ছবি সংগৃহীত

কিতাবুল ইমান : প্রবন্ধ নং- ৫৬ : ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি

priyo.Islam
লেখক
প্রকাশিত: ০৫ মার্চ ২০১৪, ১৫:৪৬
আপডেট: ০৫ মার্চ ২০১৪, ১৫:৪৬

ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি

ঈমান অভিধাটি কি কি বিষয় শামিল করে, এ ক্ষেত্রে মতানৈক্যের কারণে অন্য আরেকটি বিষয়ে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়েছে, আর তা হলো ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি। অতএব যারা আমলকে ঈমান অভিধার অন্তর্ভুক্ত করেন, তারা ঈমান বাড়ে-কমে বলে অভিমত দিয়েছেন। আর যারা ঈমান অভিধা মৌখিক স্বীকারোক্তি ও অন্তরের বিশ্বাসের বলয়ে সীমিত করেছেন, তারা ঈমান বাড়া-কমার বিপক্ষে অভিমত দিয়েছেন। যেহেতু আমরা ইতোপূর্বে জেনেছি যে, এ বিষয়ের বিতর্কটি কেবলই শাব্দিক ও তত্ত্বকেন্দ্রিক বিতর্ক, প্রায়োগিক জীবনে যার কোনো প্রভাব নেই। অনুরূপভাবে বর্তমান আলোচ্য বিষয়টির একই অবস্থা। আর তা এভাবে যে, যারা ঈমানকে একটি স্থির জিনিস বলে ভাবেন, যা বাড়েও না কমেও না, তারা বলেন যে তাকওয়া ও নেক-আমল একজনকে অন্যজনের ওপর মর্যাদাবান করে দেয়। আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে প্রতিদান লাভের ক্ষেত্রেও মানুষের মধ্যে পরস্পরে পার্থক্য থাকবে। ইমাম তাহাবী আকীদায়ে তাহাবিয়াতে বলেন, ‘ঈমান হলো এক এবং ঈমানওয়ালারা মৌলিক ঈমানের বিচারে সবাই সমান। অবশ্য তাকাওয়া, ভয়, প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে দূরে থাকা এবং যা উত্তম তা আঁকড়ে ধরে থাকার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে একজন অন্যজনের চেয়ে মর্যাদায় উত্তম।’ [শারহুল আকীদা আত্-তাহাবিয়্যাহ পৃ.৩৭৫] তবে যাই হোক, আল-কোরানের বহু আয়াত এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বেশ কিছু হাদিস ঈমান বাড়া-কমার পক্ষেই সাক্ষ্য বহন করে। যেমন আল্লাহ তাআলার বাণী, إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آَيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ ‘মুমিন তো তারা, যাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের রবের উপরই ভরসা করে’-(সূরা আল আনফাল, ২)। الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ ‘যাদেরকে মানুষেরা বলেছিল যে, ‘নিশ্চয় লোকেরা তোমাদের বিরুদ্ধে একত্র হয়েছে। সুতরাং তাদেরকে ভয় কর’। কিন্তু তা তাদের ঈমান বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং তারা বলেছিল, ‘আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক’!-(সূরা আল্ আনফাল, ১৭৩)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন , هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ السَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَعَ إِيمَانِهِمْ وَلِلَّهِ جُنُودُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا ‘তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি নাজিল করেছিলেন যেন তাদের ঈমানের সঙ্গে ঈমান বৃদ্ধি পায়।’-(সূরা আল ফাত্হ, ৪)। ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধির অর্থসংবলিত কয়েকটি হাদিস হলো নিম্নরূপ, ‘ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা আছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চটি হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং সর্বনিম্নটি হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক ময়লা সরিয়ে দেয়া। আর লজ্জা ঈমানের একটি শাখা।’ [বুখারি, আস-সহিহ ১/৪৪; মুসলিম, আস-সহিহ ১/৬ ] তিনি আরও বলেন, ‘মুমিনদের মধ্যে পরিপূর্ণ ঈমানওয়লা সে, যে চরিত্রে তাদের মধ্যে সর্বোত্তম।’ [তিরমিযি; হাকেম। হাকেম বলেছেন, হাদিসটি বুখারি ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহিহ। তিরমিযি বলেছেন, হাদিসটি হাসান। দেখুন আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব ৩/৪০৩] অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘তোমাদের মধ্যে যদি কেউ কোনো খারাপ কাজ দেখে, সে যেন তা হাত দ্বারা পরিবর্তন করে দেয়, যদি না পারে তাহলে জিহবা দ্বারা, যদি না পারে তাহলে অন্তর দ্বারা, আর এটাই দুর্বলতম ঈমান।’ [মুসলিম, আস-সহিহ (নববীর ব্যাখ্যাসহ) ২/২৭] আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমার পূর্বে যে জাতির কাছে যে নবিই প্রেরিত হয়েছেন, সে জাতির মধ্য থেকে ওই নবির কিছু সঙ্গী-সাথী ছিল যারা তার আদর্শ ধরে চলত, যারা তার নির্দেশ অনুসরণ করত। অতঃপর তাদের পরে এমন উত্তরসূরি এসেছে যারা কথা অনুযায়ী কাজ করে না। আবার এমন কাজ করে যার নির্দেশ তাদের দেওয়া হয়নি। অতঃপর যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে হাত দ্বারা জিহাদ করবে সে মুমিন, যে জিহবা দ্বারা জিহাদ করবে সেও মুমিন, যে অন্তর দ্বারা জিহাদ করবে সেও মুমিন, তবে এরপর সরিষা পরিমাণ ঈমানেরও অস্তিত্ব থাকে না।’ [মুসলিম, আস-সহিহ (নববীর ব্যাখ্যাসহ) ২/২৭] এ মর্মে সাহাবীগণেরও বিভিন্ন কথা রয়েছে। যেমন আবুদদারদা (রাযি.) বলেন, ‘ দ্বীন বিষয়ে কোনো ব্যক্তির জ্ঞানী হওয়ার একটি নিদর্শন হলো যে, সে তার ঈমানের পরিচর্যা করবে, ঈমানের কি হ্রাস পেল তা দেখবে। দ্বীন বিষয়ে কোনো ব্যক্তির জ্ঞানী হওয়ার একটি নিদর্শন হলো যে সে জানবে, তার ঈমান কি বাড়ছে, না কমছে।’ উমর (রাযি.) তাঁর সাথীদের বলতেন, ‘এসো আমরা ঈমান বাড়িয়ে নিই, অতঃপর তারা আল্লাহ তাআলার জিকির করতেন।’ আমলের কারণে এভাবে ঈমান হ্রাস-বৃদ্ধি সম্পর্কে আরও বহু হাদিস ও সাহাবীদের (রাযি.) কথা রয়েছে। [দেখুন শারহুল আকীদা আত্-তাহাবিয়্যাহ,পৃ:৩৮৬] যেহেতু কোরান-সুন্নাহর টেক্সটসমূহের বাহ্যিক অর্থানুযায়ী ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি বুঝা যাচ্ছে, অতএব তা অবলম্বন করাই উত্তম। বিশেষ করে এ ক্ষেত্রে তাবিল করার আদৌ কোনো ফায়দা নেই। এ ব্যাপারে মতানৈক্যেরও কোনো ফলাফল নেই। তবে যে বিষয়টি সমধিক গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, একজন মুমিনের উচিত, তার ঈমানের পরিচর্যা করা, যত্ন নেয়া। হিসাব মিলিয়ে দেখা তার ঈমান কি বাড়ছে, না কমছে। যদি ঈমান কমে গেছে বলে মনে হয়, তাহলে কমে যাওয়ার কারণ কী তা খুঁটিয়ে দেখা এবং তা দুরস্ত করার উদ্যোগ নেয়া। যা করলে ঈমান বৃদ্ধি পায়, সুশোভিত হয়, আত্মা পরিশুদ্ধ হয় তা করা, যেমনি করতেন সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম। মূল : ড. মুহাম্মাদ নাঈম ইয়াসিন বাংলা অনুবাদ : ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক