ছবি সংগৃহীত

আলোচিত দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০১৩ পাস

priyo.com
লেখক
প্রকাশিত: ১০ নভেম্বর ২০১৩, ১৪:৩২
আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০১৩, ১৪:৩২

অবশেষে শেষ সময়ে এসে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুত দুর্নীতি নির্মূলের অঙ্গীকার পূরণ করল মহাজোট সরকার। তিন বছর অপেক্ষার পর রোববার জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে বহুল আলোচিত দুর্নীতি দমন কমিশন বিল। ডেপুটি স্পিকার শওকত আলীর সভাপতিত্বে রোববার জাতীয় সংসদের ১৯তম অধিবেশনে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০১৩ বিল পাস হয়েছে। সংসদ কার্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বিলটি পাস করার জন্য সংসদে উত্থাপন করেন। বিল পাসের আগে বিলের ১, ৪, ৫ ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১,১২ ধারায় আনিত সরকারদলীয় সদস্য উবায়দুল মুকতাদির চৌধুরী, নূরুল ইসলাম সুজন ও জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নুর আনা সংশোধনী গৃহীত হয়। তবে বিলের সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপনের সময় মাইক বন্ধ করে দেয়ায় উবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরী বিলের ১২ দফা উত্থাপন করতে পারেননি। পরে স্পিকার মাইক দিলে তিনি বলেন, “আমি আর কোনো সংশোধনী উত্থাপন করব না।” পরে সংসদে অনুত্থাপিত ১২ দফার সংশোধনীসহ বিলটি সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়। ২০০৪ সালে প্রণীত এই আইনিটি সংশোধনের জন্য ২০১১ সালের ২৮ ফেব্রয়ারি বিলটি সংসদে উত্থাপিত হয়। সংসদীয় কমিটি বিলটিতে ১৩টি সংশোধনী আনেন। সরকারি কর্মচারী, জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ‘ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৯৭ এর বিধান আবশ্যিকভাবে প্রতিপালন করতে হবে’। অর্থাৎ সরকারি কর্মচারী, জজ ও ম্যাজিস্ট্রেটদের বিরুদ্ধে সরকারের অনুমোদন ছাড়া দুর্নীতির মামলা দায়ের করা যাবে না- এমন বিধান রেখে বহুল আলোচিত ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। নতুন আইনে দূর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) শক্তিশালী করতে দুদক আইনকে সবার উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ফৌজদারী কার্যবিধি বা অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকের অনুমোদন এছাড়া দুদক মামলায় কোনো ব্যক্তির জামিন চাইলে আদালত কমিশনকে যুক্তিসংগত সময় না দিয়ে শুনানি গ্রহণ করা যাবে না মর্মে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। দুদক আইনের ৩৩-এর উপধারা ৫ সংযোজন করে বলা হয়েছে দুদক গৃহীত যেকোনো কার্যক্রমের যেকোনো পর্যায়ে কোনো আদালতে কেউ কোনো প্রতিকার চাইলে মামলায় দুদককে পক্ষভুক্ত করতে হবে। আইনে তথ্য প্রদানকারীর পরিচয়কে সংরক্ষণ দেয়া হয়েছে। তবে মিথ্যা তথ্য প্রদান করলে আইন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গৃহীত উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরীর আনা বিলের সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ২০০৪ সালের ৫ নং আইনের ধারা ৩২-এর পরিবর্তে নিম্নরূপ ৩২ ধারা প্রতিস্থাপিত হবে, (১) ফৌজধারী কাযৃবিধি বা আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, নির্ধারিত পদ্ধতিতে কমিশনের অনুমোদন ব্যতিরেকে কোনো আদালত এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ বিচার্থে আমলে নেয়া যাবে না।’ ৩২ (ক)-তে বলা হয়েছে, এই আইনের অধীন সরকারি কর্মচারী, জজ ও ম্যাজিস্ট্রেটদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ‘ফৌজদারী কার্যবিধির ধারা ১৯৭ এর বিধান আবশ্যিকভাবে প্রতিপালন করতে হবে’। অর্থাৎ সরকারি কর্মচারী, জজ ও ম্যাজিস্ট্রেটদের বিরুদ্ধে সরকারের অনুমোদন ছাড়া দুর্নীতির মামলা দায়ের করা যাবে না। সংসদে বিলের আট দফা বর্জনের সংশোধনী গৃহীত হওয়ার ফলে মূল আইনের ২৩-ক উপধারা যোগ করে স্থায়ী কমিটির সুপারিশকৃত আইনের ‘অন্য কোনো আইন যা-ই থাকুক না কেন, দুর্নীতি প্রতিরোধের বিষয়ে মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক, র্যা ব, পুলিশসহ সরকার কর্তৃক ঘোষিত প্রতিষ্ঠান কমিশনকে তথ্য প্রদান করবে। যথা সময়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না করলে বা স্ব উদ্যোগে তথ্য প্রদানে ব্যর্থ হলে আইনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষে বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান’ বিল থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। সংশোধিত আইনে নতুন করে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বিষয়টি সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে দেশে-বিদেশে সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পত্তির বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে। বিলে দুদক আইনকে প্রাধান্য দিতে মূল আইনের ‘২ক’ উপধারা সংযোজন করে বলা হয়, ‘আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছু থাক না কেন, এ আইনের বিধানাবলি প্রাধান্য পাবে। আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি