৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক ও বর্তমান প্রেক্ষিত
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি ঘটনাবহুল ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক গতিপথে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটায়। দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকট, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্যে সিপাহি-জনতার সম্মিলিত অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। এ দিনের ঘটনাবলি পরবর্তী সময়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ধারার পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে।
তবে ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য কেবল অতীতের একটি রাজনৈতিক ঘটনা স্মরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় ঐক্য, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার, সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার প্রশ্নে এ দিবসের শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে জাতীয় সংহতি ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশার সঙ্গে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার তুলনামূলক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনেক লম্বা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশ গভীর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটে পড়ে। খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। একই দিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। সেনাবাহিনীর ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে।
এমন পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বর ভোরে সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়। জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে কর্নেল আবু তাহেরের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। বিদ্রোহী সৈনিকদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের একটি অংশ রাজপথে নেমে আসে। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। অভ্যুত্থানের ফলে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটে এবং জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে চলে আসেন। তবে এ সময় কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন এবং পরবর্তী সময়ে কর্নেল তাহেরকে সামরিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ফলে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে বিপ্লব, সংহতি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও রক্তপাত, সবকিছুরই উপস্থিতি ছিল।
এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষের উদ্দেশ্য এক ছিল না। সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে বৈষম্য ও অসন্তোষ দূর করার আকাঙ্ক্ষা, জাসদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরিকল্পনা এবং জিয়াউর রহমানকে কেন্দ্র করে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক উদ্দেশ্য একই ঘটনাপ্রবাহে মিলিত হয়েছিল। ফলে ৭ নভেম্বরকে একমাত্রিকভাবে ব্যাখ্যা না করে এর বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে জিয়াউর রহমানের মুক্তি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার এবং স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে তাঁর জাতীয় পরিচিতি ছিল। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দর্শন সামনে নিয়ে আসেন।
তাঁর শাসনামলে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, বেসরকারি খাতের বিকাশ, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন, বিদেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরির প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে সার্ক প্রতিষ্ঠার ধারণা আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস