ভব নয় বলে বিশ্বাস করা। অতএব প্রথম ভিত্তিটি হলো- আল্লাহ তাআলার কোনো গুণ সৃষ্টিকুলের কোনো গুণের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। এর প্রমাণ আল্লাহ তাআলার বাণী , لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ‘তার মতো কিছু নেই আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা’-(সূরা আন-নাহল, ৭৪)। ইমাম কুরতুবী র. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন- এ ক্ষেত্রে যা বিশ্বাস করতে হবে তা হলো, আল্লাহ তাআলা তাঁর বড়ত্ব ও মহিমায়, তাঁর রাজত্বে, তাঁর সর্বসুন্দর নাম ও গুণাবলিতে সৃষ্টিকুলের কোনো কিছুর সঙ্গেই সাদৃশ্যপূর্ণ নন। আর যেসব গুণ স্রষ্টা ও সৃষ্টি উভয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে, তা প্রকৃত অর্থের দিক থেকে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। কেননা অনাদি আল্লাহ তাআলার গুণসমূহ মাখলুকের গুণসমূহ থেকে ভিন্ন। [তাফসিরে কুরতুবী ১৬/পৃ ৮] ওয়াসেতী র. বলেন,‘আল্লাহর সত্তার মতো কোনো সত্তা নেই, আল্লাহর নামের মতো কোনো নাম নেই, আল্লাহর কর্মের মতো কোনো কর্ম নেই, আল্লাহর গুণের মতো কোনো গুণ নেই- হ্যাঁ, তবে এ ক্ষেত্রে শাব্দিক সাদৃশ্য থাকতে পারে। আর এটাই স্বাভাবিক যে অনাদি আল্লাহর তাআলার এমন কোনো গুণ থাকবে না যা সৃষ্টিকুলের কোনো গুণের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে। অনুরূপভাবে সৃষ্টিকুলের এমন কোনো গুণ থাকা অসম্ভব, যা অনাদি আল্লাহ তাআলার গুণের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে। আর এ সবই হলো আহলে হক তথা আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের মাযহাব। [সাইয়্যেদ কুতুব, ফী যিলালিল কুরান ৭/২৭২] উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় সাইয়্যেদ কুতুব র. বলেন,‘মানবপ্রকৃতি এ বিষয়টি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বিশ্বাস করে। অতএব, যিনি সকল বিষয়ের স্রষ্টা তিনি ওইসব বিষয়ের সমান হবেন না, যা তিনি সৃষ্টি করেছেন। [প্রাগুক্ত ৭/৩৭২] উল্লিখিত ভিত্তির আরেকটি প্রসঙ্গ হলো- আল্লাহ তাআলা তাঁর নিজের জন্য যেসব গুণাবলি প্রমাণ করেছেন অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর জন্য যেসব গুণাবলি প্রমাণ করেছেন, সে সবের বিপরীত বিষয়গুলো থেকে আল্লাহ তাআলাকে পবিত্র বলে বিশ্বাস করা। অতএব গুণের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলাকে অদ্বিতীয় হিসেবে বিশ্বাস করার দাবি হলো, একজন মুসলিম তাঁর রবকে- স্ত্রী, অংশীদার, সমকক্ষ, সাহায্যকারী, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশকারী ও অভিভাবক থেকে পবিত্র বলে বিশ্বাস করবে। আরও দাবি হলো, সে তাঁকে নিদ্রা, ক্লান্তি-অবসাদ, মৃত্যু, অজ্ঞতা, জুলুম, উদাসীনতা, ভুলে-যাওয়া, তন্দ্রা, স্থানবদ্ধ হওয়া ও অন্যান্য দুর্বলতা থেকে পবিত্র বলে বিশ্বাস করবে। আর দ্বিতীয় ভিত্তির দাবি হলো, আল্লাহর তাআলার নাম ও গুণের ব্যাপারে আল কোরান এবং সহীহ হাদীস দ্বারা যা প্রমাণিত, তাতেই ক্ষান্ত থাকা; কেননা বিষয়টি শ্রবণনির্ভর; বুদ্ধি-বিবেচনানির্ভর নয়। অতএব আল্লাহ তাআলা নিজেকে যেসব গুণে গুণান্বিত করেছেন অথবা তাঁর রাসূল তাঁকে যেসব গুণে গুণান্বিত থাকার সংবাদ দিয়েছেন কেবল সে সব গুণেই তাঁকে গুণান্বিত করতে হবে। এর বাইরে অন্যকোনো গুণ আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত করা যাবে না। নামের ক্ষেত্রেও আল্লাহ তাআলা নিজেকে যেসব নাম দিয়েছেন অথবা তাঁর রাসূল তাঁকে যেসব নাম দিয়েছেন, তার বাইরে অন্যকোনো নামে আল্লাহকে ডাকা যাবে না; কেননা আল্লাহ তাআলা তাঁর নিজ সত্তা, গুণাবলি ও নাম সম্পর্কে সমধিক অবহিত। আল্লাহ তাআলা বলেন , أَأَنْتُمْ أَعْلَمُ أَمِ اللَّهُ ‘তোমরা কি অধিক জান, না আল্লাহ?’