ছবি সংগৃহীত

ইসলামে ভালো কাজে আদেশ এবং মন্দ কাজে নিষেধ করার গুরুত্ব

মিরাজ রহমান
সাংবাদিক ও লেখক
প্রকাশিত: ১১ নভেম্বর ২০১৪, ০০:২৫
আপডেট: ১১ নভেম্বর ২০১৪, ০০:২৫

ভালো কাজে আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ করা উত্তম চরিত্রের অন্যতম দিক। ইসলামি জীবন বিধানের অন্যতম ভালো গুণ। একজন মানুষের মাঝে এই গুণটি না থাকলে, তাকে একজন পরিপূর্ণ ভালো মানুষ বা পরিপূর্ণ ইমানদার বলা যাবে না। ইসলাম এই গুণটিকে বিশেষভাবে বিবেচনা ও চর্চা করার প্রতি উৎসাহিত করেছে। ইসলামে ভালো কাজে আদেশ এবং মন্দ কাজে নিষেধ করা গুরুত্ব ও মহাত্ম্য মহান আল্লাহতায়ালা সমগ্র মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একটি মহৎ উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে।প্রতিটি সৃষ্টির নেপথ্যে রয়েছ সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য। আর তা হলো মানব জাতি তার প্রভুর ইবাদত করার পাশাপাশি তার শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করবে এবং আল্লাহ প্রদত্ত বিধিবিধানগুলো মেনে চলবে। আল্লাহতায়ালা যেসব বিধিবিধান মানব জাতির জন্য নির্ধারণ করেছেন তার মধ্যে সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ প্রদান করা অন্যতম। আমরা নিজেকে ঈমানদার বলে পরিচয় দিই। কেননা আমরা আল্লাহ্র উপর ঈমান এনেছি। ঈমানদার পুরুষ অথবা ঈমানদার নারী হতে গেলে আমাদেরকে অবশ্যই ভাল কাজে আদেশ এবং মন্দ কাজে নিষেধ করতে হবে। আমাদের সমাজে অনেকেই ভাল কাজের আদেশ দিয়ে থাকেন কিন্তু মন্দ কাজে নিষেধ কেউই করেন না। সেক্ষেত্রে তারা ভয় পান। কিন্তু আল্লাহ্ ব্যাতিত অন্য কাউকে ভয় করলেই সেটা শিরক। সমগ্র পৃথিবী যখন কুফর, শিরক, অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও অসৎ কাজে নিমজ্জিত ছিল, মানুষ স্রষ্টাকে ভুলে গিয়েছিল, তখন আল্লাহ্তা’আলা পথভ্রষ্ট মানুষকে পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে মানবজাতির হিদায়তের জন্য পাঠালেন। নবীজি আজীবন মানুষকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করেছেন। মানুষের চরিত্র সংশোধনের গুরুদায়িতব অত্যন্ত ন্যায়-নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। সচ্চরিত্রবান বলতে উত্তম ও ভালো চরিত্রের অধিকারীকেই বোঝায়। নৈতিকতার পরিচর্চা বলতে এমন চিন্তা ও কাজকে বোঝায়, যা সদা সঠিক কল্যাণের পথ দেখায়। দুনিয়ায় অসংখ্য পথ ও মত রয়েছে। এর মধ্যে কোনটি মানুষের সহজাত প্রকৃতির সঙ্গে অধিকতর যুক্তিযুক্ত হয়, কোনটি গ্রহণ করলে মানুষের ইহকালীন জীবনে শান্তিশৃঙখলা ও কল্যাণ এবং পারলৌকিক জীবনে মুক্তি মেলে, কোন পথে চললে মানুষের সার্বিক চিন্তা-চেতনা ও কর্মে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়, সেই দিকনিদের্শনা দিয়েছে কালজয়ী আদর্শ ও পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান ইসলাম। ইসলামের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পর আর কোনো নবী আসবেন না, আর কোনো ঐশী ধর্মগ্রন্থও আসবে না। তাই সৎ কাজের আদেশ দান এবং অসৎ কাজে নিষেধ করার দায়িতব সর্বশেষ নবীর উম্মতের ওপর পড়েছে। এটি উম্মতে মুহাম্মদীর বৈশিষ্ট্য ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দায়িতব। শয়তান সব সময় মানুষকে ধোঁকা দিয়ে পাপ কাজের প্রতি আকৃষ্ট করে। এতে মানুষ কুপ্ররোচনায় পড়ে সৎ কাজ থেকে বিরত থাকে এবং অসৎ কাজে লিপ্ত হয়। এজন্য সব সময়ই মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দিতে হবে, উৎসাহ-অনুপ্রেরণা দিতে হবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে ও বাধা দিতে হবে। এটি ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। ইসলামই একমাত্র ভারসাম্যপূর্ণ সচ্চরিত্র গঠনের সঠিক পথ প্রদর্শন করেছে। শুধু নিজে ভালো কাজ করলেই হবে না, অন্যকেও সৎ কাজের কথা বলতে হবে। বিশেষ করে সমাজের সচেতন অংশ ধর্মীয় নেতারা তথা মসজিদের ইমামদের এ মহান দায়িতব পালন করতে সচেষ্ট হতে হবে। সামাজিক স্থীতিশীলতা সৃষ্টিতে সহায়ক ইহকালীন জীবনে যেসব সৎ কাজ রয়েছে, সেগুলো যথাযথভাবে নিজে পালন করা ও অন্যকে পালন করার জন্য সদুপদেশ দেওয়া এবং দুনিয়ায় যেসব অসৎ কাজ রয়েছে, সেগুলো থেকে নিজে বিরত থাকা ও অন্যকে বিরত রাখাই হলো মানবজীবনে উন্নতির একটি উপায়। মানুষ দুনিয়ায় সত্য কথা বলবে, আমানত রক্ষা করবে, ওয়াদা পালন করবে। শুধু নিজেই এগুলো মেনে চললে হবে না, বরং অপরকেও এসব সৎ কাজ পালন করার জন্য উপদেশ দিতে হবে। পক্ষান্তরে সে মিথ্য বলা থেকে দূরে থাকবে, কারও গীবত তথা পরচর্চা ও পরনিন্দা করবে না, কারও গচ্ছিত সম্পদ নষ্ট বা আত্মাসাৎ করবে না। ঘুষ, দুর্নীতি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, সন্ত্রাস, বোমাবাজি প্রভৃতি সামাজিক অনাচার বর্জন করবে এবং এসব অসৎ কাজ থেকে দূরে থাকার জন্য অন্য ব্যক্তিদেরও সৎ পরামর্শ ও সদুপদেশ দেবে। তাহলে মানবজাতি উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করবে। আল-কোরানের আলোকে ভালো কাজে আদেশ এবং মন্দ কাজে নিষেধ করা এক. পবিত্র কোরআনে আরও বলা হয়েছে, তোমাদের মাঝে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা সৎ কাজের প্রতি আহ্বান জানাবে, নির্দেশ দেবে ভালো কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই সফলকামী। আর তোমরা তাদের মতো হইও না, যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং নিদর্শনসমূহ আসার পর বিরোধিতা করতে শুরু করেছে। তাদের জন্য রয়েছে ভয়ঙ্কর আজাব। [সূরা আল ইমরান : ১০৪-১০] দুই. মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরানে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরাই পৃথিবীর সর্বোত্তম দল, যাদের মানুষের হেদায়েত এবং সংস্কার সাধনের জন্য কর্মক্ষেত্রে বের করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজে আদেশ কর এবং অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখ। আর আল্লাহ তায়ালার প্রতি ইমান রক্ষা করে চল [সুরা আল ইমরান : ১১০]। তিন. আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভাল কাজে আদেশ দেয় এবং মন্দ কাজে নিষেধ করে। নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে। এদেরই উপর আল্লাহ তা’আলা দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশীল, সুকৌশলী। [সুরা আত তওবা : ৭১] চার. মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, তোমরা হলে উত্তম জাতি, তোমাদের মানব জাতির কল্যাণে সৃষ্টি করা হয়েছে, তোমরা সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে। আর আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে।