বাংলাদেশের ওষুধশিল্প কি এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে?
বাংলাদেশের ওষুধশিল্প দেশের অন্যতম সফল শিল্প খাত। একসময়ের আমদানি নির্ভর একটি খাত থেকে আজ দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধের চাহিদা স্থানীয়ভাবে পূরণের সক্ষমতা অর্জন করেছে এই শিল্প। বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ, সরকারি নীতি সহায়তা, ১৯৮২ সালের যুগান্তকারী ওষুধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, দক্ষ জনবল যেমন, গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের পর্যাপ্ততা এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে বাংলাদেশের মেধাস্বত্ব সুবিধা ভোগ করার সুবিধা।
সুখবর হলো ৩০ অক্টোবর ২০২৬ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২৪ নভেম্বর ২০২৬-এর পরিবর্তে ২৪ নভেম্বর ২০২৯ নির্ধারণ করেছে। এলডিসি উত্তরণের ফলে দেশের ওষুধ শিল্পকে যে সকল ঝুঁকি সামলাতে হতো তা উত্তরণের জন্য এ তিন বছর অতিরিক্ত সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এলডিসি অন্তর্ভুক্ত থাকার কারণে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিসমূহ কী ধরনের সুবিধা পায় এবং ২০২৯ এলডিসি থেকে উত্তীর্ণ হলে এসব সুবিধা কমে যাওয়ার কারণে ওষুধশিল্পে ও জনস্বাস্থ্যে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে এবং এ তিন বছর কীভাবে প্রস্তুতি নিলে ঝুঁকি কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে তা আলোচনা করা জরুরি।
তবে, এলডিসি উত্তরণের প্রভাব বুঝতে বিশ্বে যে ওষুধগুলো বাজারজাত হয়, সেগুলোর ধরন সম্পর্কে আলোকপাত করা দরকার। বিশ্বব্যাপী বাজারজাতকৃত ওষুধসমূহ তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করা যেতে পারে, প্যাটেন্টকৃত ওষুধ, জেনেরিক ওষুধ এবং ব্র্যান্ডেড জেনেরিক ওষুধ।
কোনো কোম্পানি নতুন একটি ওষুধের মলিকিউল আবিষ্কার করে প্রয়োজনীয় গবেষণা, প্রাক-ক্লিনিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা এবং রেগুলেটরি অথোরিটির অনুমোদনের মাধ্যমে বাজারজাত করলে সেটি উদ্ভাবিত বা অরিজিনেটর ওষুধ হিসেবে পরিচিত হয়। উদ্ভাবনের ওপর অরিজিনেটর কোম্পানি প্যাটেন্ট করে থাকলে সাধারণত প্যাটেন্ট আবেদনের সময় থেকে ২০ বছর অন্য কোম্পানি অরিজিনেটর কোম্পানির অনুমতি ছাড়া সে ওষুধ উৎপাদন করতে পারে না।
অন্যদিকে, কোনো ওষুধের সক্রিয় উপাদান বা জেনেরিক নামের ভিত্তিতে অন্য কোম্পানি বৈধভাবে একই জেনেরিকের ওষুধ তৈরি করতে পারে। জেনেরিক নামের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া এ ধরনের ওষুধকে জেনেরিক ওষুধ বলে। এক্ষেত্রে প্রস্ততকারক কোম্পানি কোনো ব্র্যান্ড নাম বা ট্রেড নাম ব্যবহার করে না। বিশ্বে অধিকাংশ দেশেই বেশিরভাগ ওষুধ ব্র্যান্ড নাম ছাড়াই জেনেরিক নামে উৎপাদিত ও বিক্রয় হয়।
জেনেরিক ওষুধ বৈধভাবে উৎপাদন করতে ওষুধের প্যাটেন্টের মেয়াদ শেষ হতে হয় অথবা প্যাটেন্টের সময় শেষ না হয়ে হলে আবিষ্কারক কোম্পানি থেকে ফি প্রদানের মাধ্যমে উৎপাদনের অনুমতি পেতে হয়। তবে, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার কারণে বাংলাদেশ ও অন্যান্য এলডিসিভুক্ত দেশ ২০০১ সাল থেকে ‘বাধ্যতামূলক লাইসেন্স’ এবং ‘সমান্তরাল আমদানি’ এর সুবিধা পেয়ে আসছে।
বাধ্যতামূলক লাইসেন্স-সুবিধার মাধ্যমে বাংলাদেশ কোনো আইনগত বাধা ছাড়াই প্যাটেন্ট ওষুধের জেনেরিক ভার্সন উৎপাদন, আমদানি ও রপ্তানি করতে পারে। আর সমান্তরাল আমদানি সুবিধার মাধ্যমে প্যাটেন্টের অধিকারী কোম্পানির অনুমতি ছাড়াই অন্য দেশ থেকে প্যাটেন্ট ওষুধ আমদানি করতে পারে।
অন্যদিকে যে ব্র্যান্ডেড জেনেরিক ওষুধ হলো কোনো ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি নিজস্ব নির্বাচিত ও নিবন্ধিত ব্র্যান্ড নামে উৎপাদনকৃত ও বাজারজাতকৃত ওষুধ। এ ধরনের ওষুধে একই সক্রিয় উপাদান থাকে, তবে বিভিন্ন কোম্পানি ভিন্ন ভিন্ন ব্র্যান্ড নামে বাজারজাত করতে পারে। যেমন প্যারাসিটামল একটি জেনেরিক নাম। বাংলাদেশে নাপা ও এইস হলো প্যারাসিটামলের দুটি জেনেরিক ব্র্যান্ড। দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বের আরও কিছু দেশে জেনেরিক ব্র্যান্ডের প্রচলন বেশি। আমাদের দেশে ওষুধের প্রায় শতভাগই ব্রান্ডেড জেনেরিক।
- ট্যাগ:
- মতামত
- উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