- (সূরা আল বাকারা , ১৪০)। আর আল্লাহ তাআলা যেহেতু নিজ সম্পর্কে অধিক জানেন এবং তাঁর রাসূলগণ যেসব সংবাদ দিয়েছেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীপ্রাপ্ত হয়ে দিয়েছেন,তাই আল্লাহ তাআলার নাম ও গুণের ক্ষেত্রে কোনটা বলা হবে কোনটা বলা হবে না, তার একমাত্র উৎস হবে আল্লাহ তাআলা-প্রদত্ত এবং তাঁর রাসূল-প্রদত্ত সংবাদ। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল র. বলেন,‘এমন কোনো বিশেষণে আল্লাহকে বিশেষিত করা যাবে না, যা দ্বারা আল্লাহ তাআলা নিজেকে বিশেষিত করেননি, বা রাসূল তাকে বিশেষিত করেননি, অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে কোরান-সুন্নাহর সীমানা অতিক্রম করা যাবে না। [আর রাওযা আন-নাদিইয়া পৃ. ২৩; শারহুল আকীদা আত তাহাবিয়্যাহ পৃ. ২১] ইমাম বুখারি র. এর উস্তাদ নাঈম ইবনে হাম্মাদ র.বলেন , من شبه الله بخلقه كفر، ومن حجد ما وصف الله به نفسه أو وصف به رسوله كفر، وليس فيما وصف الله به نفسه أو وصف به رسوله تشبيه ولا تمثيل. ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে মাখলুকের সঙ্গে তুলনা করল, সে কাফের হয়ে গেল। আর যে ব্যক্তি এমন কোনো বিশেষণ অস্বীকার করল, যা আল্লাহ তাআলা নিজের ওপর প্রয়োগ করেছেন, অথবা তাঁর রাসূল তাঁর ওপর প্রয়োগ করেছেন, সেও কাফের হয়ে গেল। আর আল্লাহ তাঁর নিজের ওপর যে বিশেষণ প্রয়োগ করেছেন অথবা তাঁর রাসূল তাঁর ওপর যে বিশেষণ প্রয়োগ করেছেন, তাতে কোনো তাশবিহ তথা সাদৃশ্যকরণ, তামছীল তথা উপমানির্ধারণ নেই। [দেখুন ইতহাফুল কায়েনাত পৃ. ৬; শারহে মুল্লা আলী কারী পৃ ১৫] প্রতিটি মুসলমানের কাছে এ ভিত্তিটির দাবি হলো যে, আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসে, আল্লাহর যেসব নাম ও গুণাবলি বর্ণিত হয়েছে, তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এবং আরবী ভাষায় এ সব নাম ও গুণের যে বাহ্যিক অর্থ রয়েছে, সে অর্থ অনুযায়ী তা মেনে নিতে হবে, এগুলোকে অস্বীকার করা অথবা এর কোনোটিকে আল্লাহর জন্য অনুপযোগী মনে করে প্রত্যাখ্যান করা কখনো উচিত হবে না। সঙ্গে-সঙ্গে এ সবের যে বাহ্যিক অর্থ রয়েছে, তা থেকে এগুলোকে বিচ্যুতও করা যাবে না। তৃতীয় ভিত্তিটির দাবি হলো- কোরান-সুন্নাহয় আল্লাহর যেসব নাম ও গুণের উল্লেখ রয়েছে, তা যেভাবে আছে সেভাবেই বিশ্বাস করা, এ সবের ধরন-ধারণ কি সে ব্যাপারে আদৌ কোনো প্রশ্ন না করা, এ সবের প্রকৃতি ও হাকীকত কি, সে ব্যাপারে কোনো গবেষণায় না যাওয়া; কেননা ‘সিফাত’ তথা গুণের ধরন-ধারণ জানা, ‘যাত’ তথা আল্লাহর সত্তার ধরন-ধারণ জানার ওপর নির্ভরশীল; কেননা বিশেষণ বিশেষ্য অনুযায়ী পার্থক্য হয়ে থাকে। আর আল্লাহ তাআলার সত্তার হাকীকত-প্রকৃতি, ধরন-ধারণ কি, সে ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করা অনুমোদিত নয়। অনুরূপভাবে আল্লাহর সিফাত সম্পর্কিত ধরন-ধারণের ব্যাপারে প্রশ্ন করারও কোনো অনুমতি নেই। এ কারণেই সালাফদের অনেককেই যখন ইস্তিওয়া (استواء ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, তারা বলেছেন , الاسةواء معلوم، والكيف مجهول، والإيمان به واجب، والسؤال عنه بدعة. অর্থাৎ ‘ইস্তিওয়ার অর্থ জ্ঞাত। এর ধরন অজ্ঞাত। এর প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব এবং এ বিষয়ে প্রশ্ন করা বিদআত।