[সূরা : আল-ইমরান : ৭৭] পাচ. হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার পরিজনকে আগুন হতে বাঁচাও, যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর; যেখানে রয়েছে নির্মম ও কঠোর ফেরেশ্তাকূল, যারা আল্লাহ তাদেরকে যে নির্দেশ দিয়েছেন সে ব্যাপারে অবাধ্য হয় না। আর তারা তাই করে যা তাদেরকে আদেশ করা হয়।’’[ সুরা তাহরিম : ০৬] ছয়. ‘হে আমার বৎস! তুমি নামাজ প্রতিষ্ঠা করো, সৎ কাজের আদেশ দাও, মন্দ কাজ হতে বিরত রাখো এবং বিপদে-আপদে ধৈর্যধারণ করো, নিশ্চয়ই এটা দৃঢ় সংকল্পের কাজ।’ [সূরা লুকমান : ১৭] আল হাদিসের আলোকে ভালো কাজে আদেশ এবং মন্দ কাজে নিষেধ করা এক. হজরত আবু সাঈদ খুদরি [রা.] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলকে [সা.] আমি বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মাঝে যে কোনো মন্দ কাজ হতে দেখবে, সে যেন তার হাত দ্বারা প্রতিরোধ করে। যদি সে এই (হাত দ্বারা প্রতিরোধ করার) শক্তি না রাখে, তবে যেন সে জিহ্বা দ্বারা প্রতিরোধ করে। সে যদি এই (জিহ্বা দ্বারা প্রতিরোধ করার) শক্তিও না রাখে, তবে যেন সে অন্তরের মাধ্যমে ঘৃণা করে। আর এটাই ইমানের দুর্বলতম অবস্থা। [মুসলিম] দুই. হজরত হুজায়ফা [রা.] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল [সা.] বলেছেন, ‘সেই আল্লাহর শপথ যার হাতে আমার জান! তোমরা অবশ্যই অবশ্যই ভালো কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজে নিষেধ প্রদান কর। অন্যথায় তিনি তোমাদের ওপর আজাব প্রেরণ করবেন আর তখন আল্লাহকে ডাকলেও তোমাদের ডাকে কোনো সাড়া দেবেন না তিনি। [তিরমিজি] তিন. রাসূল সাল্লাল্লাহু আ'লাইহিওয়াসাল্লাম বলেন, ‘সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা অবশ্যই ভালো কাজের আদেশ দিবে এবং খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করবে। নতুবা অনতিবিলম্বে আল্লাহ তা‘আলা নিজের পক্ষ থেকে তোমাদের উপর আযাব প্রেরণ করবেন। অতঃপর তোমরা তাঁর নিকট দো‘আ করবে কিন্তু তোমাদের দো‘আ কবুল করা হবে না’ । [তিরমিজি : হাদিস ৫১৪০] চার. হজরত জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা.)-কে এ কথা বলতে শুনেছি, যে জাতির মধ্যে কোনো এক ব্যক্তি পাপ কাজে লিপ্ত হয়, আর ওই জাতির লোকেরা শক্তি থাকা সত্ত্বেও তা থেকে বিরত রাখে না, আল্লাহ সে জাতির ওপর মৃত্যুর আগেই এক ভয়াবহ আজাব চাপিয়ে দেবেন। [আবু দাউ]) পাচ. রাসূল (সা.) বলেন, তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অন্যায় কাজ হতে দেখ, তাহলে তাকে হাত দ্বারা প্রতিহত কর, যদি তাতে অপারগ হও; তাহলে মুখে বল, যদি তাতেও অপারগ হও; তাহলে মনে মনে ঘৃণা কর, তবে এটা হলো দুর্বল ঈমানের পরিচয়। [মিশকাত শরিফ] ভালো কাজে আদেশ এবং মন্দ কাজে নিষেধ করার কিছু নীতিমালা ভালো কাজে আদেশ এবং মন্দ কাজে নিষেধ প্রদান করার জন্য পবিত্র কোরান ও হাদিসের মাধ্যমে বিশেষ কিছু নীতিমালা ও আদব বাতিয়েছে ইসলাম। কারণ এভাবে সরাসরি আদেশ ও নিষেধ প্রদানে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। তাই ইসলাম আমাদের খুব সতর্কতার সঙ্গে এবং আদব রক্ষা করে এই গুণটি চর্চার নির্দেশ দিয়েছেন। আদবগুলো হলো : ১. হিকমত বা কৌশল অবলম্বন করা। ২. বিতর্ক সৃষ্টিকারী উপায় ত্যাগ করা। ৩. নম্র স্বভাব অবলম্বন ও উগ্রতা পরিহার করা। ৪. ব্যক্তিগত ‘বল’ প্রয়োগের মানসিকতা ত্যাগ করা। ৫. কোনো প্রকার ‘একগুঁয়েমি’ বা কঠোর মানসিকতা লালন না করা। মাওলানা মিরাজ রহমান