কার্পেটের নিচের ময়লা বেরিয়ে পড়েছে
শিল্প, সাহিত্য, ফ্যাশন, রুচিবোধ আর সুগন্ধির দেশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ফ্রান্সের বাতাস আজকাল যেন অন্য এক গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে। আবর্জনার স্তূপে আগুন, পোড়া বর্জ্যের ধোঁয়া আর কাঁদানে গ্যাসের ঝাঁজালো গন্ধে ক্রমেই দূষিত হচ্ছে সেই চেনা পরিবেশ। প্রতি সপ্তাহেই কোথাও না কোথাও এক বা একাধিক বিক্ষোভের ডাক আসছে। আর সেই ডাকে সাড়া দিয়ে রাজপথে নেমে আসছেন লাখ লাখ নাগরিক। যে দেশের পরিচয় একসময় শিল্প-সংস্কৃতি, সৌন্দর্য আর জীবনবোধের অনন্যতায়, সেই দেশের রাজপথ আজ যেন জমে ওঠা ক্ষোভ, হতাশা ও প্রতিবাদের এক বিশাল মঞ্চ।
শুরু হয়েছিল অনেকটা সাদামাটাভাবে, গত ২১ সেপ্টেম্বর প্যারিসের উপকণ্ঠ ক্রাতেইয়ে। একটি হাইস্কুলে শিক্ষক সংকটকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু শিক্ষার্থী রাস্তায় নামে। ছোট একটি আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল মাত্র। ফরাসি সমাজের গভীরে অসন্তোষের আগুন অনেক দিন ধরেই ধিকিধিকি জ্বলছিল; জনরোষের বারুদের স্তূপও তৈরি ছিল। আর সে কারণেই যা ঘটার ছিল তাই ঘটেছে। দ্রুত সেই ক্ষোভের আগুন পুরো প্যারিস অঞ্চল ছাড়িয়ে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
সব থেকে খারাপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় গত ১৭ অক্টোবর। পুরো ফ্রান্সে এমন সহিংস রূপ সহসা দেখা যায়নি। সেদিন ছাত্রদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের শিক্ষক, অভিভাবক, বিভিন্ন পেশাজীবীও অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁদের অসন্তুষ্টি, মনের কোণে জমে থাকা বহুদিনের ক্ষোভ উগরে দেওয়ার জন্য। জন-অসন্তোষের এই উত্তাল পরিস্থিতির সুযোগে রাস্তায় নেমে আসে একদল মুখোশধারী এবং অতিমাত্রায় সহিংস লুটেরা। প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরের বহু দোকানপাট লুট করা হয়। ভাঙচুরের ঘটনা আর আগুনের লেলিহান শিখা থেকে রক্ষা পায়নি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। আক্রমণ করা হয় সরকারের স্থানীয় প্রতিনিধির সরকারি বসতবাড়িতে। পুড়িয়ে দেওয়া হয় ফ্রান্সের মধ্যাঞ্চলীয় শহর লিমোজের প্রায় দেড় শ বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপত্যসৌকর্যের নিদর্শন পৌরভবন।
ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নাগরিক গৌরবের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক এই বিশাল ভবনটি কোনো সাধারণ ভবন নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় প্রতীক। একটি রাষ্ট্রীয় প্রতীকে অগ্নিসংযোগের এমন দুঃখজনক ঘটনা ফরাসি সমাজের গভীর ক্ষতকে জাগিয়ে তুলেছে। সমাজ যে ধুঁকছে তা আর ধামাচাপা দিয়ে রাখা যাচ্ছে না। এটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার, সামাজিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সহিংসতার বিপজ্জনক পরিণতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এমন জনরোষের কারণ কী? কারণ হিসেবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে সাধারণ নাগরিকদের জীবন অনেকটাই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তরুণেরা যেমন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তেমনই এ দেশের মানুষেরা তাদের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সমীকরণ মেলাতে পারছে না।
ফ্রান্সের জাতীয় ঋণের বোঝা সহনীয় পর্যায়ে নেই, দিন দিনই বাড়ছে। জাতির কাঁধে সিন্দাবাদের ভূতের মতো চেপে বসেছে এই লাগামহীন ঋণের কষ্টকর বোঝা। ফ্রান্স ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি, শিল্পোন্নত রাষ্ট্র এবং শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার দেশ। নাগরিকদের জন্য বিনা মূল্যে বা স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বেকার, প্রতিবন্ধী ভাতা, আবাসন সহায়তা, পেনশনসহ নানা সামাজিক সুবিধা দেশটি একটি কল্যাণরাষ্ট্রের আদর্শ উদাহরণ। কিন্তু এই সামাজিক সুরক্ষার বিপরীতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়, বাজেট ঘাটতি এবং জাতীয় ঋণের পরিমাণও ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে ফ্রান্সের অর্থনীতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সরকারবিরোধী বিক্ষোভ