[আর রাওযা আন-নাদিইয়া পৃ. ২৯] অতঃপর সালাফগণ এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, ধরন-ধারণ আমাদের অজ্ঞাত এবং এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা বিদআত। অতএব, যদি কোনো প্রশ্নকারী বলে যে- আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আকাশে কীভাবে নেমে আসেন? অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার নেমে আসার ধরন-ধারণ কী? তবে তাকে পাল্টা প্রশ্ন করে বলা হবে, প্রথমে বলুন, আল্লাহর তাআলার ধরন-ধারণ কী? সে যদি বলে, আল্লাহর তাআলার ধরন-ধারণ কী, তা আমার জানা নেই। তাহলে এবার তাকে বলা হবে, একইরূপে আল্লাহর তাআলার নেমে আসার ধরন-ধারণ কী, তা আমাদের জানা নেই; কারণ কোনো সিফাত তথা বিশেষণের ধরন-ধারণ জানা মাওসূফ তথা বিশেষ্যের ধরন-ধারণ জানার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষণ হলো বিশেষ্যের অধীন। অতএব, কীভাবে আমাদের ব্যাখ্যা করতে বলেন- আল্লাহর শ্রবণ, দর্শন, কথা, ইস্তিওয়া ও নেমে আসা ইত্যাদির ধরন-ধারণ কী? অথচ আপনি জানেন না আল্লাহর তাআলার সত্তার ধরন-ধারণ কী। আর যদি স্বীকার করে নেন, যে আল্লাহ তাআলা সকল বিবেচনার বাইরে এমন এক প্রতিষ্ঠিত সত্য, যার রয়েছে সকল পূর্ণ গুণাবলি এবং যার তুল্য অন্য কেউ নেই, তাহলে শ্রবণ, দর্শন, কথা, অবতরণ, ও ইস্তিওয়াও সকল বিবেচনার বাইরে প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। আর তাঁর ওই সকল পূর্ণাঙ্গ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মাখলুকের শ্রবণ, দর্শন, কথা, নেএে আসা ও ইস্তিওয়ার কোনো তুলনা হয় না। [আর রাওযা আন-নাদিইয়া, পৃ. ৩৪] উল্লিখিত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এমন কিছু বিষয় আছে, যা তাওহিদকে কলুষিত করে এবং যা থেকে বেঁচে থাকা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অবশ্য কর্তব্য। আর তা হলো নিম্নরূপ , ১ . তাশবিহ : আর তা হলো সৃষ্টিকর্তার গুণাবলিকে মাখলুকের গুণাবলির সাদৃশ্য বা তুল্য বলে ধারণা করা। যেমন নাসারা সম্প্রদায় ঈসা ইবনে মারয়াম আলাইহিস সালামকে আল্লাহর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে ভেবেছে। ইহুদি সম্প্রদায় উযাইর আলাইহিস সালামকে আল্লাহর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ভেবেছে। এমনকি মুসলিম সম্প্রদায়ের কোনো-কোনো দল আল্লাহর চেহারা ও হাতকে মাখলুকের চেহারা ও হাতের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে ভেবেছে। আল্লাহর শ্রবণকে মাখলুকের শ্রবণের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে করেছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। [আল আসইলা ওয়াল আজওয়েবা আল উসুলিয়া পৃ. ৩৫, আর রাওযা আন-নাদিইয়া পৃ. ৩৫] ২ . তাহরিফ : অর্থাৎ পরিবর্তন ও বিকৃতিসাধন। যেমন আল্লাহ তাআলার নাম ও বিশেষণ বর্ণনায় যেসব শব্দ উল্লিখিত হয়েছে তাতে কোনো কমবেশ করা, ব্যাকরণের দৃষ্টিতে তাতে যে হরকত (যের-যবর- পেশ ইত্যাদি) রয়েছে, তা পরিবর্তন করা, অথবা তার অর্থ বিকৃত করে ফেলা, যেটাকে মুসলিম সম্প্রদায়ের কোনো কোনো দল তাবীল বলে থাকে। অর্থ বিকৃত করার মানে- শব্দকে এমন অযাচিত অর্থে ব্যবহার করা, আরবী ভাষায় যার ব্যবহার আদৌ প্রচলিত নয়। যেমন وجه (চেহারা) এর অর্থ করা الذات (সত্তা), استواء (উপরে ওঠা) এর অর্থ করা استيلاء (নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা)। [আর রাওযা আন-নাদিইয়া পৃ. ২৫] ৩ . তাতিল (التعطيل ) : আর হলো আল্লাহ তাআলার কোনো সিফাত-বিশেষণ প্রত্যাখ্যান করা এবং তা যে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তা অস্বীকার করা। যেমন আল্লাহ তাআলার নাম ও গুণাবলি প্রত্যাখ্যান করে তাঁর পূর্ণতায় অস্বীকৃতিজ্ঞাপন। যেমন আল্লাহর তাআলার সৃষ্টির গুণকে প্রত্যাখ্যান করা- বলা, যে সৃষ্টিজগৎ অনাদিকাল থেকেই বিরাজমান। [প্রাগুক্ত] ৪ . তাকঈফ (التكييف ) : আর তা হলো গুণের আকৃতি-প্রকৃতি নির্ধারণ এবং তার স্বরূপ স্থির করা। সালাফ তথা সাহাবায়ে কেরাম ((রাযি.)) তাবেঈন (র.), তাবে তাবেঈন (র.) এর পদ্ধতি ছিল, নাম ও গুণের ক্ষেত্রে তাহরিফ, তাতিল ও তাক-ঈফ এর আশ্রয়ে না যাওয়া। ইমাম শাওকানী র. বলেন,‘সালাফ তথা সাহাবায়ে কেরাম ((রাযি.)), তাবেঈন (র.), তাবে-তাবেঈন (র.) এর মাযহাব হলো, সিফাতকেন্দ্রিক দলিলগুলো তার প্রকাশ্য অর্থেই রেখে দেয়া। এ ক্ষেত্রে কোনো বিকৃতিসাধন, কোনো একটিকে অযাচিতভাবে তাবীলকরণ, সাদৃশ্য-নির্ধারণ, এবং প্রত্যাখ্যানকরণ- যা তাবীলেরই ফলাফল- এ সব থেকে বিরত থাকা। অতএব কোনো প্রশ্নকারী যদি সিফাত সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করত, জবাবে তারা সরলভাবে কেবল এ বিষয়ক দলিলটি পাঠ করে শুনিয়ে দিতেন, এর অতিরিক্ত কোনো কথা বলতেন না। তারা বলতেন, আল্লাহ তাআলা এরূপই বলেছেন, আর এর অতিরিক্ত কিছু জানি না। আমরা আড়ম্বরতার আশ্রয় নিই না এবং যা জানি না তা বলি না। আর আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে আমাদের সীমালঙ্ঘনের অনুমতি দেননি। যদি প্রশ্নকারী, প্রকাশ্য অর্থের বাইরে অতিরিক্ত কিছু জানার আগ্রহ ব্যক্ত করত, তারা তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিতেন এবং এমন বিষয় তলব করা থেকে বারণ করতেন যা হাসিল করা বিদআতে নিপতিত হওয়া ছাড়া সম্ভব নয়। আর বিদআতের পথ ছিল ওই পথ থেকে ভিন্ন যা সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সংরক্ষণ করেছেন, এরপর তাবেঈগণ (র.) সাহাবায়ে কেরাম ((রাযি.)) থেকে এবং তাবে-তাবেঈগণ (র.) তাবেঈদের থেকে সংরক্ষণ করেছেন। অতএব, উত্তম শতাব্দিসমূহে আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর বাক্য ছিল এক ও অভিন্ন। তাদের সকলের পথ ছিল অভিন্ন। আল্লাহ তাদের যা করতে বলেছেন তা নিয়েই তারা ব্যস্ত ছিলেন। আল্লাহ তাদের যেসব দায়িত্ব দিয়েছেন, যেমন- ঈমান আনা, নামাজ কায়েম করা, জাকাত দেয়া, রোজা রাখা, হজ করা, কল্যাণমূলক কাজে সম্পদ ব্যয় করা, উপকারী ইলম তালাশ করা, মানুষকে সৎকাজের পথ দেখানো, জান্নাতমুখী আমল করা এবং জাহান্নামমুখী আমল থেকে বিরত থাকা, সৎকাজের আদেশ দেয়া ও অসৎকাজ থেকে বারণ করা, সাধ্যমত জালেমকে জুলুম থেকে নিবৃত্ত করা- ইত্যাদিতেই তারা নিজেদের ব্যস্ত রাখতেন। এর বিপরীতে, যে সবের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেননি, যার হাকীকত-বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা ইবাদত হিসেবে সাব্যস্ত করেননি, তা নিয়ে তারা ব্যস্ত হতেন না। অতএব সে যুগে দ্বীন ছিল স্বচ্ছ ও সকল বিদাত থেকে মুক্ত। [শাওকানী, আত-তুহাফ ফী মাযাহিবিল সালাফ পৃ. ৭] মূল : ড. মুহাম্মাদ নাঈম ইয়াসিন বাংলা অনুবাদ : ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক