প্যাকেটের বর্জ্য, উৎপাদকের দায়িত্ব
চিপস খাওয়া শেষ। প্যাকেটটি ছুঁড়ে ফেলা হলো রাস্তার পাশে। চানাচুরের প্যাকেট খালি হতেই সেটিও পড়ে রইল ফুটপাতের ওপর। সিগারেটের শেষ টান দিয়ে অবশিষ্টাংশ ফেলে দেওয়া হলো ফুটপাতে, নর্দমায়। বাসে বসে বিস্কুট খেতে খেতে কেউ জানালা দিয়ে প্যাকেট ছুড়ে দিলেন। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কেউ পানির বোতল ফেলে গেলেন। এভাবেই প্রতিদিন আমাদের চারপাশে জমছে নানা ধরনের বর্জ্য। নোংরা হচ্ছে সড়ক, ফুটপাত, নর্দমা, নদী। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ।
অথচ এই দৃশ্যের দিকে তাকালে আমরা সাধারণত দায়ী করি অসচেতন নাগরিকদের। নিঃসন্দেহে যারা যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলছেন, তাদের দায় রয়েছে। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ চিপস, চানাচুর, বিস্কুট, চকলেট, পানীয় ও সিগারেট বিক্রি করছে, তাদের কি কোনো দায় নেই? পণ্য বিক্রির জন্য যে প্যাকেট বা মোড়ক ব্যবহার করা হচ্ছে, তা ব্যবহারের পর কোথায় যাচ্ছে, পরিবেশের কী ক্ষতি করছে এবং সেগুলো সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার দায় কে নেবে, এসব প্রশ্নও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একটি কোম্পানি পণ্য উৎপাদন করে, আকর্ষণীয় মোড়কে বাজারজাত করে, বিজ্ঞাপন দেয় এবং পণ্য বিক্রি করে ভোক্তার কাছ থেকে অর্থ উপার্জন করে। কিন্তু পণ্যটি ব্যবহারের পর তার মোড়কটি যখন বর্জ্যে পরিণত হয়, তখন ওই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পুরো দায় কেন সাধারণ মানুষ কিংবা সরকারের ওপর বর্তাবে? কোম্পানির পণ্য বিক্রির সঙ্গে যদি প্যাকেটের ব্যবহার ও বর্জ্য সৃষ্টি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত থাকে, তাহলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কোম্পানিরও দায়িত্ব থাকা উচিত।
ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন কয়েক লাখ প্যাকেট বাজারে ছাড়ছে। পণ্য সমৃদ্ধ প্যাকেটগুলো বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি লাভ করছে। কিন্তু খালি প্যাকেটগুলো রাস্তার পাশে পড়ে থাকলে সেগুলো সংগ্রহ, পরিবহন ও পরিষ্কার করার ব্যয় বহন করছে কে? পরিচ্ছন্নতাকর্মী, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা কিংবা সরকার। শেষ পর্যন্ত এই ব্যয়ের অর্থ আসে জনগণের কর ও সরকারি সম্পদ থেকে। অর্থাৎ, পণ্য বিক্রির মুনাফা পাচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠান, অথচ পণ্যের মোড়ক থেকে সৃষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয়ের বড় অংশ বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা জরুরি। উৎপাদককে তার পণ্যের সম্পূর্ণ জীবনচক্র সম্পর্কে দায়িত্বশীল হতে হবে। শুধু কারখানা থেকে পণ্য বের করা কিংবা বাজারে পৌঁছে দেওয়াই শেষ কথা নয়। পণ্য ব্যবহারের পর সৃষ্ট বর্জ্য কীভাবে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা নিরাপদে নিষ্পত্তি করা হবে, সে বিষয়েও উৎপাদককে পরিকল্পনা করতে হবে।
আন্তর্জাতিকভাবে এই ধারণা ‘উৎপাদকের সম্প্রসারিত দায়িত্ব’ (ইপিআর) নামে পরিচিত। এর মূল দর্শন হলো, পণ্য ব্যবহারের পর সৃষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আর্থিক ও সাংগঠনিক দায় উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকদের ওপরও বর্তাবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে নাগরিকেরা যত্রতত্র ময়লা ফেলার স্বাধীনতা পাবেন। বরং নাগরিকের দায়িত্ব এবং উৎপাদকের দায়িত্ব, দুটিই পাশাপাশি কার্যকর থাকবে।
প্যাকেটজাত পণ্যের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে। ইউরোপের একাধিক দেশে উৎপাদকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে প্যাকেজিং বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যেসব প্রতিষ্ঠান প্যাকেটজাত পণ্য বিক্রি করে, তাদের প্যাকেটের বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের খরচও বহন করতে হয়। প্যাকেটের ধরন অনুযায়ী এই খরচ নির্ধারিত হয়, যাতে কোম্পানিগুলো অপ্রয়োজনীয় প্যাকেট কমায় এবং পরিবেশবান্ধব মোড়ক ব্যবহারে উৎসাহিত হয়। সুইডেনেও প্যাকেজিং উৎপাদকদের দায়বদ্ধতার আওতায় আনা হয়েছে।
এ ধরনের ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উৎপাদকদের আর্থিক দায় শুধু বর্জ্য অপসারণেই সীমাবদ্ধ থাকে না। প্যাকেজিংয়ের ধরন ও পরিবেশগত প্রভাবের ভিত্তিতে ফি নির্ধারণ করা হলে সহজে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহারে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎসাহিত হতে পারে। বিপরীতে, পুনর্ব্যবহার করা কঠিন কিংবা ব্যয়বহুল মোড়কের জন্য বেশি ব্যয় বহন করতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলো প্যাকেটের নকশা পরিবর্তনের কথা ভাববে। এতে পরিবেশ দূষণ সৃষ্টির আগেই সমস্যাটি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
- প্যাকেট