ছবি সংগৃহীত

এক লাখ মতান্তরে দুই লাখ চব্বিশ হাজার : নবি-রাসুলদের প্রকৃত সংখ্যা কত?

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর
লেখক
প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০১৫, ০৪:২৫
আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০১৫, ০৪:২৫

পৃথিবীতে মোট কতোজন নবি এসেছেন? এ প্রশ্ন অনেকেরই। তবে আমরা প্রায় সময় একটা কথা শুনে থাকি, ‘এক লক্ষ মতান্তরে দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার পয়গাম্বর পৃথিবীতে এসেছেন’, এই কথার ভিত্তি কী? এটা হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত নাকি ইসলামি ইতিহাসের কোনো রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত? এখানে স্বাভাবিকভাবে আরও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, এই মতান্তরটা পয়গাম্বরদের এতো বিশাল সংখ্যাকে নিয়ে কীভাবে হলো? দু-চারশো বা হাজার নিয়ে মতান্তর হলেও কথা ছিলো, পুরো এক লক্ষ নবিকে নিয়ে সন্দেহের মতান্তর থাকার রহস্যটা কী? এ বিষয়ে আমরা প্রথমে হাদিসের ভাষ্য গ্রহণ করতে পারি। হাদিস গ্রন্থসমূহে নবিদের সংখ্যার ব্যাপারে বিভিন্ন মতভেদ লক্ষ করা যায়। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হাদিস- ০১. এ বিষয়ে প্রথম হাদিসটি গ্রহণ করা হয়েছে ‘সহিহ ইবনে হিব্বান’ গ্রন্থ থেকে। হজরত আবু জর রা. বর্ণনা করেন, ‘আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! কতোজন আল্লাহর নবি আগমন করেছেন? এক লক্ষ চব্বিশ হাজার। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! তাদের মধ্যে কতোজন রাসুল? তিনি বললেন, তিনশো ত্রিশজন; এটাই যথেষ্ট। আমি বললাম, তাদের মধ্যে প্রথম কে? তিনি বললেন, আদম।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, পৃষ্ঠা ৩৬১) কিন্তু এই হাদিসের বর্ণনাকারীদের বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে ইমাম জাহাবি, ইমাম আবু হাতিম, ইমাম ইবনে কাসির ঘোরতরভাবে সন্দেহ পোষণ করেছেন। তারা এ হাদিসটিকে জয়িফ বলেছেন এবং এটিকে পরিত্যাজ্য বলে রায় দিয়েছেন। ‘তাহকিকে সহিহ ইবনে হিব্বান’ গ্রন্থকার শুয়াইব আল আরনুত এ হাদিসটি গ্রহণে অসম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৭৯) ০২. মুসনাদে আহমদ গ্রন্থে আবু জর রা.-এর বরাত দিয়ে অন্য একটি হাদিস প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! কতোজন আল্লাহর নবি আগমন করেছেন? তিনি বললেন, তিনশো এবং ততোধিক। ’ একই গ্রন্থে অন্য এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে, ‘তিনশো পঞ্চাশ।’ (খণ্ড ৩৫, পৃষ্ঠা ৪৩১ ও ৪৩৮) কিন্তু পূর্বোক্ত রেওয়ায়েতের মতো এ রেওয়ায়েতটিকেও অধিকাংশ ইমাম পরিত্যাজ্য বলে রায় দিয়েছেন। শুয়াইব আল আরনুত বলেছেন, এর বর্ণনাক্রম (সনদ) অত্যন্ত দুর্বল। ০৩. আবু ইয়ালা রহ. তার ‘মুসনাদে আবু ইয়ালা’ গ্রন্থে হজরত আনাস রা.-এর বরাত দিয়ে একটি হাদিস বর্ণনা করেন। হজরত আনাস রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘আল্লাহ মোট আট হাজার নবি পাঠিয়েছেন। চার হাজার বনি ইসরাইলের মধ্যে এবং বাদবাকি চার হাজার পৃথিবীর অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে।’ (খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৬০) কিন্তু ইবনে কাসির তার তাফসিরে ইবনে কাসিরে এই হাদিসকেও জয়িফ বলেছেন। (তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৭০) সমাধান : এমন মতবিরোধপূর্ণ হওয়ার ফলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার দাবি রাখে। তবে ‘মতান্তরে দুই লক্ষ পয়গাম্বর’-এর তেমন কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের অন্যতম হাদিসবিশারদ এবং প্রথিতযশা আলেম মুফতি আবদুল মালেক দা. বা. রচিত ‘প্রচলিত ভুল’ গ্রন্থে ‘এক লক্ষ মতান্তরে দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার পয়গাম্বর’ বিষয়ে স্পষ্ট লিখেছেন, ‘আমি এটা অনেক তালাশ করেছি, কিন্তু কোথাও পাই নি। শেষে মোল্লা আলী কারী রহ.-এর ‘ইকদুল ফারাইদ ফী তাখরীজি আহাদীছি শরহিল আকাইদ’ গ্রন্থে (ক্রমিক নং ৩৭) এ উক্তি পেলাম যে, হাফেয জালালী রহ. বলেছেন- لم اقف عليه অর্থাৎ এ কথা আমি কোনো রেওয়ায়েতে পাই নি।’ সুতরাং হাদিস এবং বিজ্ঞ আলেমদের মতামতের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, আল্লাহ তাআলা প্রেরিত রাসুল এবং নবিদের নির্দিষ্ট সংখ্যা সর্বসম্মতভাবে প্রমাণিত নয়। আল্লাহ যতো নবি প্রেরণ করেছেন, অনির্দিষ্টভাবে তাদের সকলের ওপর ঈমান আনা আমাদের জন্য ফরজ ও ঈমানের অঙ্গ। শুধু সংখ্যা নির্দিষ্ট করে তাদের ওপর ঈমান আনয়নের বা অসর্থিতভাবে তাদের সংখ্যা নির্ধারণের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। আল্লাহ আমাদের সঠিক জ্ঞান দান করুন। হাফেজ মাওলানা সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর [হাফেজ মাওলানা সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর অনুসন্ধানী তরুণ লেখক। ধর্মদর্শন, ইতিহাস, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় মিথ, ইতিহাসের আড়ালের ইতিহাস নিয়ে কাজ করে থাকেন। ইতোমধ্যেই ইতিহাসভিত্তিক তার লেখা বেশকিছু বই প্রকাশ হয়েছে। প্রকাশের অপেক্ষায় আছে আরও কিছু গ্রন্থ। ইতিহাসের জানালা তার রচিত একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ। সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর ২০০৮ সালে জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া থেকে দাওরা হাদিস সম্পন্ন করেন। ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স সম্পন্ন করেছেন দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কর্মজীবনে সহযোগী সম্পাদক ছিলেন সাপ্তাহিক লিখনীতে। বর্তমানে তিনি ফ্রিল্যান্সিং লেখালেখিতেই নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন।]