দেয়া তথ্য দেওয়ানী বা ফৌজদারী আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ কার যাবে না। এছাড়া কোনো সাক্ষীকে অভিযোগকারীর পরিচয় প্রকাশ করতে বাধ্য করা যাবে না। তবে অপরাধের পূর্ণ তদন্তের পর আদালত যদি মনে করে, মিথ্যা তথ্য প্রদান করা হয়েছে বা তথ্য প্রদানকারীর পরিচয় প্রকাশ করা ছাড়া ন্যায় বিচার করা সম্ভব নয়, তাহলে আদালত পরিচয় প্রকাশ করতে পারবে। তবে কমিশন বা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বা সাধারণ নাগরিক যে কেউ উচ্ছাকৃতভাবে কোনো মিথ্যা তথ্য প্রদান করলে আইনের ২৮ (গ) ধারার (২)-এর ১ উপধারায় অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন এবং কমপক্ষে দুই বছর এবং সবোর্চ পাঁচ বছরের জন্য সশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থ দন্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। বিলে দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুদক আইনের অধীন অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রেও সংশোধনী আনা হয়েছে। বিলে বলা আছে, কমিশন নিজে তাদের অপরাধ তদন্ত করতে পারবে না। দুদক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অপরাধ তদন্তের দায়িত্ব পুলিশ বা অন্য কোনো সংস্থাকে দিতে হবে। দায়িত্ব পাওয়ার ১৮০ কার্য দিবসের মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তদন্ত কাজ শেষ করতে হবে। এসময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে না পারলে তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন আরো ৯০ কার্য দিবস সময় বাড়াতে পারবে। আইনের ৩৩ ধারা সংশোধন করে দুদককে আদালতে মামলায় পক্ষভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ‘দুদক থেকে দায়ের করা মামলায় অথবা দুদক কর্তৃক গৃহীত যে কোন কার্যক্রমের যে কোন পর্যায়ের আদালতে কেউ কোন প্রতিকার প্রার্থনা করলে দুদককে পক্ষভুক্ত করতে হবে। এছাড়া দুদক কর্তৃক দায়ের করা কোন মামলায় বা কোন কার্যক্রমে কোন ব্যক্তি জামিন কিংবা অন্য কোন প্রকার প্রতিকার প্রার্থনা করলে দুদককে শুনানির জন্য যুক্তিসঙ্গত সময় প্রদান না করে শুনানি গ্রহণ করা যাইবে না’। উল্লেখ্য, বর্তমানে দুদককে পক্ষভুক্ত না করায় দুর্নীতি মামলার আসামিরা সুবিধা পাচ্ছেন। বিলটিতে বলা হয়, দুদক আইনে মামলা দায়েরের সময় কমিশনের এবং ক্ষেত্র বিশেষে কমিশন ও সরকারের যৌথ অুনমোদনপত্রের কপি আদালতে দাখিল করতে হবে। এছাড়া ফৌজদারী কার্যবিধি বা আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, নির্ধারিত পদ্ধতিতে কমিশনের অনুমোদন ছাড়া কোনো আদালত দুদক আইনের অধীন অপরাধ আমলে নিতে পারবেনা বলেও বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। দুদক আইনের অধীন অপরাধসমূহ আমলযোগ্য, অ-আপোষযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য হবে বলেও বিধান রাখা হয়েছে। আইনের ২৮ ধারার সংশোধন করে ২৮ক, ২৮খ ও ২৮গ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। ২৮কতে বলা হয়েছে, ‘দুদকের অনুসন্ধান, তদন্ত, মামলা ও চার্জশিটে আনীত অপরাধের তিন ধরনের হবে। যেমন, আমলযোগ্য, অ-আপসযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য’। বর্তমানে দুদক আইনে এই ধারাটি সরাসরি না থাকায় সুবিধা পাচ্ছেন আসামিরা। ২৮খতে তথ্য প্রদানকারীর পরিচয় গোপন রাখার কথা বলা হয়েছে এবং মিথ্যা তথ্য প্রদানে দণ্ড রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘মিথ্যা তথ্য প্রমাণ হলে তথ্য প্রদানকারীর দুই থেকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড হবে। তথ্য প্রদানকারী কমিশনের বা সরকারি কর্মকর্তা হলে কারাদণ্ড ছাড়াও বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে’। আইনের সংশোধিত ১৯ ধারার ‘ক’ উপধারায় বলা হয়েছে- ‘সাক্ষীর সমন’ শব্দের পরিবর্তে ‘সাক্ষীর প্রতি নোটিশ’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হইবে এবং ‘পরোয়ানা’ শব্দের পরিবর্তে ‘নোটিশ’ শব্দ প্রতিস্থাপিত হইবে’। এতে ওই সমন আদালতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আইনের সংশোধিত ২৩ ধারায় বলা হয়েছে, ‘দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজের সুবিধার জন্য সরকারের অধীন যে কোন কর্তৃপক্ষ বা সংস্থা থেকে যেকোনো প্রতিবেদন বা তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও পারদর্শী এক বা একাধিক কর্মকর্তার সহায়তা চাইতে পারবে’। মহাজোট সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে, দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) শক্তিশালী করা হবে। ২০০৯ সালে দুদককে কার্যকর করতে শক্তিশালী আইন করার উদ্যোগও নেয়া হয়। বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাবকে এর মধ্যে বারবার সংশোধন করা হয়। বিলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদককে আরও শক্তিশালী, জবাবদিহিতাসম্পন্ন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে দুদক আইন, ২০০৪- এর অধিকতর সংশোধনের উদ্দেশে বিলটি আনা হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনের মাধ্যমে দুদকের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে বলেও দাবি করা হয়।